মানসলোক

চঞ্চলকুমার ঘোষ

হিউ-এন-সাঙ চলেছেন, তঁার সঙ্গে অমিতাভর মনও ভেসে চলে। মানসলোকে সেও তো হিউ-এন-সাঙ-এর দীর্ঘ যাত্রাপথের সঙ্গী।

মনে পড়ে কয়েক বছর আগে নালন্দায় গিয়েছিল। চারদিকে ধ্বংসাবশেষ। তার মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে কখন যেন হারিয়ে গিয়েছিল অন্য এক জগতে। মনে হচ্ছিল সেখানে যেন অতীত আর বর্তমান হাত ধরাধরি করে চলেছে।

বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। বাড়িঘর সবই লাল ইটের তৈরি। ছোটো ছোটো বাগান। উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত পায়ে হাঁটা পথ। দু-ধারে প্রাচীন বাড়ি ঘরের ভিত্তিটুকু রয়েছে। এই পথের পূর্ব দিকে মঠ বা বিহার। প্রথম বিহারটি চোখে পড়ার মতো। বিরাট একটা উঠোন ঘিরে দোতলা সমান বাড়ি। উপরের তলায় পর পর কুটুরিগুলি সাজানো। সিঁড়ির ধাপ উঠে গিয়েছে কোনো মঞ্চ পর্যন্ত। একদিন ওখানে বসেই শিক্ষকরা তঁাদের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলতেন ভগবান বুদ্ধের গাথা।

জাগো জাগো, বৃথা কাল না করো ক্ষেপণ

ধম্ম পথে আচরণে হও সচেতন।

যে জন এপথ সেবে সুখে যাপে কাল

সতত সুগতি তার ইহ পরকাল।

গুরুর সঙ্গে শিষ্যরাও আবৃত্তি করত সেই গাথা। সামান্য দূরে ছোটো একটি উপাসনাগৃহ, একদিকে রয়েছে ভগ্ন বুদ্ধের মূর্তি। কবে কোন শিল্পী নির্মাণ করেছিলেন। আজ শুধুই স্মৃতি। আরও এগিয়ে পিরামিডাকৃতি একটি স্তুপ। দেখে মনে বিস্ময় জাগে। উপর থেকে চারদিকে মনোরম দৃশ্য। দেওয়ালে উৎকীর্ণ অপরূপ ভাস্কর্য। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ছোটো ছোটো কুটির। সামনে প্রশস্ত বারান্দা, চতুষ্কোণ উঠান। মাঝে মাঝে স্তূপ। তার গায়ে ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের মূর্তি।

সারা সকাল ঘুরে ক্লান্ত হয়ে একটা পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে বসেছিল অমিতাভ। চারদিক ফাঁকা। লোকজনের ভিড় নেই। ইতস্তত দু-চার জন এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আনমনা হয়েছিল অমিতাভ। হঠাৎ কারও পায়ের শব্দে মুখ ফেরাল। প্রায় বৃদ্ধ একজন মানুষ। ধুতি আর কম দামের সার্টপরা। কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক এগিয়ে এসে অমিতাভর পাশে বসলেন।

‘নমস্কার, আপনাকে অনেকক্ষণ থেকে দেখছি ঘুরে ঘুরে সব দেখছেন।’

মাথা নাড়ে অমিতাভ।

‘আসলে আমি পুরোনো কোথাও কিছু দেখলে তার সম্বন্ধে যতটুকু পারি জানিবার চেষ্টা করি। আর নালন্দা, এখানে তো ইতিহাস কথা বলে।’

বৃদ্ধ মানুষটি শান্ত গলায় বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি চল্লিশ বছর এই নালন্দায় আছি। এখানকার প্রত্যেকটা ইট-পাথর আমার চেনা। ওরা আমার সঙ্গে কথা বলে। আমি চোখ বুজলে শুনতে পাই সমস্ত প্রাঙ্গণ জুড়ে ছাত্রদের গুঞ্জন। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কত দৃশ্য। আচার্যরা শিক্ষা দিচ্ছেন। ছাত্ররা অধ্যয়ন করছে। আরও কত ছবি।

আশ্চর্য লাগছিল অমিতাভর। ধীর কণ্ঠে প্রশ্ন করে, আপনি এখানে থাকেন ?

বৃদ্ধ বললেন, আমার বাবা ছিলেন এখানকার পাহারাদার। বাবার পর আমি এখানে চাকরি পেলাম। প্রথমে কিছু জানতাম না। কত পণ্ডিত এখানে এসেছেন। তঁাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে নালন্দার গোটা ইতিহাসটাই জেনে গেলাম।

অমিতাভর চোখ দুটো চকচক করে ওঠে।

‘বলুন-না সেই ইতিহাসের কথা।’

একটু চুপ করে থেকে বৃদ্ধ বললেন, মগধের প্রাচীন রাজধানী ছিল রাজগৃহ। এই রাজগৃহ ছিল সমৃদ্ধ নগর। বৈদিক যুগে ঋষিরা নগরের বাইরে নির্জনে গিয়ে আশ্রম তৈরি করতেন। সেখানে তঁারা ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন। বৌদ্ধ যুগে এই আশ্রমকে বলা হত বিহার। বিহার শব্দের অর্থ এক-এক জন ভিক্ষুর বাসের জন্যে এক-একটি স্বতন্ত্র কক্ষ। পরে বিহার বলতে বোঝানো হত সমবেতভাবে ভিক্ষুরা যেখানে বাস করত। বহুক্ষেত্রে এই বিহারগুলিই ছিল শিক্ষাকেন্দ্র। রাজা-মহারাজা, ধনী ব্যক্তিরা পুণ্যার্জন করবার জন্যে এইসব বিহার প্রতিষ্ঠা করতেন।

ভগবান বুদ্ধের সময় নালন্দায় বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ বিহার ছিল। নালন্দার সঙ্গে বুদ্ধের শিষ্য সারিপুত্র ও মৌদ্গল্যায়নের নিবিড় সম্পর্ক থাকার জন্যে বৌদ্ধ শ্রমণরা নিয়মিত এখানে আসতেন।

‘ভগবান বুদ্ধ কি এখানে এসেছেন ?’

‘হ্যাঁ, তিনিও কয়েক বার এখানে এসেছেন। তবে নালন্দার সমৃদ্ধি পরবর্তীকালে। যেসব ছোটো ছোটো বৌদ্ধ বিহার এখানে ছিল স্থানীয় রাজা-মহারাজারা সেখানে দান দিতেন। একটু একটু করে তার বৃদ্ধি হতে থাকে। পরবর্তীকালে রাজারা এখানে মহাবিহার নির্মাণ করেন।

‘এই মহাবিহার থেকেই কি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয় ?’

‘আপনি ঠিকই বলেছেন। এই মহাবিহার উত্তরকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্যে গুপ্তসম্রাট কুমারগুপ্ত প্রথম উদ্যোগ নেন। মূলত গুপ্তরাজাদের চেষ্টাতেই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের যশ ও খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।’

মনোযোগী ছাত্রের মতো বয়স্ক মানুষটির কথা শুনছিল অমিতাভ। এবার জিজ্ঞাসা করল, নালন্দা নাম এল কোথা থেকে ?

‘হিউ-এন-সাঙ-এর বর্ণনা অনুসারে দূর অতীতে এখানে বিরাট এক দিঘি ছিল। সেখানে নালন্দা নামে এক নাগ বাস করত। তার নাম থেকেই নালন্দার নাম হয়। জাতকের কাহিনি অনুসারে বোধিসত্ত্ব এখানে রাজা হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এত দান করেছিলেন প্রায় নিঃশেষ হবার অবস্থা, তখন তিনি ঘোষণা করলেন, ‘ন অলং দা’—যার অর্থ আমি কিছু দেব না। এই দুটি ব্যাখ্যাই মানুষের কল্পনায় গড়ে উঠেছিল। এর কোনো বাস্তবভিত্তি নেই। প্রকৃত সত্য হল একসময় এখানে প্রচুর জলাশয় ছিল। তাতে প্রচুর নাল ফুল ফুটত। সেইজন্যে এর নাম হয় নালন্দা।

‘শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বলেই কি বৌদ্ধদের কাছে নালন্দার আকর্ষণ ?’

‘সে একটি কারণ। এ ছাড়াও এই নালন্দায় ভগবান বুদ্ধের অন্যতম প্রধান শিষ্য সারিপুত্রের জন্ম ও মৃত্যু হয়। তাই বৌদ্ধদের কাছে নালন্দা ছিল বিশেষ শ্রদ্ধার। এখানে সম্রাট অশোক বিরাট এক চৈত্য স্থাপন করেন।’

‘নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় কোন সময়ে ?’ জিজ্ঞাসা করে অমিতাভ।

‘খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে নালন্দা বিহার প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রচুর অর্থ দান করেন গুপ্তসম্রাটরা। তার আগে এখানে বৌদ্ধ ধর্মশিক্ষা দান করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে ওঠেনি। গুপ্তসম্রাট কুমারগুপ্ত প্রথম মহাবিহারের কাজ শুরু করেন। তারপর প্রথম কুমারগুপ্ত, বুধগুপ্ত, নরসিংহ গুপ্ত, বালাদিত্য আরও কয়েক জন সম্রাটের দানে নালন্দা একটু একটু করে বেড়ে ওঠে। পুরবর্মা নামে এক রাজা এখানে আশি ফুট উঁচু এক বুদ্ধমূর্তি দান করেন। সম্রাট হর্ষবর্ধন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে বহু অর্থ ব্যয় করেছিলেন। তার সঙ্গে একশোটি গ্রামও দান করেন। যার রাজস্ব থেকে এখানকার খরচ চলত। হিন্দু ও বৌদ্ধ দুই ধর্মের রাজারাই এখানে অকৃপণভাবে দান করতেন। ধীরে ধীরে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি ভারতবর্ষের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছিল। নানান দেশ থেকে এখানে ছাত্ররা আসতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা তঁাদের দেখাশোনা করতেন। বিদেশি ছাত্রদের জন্যে আলাদা ব্যবস্থা ছিল। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য ছিল এখানকার ছাত্র-শিক্ষক সকলেই ছিলেন আবাসিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের যিনি প্রধান ছিলেন তঁাকে বলা হত সর্বাধ্যক্ষ বা প্রধানাচার্য। তঁার নির্দেশেই সমস্ত কাজকর্ম পরিচালনা হত। কেউ সেই নির্দেশ ভঙ্গ করার কথা ভাবতেও পারত না। সকলেই নিয়মশৃঙ্খলা কঠোরভাবে মেনে চলত।’

‘এখানে ছাত্ররা কীভাবে ভরতি হত ?’

এখানে কুড়ি বছর বয়েসের আগে কোনো ছাত্র ভরতি হতে পারত না এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই ভরতি হতে পারত। তবে ভরতি হওয়ার পরীক্ষা ছিল ভীষণ কঠিন। কোনো ছাত্র এলে প্রথমেই তাকে দ্বারপণ্ডিতদের সঙ্গে দেখা করতে হত। এই দ্বারপণ্ডিতেরা ছাত্রদের নানা প্রশ্ন করত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যেত দশ জনের মধ্যে নয় জনই ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেত। যারা ভরতি হত তাদেরও পরবর্তীকালে নানান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হতো। এখানে ভারতবর্যের নানান প্রান্ত ছাড়াও চিন, তিব্বত, কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা থেকেও ছাত্ররা আসত।’

আশ্চর্য লাগছিল অমিতাভর। দু-হাজার বছর আগে ভারতবর্ষের শিক্ষা এত উন্নত ছিল যে, সারা বিশ্ব থেকে এখানে ছাত্ররা আসত। অথচ আজ ভারতবর্ষের ছাত্রদের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন হলেই বিদেশ যেতে হয়।

মাথার উপর সূর্য। রোদের তেমন তাপ নেই। একটা বাস এসেছে। লোকজন বেশিরভাগই গ্রামের। তারা বেড়াতে এসেছে। ঘুরে বেড়াতেই তাদের আনন্দ।

বয়স্ক মানুষটির দিকে মুখ ফেরাল অমিতাভ।

‘আপনার নামটাই তো জানা হল না।’

‘রামশরণ শর্মা।’

‘আপনার কথা শুনে বড়ো ভালো লাগছে।’

‘আসলে কী জানেন, যারা এখানে আসে তারা কিছু জানতে চায় না। জানার আগ্রহও দেখায় না। ঘুরে দেখে কিছু ইট-কাঠ-পাথর দেখে। হই-চই করে, আনন্দ করে, সময় কাটায়, তারপর চলে যায়। আপনি জানতে চাইছেন তাই বলছি, আপনারও আনন্দ, আমারও আনন্দ।’

‘সেই সময় নালন্দায় কোন কোন বিষয় পড়ানো হত আপনার জানা আছে ?’

‘নালন্দায় হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন তিন শাস্ত্রই পড়ানো হত। হিউ-এন-সাঙ-এর পরবর্তীকালে এসেছিলেন আরেক চিনা পর্যটক ইৎ সিঙ, তঁার লেখা থেকে এখানকার পাঠ্যসূচির একটা তালিকা পাওয়া যায় ১. চার বেদ ২. বৌদ্ধহীনযান ধর্মপুস্তক ৩. মহাযান অষ্ট দশ শাখার ধর্মপুস্তক, ৪. ন্যায়শাস্ত্র, ৫. শব্দবিদ্যা ও ব্যাকরণ, ৬. রসায়ন, ৭. চিকিৎসাবিদ্যা, ৮. জাদুবিদ্যা, ৯. যোগশাস্ত্র, ১০. জ্যোতিষবিদ্যা, ১১. ব্যাবহারিক শাস্ত্র, ১২. শিল্পবিদ্যা, ১৩. ধাতুবিদ্যা, ১৪. তান্ত্রিক বৌদ্ধশাস্ত্র।

‘কীভাবে এখানে ছাত্রদের শিক্ষা দেওয়া হত?’

‘তক্ষশীলার মতো এখানেও আবৃত্তির উপর বেশি জোর দেওয়া হত। ছাত্ররা যা শুনত, তা চর্চা করত। পরে তা বক্তৃতা দিত। এ ছাড়াও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হত। প্রতিদিন কম-বেশি একশো বক্তৃতা হত। এইভাবে ছাত্রদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত উন্নতির চেষ্টা করা হত। একটি হলঘর ছাড়াও তিনশো মাঝারি ঘর ছিল যেখানে নিয়মিত ক্লাস হত। হিউ-এন-সাঙ যখন নালন্দায় গিয়েছিলেন তখন সেখানকার ছাত্রসংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার।’

‘আজকের পৃথিবীতে দশ হাজার ছাত্র কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে বলে আমার জানা নেই।’

‘থাকলেও তাদের আবাসিক রাখার কথা কেউ ভাবতেও পারবে না। সে বিরাট এক কর্মযজ্ঞ।’

রামশরণের কথায় সায় দেয় অমিতাভ। ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি কয়েক বছর ছাত্রাবাসে ছিলাম। একশোর বেশি ছাত্র ছিল না। তাতেই বিশৃঙ্খল অবস্থা।’

রামশরণ বললেন, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের মতোই বিখ্যাত ছিল তার গ্রন্থাগার। প্রাচীন বিবরণ থেকে জানা যায়, নালন্দা মহাবিহারের ধর্মগঞ্জ নামক স্থানে রত্নসাগর, রত্নরঞ্জক, রত্নদধি নামে সুরম্য তিনটি প্রাসাদে উন্নত ধরনের পুস্তকাগার ছিল। এখানে কয়েক লক্ষ পুথি রাখা ছিল।

‘সেইসব পুথির কি কোনো সন্ধান পাওয়া যায় ?’

অল্পক্ষণ চুপ করে রইলেন রামশরণ। তারপর বললেন, নালন্দার সব কিছুই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। দ্বাদশ শতকের শেষ দিকে যখন নালন্দার গৌরব চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে সেইসময় বখতিয়ার খিলজি নামে এক মুসলিম সেনাপতি নালন্দায় এসে লুঠতরাজ শুরু করেন। মাত্র এক দিনের তাণ্ডবতায় নালন্দায় কয়েক-শো বছর ধরে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত সম্পদ ধ্বংসে পরিণত হল। অনেকের ধারণা, স্থানীয় ব্রাহ্মণ, যাঁরা বৌদ্ধ ধর্মের বিদ্বেষী ছিলেন তঁারাই এই গণ্ডগোলের সুযোগে পাঠাগারে আগুন লাগিয়ে দেয়। ওই আগুনে পাঠাগারের বই ও পুথি পুড়ে শেষ হতে সময় লেগেছিল বহু বছর। পরবর্তীকালে তিব্বতীয় পণ্ডিত ধর্মস্বামী ১২৩৫-৩৬ খ্রিস্টাব্দে এখানে এসে ধ্বংসস্তূপ পর্যবেক্ষণ করেন। মন্দির সংঘারামগুলি ছিল জনশূন্য পরিত্যক্ত। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি কয়েক জন রাজার প্রচেষ্টায় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আবার চালু হয়। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ধ্যানভদ্র নামে কোনো এক ব্যক্তির রচনায়। তিনি এখানে অল্প কিছুদিন শাস্ত্রচর্চা করেছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে নালন্দা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।

‘পরবর্তীকালে নালন্দার সন্ধান পাওয়া যায় কীভাবে?’

‘আলেকজান্ডার কানিংহাম হিউ-এন-সাঙ-এর বিবরণ পড়ে প্রথম এর অনুসন্ধান শুরু করেন। সেই সময় এই জায়গার নাম ছিল বরগাঁও। এখানে মাটি খুঁড়ে নানান শিলমোহর, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যকলা আবিষ্কার হয়। তার থেকেই জানা যায় এখানেই ছিল নালন্দা মহাবিহার তথা বিশ্ববিদ্যালয়। তারপর বিভিন্ন সময়ে মাটি খুঁড়ে এখন যা দেখছেন তা বার করা হয়েছে।’

আর কিছু বলতে গিয়েই ঘড়ির দিকে চোখ পড়ে রামশরণের।

‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে এত বেলা হয়ে গিয়েছে বুঝতে পারিনি। চলি।’

অমিতাভ হাতজোড় করে।

‘আপনার কাছে অনেক কিছু জানতে পারলাম।’

‘আবার যদি কখনো আসেন দেখা হবে।’

অমিতাভ জিজ্ঞাসা করে, আপনি কি এখানে থাকেন ?

‘পাশের গাঁয়ে। দশ মিনিটের রাস্তা। দু-বছর হল চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি। ছেলে শহরে থাকে। ওখানে চাকরি করে। আমাকে শহরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। মাঝে মাঝে যাই, ভালো লাগে না। আমার বউ ঠাট্টা করে বলে আমি এই পুরোনো দিনের ইট-পাথরের প্রেমে পড়ে গিয়েছি। বউ ঠিকই বলে। এখানে এসে দাঁড়ালেই মনে হয় চারপাশের সব যেন জীবন্ত। কতদিন রাতে এখানেই ঘুমিয়ে পড়েছি। ভোরবেলায় ঘুম ভেঙেছে। অন্য লোকেরা এসে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। সেসব অনেক কথা। আবার যদি কোনো দিন দেখা হয় বলব।’

মাথা নাড়ে অমিতাভ। ‘নিশ্চয়ই দেখা হবে।’

আর দাঁড়ালেন না রামশরণ। যতক্ষণ দেখা যায় একদৃষ্টে তঁার দিকে তাকিয়ে থাকে অমিতাভ। একসময় পাথরের আড়ালে হারিয়ে যান মানুষটা। চড়া রোদ। অমিতাভ যেখানে বসে আছে সেখানে ছায়া। মাথার উপর ছাদ। তিন দিকের দেওয়াল ঘিরে পুরোনো দিনের কোনো কক্ষ।

কেমন আনমনা হয়ে যায় অমিতাভ। চারপাশের নির্জনতার মধ্যে দুটো পাখি অনেকক্ষণ ধরে একটানা গুব গুব করে ডেকে চলেছে। ঠিক যেন ছাত্রদের গুঞ্জন। কবিগুরুর সেই ‘ব্রাহ্মণ’ কবিতার মতো :

যত তাপস বালক

শিশিরস্নিগ্ধ যেন তরুণ আলোক

ভক্তি অশ্রু-ধীতে যেন নবপুণ্যচ্ছটা,

প্রাতঃস্নাত স্নিগ্ধচ্ছবি আর্দ্রসিক্ত জটা,

শুচিশোভা সৌম্যমূর্তি সমুজ্জ্বলকায়ে

বসেছে বেষ্টন করি বৃদ্ধ বটচ্ছায়ে

গুরু গৌতমেরে, বিহঙ্গকাকলী গান

মধুপগুঞ্জনগীতি, জলকলতান,

তারি সাথে উঠিতেছে গম্ভীর মধুর

বিচিত্র তরুণ কণ্ঠে সম্মিলিত সুর।

শান্ত সামগীতি।

গুঞ্জন মিলিয়ে যায়। কোথা থেকে হঠাৎ কুয়াশার মতো ঘন আবরণ ভেসে আসে। হঠাৎ চারপাশের সব কিছু কেমন অস্পষ্ট হয়ে যায় দূর থেকে ভেসে আসে সমবেত পদধ্বনি, কারা যেন আসছেন নালন্দার দিকে।

মুখ তোলে অমিতাভ। স্পষ্ট দেখতে পায় এক তরুণ। পরনে পীত বসন। মাথা থেকে পিঠ হয়ে কোমর পর্যন্ত বিচিত্র আকৃতির ঝোলা। চিনতে পারে অমিতাভ। জ্ঞানতাপস হিউ-এন-সাঙ চলেছেন নালন্দার দিকে। উঠে দাঁড়াল অমিতাভ। সেও সঙ্গী হবে হিউ-এন-সাঙ-এর।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%