চঞ্চলকুমার ঘোষ
একদল বণিক চলেছে নগরহার থেকে পুরুষপুর। হিউ-এন-সাঙ তাদের সঙ্গী হয়েছেন। বণিকরা সকলেই উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ। তাদের ভাষা একেবারেই অবোধ্য হিউ-এন-সাঙ-এর কাছে। তবু মানুষগুলোকে ভালো লাগে হিউ-এন-সাঙ-এর। তাদের ব্যবহারে আন্তরিকতার ছোঁয়া। নিজেদের খাবার ভাগ করে দেয় হিউ-এন-সাঙকে। সমস্ত দিন পথ চলে তারা এসে পৌঁছোয় খাইবার পাসের কাছে। দু-দিকে পর্বতমালা। মাঝখানে সরু পথ। এই পথ ধরেই যুগ যুগ ধরে মানুষ চলেছে।
একটা বড়ো পাথরের চাতাল। সেখানে সকলে রাতের বিশ্রামের আয়োজন করে। সারাদিনের পথচলায় বণিকরা সকলেই ক্লান্ত। প্রথম রাতেই ঘুমিয়ে পড়ে সকলে। ঘুম আসে না হিউ-এন-সাঙ-এর। চুপ করে বসে ভাবেন, যেদিন চিন থেকে যাত্রা করেছিলেন, মনের মধ্যে ছিল কত অনিশ্চয়তা, অথচ আজ মন জুড়ে গভীর বিশ্বাস।
আকাশে চাঁদ ওঠে। একটু একটু করে চারদিক আলোকময় হয়ে ওঠে। মুগ্ধ চোখে দেখতে দেখতে কেমন তন্ময় হয়ে যান হিউ-এন-সাঙ। রাতশেষে ভোরের আলো ফুটতেই আবার সকলে যাত্রা করে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে তঁারা এসে পৌঁছোলেন পুরুষপুর। একসময় এই পুরুষপুর ছিল সম্রাট কনিষ্কের রাজধানী। শোনা যায় প্রথম জীবনে কনিষ্ক ছিলেন যেমন নিষ্ঠুর তেমনি বৌদ্ধ ধর্ম-বিদ্বেষী। এক বৌদ্ধ ভিক্ষু নিজের আত্মশক্তিতে কনিষ্কের অন্তরের মধ্যেকার অশুভ শক্তিকে নাশ করে তঁাকে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত করেন। পরবর্তীকালে কনিষ্ক অসংখ্য বৌদ্ধ স্তূপ নির্মাণ করেন। এখানেই ছিল প্রাচীন ভারতের সর্বোচ্চ স্তূপ। বর্ণনা অনুসারে জানা যায়, সেই স্তূপের ভিত ছিল ত্রিশ ফুট উঁচু। তার ওপর পাথরের পাঁচ-তলা অট্টালিকা, তার ওপর একশো কুড়ি ফুট কাঠের ঘর। তার ওপর লৌহস্তম্ভ। তার ওপর ছাতার আবরণ। এই স্তূপের উচ্চতা ছিল প্রায় সাতশো ফুট।
হিউ-এন-সাঙ যখন পুরুষপুরে এলেন, বৌদ্ধ ধর্মের সেই গৌরবের দিন শেষ। বহু আগেই হূন সেনাপতি মিহিরকুল সবকিছু ধ্বংস করে ভগবান বুদ্ধের ভিক্ষাপাত্র লুঠ করে নিয়ে গিয়েছিল।
হিউ-এন-সাঙ পুরুষপুরে প্রবেশ করলেন। বণিকরা অন্য পথে চলে গেল। নগরের পথ ধরে এগিয়ে চলেন হিউ-এন-সাঙ। আশ্চর্য হয়ে ভাবেন এ কোন নগর! বাড়িঘর নেই। প্রায় জনশূন্য পথ। কত বৌদ্ধ বিহার, মঠ সবই ধ্বংসস্তূপ। মনে হয় কোনো মৃত, পরিত্যক্ত নগর।
এই নগরের কোথায় আশ্রয় নেবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। হঠাৎ চোখে পড়ল কয়েক জন বৌদ্ধ শ্রমণ সামনের পথ ধরে চলেছেন। এগিয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। ইতিমধ্যেই কিছু স্থানীয় ভাষা শিখে নিয়েছিলেন। নিজের পরিচয় দিতেই তঁারা বললেন নগরের উত্তর প্রান্তে আমাদের বৌদ্ধ বিহার, আপনি সেখানেই আতিথ্য গ্রহণ করুন।
সেখানেই রয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। নগরের নানান প্রান্ত ঘুরে দেখেন। অতীতের সবই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। বিষণ্ণ হয়ে যায় মন। এক দুর্ভাবনা জেগে ওঠে। ভারতবর্ষের সর্বত্রই কি তঁাকে এই ধ্বংসের রূপ প্রত্যক্ষ করতে হবে ?
চলতে চলতে নগরপ্রান্তে এক গ্রামে এসে দেখলেন কয়েক জন মহিলা মাটিতে গর্ত করে তার মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে কিছু গরম করছে। কৌতূহলে এগিয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। আগুনের উপর একটা পাত্র বসানো। তাতে তরল কিছু ফুটছে। জিজ্ঞাসা করতেই একজন ঘন হয়ে আসা সেই তরল পদার্থ নিয়ে আসে। মুখে দিয়ে স্বাদ পরীক্ষা করলেন। ভালো লাগে। যেমন সুগন্ধ তেমনই স্বাদ। আগে কখনো এই রকম কোনো খাবার খাননি হিউ-এন-সাঙ। জিজ্ঞাসা করে জানলেন, আখের রস গরম করে তৈরি হচ্ছে সুমিষ্ট বস্তুটি (গুড়)।
হিউ-এন-সাঙ-এর বিবরণ পড়ে পরবর্তীকালে চিন সম্রাট সেদেশে আখের রস থেকে গুড় তৈরির কাজ শুরু করেন। আরও পরে এই আখের রস থেকে তৈরি হয় চিনি।
চিন দেশ থেকে প্রচুর চিনি ভারতবর্ষে আসত, তাই তার নাম চিনি।
কয়েক দিন পুরুষপুরে কাটিয়ে হিউ-এন-সাঙ রওনা হলেন পুষ্কলাবতার দিকে। একসময় এখানে গ্রিকদের রাজত্ব ছিল। এর একদিকে কাবুল নদী অন্য দিকে শ্বাট নদী। পুরুষপুরের মতো এখানেও সর্বত্রই ধ্বংসের চিহ্ন। বোঝা যায় একসময়ে এখানে সমৃদ্ধি ছিল আর আজ কিছুই নেই। এখানেই প্রথম হিউ-এন-সাঙ-এর চোখে পড়ল হিন্দু মন্দির। সেখানে যাওয়ার কোনো বাধা নিষেধ ছিল না।
স্থানীয় এক পথপ্রদর্শক তঁাকে নিয়ে গেল সেই মন্দিরে। একটা পাহাড়ের নীচে বিরাট পাথরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে দেবীর মূর্তি। পাথরের রং নীল। দেবীর নাম ভীমা। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস ভীমাদেবী শিবের পত্নী। সকলেই এই দেবীকে গভীর শ্রদ্ধা করে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এই মন্দিরে এসে পুজো দেয়। তাদের বিশ্বাস সাত দিন উপবাস করে এই মন্দিরে পুজো দিলে দেবতার দর্শন মেলে এবং মনের সকল কামনা-বাসনা পূর্ণ হয়। ভীমাদেবীর মন্দিরের অদূরে মহেশ্বরের মন্দির।
এখান থেকে হিউ-এন-সাঙ যাত্রা করলেন গান্ধারের রাজধানী তক্ষশীলায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন