চঞ্চলকুমার ঘোষ
হিউ-এন-সাঙ-এর বিবরণী থেকে সেকালের কান্যকুব্জর অনেক কথা জানা যায়।
হর্ষবর্ধন তখন ছিলেন কান্যকুব্জ বা কনৌজের অধিপতি। কনৌজের আয়তন ছিল দৈর্ঘে কুড়ি লি অার প্রস্থে চার-পাঁচ লি। নগরের পশ্চিমে গঙ্গা। নগরের চারদিকে উদ্যান। মাঝে মাঝে গৃহ-প্রসাদ। নগরবাসীদের মধ্যে অধিকাংশই ধনী। দরিদ্রের সংখ্যা প্রায় নগণ্য। লোকজন মার্জিত রুচির, তারা বিদ্যা ও শিল্পচর্চা করে। বৌদ্ধ ও অবৌদ্ধদের সংখ্যা প্রায় সমান সমান। নগর জুড়ে অজস্র দেবমন্দির।
নগরের পশ্চিমে দুশো ফুট উঁচু স্তূপ। ভগবান বুদ্ধ এখানে বসে ধর্মপ্রচার করেছিলেন। তঁারই স্মৃতিতে সম্রাট অশোক এই স্তূপ নির্মাণ করেন। একটি বিহারে ভগবান বুদ্ধের দাঁত সংরক্ষিত করা ছিল। বলা হত দিনের এক এক সময় তা থেকে এক এক বর্ণ বিচ্ছুরণ করে। এক স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে যে কেউ তা দর্শন করতে পারে।
নগরের নাম কান্যকুব্জ হওয়ার পিছনে রয়েছে এক করুণ কাহিনি। পুরাকালে এক রাজা ছিলেন, তঁার নাম ব্রহ্মদত্ত। তখন এই দেশের নাম ছিল কুসুমপুর। ব্রহ্মদত্ত রাজার একশো কন্যা। সকলেই অসাধারণ সুন্দরী। একদিন রাজকন্যারা গঙ্গায় স্নান করতে গিয়েছে। সকলে নদীর জলে নেমে কোলাহল করছে। সেইসময় সেই ঘাটের পাশে এক বটবৃক্ষের নীচে বসে ধ্যান করছিলেন এক সাধু। রাজকন্যাদের কোলাহলে সাধুর ধ্যানভঙ্গ হল। সাধু ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দিতে চাইলে সকলে ক্ষমা প্রার্থনা করল। সাধু বললেন, যদি রাজকন্যারা তঁাকে বিবাহ করে তবেই তিনি তঁাদের ক্ষমা করবেন। এক এক করে সব রাজকন্যাদের আহ্বান করলেন, কেউ সেই সাধুকে বিবাহ করতে রাজি হল না। সাধু তখন অভিশাপ দিলেন, রাজকন্যাদের সব রূপ নষ্ট হয়ে তারা কুব্জা হয়ে যাবে। সেই থেকে নগরের নাম হল কান্যকুব্জ।
সম্রাট অশোকের পরবর্তীকালে অধিপতি হর্ষবর্ধন হয়ে উঠেছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতি।
হিউ-এন-সাঙ হর্ষবর্ধনের প্রতি শুধুমাত্র শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেননি, তঁার বহু গুণের কথাও বলেছেন। সিংহাসনে বসবার পর বেশ কয়েক বছর যুদ্ধবিগ্রহেই কেটে যায় হর্ষবর্ধনের। ধীরে ধীরে সমস্ত গাঙ্গেয় ভারত নিজের অধীনে আনেন। সাম্রাজ্য জুড়ে স্থাপন করেন সুশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থা। শত্রুদের সংযত রাখতে ও আপন রাজ্য সুরক্ষিত করতে বিরাট এক সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। তঁার সেনাবাহিনীতে ছিল ষাট হাজার হাতি ও এক লক্ষ অশ্বারোহী। দেশের শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করবার পর পরবর্তী ত্রিশ বছর যুদ্ধবিগ্রহ ত্যাগ করে নানান সৎকাজে আত্মনিয়োগ করেন।
হিউ-এন-সাঙ লিখলেন, হর্ষবর্ধন ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও কর্তব্য সচেতন রাজা। তঁার জীবনের আদর্শই ছিল সৎকর্ম করা। রাজ্যে প্রাণীহত্যা করে মাংসগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছিলেন। গঙ্গার তীরে বহু স্তূপ তৈরি করেছিলেন। রাজ্যজুড়ে তৈরি করেছিলেন অজস্র ধর্মশালা ও বৌদ্ধ বিহার। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর মহাসম্মেলনে সমরাস্ত্র ছাড়া নিজের প্রায় সবকিছুই ধর্মভিক্ষায় দান করতেন। প্রতি বছর এক বার করে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সমাবেশ করতেন। একুশ দিন ধরে দান করতেন। নগরের অতিথিশালা থেকে প্রতিদিন এক হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পাঁচশো ব্রাহ্মণকে ভোজন করানো হত। হর্ষবর্ধন প্রথমজীবনে ছিলেন শৈব, পরে ভগবান বুদ্ধের আদর্শে নিজেকে সমর্পণ করেন।
হিউ-এন-সাঙ তিন মাস কান্যকুব্জের ভদ্রবিহারে বাস করেছিলেন। সেখানে আচার্য ছিলেন বীর্যসেন। হিউ-এন-সাঙ তঁার কাছে বিভাষাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
কান্যকুব্জে তিন মাসের অবস্থানকালে হিউ-এন-সাঙ-এর সঙ্গে হর্ষবর্ধনের সাক্ষাৎ হয়নি। সাক্ষাৎ হয়েছিল এর ছয় বছর পর ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে। তখন তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সমাপ্ত করে ভারত পরিক্রমা সম্পন্ন করে রওনা হয়েছেন স্বদেশের পথে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন