ভারত পরিক্রমা

চঞ্চলকুমার ঘোষ

হিউ-এন-সাঙ চিন থেকে যাত্রা করেছিলেন ৬২৯ খ্রিস্টাব্দের ১ আগস্ট। নালন্দায় পৌঁছোন দীর্ঘ আট বছর পর ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ। তিনি নালন্দায় ছিলেন এক বছর তিন মাস। এইসময় তিনি আচার্য শীলভদ্রের কাছে যোগাচারদর্শনের শিক্ষা নেন। এ ছাড়াও শেখেন হিন্দুদর্শন ও সংস্কৃত ভাষা।

একদিকে জ্ঞানার্জন, অন্যদিকে ভারত পরিভ্রমণ করবার জন্যে একসময় তিনি আবার বেরিয়ে পড়লেন। এবার যাত্রা করলেন পূর্ব দিকে। প্রথমে তিনি এলেন বর্তমান বিহারের মুঙ্গেরে। এই জায়গার সেইসময়ে নাম ছিল ইরিন পর্বত। এখানে তখন বেশ কিছু সংঘারাম ছিল। প্রবল গ্রীষ্মের কারণে হিউ-এন-সাঙ এখানে কয়েক মাস থেকে যান।

মুঙ্গের থেকে হিউ-এন-সাঙ বাংলা দেশে আসেন। সেইসময় মহারাজ শশাঙ্কের মৃত্যু হয়েছে। শশাঙ্ক ছিলেন হিন্দু। যেহেতু তিনি হিউ-এন-সাঙ-এর মিত্র হর্ষবর্ধনের শত্রু ছিলেন তাই হিউ-এন-সাঙ তাকে বৌদ্ধ বিদ্বেষী বলে উল্লেখ করেছেন।

হিউ-এন-সাঙ গঙ্গার ধারে করতোয়া নদীর তীরে পুণ্ড্রবর্ধন নগরীতে এসে পৌঁছোন। এই নগর দেখে খুব খুশি হন হিউ-এন-সাঙ। তিনি লিখেছেন, পুণ্ডোবর্ধন নগরে বহু লোকের বাস। এখানে প্রচুর উদ্যান রয়েছে। কয়েক-শো মন্দির রয়েছে। নানান ধর্মের মানুষ এখানে বাস করেন। পুণ্ড্রবর্ধন থেকে আসেন মুর্শিদাবাদের কাছে শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ নগরে। হিউ-এন-সাঙ লিখেছেন, নগরের পরিধি চার মাইল। এখানে বহু লোকের বাস এবং বেশিরভাগই ধনী। এখানকার জমি খুব উর্বর। আবহাওয়া মনোরম। স্থানীয় মানুষজনের ব্যবহার খুব ভালো। এরা শিক্ষা-সংস্কৃতি বিষয়ে খুবই আগ্রহী। এখানে একইসঙ্গে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুরাগীরা বাস করেন। গোটা দশেক সংঘারাম আর দু-হাজার ভিক্ষু রয়েছে। মন্দিরের সংখ্যাও অনেক। কর্ণসুবর্ণের কাছে রক্তমৃত্তিকা নামে এক জায়গায় বিরাট এক সংঘারাম রয়েছে। সেখানে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন।

হিউ-এন-সাঙ অসম প্রদেশের কামরূপ গিয়েছিলেন। তবে এইবার নয়, পরের বার।

কর্ণসুবর্ণ থেকে হিউ-এন-সাঙ যাত্রা করলেন দক্ষিণবঙ্গের দিকে। সম্ভবত তিনি আসেন বর্তমান যশোরে। তিনি লিখেছেন, এখানে প্রচুর চাষ-আবাদ। মানুষজন পরিশ্রমী, সৎ। গায়ের রং কালো। এখানে বহু সংঘারাম ভিক্ষু রয়েছে। মন্দিরের সংখ্যা কয়েক-শো।’

এখান থেকে আসেন প্রাচীন তাম্রলিপ্তনগরে। রূপনারায়ণ নদীর তীরে তাম্রলিপ্ত ছিল সেকালের বিখ্যাত বন্দর। তিনি লিখেছেন, ‘সমুদ্রের একটা অংশ এখানে রয়েছে। জলপথ আর স্থলপথ এখানে একসঙ্গে মিশেছে। এই বন্দর থেকে পূর্ব দ্বীপপুঞ্জ, চিন, জাপান, সিংহল আরও অনেক দেশে জাহাজ যায়।’ হিউ-এন-সাঙ-এর আগে চিনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন ভারত পরিক্রমা শেষ করে এখান থেকেই স্বদেশে ফিরে যান। এখানকার সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন হিউ-এন-সাঙ। ‘এলাকাটি গ্রীষ্মপ্রধান। এখানে প্রচুর ফলমূল শস্য জন্মায়। লোকজন পরিশ্রমী। দশটি সংঘারামে প্রায় এক হাজার ভিক্ষু শ্রমণ বাস করেন। নগরে প্রায় দুশো ফুট উঁচু একটি স্তূপ রয়েছে। বন্দর গড়ে ওঠায় প্রচুর সম্পদ রয়েছে নগরে।’

হিউ-এন-সাঙ-এর ইচ্ছা ছিল তাম্রলিপ্ত দর্শন করে সিংহল যাবেন। সেখানে ভগবান বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বহু কিছু জিনিস রয়েছে। তা ছাড়া অধিবাসীরা স্থবিরবাদী ত্রিপিটক সম্পর্কে অবহিত।

সমুদ্রপথে সিংহল বহুদূর। এক বৌদ্ধ শ্রমণের কাছে হিউ-এন-সাঙ জানতে পারলেন পায়ে হেঁটে দক্ষিণে গিয়ে সেখান থেকে মাত্র তিন দিনে সিংহল পৌছোনো যায়।

বৌদ্ধ শ্রমণের উপদেশ মেনে হিউ-এন-সাঙ দক্ষিণ দিকে যাত্রা করলেন। ওড়িশা অন্ধ্র দর্শন করে এলেন তামিলনাড়ুতে। এখানে তিনি বেশ কিছু স্থাপত্য ভাস্কর্য দর্শন করেন।

মহাবলীপুরম ও কাঞ্চীপুরম থেকে আসেন পল্লব দেশে। এইসময় সিংহল থেকে আসা কয়েক জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর সঙ্গে পরিচয় হয়। তঁাদের কাছে জানতে পারেন সম্প্রতি সিংহলের রাজা মারা গিয়েছেন। দেশের অবস্থা ভালো নয়। সারা দেশে দুর্ভিক্ষ। জ্ঞানী-গুণী মানুষরা সকলে পালিয়ে গিয়েছেন।

বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কথায় সিংহল যাত্রার ইচ্ছা মন থেকে ত্যাগ করে দাক্ষিণাত্য পরিভ্রমণ করতে শুরু করেন। মহারাষ্ট্রে এসে তিনি সেখানকার সুন্দর বিবরণ দিয়েছেন।

‘মারাঠারা খুবই যুদ্ধপ্রিয় জাতি। এরা দীর্ঘকায়। সরল স্বভাবের হলেও অহংকারী। এরা যেমন সাহসী, তেমনি বীর। মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। অধ্যয়নেও এদের অনুরাগ রয়েছে।’

মহারাষ্ট্রের চালুক্য রাজারা ছিলেন হিন্দু। শিবভক্ত। কিন্তু বৌদ্ধরা শান্তিতে বসবাস করত। হিউ-এন-সাঙ কয়েক-শো বৌদ্ধ মঠ দেখেছিলেন।

হিউ-এন-সাঙ বর্ষাকাল নাসিকে কাটিয়েছিলেন। তিনি অজন্তা গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘মহারাষ্ট্র দেশের পৃষ্ঠসীমানায় এক পাহাড়ের গায়ে সংঘারাম রয়েছে। এর ভেতর অনেক গুহা, আর উঁচু উঁচু ঘর। সামনে উপত্যকা আর নদী। গুহার দেওয়ালে ভগবান বুদ্ধের জীবনের ঘটনা আঁকা রয়েছে।’

এরপর হিউ-এন-সাঙ গুজরাট হয়ে যান মালব প্রদেশে। এইভাবে তিনি সমগ্র পূর্ব-দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত প্রদক্ষিণ করে নালন্দায় ফিরে আসেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি সমস্ত ভারতবর্ষই ঘুরে দেখেছিলেন। প্রায় সাড়ে তেরোশো বছর আগে একজন বিদেশির পক্ষে কীভাবে এই কাজ করা সম্ভব হয়েছিল, তা ভাবলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। তবে হিউ-এন-সাঙ-এর বিবরণী পড়লে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেইসময় ভারতবর্ষ যথেষ্ট সমৃদ্ধ ছিল। এখানে ভিন্ন ধর্মের মানুষেরা সহাবস্থান করত। দেশে যথেষ্ট শান্তিশৃঙ্খলা বজায় ছিল।

পরিভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে শাস্ত্রচর্চা কখনো বন্ধ করেননি হিউ-এন-সাঙ। তিনি যখন যেখানে পুথি বা শাস্ত্র পেয়েছেন তা পাঠ করেছেন এবং জ্ঞানী মানুষদের সান্নিধ্য পেলেই তঁাদের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%