বৈশালী

চঞ্চলকুমার ঘোষ

সারনাথে দু-দিন অতিক্রান্ত করে আবার এগিয়ে চলেছেন হিউ-এন-সাঙ ৷ এবার গন্তব্যস্থল বৈশালী। পথশ্রমের কোনো ক্লান্তি নেই। যেখানেই যাচ্ছেন কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছেন। তারই মাঝে এক বেদনা তঁাকে বড়ো যন্ত্রণা দেয়। কিছু ভিক্ষু, সন্ন্যাসী, শ্রমণ ছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে ভগবান বুদ্ধ ভীষণ উপেক্ষিত। মাঝে মাঝে মনে হয় নদীর জোয়ার-ভাটার মতো এও হয়তো কালের নিয়ম। পাঁচ দিন চলার পর তিনি এসে পৌছোলেন গর্জপুর।

কোথায় এই গর্জপুর ?

একালে এই নামের কোনো শহরের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে অনেকে অনুমান করেন আধুনিক ঘারিপুরে ছিল এই রাজ্য। গঙ্গার তীরে ছোটো রাজ্য তবে বড়ো মনোরম। হিউ-এন-সাঙ লিখেছেন এখানকার মানুষজন সৎ ও পরিশ্রমী। এখানে বেশ কিছু সংঘারাম রয়েছে। কয়েক হাজার ভিক্ষু এইসব সংঘারামে বাস করেন। একইসঙ্গে নগর মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু দেবমন্দির।

নগরের সীমানা ছড়িয়ে রয়েছে কুম্ভস্তূপ। হিউ-এন-সাঙ যখন এখানে এলেন মাটির উপর স্তূপের সামান্য অংশ দাঁড়িয়ে রয়েছে। জনশ্রুতি ভগবান বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর তঁার দেহাবশেষ নিয়ে যখন রাজারা প্রবল বিবাদ করছেন তখন এক ব্রাহ্মণ কুম্ভপাত্রে সেই দেহভস্ম ভাগ করে দিয়েছিলেন। সেই ভস্মের অংশ নেবার জন্যে ব্রাহ্মণ পাত্রের মধ্যে মধু মাখিয়ে রেখেছিলেন। সেই পাত্রটি নিয়ে এসে ব্রাহ্মণ একটি স্তূপনির্মাণ করেন।

গর্জপুর দর্শন করে হিউ-এন-সাঙ গঙ্গা পার হয়ে এসে পৌঁছোলেন বৈশালী। ভগবান বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বৈশালী। তার কত ইতিহাস, কত কাহিনি, কত গল্পকথা। মনের মধ্যে ক্ষীণ আশা ছিল এখানে হয়তো দেখতে পাবেন অতীত গৌরবের কিছু চিহ্ন। নগরে প্রবেশ করতেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। দূর অতীতে কয়েক-শো বৌদ্ধ বিহার ছিল। তার মধ্যে মাত্র তিন-চারটি কোনোক্রমে নিজের অস্তিত্বটুকু বাঁচিয়ে রেখেছে। সামান্য কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এখানে বাস করেন। তঁারাই স্বাগত জানালেন হিউ-এন-সাঙ-কে। প্রায় ভগ্ন এক কক্ষ। সেই কক্ষেই হিউ-এন-সাঙ-এর বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হল। সকলেই কুণ্ঠিত কীভাবে এই সম্মানিত অতিথিকে আপ্যায়ন করবেন। তঁাদের সামর্থ্য নিতান্তই কম। হিউ-এন-সাঙ অনুভব করেন তঁাদের কুণ্ঠাটুকু। বললেন, সংকোচের কোনো কারণ নেই। আমি সন্ন্যাসী। কোনো কিছুতেই আমার অসুবিধে হয় না। তা ছাড়া চিন থেকে ভারতবর্ষ_এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আমি সব কিছুতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।

এক তরুণ শ্রমণ এগিয়ে এলেন। চোখে-মুখে সারল্য। পরিচয় হতেই ভালো লাগে। হিউ-এন-সাঙ অনুভব করেন তঁারই মতো জ্ঞানপিপাসু এই তরুণ। বললেন, এখানে যা-কিছু দ্রষ্টব্য আছে আমি দর্শন করতে চাই। জানতে চাই ভগবান বুদ্ধের কথা। আপনি যদি আমার সঙ্গী হন।

শ্রমণ বললেন, সে আমার পরম সৌভাগ্য ধর্মগুরু। আজ আপনি বিশ্রাম করুন। আগামীকাল সূর্যোদয়ের পর আমরা বৈশালী দর্শনে বার হব।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, বৈশালীর কথা ইতিপূর্বে আমি কিছু শুনেছি। ভগবান বুদ্ধের জীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে রয়েছে এই বৈশালী।

শ্রমণ বললেন, আপনি ঠিকই শুনেছেন মহাত্মন। এই বৈশালী প্রাচীন ভারতের এক সমৃদ্ধ নগরী ছিল। এর খ্যাতি সেই যুগে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। রামায়ণে আছে বিশাল নামে এক রাজা এখানে রাজত্ব করতেন। তঁার নাম থেকেই এই নগরের নাম হয় বৈশালী। এখানকার নাগরিকরা ছিলেন লিচ্ছবি সম্প্রদায়ের। তঁারা নিজেদের মধ্যে থেকে প্রতিনিধি নির্বাচন করতেন। এই প্রতিনিধিরা মন্ত্রী পরিষদ গঠন করতেন। তঁারাই রাজ্য পরিচালনা করতেন। নিয়মিতভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভা বসত এবং সেখানে মন্ত্রীদের কাজকর্মের পর্যালোচনা করা হত। (বলা হয় বিশ্বের প্রথম সাধারণতন্ত্র এই বৈশালীতে গড়ে উঠেছিল) নগরের প্রান্তে ছিল গণ্ডক নদী। তবে ভগবান বুদ্ধ ছাড়াও আরেক মহাপুরুষের নাম এই নগরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, ভগবান তথাগত ছাড়া ভারতের আর কোনো মহাপুরুষের কথা আমার জানা নেই। শ্রমণ বললেন, সেই মহাপুরুষের নাম মহাবীর।

হিউ-এন-সাঙ কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। বললেন, আপনি সেই মহাপুরুষের কথা যতটুকু জানেন বলুন। আমি তঁার কথা জানতে চাই।

মহাবীর ছিলেন জৈন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। ৫৪০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে বৈশালীর কাছে কুন্দপুর গ্রামে এক অভিজাত ক্ষত্রিয় বংশে মহাবীর জন্মগ্রহণ করেন। তঁার পিতার নাম ছিল সিদ্ধার্থ। মায়ের নাম ত্রিশলা। সংসারজীবনে মহাবীর-এর নামছিল বর্ধমান। যৌবনে তঁার বিবাহ হল। এক কন্যাসন্তানও জন্ম নিল। কিন্তু ক্রমশই সংসারের প্রতি কোনো আকর্ষণ অনুভব করছিলেন না। একদিন সংসার ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়লেন। তখন তঁার বয়েস ত্রিশ বছর। বারো বছর কঠোর সাধনা করবার পর তিনি দিব্যজ্ঞান লাভ করেন। শারীরিক চেতনা অগ্রাহ্য করে সব আসক্তি বর্জন করে বস্ত্র ত্যাগ করলেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি উলঙ্গ অবস্থায় থাকতেন। সিদ্ধিলাভ করার পর তিনি জিন বা বিজয়ী আখ্যা লাভ করেন। এই জিন থেকেই জৈন কথাটির উদ্ভব হয়। দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধর্মপ্রচার করে বাহাত্তর বছর বয়সে তঁার মৃত্যু হয়।

হিউ-এন-সাঙ গভীর মনোযোগের সঙ্গে মহাবীরের জীবনকথা শুনছিলেন। বললেন, সেই মহাপুরুষের ধর্মমত সম্পর্কে কিছু বলুন।

শ্রমণ বললেন, মহাবীর পাঁচটি উপদেশ প্রচার করেন। এগুলি হল— ১. কখনো হিংসা করবে না। ২. কখনো মিথ্যা কথা বলবে না। ৩. চুরি করবে না ৪. কোনো দ্রব্য গ্রহণ করবে না। ৫. সর্বদা ব্রাহ্মচর্য পালন করবে। জৈন ধর্ম অহিংসা, সত্যবাদিতা এবং ব্রহ্মচর্য এই তিন মূল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। কর্মফলের জন্যেই মানুষ পুনঃপুন জন্মগ্রহণ করে দুঃখ ভোগ করে। জৈন ধর্মালম্বীদের মতে যথার্থ জ্ঞান, যথার্থ বিশ্বাস, যথার্থ কার্য_এই তিন গুণ বা ত্রিরত্ন অনুসরণ করে তপস্যার দ্বারা মানুষ কর্মবন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে মোক্ষলাভ করতে পারে। বৌদ্ধ ধর্মের মতো মহাবীরের ধর্মও একসময় সমস্ত ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল।

হিউ-এন-সাঙ অস্ফুটে বললেন, সেই মহাজ্ঞানীর উদ্দেশ্যে আমার প্রণাম।

পরদিন নগর পরিক্রমায় বার হলেন হিউ-এন-সাঙ। সঙ্গী তরুণ শ্রমণ। চারদিকেই অতীতের বিহার, চৈত্য, স্তূপ, শিলাস্তম্ভের ধ্বংসাবশেষ। নগরের দক্ষিণ-পূর্বে বুদ্ধের পূতাবশেষের উপর বিরাট স্তূপ।

শ্রমণ বললেন, ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর পর এই স্তূপটি নির্মাণ করেন বৈশালীর রাজা। পরে সম্রাট অশোক এখানে নতুন করে স্তূপ নির্মাণ করেন।

এগিয়ে চলেছেন দু-জন। সামান্য দূরেই বিরাট উঁচু একটি শিলাস্তম্ভ। তার উপর রয়েছে এক সিংহমূর্তি। তাই এর নাম সিংহস্তূপ। এটিও নির্মাণ করেন সম্রাট অশোক।

ধীরে ধীরে সব কিছুই বর্ণনা করছিলেন শ্রমণ। চারদিকে জনশূন্য। পাখির কূজন ছাড়া সর্বত্রই নিস্তব্ধ। এক জায়গায় ভগ্ন প্রাসাদ। তার পাশে একটি প্রাসাদের ধ্বংসস্তুপ। হিউ-এন-সাঙ জিজ্ঞাসা করলেন, এটি কার প্রাসাদ ?

শ্রমণ বললেন, এখানে ছিল বৈশালীর নটী আম্রপালীর বাসভবন। জনশ্রুতি জন্মের পর তঁাকে আমবাগানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। আমবাগানে পাওয়া গিয়েছিল বলে তঁার নাম হয় আম্রপালী। তার রূপ যৌবনের আকর্ষণে বহু রাজকুমার তাকে কাছে পেতে চায়। এই নিয়ে নগর মধ্যে বিবাদ শুরু হয়ে যায়। নগরে শান্তির জন্যে আম্রপালি তখন নিজেকে নগরবধূ অর্থাৎ বৈশালী নগরের সকলের বধূ হিসেবে ঘোষণা করেন। তারপর সাক্ষাৎ হল ভগবান বুদ্ধের সঙ্গে। আম্রপালী তখন পার্থিব কামনা ত্যাগ করে বুদ্ধের শরণ নিলেন। নিজের যা-কিছু ছিল সব বৌদ্ধ সংঘে দান করলেন। পরে এই প্রাসাদে বৌদ্ধ ভিক্ষুণীদের থাকবার ব্যবস্থা হয়।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, ভগবান বুদ্ধ তো কোনো নারীকে সংঘ গ্রহণ করতে চাননি ?

শ্রমণ বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন ধর্মগুরু। ভগবান বুদ্ধ তখন বৈশালীতে অবস্থান করছেন। একদিন কপিলাবস্তু থেকে বুদ্ধের পালিতা মাতা রানি প্রজাপতি, যশোধরা ও রাজপরিবারের অন্য কয়েক জন মহিলা এক পত্রে তথাগতকে জানালেন তঁারা সন্ন্যাস গ্রহণ করে সংঘ থেকে ধর্মাচরণ করতে চান।

বুদ্ধ তঁাদের সেই অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন। তখন রানি প্রজাপতি মস্তক মুণ্ডন করে পীত বসন পরে শাক্য বংশীয় কয়েক জন মহিলার সঙ্গে বৈশালীতে এসে উপস্থিত হলেন। দীর্ঘ পথ এসে সকলেই ক্লান্ত অবসন্ন। এইসময় বুদ্ধের শিষ্য আনন্দ তঁাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেলেন। সব কথা শুনে তখনই বুদ্ধের কাছে গিয়ে বললেন, প্রভু মহারানি প্রজাপতি কয়েক জন মহিলাকে নিয়ে বহু কষ্ট করে এখানে এসেছেন। তঁাদের একান্ত ইচ্ছা সন্ন্যাসগ্রহণ করবেন। তঁারা এই সংঘে থাকতে চান।

বুদ্ধ দ্বিধাগ্রস্ত। নীরব হয়ে রইলেন।

আনন্দ তখন বললেন, প্রভু নারীরা যদি সংসার ত্যাগ করে দুঃখ থেকে নিবৃত্তিলাভ করে তবে কি তঁাদের পুনর্জন্ম হবে ?

বুদ্ধ বললেন, না তাদের আর কখনো জন্ম হবে না।

আনন্দ আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তঁারা যদি কামনা-বাসনা আর দুঃখের হাত থেকে নিবৃত্তিলাভ করে, তবে কি তারা সাধুত্ব লাভ করতে পারবে ?

এবারও বুদ্ধ জবাব দিলেন, হ্যঁা তঁারা পারবে।

আনন্দ তখন বললেন, তাহলে প্রভু মহারানি প্রজাপতি ও তঁার সঙ্গীদের সংঘে প্রবেশের অনুমতি দিন।

বুদ্ধ আর না করতে পারলেন না। তিনি তাদের সংঘে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। তবে তাদের আটটি নিয়ম ছাড়াও আরও কিছু নিয়ম নেমে চলতে হবে।

আনন্দ বললেন, প্রভু আপনার প্রতিটি নির্দেশ তঁারা পালন করবেন।

বৈশালীতে দু-দিন কাটিয়ে হিউ-এন-সাঙ যাত্রা করলেন মগধের দিকে। বৈশালী থেকে চোদ্দো-পনেরো লি দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে এক মহাস্তূপ।

সেখানে ভগবান বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের একশো বছর পরে বৌদ্ধ পণ্ডিতরা সমবেত হয়ে দ্বিতীয় বৌদ্ধসংগীতের আয়োজন করেন। এখানে নানান বিষয়ে আলোচনা করে বিভিন্ন প্রশ্নের মীমাংসা করা হয়।

সেখান থেকে গঙ্গা পার হয়ে এলেন শ্বেতপুর সংঘারামে। লোকালয় থেকে সামান্য দূরে এই সংঘারামটি দেখে ভালো লাগে হিউ-এন-সাঙ-এর। বোঝা যায় নিয়মিত সংস্কার করা হয়। তাই কোথাও ভগ্নদশা নেই। কাছে আসতেই শুনতে পেলেন বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রার্থনাসংগীত।

ইতিমধ্যেই তঁার আগমনের সংবাদ পৌঁছে গিয়েছিল। সংঘের মহাথের অন্য সন্ন্যাসীদের নিয়ে এগিয়ে এসে স্বাগত জানালেন হিউ-এন-সাঙকে। বৃদ্ধ মহাথের হিউ-এন-সাঙ-কে আলিঙ্গন করে বললেন, জীবনের প্রান্তবেলায় এসে আপনার মতো মহামানবকে দর্শন করে সার্থক হল জীবন। আমরা শুধু গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাস নিয়েছি। আপনার মতো ভগবান তথাগতের উদ্দেশ্যে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে পারিনি।

আত্মপ্রশংসা ভালো লাগে না হিউ-এন-সাঙ-এর। মৃদুস্বরে বললেন, সবই ভগবান তথাগতের ইচ্ছা।

সকলে এগিয়ে চললেন সংঘারামের ভিতর। প্রশস্ত পাথরের চাতাল পেরিয়ে তারা প্রবেশ করলেন প্রার্থনাকক্ষে। বিরাট কক্ষ। একদিকে পাথরের বেদির উপর ধ্যানস্থ ভগবান বুদ্ধের মূর্তি। তঁার মুখে ফুটে উঠেছে কী গভীর এক প্রসন্নতা। সকলের সঙ্গে নতজানু হলেন হিউ-এন-সাঙ ৷ কিছুক্ষণ প্রার্থনা করলেন।

প্রার্থনা শেষ করে দীর্ঘ অলিন্দ দিয়ে চলতে চলতে হিউ-এন-সাঙ-এর দৃষ্টি পড়ল পুথি সংগ্রহ কক্ষের দিকে। দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। বললেন, আমি কি এই কক্ষে প্রবেশ করতে পারি ?

মহাথের বললেন, আসুন ধর্মগুরু। এই পুথিকক্ষটি আমাদের সংঘের সম্পদ। এখানে প্রায় দশ হাজার পুথি রয়েছে।

কক্ষের চারদিকে কাঠের খোপ। প্রতিটি খোপে পর পর পুথি সাজানো। প্রতিটি পুথি লাল কাপড়ে মোড়া।বিস্ময়ে অভিভূত হিউ-এন-সাঙ জিজ্ঞাসা করলেন, এত পুথি আপনারা কোথা থেকে সংগ্রহ করলেন ?

মহাথের বললেন, সে এক আশ্চর্য কাহিনি। ভগবান বুদ্ধের সময় থেকেই বৈশালী ছিল বৌদ্ধ ধর্মের পীঠস্থান। বহু জ্ঞানী-গুণী মানুষ এখানে আসতেন, থাকতেন, শাস্ত্রচর্চা করতেন। সেই সূত্রে অসংখ্য পুথিও লেখা হয়েছে। কয়েক-শো বছর ধরে নিয়মিত শাস্ত্রচর্চা হয়েছে। তারপরই শুরু হল বিদেশি শত্রুর আক্রমণ। তারা শুধু লুঠপাট করেই ক্ষান্ত হল না, যেখানে যা কিছু ছিল সব জ্বলিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিল।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি দেখেছি বৈশালীর সর্বত্র শুধু ধ্বংসের চিহ্ন ছাড়া আর কিছু নেই।

‘সেই ধ্বংসের মধ্যে অধিকাংশ মানুষই নগর ত্যাগ করে পালিয়ে গেল। ভগবান বুদ্ধের অনুগামী সামান্য দু-চার জন সেখানে রয়ে গেলেন। এমনি করে বেশ কয়েক-শো বছর কেটে গেল। একবার কয়েক জন শ্রমণ কোনো ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে কিছু নির্মাণের কাজ করছিলেন। হঠাৎ তঁাদের চোখে পড়ল একটি পুথিকক্ষ। সেখানে প্রবেশ করতেই দেখলেন বিরাট এক সংগ্রহশালা। রয়েছে রাশি রাশি পুথি। কয়েক পেটি স্বর্ণমুদ্রা। তারা কারও কাছে সেকথা প্রকাশ করলেন না। জানেন একথা প্রকাশ হলেই আবার লুঠতরাজ শুরু হবে। গোপনে সব কিছু সরিয়ে নিয়ে এলেন এই শ্বেতপুর সংঘারামে। এটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল। এখানে কয়েক ক্রোশের মধ্যে তেমন জনবসতি নেই। স্বভাবতই সকলের দৃষ্টির অন্তরালে রয়ে যাবে। তা ছাড়া ধর্মচর্চার জন্যে এই স্থানটি খুবই উপযুক্ত।’

হিউ-এন-সাঙ বললেন, আপনি যথার্থই বলেছেন মহাথের। সাধনার জন্যে নির্জনতা একান্ত প্রয়োজন।

সেখানে কয়েক দিনের জন্য রয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। প্রায় সমস্ত সময়ই তার পুথিকক্ষে কেটে যায়। অনুভব করেন একসময় বৈশালীতে কী গভীর শাস্ত্রচর্চা হতো। অথচ তিনদিন শ্বেতপুর সংঘারামে সকলের সঙ্গে কথা বলে অনুভব করেন এখানে কারও শাস্ত্রচর্চায় সামান্যতম আগ্রহ নেই। তবুও হিউ-এন-সাঙ তঁাদের শাস্ত্রের নানান কথা বলেন। সকলেই মুগ্ধ।

মহাথের বললেন, আপনি মহাজ্ঞানী, আপনাকে পেয়ে আমরা পরম প্রসন্ন হয়েছি। আপনার কাছ থেকে বহু কিছু শিক্ষালাভ করেছি। আপনাকে কোনো কিছু দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। যদি এই পুথিকক্ষ থেকে কোনো পুথি প্রয়োজন হয় স্বচ্ছন্দে নিতে পারেন।

একটিমাত্র পুথি হিউ-এন-সাঙ গ্রহণ করলেন। বোধিসত্ত্বপিটক। তারপর সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাত্রা করলেন মগধের দিকে।

এখানে মহাপথিকের যাত্রাপথ নিয়ে সামান্য বিতর্ক রয়েছে। হিউ-এন-সাঙ-এর জীবনীকার লিখেছেন শ্বেতপুর নগর থেকে তিনি গিয়েছিলেন মগধে। ভিন্ন মতে তিনি বৃজি হয়ে যাত্রা করেন নেপালে। সেই যাত্রাপথের কিছু বর্ণনা রয়েছে।

শ্বেতপুর বিহার থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে হিউ-এন-সাঙ এলেন বৃজি বলে এক নগরে। এই নগরের আয়তন যথেষ্ট বড়ো। তবে জনসংখ্যা কম। তাদের আচারব্যবহার ভালো নয়। নগরের বেশ কয়েকটি বৌদ্ধবিহার ছাড়াও বেশ কিছু মন্দির রয়েছে। বৌদ্ধ অপেক্ষা ভিন্ন ধর্মের মানুষের সংখ্যাই বেশি। এখান থেকে হিউ-এন-সাঙ যাত্রা করলেন নেপালের দিকে। দীর্ঘ পাহাড়ি পথ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পথ দুর্গম। বেশ কয়েক দিন চলবার পর তিনি এসে পৌঁছোলেন নেপাল রাজ্যের সীমানায়। এখানকার রাজার নাম ছিল অংশুবর্মন। তখন এই রাজ্য ছিল তিব্বতের অধীন। এখানকার মানুষরা চেহারায় শুধু রুক্ষ নয়, তাদের আচার-ব্যবহারেও রুক্ষতা। সৌজন্যবোধের প্রকাশ কম। বেশিরভাগ মানুষই অসৎ চরিত্রের, শিক্ষা সংস্কৃতির প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। তবে তারা যন্ত্রবিদ্যায় কুশলী। এখানে একইসঙ্গে রয়েছে বৌদ্ধ বিহার আর হিন্দুমন্দির। নেপাল যাত্রার বিবরণ লেখা হলেও সম্ভবত হিউ-এন-সাঙ সেখানে যাননি। তিনি নেপালের সীমান্ত অঞ্চল ঘুরেই সেখানকার বিবরণ লেখেন। এবার তঁার গন্তব্যস্থল মগধ।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%