চঞ্চলকুমার ঘোষ
তক্ষশীলা প্রাচীন বিশ্বের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
ইতিহাসে পড়া তক্ষশীলার নাম দেখেই চুপ করে ভাবে অমিতাভ। প্রায় তিন হাজার বছর আগে ভারতবর্ষের শিক্ষা কোন পর্যায়ে উঠেছিল ভাবতেও বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। অথচ সেই তক্ষশীলা সম্পর্কে সে প্রায় কিছুই জানে না।
কম্পিউটার খুলে নেট চালু করে তক্ষশীলা নাম লিখতেই একের পর এক তথ্য বেরিয়ে আসে। বর্তমান পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে মাত্র বত্রিশ কিলোমিটার দূরে ছিল প্রাচীন তক্ষশীলা। ‘তক্ষশীলা’ শব্দটির অর্থ পাথরের খণ্ড। অন্য অর্থে রামচন্দ্রের ছোটোভাই ভরতের পুত্র তক্ষ ছিলেন এই অঞ্চলের রাজা। তঁার নাম থেকে এই স্থানের নাম হয় তক্ষশীলা। তবে তক্ষশীলার কথা বিশেষভাবে পাওয়া যায় বুদ্ধের জাতকের গল্পে। কম-বেশি প্রায় চারশো বছর তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছিল। প্রথমে এখানে বেদ উপনিষদ ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চর্চা হলেও পরে যখন বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটল তখন এখানে বৌদ্ধশাস্ত্র চর্চা শুরু হল।
বিভিন্ন বৌদ্ধশাস্ত্র থেকে জানা যায়, এখানে ধর্মশাস্ত্র ছাড়াও ব্যবহারিক নানা বিষয় যেমন_কৃষি, বাণিজ্য, পশুপালন, রাজধর্ম, চিকিৎসা, অর্থশাস্ত্র, যুদ্ধবিদ্যা, কলাবিদ্যা, স্থাপত্যবিদ্যা, এমনকী অভিনয়ও শেখানো হত। ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে ছাত্ররা এখানে আসত। ধনী ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করতেন। সেই অর্থে শিক্ষক ও অন্যদের ভরণপোষণ হত।
তক্ষশীলার গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী তার তিন ছাত্র। প্রথম জন প্রখ্যাত চিকিৎসক জীবক, দ্বিতীয় জন অর্থশাস্ত্র রচয়িতা কৌটিল্য (চাণক্য) এবং অপর জন বিখ্যাত বৈয়াকরণিক পাণিনি।
জীবক ছিলেন গৌতম বুদ্ধ ও মগধ সম্রাট বিম্বিসারের সমসাময়িক, তঁাকে ঘিরে রয়েছে কত কাহিনি। অনুমান, জীবকের জন্ম ৫৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রাজগৃহে। তঁার পিতার কোনো পরিচয় জানা যায় না। ভিন্ন মতে তিনি মহারাজ বিম্বিসারের অবৈধ সন্তান। একদিন বনের পথে তঁাকে কুড়িয়ে পান মহারাজ বিম্বিসারের এক অনুচর। মহারাজ এই শিশুর দায়িত্ব নেন। দ্বিতীয় বার জীবন ফিরে পাওয়ার জন্যে তঁার নাম রাখা হয় জীবক। জীবক একটু বড়ো হতেই মনস্থির করেন তঁাকে অনেক বড়ো হতে হবে। সকলের শ্রদ্ধেয় হতে হবে। পরিচয়হীনতার গ্লানি তঁাকে মুছে ফেলতেই হবে।
শৈশব থেকে ধীর, বুদ্ধিমান, মেধাবী ছাত্র ছিলেন জীবক। গুরুগৃহের পাঠ শেষ করে গেলেন তক্ষশীলায়। অনেক বিদ্যার মধ্যে তিনি বেছে নিলেন চিকিৎসাবিদ্যা। তিনি জানতেন চিকিৎসার মধ্যে দিয়ে একদিকে যেমন সকলের সেবা করা যায় অন্যদিকে সহজেই সব মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করা সম্ভব। দীর্ঘ সাত বছর তক্ষশীলায় থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় নিজের পাঠ শেষ করলেন জীবক। তঁার সহজাত মেধা ও প্রতিভার পরিচয় পেয়ে সকলে মুগ্ধ। শোনা যায় তিনি যখন তক্ষশীলা থেকে ফিরে চলেছেন রাজগৃহে, পথে পড়েছিল সাকেত নগর। দীর্ঘ পথ এসে সেখানে কয়েক দিন বিশ্রাম করছিলেন জীবক। সেখানে এক বণিকের স্ত্রী দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছিলেন। বণিক কোনোভাবে জীবকের কথা জানতে পেরে তঁাকে নিজের গৃহে নিয়ে গেলেন। বললেন স্ত্রীকে সুস্থ করে তুলতেই হবে। দ্বিধান্বিত জীবক। সদ্য শিক্ষা শেষ করেছেন। কতটুকু তঁার জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা। তবু চিকিৎসা শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পরীক্ষা করতেই রোগের কারণ বুঝতে পারলেন। বিভিন্ন গাছপালার রস মিশিয়ে একটি ভেষজ তৈরি করলেন। তারপর সেই ভেষজ আর ঘি গরম করে বণিক পত্নীকে শোঁকাতে আরম্ভ করলেন। কয়েক ঘণ্টাতেই আরাম বোধ করলেন বণিকের স্ত্রী। তিন দিনে সম্পূর্ণ সুস্থ। জীবকের আশ্চর্য চিকিৎসায় অভিভূত বণিক। তিনি প্রচুর অর্থ ছাড়াও দিলেন রথ, এক জন দাস, এক জন দাসী। জীবক ফিরে এলেন রাজগৃহে। তিনি যা উপার্জন করেছিলেন সব উপহার দিলেন মহারাজ বিম্বিসারকে। তঁার জীবন শিক্ষা সবই তো মহারাজ বিম্বিসারের জন্যে।
এরপর শুরু হল জীবকের সাধনা। একদিকে চিকিৎসা অন্যদিকে গবেষণা।
মলদ্বারের ব্যাধিতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন বিম্বিসার। কারও ওষুধেই কাজ হয় না। শেষে জীবককে ডাকা হল। তিনি পরীক্ষা করে একটি মলম তৈরি করে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন। কয়েক দিনেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন বিম্বিসার। জীবককে করলেন রাজচিকিৎসক। এইসময় বিম্বিসার বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। বুদ্ধের সান্নিধ্য পেয়ে জীবকের জীবনেও এল বিরাট পরিবর্তন। তিনি নিজেকে সমর্পণ করলেন বুদ্ধের চরণে। বুদ্ধের নির্দেশে চিকিৎসা হয়ে উঠল তঁার কাছে পরম সাধনা। জীবক শুধু যে ভেষজ চিকিৎসা করতেন তাই নয়, তিনি শল্যচিকিৎসাও করতেন। অর্থ-যশ-খ্যাতি বুদ্ধের স্নেহ_সবই পেলেন জীবক। হঠাৎ পিত্তরসের গোলমালের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লেন বুদ্ধ। চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন জীবক। পদ্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিলেন কয়েকটি ওষুধ। তারপর তার ঘ্রাণ নিতে বললেন। কয়েক দিনেই সুস্থ হয়ে উঠলেন বুদ্ধ।
জীবনের এই পরম শান্তির মধ্যে চরম অশান্তি নেমে আসে জীবকের জীবনে। অজাতশত্রু পিতা বিম্বিসারকে হত্যা করে সিংহাসনে বসলেন। বৌদ্ধদের প্রতি তঁার ছিল চরম ঘৃণা। বিপদের কথা মাথায় নিয়েও শুধু সাধারণ মানুষের কথা ভেবে রাজগৃহে রয়ে গেলেন। শেষপর্যন্ত তঁারই চেষ্টায় একদিন অন্তরের সব বিদ্বেষ ত্যাগ করে বুদ্ধের শরণ নিলেন অজাতশত্রু।
তক্ষশীলার আরেক মহান ছাত্র চাণক্য। ভিন্ন নাম কৌটিল্য। মৌর্যবংশীয় রাজা চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী ছিলেন চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৪_৩০০)। তক্ষশীলার পাঠ শেষ করে তিনি ফিরে আসেন পাটলিপুত্রে। তখন পাটলিপুত্রের রাজা ছিলেন নন্দ। কোনো কারণবশত নন্দের রাজসভায় অপমানিত হন চাণক্য। তার প্রতিশোধ নেবার জন্যে চন্দ্রগুপ্তের সাহায্যে নন্দকে হত্যা করে চন্দ্রগুপ্তকে পাটলিপুত্রের রাজা করেন। চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী চাণক্য ও অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা কৌটিল্য একই ব্যক্তি কি না এ বিষয়ে বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশ পণ্ডিতের ধারণা দুই নামে একই ব্যক্তি। চাণক্যের নীতি বিষয়ক শ্লোকগুলির জনপ্রিয়তা ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।
পাণিনি ছিলেন গান্ধারের অধিবাসী। ভাষাতত্ত্বের দিক থেকে তঁার রচিত ব্যাকরণ মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ। পাণিনির পিতামহের নাম ছিল দেবল। মায়ের নাম দাক্ষী। তাই বহু পুথিতে পাণিনিকে বলা হয়েছে দাক্ষীপুত্র বা দক্ষেয়। পাণিনির ব্যাকরণ গ্রন্থের নাম অষ্টাধ্যায়ী। আটটি অধ্যায়ে বিভক্ত বলে এই নাম। তিনি ছিলেন শিবের উপাসক। পরবর্তীকালে রচিত সমস্ত ব্যাকরণই তঁার ব্যাকরণকে ভিত্তি করে রচিত হয়েছিল। অনুমান করা হয় তিনি ছিলেন নন্দ বংশের শেষ রাজার মন্ত্রী এবং চাণক্যের সমসাময়িক।
জীবক, চাণক্য, পাণিনি_তক্ষশীলার তিন মহান ছাত্রের জীবনকথা পড়তে পড়তে কেমন আনমনা হয়ে গিয়েছিল অমিতাভ। আড়াই হাজার বছর আগে পৃথিবীতে যখন সবেমাত্র জ্ঞানের আলো প্রস্ফুটিত হচ্ছে, ভারতবর্ষ তখন জ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে এগিয়েছিল। সেই জ্ঞানের সামান্য কিছু অর্জন করবার জন্যেই হিউ-এন-সাঙ ভারতবর্ষে এসেছিলেন।
কম্পিউটার বন্ধ করে আবার বই খোলে অমিতাভ। হিউ-এন-সাঙ এসেছেন তক্ষশীলায়। বিভিন্ন পুথি থেকে তক্ষশীলার অতীত ইতিহাসের অনেক কিছু জানতে পারেন। আজ সব ধ্বংসস্তূপ। মানুষজন নিতান্তই কম। বেশ কয়েকটা সংঘারাম রয়েছে। তাদের অবস্থাও খুবই দুর্দশাগ্রস্ত।
ব্যথিত হন হিউ-এন-সাঙ। মানুষের লোভ লালসা কি এমনিভাবেই মানুষের যা-কিছু মহৎ সৃষ্টি রয়েছে তাকে ধ্বংস করে ফেলবে ? মনের মধ্যে ভাবনা জাগে, নালন্দা, বুদ্ধগয়া, কপিলাবস্তু, সারনাথ সেখানে গিয়ে কী দৃশ্য দেখবেন কে জানে! অল্প কিছুদিনের জন্যে তক্ষশীলায় রয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। নগরের উত্তরে মস্তকদানের স্তূপ। এই স্তূপের কথা আগেই শুনেছিলেন হিউ-এন-সাঙ। বলা হয় অতীতজন্মে বুদ্ধ রাজা চন্দ্রপ্রভ নামে জন্মগ্রহণ করেন। সাধনায় সিদ্ধিলাভ করবার জন্যে নিজের মস্তক দান করেছিলেন। সেই মহান দানের কথা স্মরণ করে সম্রাট অশোক এই স্তূপ নির্মাণ করেন। বলা হত বিশেষ দিনে ওই স্তূপ থেকে আলোর প্রভা বেরিয়ে আসে। যাঁরা প্রকৃতই ভগবান বুদ্ধের অনুগামী তঁারা সেই আলো দেখতে পান।
হিউ-এন-সাঙ যখন মস্তকদানের স্তূপ দেখবার জন্যে যান, সেখানে এক অলৌকিক কাহিনি জানতে পারেন। তিনি সেখানে যাওয়ার অল্প কয়েক দিন আগে এক রমণী সেখানে পুজো দিতে আসেন। তঁার সমস্ত শরীর জুড়ে দগদগে ঘা। স্তূপের চারদিকে নোংরা আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখে নিজেই এগিয়ে এসে সব পরিষ্কার করেন। তারপর পুজো দিতেই আশ্চর্য হয়ে দেখেন তার শরীরে আর রোগের চিহ্নমাত্র নেই!
এই মস্তকদানের স্তূপে প্রার্থনা শেষ করে হিউ-এন-সাঙ গেলেন নগরের উত্তরে একশো ফুট উঁচু এক স্তূপ দর্শনে। এই স্তূপের নাম কুণাল স্তূপ। সম্রাট অশোকের পুত্র কুণাল ছিলেন তক্ষশীলার শাসনকর্তা। সম্রাট অশোকের এক রানির ষড়যন্ত্রে কুণালের চোখ নষ্ট করে দেওয়া হয়। পরে অর্হৎ ঘোষার আশীর্বাদে আবার দৃষ্টি ফিরে পান।

তক্ষশীলা দর্শন করে হিউ-এন-সাঙ এগিয়ে চললেন। কয়েক দিন চলার পর তিনি এসে পৌঁছলেন সিংহপুর রাজ্যে। চারিদিকে পাহাড়। পশ্চিমে বয়ে চলেছে সিন্ধু নদ। রুক্ষ অঞ্চল। তাই এখানকার মানুষদের প্রকৃতিও কিছুটা রুক্ষ। এখান থেকে যাত্রা করে যখন সিন্ধু নদের তীরে এসে থামলেন তখন দিন ফুরিয়ে এসেছে।
দু-জন সঙ্গী পথশ্রমে ক্লান্ত। শূন্য ঘাট, মাঝি নৌকা নিয়ে অন্য কোথাও গিয়েছে। হিউ-এন-সাঙ বললেন, আজ রাতে এখানেই বিশ্রাম নেব।
ঘাটের পাশেই একটি ভাঙা ঘর, সেখানেই বিশ্রামের আয়োজন করা হল। প্রথম রাতটুকু ঘুমিয়ে নেন হিউ-এন-সাঙ। মধ্যরাত পেরিয়ে যেতেই ঘুম ভেঙে যায় তঁার। সঙ্গীরা ঘুমিয়ে আছে। সন্তর্পণে উঠে পড়লেন। ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নদীর পাড়ে এসে বসলেন। চাঁদের আলোয় চারদিক দিনের মতো পরিষ্কার। নদীর ঢেউয়ের শব্দ বাতাসে ভাসছে। রাতজাগা পতঙ্গের দল বিচিত্র শব্দ তুলে ডেকে চলেছে। কতক্ষণ বসেছিলেন খেয়াল নেই। হঠাৎ কারও পায়ের শব্দে মুখ ফেরালেন, দেখলেন এক বৃদ্ধ। সাদা দাড়ি সাদা চুল। এই সময়ে এখানে কোনো বৃদ্ধকে দেখবেন ভাবেননি হিউ-এন-সাঙ। জিজ্ঞাসা করলেন, কে আপনি ? বৃদ্ধ বললেন, সামান্য মানুষ।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমরা সকলেই সামান্য মানুষ। আপনি বৃদ্ধ। এই রাতের অন্ধকারে কোথায় গিয়েছিলেন ?
বৃদ্ধ অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, একজন অসুস্থ, তার চিকিৎসার জন্যে গিয়েছিলাম। আগেই ফিরে আসতাম, আরও দু-জন অসুস্থ মানুষের ঘর থেকে ডাক এল। রুগির ডাক এলে চিকিৎসককে যেতেই হয়।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমার পরম সৌভাগ্য আপনার মতো একজন পুণ্যবান চিকিৎসকের সান্নিধ্য পেলাম।
মুহূর্তে প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন বৃদ্ধ_আমি পুণ্যবান নই, পরম পাপী !
আগের মতোই শান্তভাবে হিউ-এন-সাঙ বললেন, মানুষের মধ্যে যখন অনুশোচনা জন্মায় তখন আর তার পাপ থাকে না।
মাথা নীচু করে বৃদ্ধ বললেন, আমার এ পাপ কখনো মুছে যাবার নয়।
‘কীসের পাপ ?’ জিজ্ঞাসা করলেন হিউ-এন-সাঙ।
কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে সিন্ধুর জলপ্রবাহের দিকে তাকিয়ে থাকেন বৃদ্ধ।
তারপর বললেন, আমার পিতা ছিলেন বণিক। বাণিজ্য করে যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করেছিলেন। পিতার ইচ্ছা ছিল আমিও তঁার সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্যের কাজ করব। কিছু খারাপ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে আমিও খারাপ হয়ে গেলাম। পিতা আমার এই আচরণকে মেনে নিতে পারলেন না। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। গ্রামের লোকেরাও গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিল। প্রচণ্ড রাগে আমি ঠিক করলাম এর প্রতিশোধ নেব। একটা দস্যুদল তৈরি করলাম। চারদিকে লুটপাট আরম্ভ করলাম। আমার হাতে কত মানুষ মারা পড়ল তার হিসাব নেই। একদিন ডাকাতি করতে গিয়ে ভীষণভাবে আহত হলে সঙ্গীরা আমাকে পথের পাশে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেল। হয়তো মারাই যেতাম। অপরিচিত একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আমাকে তঁার বিহারে নিয়ে গেলেন। তিনি ছিলেন চিকিৎসক। তঁার সেবা ও চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠলাম। পরে জানলাম সেই সন্ন্যাসীর স্ত্রী ছিল, সন্তান ছিল। তাদের সকলকে আমিই হত্যা করেছিলাম। প্রবল অনুশোচনা শুরু হল অামার মধ্যে।
হিউ-এন-সাঙ প্রশ্ন করলেন, সেই চিকিৎসক কি জানতেন আপনার পরিচয় ?
‘তিনি জানতেন না, আমিই প্রকাশ করেছিলাম। সব জেনেও বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আমাকে ক্ষমা করেছিলেন। আমি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন আত্মহত্যায় পাপের মুক্তি হয় না। সৎ আচরণ, সৎবুদ্ধি, সৎকর্মের মধ্যেই পাপের মুক্তি হয়।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, তিনি ঠিকই বলেছেন। আপনার নবজন্ম হয়েছে। অতীতের কোনো পাপই আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে না। ভগবান বুদ্ধও সেকথা বলতেন।
বৃদ্ধ বললেন, ভগবান বুদ্ধ কী আমার পাপ ক্ষমা করবেন ?

হিউ-এন-সাঙ বললেন, ভগবান বুদ্ধ পরম করুণাময়। অন্তর দিয়ে তঁার কাছে প্রার্থনা জানালে কেউ তঁার করুণা থেকে বঞ্চিত হয় না।
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে নতজানু হলেন হিউ-এন-সাঙ-এর সামনে। প্রণাম করে বললেন, হে মহাজ্ঞানী, আমার পরম সৌভাগ্য আপনার সঙ্গে দেখা হল। এই হয়তো ভগবান বুদ্ধের করুণা।
রাত শেষ হয়ে এসেছিল। হিউ-এন-সাঙ-এর অনুচরেরা এসে দাঁড়ায়। ভোর হতেই খেয়া চলে। চিকিৎসক হিউ-এন-সাঙ-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভিন্ন পথে এগিয়ে চলেন।
সিন্ধু নদী পেরিয়ে পূর্ব দিকে মহাগিরিদ্বার। পার্বত্যসংকুল এই স্থানে রয়েছে বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বেশ কয়েকটি স্তূপ। তার মধ্যে প্রধান মহাসত্ত্ব স্তূপ। জাতক কাহিনিতে আছে বুদ্ধ কোনো এক জন্মে ছিলেন এই রাজ্যের যুবরাজ। তখন তার নাম ছিল মহাসত্ত্ব। একদিন মহাসত্ত্ব বনে গিয়েছিলেন। হঠাৎ দেখলেন এক হরিণী কাতরস্বরে আর্তনাদ করছে। মহাসত্ত্ব হরিণীকে জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কীসের জন্যে আর্তনাদ করছ ? হরিণী জবাব দিল, এক বাঘিনি আমার দুটি শাবককে নিয়ে গিয়েছে। তুমি তাদের রক্ষা করো।
হরিণীর কথায় বিচলিত হয়ে দ্রুত এগিয়ে গেলেন মহাসত্ত্ব। কিছু দূর যেতেই তঁার চোখে পড়ল এক গুহার সামনে বসে আছে ভয়ংকর চেহারার এক বাঘিনি। তার দুই থাবার মধ্যে ধরা রয়েছে দুই হরিণশিশু। মহাসত্ত্ব বললেন, হরিণশিশুদের মুক্ত করে দাও। বাঘ বলল, আমি ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছি। ওদের মুক্ত করে দিলে আমার ক্ষুধা মিটবে কেমন করে ? মহাসত্ত্ব বললেন, তুমি অন্য কোনো পশু শিকার করে খাও। বাঘিনি বলল, আমি ক্ষুধায় এত কাতর হয়ে পড়েছি নতুন করে শিকার করা সম্ভব নয়। কিছু ভাবলেন মহাসত্ত্ব। তারপর বললেন, তুমি হরিণশিশুদের মুক্ত করে দাও তার বিনিময়ে আমাকে খাদ্য হিসেবে নাও। মুহূর্তে বাঘিনি হরিণশিশুদের ছেড়ে দিয়ে ঝাপিয়ে পড়ল মহাসত্ত্বের উপর। তঁাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল।
মহাসত্ত্বের এই মহান দানকে স্মরণ করে তৈরি হয় স্তূপ। হিউ-এন-সাঙ এই স্তূপ দর্শন করে যাত্রা করলেন কাশ্মীরের দিকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন