লুম্বিনী

চঞ্চলকুমার ঘোষ

কপিলাবস্তু থেকে হিউ-এন-সাঙ চলেছেন লুম্বিনীর দিকে। তার প্রায় হাজার বছর আগেকার কথা।

৬২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের এক বৈশাখী পূর্ণিমা। সেদিন কপিলাবস্তুর মহারানি মায়া দেবী শিবিকায় করে চলেছেন পিতার গৃহে। চলতে চলতে তঁারা এসে পড়েছেন চুরিয়া পর্বতমালার পাদদেশে_সেদিন পাদদেশে লুম্বিনী গ্রামের শালবনে হঠাৎ প্রসববেদনা উঠল মায়া দেবীর। শিবিকা থেকে নেমে এক গাছের তলায় এসে দাঁড়ালেন মায়া দেবী। সেখানেই জন্ম হল বিষ্ণুর নবম অবতার ভগবান বুদ্ধের।

ভগবান বুদ্ধের জন্মকথা পড়তেই অমিতাভের মনে পড়ল কয়েক বছর আগে সেও গিয়েছিল লুম্বিনী। সেদিনও ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা, বুদ্ধদেবের জন্মতিথি। নেপালের পশ্চিম সীমান্তে লুম্বিনী। সামান্য দূরে ভারত সীমান্ত। কলকাতা থেকে প্রথমে গিয়েছিল ভারতের সীমান্ত শহর সোনেউলি। সেখান থেকে রিকশায় চার কিলোমিটার দূরে নেপালের শিল্প শহর ভৈরোয়া। বাসস্ট্যান্ডে অনেক মানুষের ভিড়। বুদ্ধজয়ন্তী উপলক্ষ্যে বেশিরভাগ মানুষেরই গন্তব্যস্থল লুম্বিনী। সকলের পরনে নতুন জামাকাপড়। হাতে পুজোর ফুল ফল। অন্যদিন এক ঘণ্টা অন্তর বাস ছাড়ে, আজ পনেরো মিনিট অন্তর বাস ছাড়ছে। নেপালি একদল বরযাত্রীও চলেছে। অল্পবয়সি বর, মাথায় পাগড়ি, গলায় ফুলের মালা সঙ্গে শিঙা ড্রাম। এই দিনটা শুধু বৌদ্ধদের কাছে নয়, নেপালিদের কাছেও পরম পবিত্র দিন। ভৈরোয়া ছোটো শহর। অনেক বিদেশিও এসেছেন। ভৈরোয়া থেকে লুম্বিনী বাইশ কিলোমিটার। ভালো রাস্তা। এক ঘণ্টায় পৌঁছে গেল লুম্বিনী। বাসস্ট্যান্ডের কাছেই দুটি বৌদ্ধ মনাস্ট্রি। সেখানে মানুষের ভিড়। শুধু ভারত বা নেপাল নয় সারা বিশ্ব থেকে মানুষ এসেছেন। সকলেই শান্তভাবে চলেছেন। সামনে এক বৌদ্ধ মনাস্ট্রির ধ্বংসাবশেষ। এক পাশে কিছুটা অঞ্চল রেলিং দিয়ে ঘেরা। তার উপর ঢাকা দেওয়া। সকলের গন্তব্যস্থল সেখানে। এখানে ছোটো গহ্বরের মধ্যে রয়েছে কারুকার্য-করা একটি শিলা। বলা হয় এই শিলার উপরেই একদিন জন্ম নিয়েছিলেন গৌতম বুদ্ধ। তাই এই স্থান পৃথিবীর সকল বুদ্ধভক্তদের কাছে বড়ো পবিত্র। সারিবদ্ধভাবে মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সকলেরই চোখে-মুখে কী ব্যাকুলতা ওই পবিত্র শিলা একবার দর্শন করবার। কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। একে একে সকলে এগিয়ে চলেছেন। তারপর হাতের ফুল দিচ্ছেন ওই শিলার উপরে।

আরেক দিকে ছোট্ট টিলার উপর রয়েছে অশোক স্তম্ভ। সম্রাট অশোক এই স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। ভক্তরা টিলার উপর উঠে এই স্তম্ভে প্রণাম করছেন। টিলা থেকে নেমে একটু এগিয়ে বিশাল এক জলাধার। তার পাশেই বিরাট বট গাছ। সেখানে পুজোপাঠ চলছে। কয়েক জন বৌদ্ধ লামা পুথি পাঠ করছেন। বট গাছের নীচে বুদ্ধের মূর্তি। বহু পুরুষ-মহিলা সেখানে বসে রয়েছে। তঁারাও মন্ত্র পড়ছেন। আর মাঝে মাঝে হাতের ফুল ছুড়ে দিচ্ছেন বুদ্ধমূর্তির দিকে। মন্ত্রপাঠ শেষে উঠে যাবার সময় সেখানে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিচ্ছেন।

কাছেই আরেক গুম্ফা। তার মধ্যে রয়েছে সোনালি রঙের বিশাল বুদ্ধের মূর্তি। সেখানেও পুজো করছেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। তঁাদের মন্ত্র-উচ্চারণে চারদিক গমগম করছে। ভক্তের দল সারিবদ্ধভাবে প্রবেশ করছেন, প্রণাম করে মোমবাতি জ্বালিয়ে চলে যাচ্ছেন।

আরেকটি মনাস্ট্রির মধ্যে রয়েছে বুদ্ধদেবের মা মায়া দেবীর মূর্তি। ভক্তজনের ভিড় উপচে পড়ছে। যিনি ভগবান বুদ্ধের মতো মহামানবকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন তিনিও তো সাধারণ কেউ নন।

এত মানুষের সমাগমে ছোটোখাটো মেলা বসে গিয়েছে। বিক্রি হচ্ছে বুদ্ধের ধাতুর মূর্তি, পুতুল। চারদিকে রং-বেরঙের পতাকা উড়ছে। মানুষজনের পরনেও বিচিত্র রঙের পোশাক। পুরো লুম্বিনী জুড়ে যেন উৎসব। দিন ফুরিয়ে রাত নামে নামে। আকাশে গোটা থালার মতো চাঁদ। তার আলোয় ভেসে চলে সারাটা লুম্বিনী।

ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসে অমিতাভ। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। হাতে রাখা বইটা খোলে। মন আবার হিউ-এন-সাঙ-এর সঙ্গী হয়। সেও তো চলেছে সেই মহাপরিব্রাজকের সঙ্গে।

সম্রাট অশোক তঁার রাজত্বকালের বিংশতি বছরে সন্ন্যাসী উপগুপ্তকে নিয়ে লুম্বিনী এসেছিলেন। সেখানে তিনি স্তূপ ও স্তম্ভ নির্মাণ করে অনুশাসন লিখে যান। তিনি লুম্বিনী গ্রামের অধিবাসীদের রাজকরও মকুব করে দেন।

হিউ-এন-সাঙ যখন এখানে এসেছিলেন চারিদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ। সামান্য কয়েক জন ছাড়া জনমানবহীন অঞ্চল। এখানে রাত্রিবাস করে আবার এগিয়ে চললেন। পথে রামগ্রাম। এখানে ছিল শ্রমণের বিহার। একজন মাত্র সন্ন্যাসী সেখানে বাস করেন। বিস্মিত হিউ-এন-সাঙ জিজ্ঞাসা করলেন, এই জনমানবহীন প্রান্তরে কে বিহার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ?

সন্ন্যাসী বললেন, আগে এই অঞ্চল জুড়ে ছিল গভীর অরণ্য। আশপাশে কোথাও মানুষের বসতি ছিল না। একদিন এক বৌদ্ধ শ্রমণ এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তঁার চোখে পড়ল একটি হাতি এক জায়গায় শুঁড় দিয়ে ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার করছে। কৌতূহলে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়লেন শ্রমণ। খানিক পরেই ঝোপের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল এক ভগ্নস্তূপ। অল্প দূরে এক জলাধার থেকে জল নিয়ে এসে স্তূপটি পরিষ্কার করুল হাতিটা। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন শ্রমণ। মনে হল বনের এক পশু যদি ভগবান বুদ্ধের এই স্তূপের পরিচর্যা করতে পারে তিনি মানুষ হয়ে তা পারবেন না! সেখানেই রয়ে গেলেন সন্ন্যাসী। বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে স্তূপ সংস্কার করলেন। নির্মাণ করলেন বৌদ্ধ বিহার। বিহারের নাম হয়ে গেল শ্রমণের বিহার।

এখানে এক রাত্রি অতিবাহিত করলেন হিউ-এন-সাঙ। পরদিন আবার যাত্রা করলেন। শ্রমণের বিহার থেকে একশো-লি দূরে আরেক গভীর বন। সেই বনের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা সরু পথ।

চলতে চলতে এক জায়গায় এসে থমকে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। সামনে একটা স্তূপ, ভগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। হিউ-এন-সাঙ কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই পথপদর্শক বললেন, যুবরাজ সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করে তঁার রথের সারথি ছন্দকের সঙ্গে এখানে এসেছিলেন। তারপর তঁার মাথার মুকুট রত্নালংকার খুলে ছন্দককে দিয়ে প্রাসাদে পাঠিয়ে দিলেন। পরে সম্রাট অশোক এই স্তূপ নির্মাণ করেন।

সামান্য দূরে আরেকটি স্তূপ। পথপ্রদর্শক বললেন, এইখানে যুবরাজ তঁার রাজবেশ ত্যাগ করে এক কিরাতের কাছ থেকে মৃগচর্ম নিয়ে পরেছিলেন। বলা হয় এই কিরাত ছিল ছদ্মবেশী ইন্দ্র। তারপর এখানে মস্তক মুণ্ডন করেন। তাই এই স্তূপের নাম হয় মস্তকমুণ্ডন স্তূপ।

তখন ভগবান বুদ্ধের বয়স উনত্রিশ বছর। কেউ কেউ বলেন উনিশ বছর। দিনটি ছিল বৈশাখের দ্বিতীয় পক্ষের অষ্টম দিন।

এখান থেকে এগিয়ে চললেন হিউ-এন-সাঙ। পথে বটবৃক্ষের বন। এখানেও রয়েছে একটি স্তূপ। প্রায় ত্রিশ ফুট উঁচু। বুদ্ধের পূতাস্থি আট ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ার পরে কয়েক জন ব্রাহ্মণ সেখানে উপস্থিত হন। তখন সেখানে অঙ্গার ভস্ম ছাড়া আর কিছু ছিল না। কিছু না পেয়ে ব্যথিত ব্রাহ্মণরা সেই ভস্ম নিয়ে এলেন এখানে। তারপর তঁারা এখানে অঙ্গারভস্মের উপর স্তূপ নির্মাণ করলেন।

সম্ভবত ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে হিউ-এন-সাঙ এখানে এসেছিলেন। এখান থেকে যাত্রা করলেন পূর্ব দিকে। জনহীন অরণ্যময় পথ। এ পথে শুধু হিংস্র জীবজন্তুদের ভয় নয়, তার সঙ্গে ছিল দস্যুদের বিপদ। দেখা পেলেই তারা যাত্রীদের সব কিছু লুঠ করত। পথপ্রদর্শক ভীত হলেও হিউ-এন-সাঙ-এর অন্তর জুড়ে গভীর এক বিশ্বাস। ভগবান তথাগত, যিনি তঁাকে এত পথ নিয়ে এসেছেন, তিনিই তঁাকে বাকি পথটুকু পার করে দেবেন।

নির্বিঘ্নেই হিউ-এন-সাঙ সেই পথ পার হয়ে এলেন কৌ-শিহ-ন-ক-লো অর্থাৎ কুশীনগর। যেখানে ভগবান বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%