যাত্রা হল শুরু

চঞ্চলকুমার ঘোষ

ঘুম ভেঙে গেল অমিতাভর। একটা স্বপ্ন। শেষ রাতের স্বপ্ন। বিছানায় উঠে বসল অমিতাভ। মুখ তুলে তাকাল। খোলা জানালা দিয়ে ভোরের আবছা আলো এসে পড়েছে ঘরের মধ্যে। বিছানার পাশেই লাইটের সুইচ টিপতেই সারাটা ঘর আলোয় ভরে উঠল। মুখ ফেরাতেই চোখ পড়ল বালিশের পাশে রাখা বইয়ের দিকে। আগের দিন লাইব্রেরি থেকে এনেছিল। লাইফ অফ হিউ-এন-সাঙ। পড়তে পড়তে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল, চোদ্দোশো বছর আগে একজন মানুষ শুধু জ্ঞানের সন্ধানে কী ভয়ংকর দুর্গম পথ পার হয়ে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। পাহাড়, পর্বত, জঙ্গল, মরুভূমি, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, কোনো কিছুই তঁার চলার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি।

অমিতাভ ইতিহাসের ছাত্র নয়। ইতিহাস ভালোবাসে। তার চেয়ে বেশি ভালোবাসে ইতিহাসের সেইসব জায়গায় ঘুরে বেড়াতে, যেখানে পা ফেললে অনুভব করে ফেলে আসা অতীত যেন তার সামনে এসে নতুন করে জেগে উঠেছে। তারা কথা বলছে। অভিনীত হচ্ছে একের পর এক দৃশ্য।

বেশ কয়েক পাতা পড়বার পর আর আলো ছিল না। বইটা বন্ধ করে বালিশের পাশে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছিল হিউ-এন-সাঙ চলেছেন পাহাড়ের কোল দিয়ে। কোথাও কেউ নেই। সামনে ধুধু বালি আর বালি। চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন হিউ-এন-সাঙ। আর চলতে পারছেন না, তবু চলছেন। মাঝে মাঝে বালির ওপরেই হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করছেন। আবার যেন নতুন শক্তি ফিরে পাচ্ছেন।

শেষ রাতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল অমিতাভর। জানে আর এখন ঘুম আসবে না। ঘরের আলো জ্বালিয়ে বালিশে হেলান দিয়ে বইটা খুলল। হিউ-এন-সাঙ তাকে নেশার মতো টানছে। আগের দিন রাতে যেখানে শেষ করেছিল সেখান থেকেই আবার শুরু করল।

প্রার্থনাকক্ষে নতজানু হয়ে বসেছিলেন হিউ-এন-সাঙ। ঠিক তঁার পিছনে হুই-তি। আজ আর প্রার্থনায় মন নেই হুই-তির। মনের মধ্যে গভীর এক বেদনা। অল্পক্ষণ পরেই উঠে দাঁড়ালেন হিউ-এন-সাঙ। সামনে বুদ্ধের মূর্তির দিকে চেয়ে অস্ফুটে কিছু বললেন, তারপর হুই-তির কাঁধে হাত রাখলেন।

‘চল যাই।’

প্রার্থনাকক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে এক কিশোর শ্রমণ। হিউ-এন-সাঙ-কে দেখামাত্রই বলল, প্রণাম ভন্তে। মহাস্থবির তঁার কক্ষে আপনার জন্যে প্রতীক্ষা করছেন।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি তঁার কক্ষেই যাব।

প্রার্থনা কক্ষের পরই মহাস্থবিরের কক্ষ। নরম গালিচার ওপর বসেছিলেন মহাস্থবির। বৃদ্ধ হলেও এখনও যথেষ্ট সমর্থ। তঁাকে ঘিরে আরও অনেক সন্ন্যাসী। সকলে একসঙ্গে অভিবাদন জানালেন।

হিউ-এন-সাঙ মাথা নত করলেন। বললেন, আমি ভগবান বুদ্ধের দেশে যাত্রা করছি। আপনাদের সকলের আশীর্বাদ প্রার্থনা করছি।

সকলেই মৃদুস্বরে বললেন, ভগবান বুদ্ধ আপনার কল্যাণ করবেন। আমরা সকলেই আপনার প্রতীক্ষা করব।

‘ভগবান বুদ্ধের করুণায় নিশ্চয়ই আমাদের আবার দেখা হবে।’

মহাস্থবির বললেন, গতকাল মহামান্য নগরপাল ওয়ান-পো কিছু উপহার পাঠিয়েছেন। আপনার যাত্রাপথের প্রয়োজন মেটাবে।

কোনো কথা বললেন না। হিউ-এন-সাঙ। নীরব এক ভালবাসার ছোঁয়া।

সকলে একসঙ্গে কিছুক্ষণ প্রার্থনা করলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি আর বিলম্ব করতে চাই না মহাস্থবির।

একজন শিঙ্গা বাজায়। বিহারের সকলে সারিবদ্ধভাবে এসে দাঁড়ায়।

একে একে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফটকের সামনে এসে দাঁড়ালেন হিউ-এন-সাঙ। ফটকের সামনে তিনটি সুন্দর চেহারার ঘোড়া। প্রতিটি ঘোড়ার দু-পাশে পেটিকা। পাশে দাঁড়িয়ে দু-জন তরুণ শ্রমণ হুই-লি আর তাও-চিন। কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই মহাস্থবির বললেন, হুই-লি আর তাও-চিন এই যাত্রা পথে আপনার সেবা করবে।

সামান্য অসহিষ্ণু হলেন হিউ-এন-সাঙ। তিনি চাননি কেউ তঁার সঙ্গী হোক। কিন্তু মনের সে ভাবটুকু প্রকাশ করলেন না। মৃদুস্বরে বললেন, আপনাদের সকলের এই অকৃত্রিম স্নেহ কখনো ভুলব না মহাস্থবির। এবার যাত্রার অনুমতি দিন।

আবেগে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল মহাস্থবিরের। নিঃশব্দে হাতের ইশারা করলেন। ভোরের আকাশ আলোয় ভরে উঠেছে। দু-একটা পাখির ডাক শোনা যায়। তিনটি ঘোড়ায় উঠলেন তিনজন। শিক্ষিত ঘোড়া। নির্দেশ পাওয়ামাত্রই তারা এগিয়ে চলল। কারও মুখে কথা নেই। সামনে অনিশ্চয়তায় ভরা যাত্রাপথ।

বৌদ্ধ বিহারের কিছুদূরে ইজিং নদী এসে মিশেছে ওয়ে নদীর সঙ্গে। কয়েক মুহূর্তের জন্যে থমকে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। তঁার প্রিয় জায়গা। এখানে কতদিন বসে ধ্যান করেছেন। মুহূর্তের জন্যে মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল। আর কোনো দিন এখানে আসা হবে কি না কে জানে।

‘ভন্তে আজ রাতে আমরা কোথায় আশ্রয় নেব ?’ এতক্ষণ পর কথা বললেন তাও-চিন।

চলতে চলতেই হিউ-এন-সাঙ বললেন, দিন ফুরিয়ে আসার আগেই আমরা লান-জাহু পৌঁছে যাব। ওখানে বৌদ্ধ বিহারের স্থবির আমার পরিচিত।

সারাদিন ধরে তঁারা এগিয়ে চললেন। যখন লান-জাহুতে পৌঁছলেন সন্ধে হয় হয়। নগরের মুখেই বৌদ্ধ বিহার। খুবই ছোটো। চারদিকে প্রাচীর। ভেতরে প্রবেশ করতেই হিউ-এন-সাঙ এর চোখে পড়ল পরিচিত এক শ্রমণ।

হিউ-এন-সাঙ-কে দেখামাত্রই আনন্দে শ্রমণের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

‘আসুন, আসুন ভন্তে। এখানে আপনার সাক্ষাৎ পাব ভাবিনি।’

তিনজনেই ঘোড়া থেকে নামলেন। সকলের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। হিউ-এন-সাঙ শ্রমণকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, বহুদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হল।

‘আপনারা কোথায় চলেছেন ?’

সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে হিউ-এন-সাঙ-এর সঙ্গীরা। আগেই তাদের নিষেধ করেছেন। কোথায় চলেছেন সে কথা যেন প্রকাশ না পায়। বললেন, লাল-চাউ বৌদ্ধ বিহারে।

‘সে তো দীর্ঘ পথ।’

সামান্য হাসলেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, ভগবান বুদ্ধের বাণী প্রচার করবার জন্যে কোনো পথই দীর্ঘ নয়।

শ্রমণ বললেন, আসুন আমি আপনাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করছি।

পরদিন সূর্য ওঠবার আগেই আবার তিনজনে যাত্রা করলেন। রুক্ষ পথ। মাঝে মাঝে চড়াই-উতরাই। গাছপালা নেই। বহু দূর অন্তর গ্রাম। সেখানকার মানুষগুলোর আচরণেও রুক্ষতা। বড়ো বড়ো চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে তিন সন্ন্যাসীর দিকে। তাও-চিনের চোখে-মুখে সামান্য ভয়ের ভাব ফুটে উঠেছিল।

‘ভন্তে ওরা দস্যু নয়তো ?’

মৃদুস্বরে জবাব দিলেন হিউ-এন-সাঙ, ওরা গ্রামবাসী।

‘কেমন বর্বরের মতো ভাব। যদি আমাদের সবকিছু লুঠ করে নেয়।’

হিউ-এন-সাঙ-এর মধ্যে কোেনা ভাবান্তর হল না। সহজভাবে বললেন, ভগবান বুদ্ধের যদি ইচ্ছা হয় তাই হবে।

সামনে একটা নদী। জল নেই। ধুধু বালি আর বড়ো বড়ো পাথর। মাঝে মাঝে সামান্য জল তিরতির করে বইছে। সমস্ত সকাল ধরে পথ চলেছেন। মাথার ওপর সূর্য। প্রখর রোদে তিনজনেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। পাথরের আড়ালে পোশাক খুলে সকলেই নদীতে নেমে গেলেন। সামান্য জল তাতেই শরীর ডুবিয়ে বসে থাকেন। ক্লান্ত শরীর বিশ্রাম পায়।

আচমকা ঘোড়ার খুরের শব্দে সকলেই চমকে উঠলেন। চারজন সৈনিক, কাঁধে অস্ত্র। মাথায় টুপি। সামনে এসেই দলের নেতা গোছের একজন কর্কশ গলায় বলল, এই পথে কোনো বৌদ্ধ ভিক্ষুকে দেখেছ ?

হুই-লি বললেন, বৌদ্ধ ভিক্ষু ! কী প্রয়োজনে আপনারা তঁার সন্ধান করছেন ?

‘চাঙ-আন বৌদ্ধ বিহারের এক ভিক্ষু মহামান্য সম্রাটের আদেশ অমান্য করে পশ্চিমে যাত্রা করেছেন।’

মুহূর্তে অজানা আশঙ্কায় চমকে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ। এরা তঁারই সন্ধানে বার হয়েছে। তিনি কিছু জবাব দেবার আগেই হুই-লি বলে উঠলেন, আমরা কোনো বৌদ্ধ ভিক্ষুকে দেখিনি।

সৈনিকরা নিজেদের মধ্যে কিছু কথা বলে, তারপর আবার ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। নদীর বালুচরের ওপর দিয়ে চলতে চলতে এক সময় দূর প্রান্তরে মিলিয়ে যায় চারজন। তিনজনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ তাও-চিন বলে উঠলেন, সৈনিকরা কার সন্ধান করছে ?

এতক্ষণের বিহ্বলতা কাটিয়ে হিউ-এন-সাঙ বললেন, সৈনিকরা আমার সন্ধান করছে। আমিই সম্রাটের আদেশ অমান্য করেছি।

‘তাহলে শুধু জিজ্ঞাসা করে চলে গেল কেন ?’

অবাক হলেন হিউ-এন-সাঙ। তিনজনেই বৌদ্ধ অথচ কাউকে সৈনিকরা সন্দেহ করল না। হঠাৎ চোখ যায় কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সঙ্গীর দিকে। কারও গায়েই সন্ন্যাসীর পোশাক নেই। খালি গা। সারা শরীর বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ভিজে চুল পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। তিনটি ঘোড়াই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে। পিঠের ওপর পেটিকা দেখে মনে হচ্ছে বণিকরা পণ্য নিয়ে দূর দেশে বাণিজ্য করতে চলেছে। তিনজনের পোশাকই সামান্য দূরে একটা পাথরের আড়ালে রাখা। বললেন, সৈনিকরা আমাদের বণিক ভেবে চলে গিয়েছে।

তাও-চিন বললেন, আবার যদি সাক্ষাৎ হয় ?

‘আজ আর সাক্ষাৎ হবে না। তবে আমাদের সতর্ক হয়ে চলতে হবে।’

তিনজনেই পোশাক পরে ঘোড়ায় উঠলেন। তারপর নদী পার হয়ে এগিয়ে চললেন। সতর্ক চোখ সকলের। একবার সৌভাগ্যবশত ধরা পড়েননি। এখন দেখামাত্রই আর ভুল হবে না। চলতে চলতে তাও-চিন বললেন আমরা বুদ্ধের দেশে চলেছি সম্রাট কী করে জানলেন ?

হিউ-এন-সাঙ শান্তভাবে বললেন, সর্বত্রই সম্রাটের লোকজন। সব দিকেই তাদের সতর্ক চোখ।

হুই-লি বললেন, যদি আমরা ধরা পড়ি। সম্রাট কি আমাদের বিচার করবেন ? গলার স্বর অসম্ভব কাঁপছিল তঁার।

হিউ-এন-সাঙ বুঝতে পারছিলেন দু-জনের ভয়-উদ্েবগ। সহজভাবেই বললেন, তোমাদের অকারণ ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। নদী তীরে যিনি আমাদের রক্ষা করেছেন, সেই ভগবান তথাগতই আমাদের রক্ষা করবেন।

বেলা পড়ে এসেছিল। আগে এই পথে কখনো আসেননি হিউ-এন-সাঙ। শুধু কয়েকটি নগরের নাম আর পথের মোটামুটি বর্ণনা ছাড়া কিছুই জানেন না। এক জায়গায় এসে পথ ভাগ হয়েছে। দু-দিকে পথ গিয়েছে। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। কোন পথে যাবেন। সঙ্গীরাও কেউ পথের সন্ধান জানে না। যদি কোনো গ্রামবাসী বা স্থানীয় মানুষের দেখা পেতেন তবে হয়তো জানতে পারতেন।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই পথের পাশে বনের মধ্যে থেকে পায়ের শব্দ ভেসে এল। দু-জন কাঠুরে জঙ্গল থেকে কাঠ নিয়ে আসছে। তিন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে দেখামাত্রই তারা এগিয়ে এল। ঘোড়া থেকে নামলেন হিউ-এন-সাঙ। দুই কাঠুরে পথের ওপরেই নতজানু হল।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, কল্যাণ হোক তোমাদের। আমরা লাল-চাউ নগরে যাব। কোন পথে যাব ?

একজন কাঠুরে বলল, লাল-চাউ অনেক দূরের পথ। বহুদিন আগে আমরা গিয়েছিলাম। পায়ে হেঁটে পাঁচদিন লেগেছিল। পুরো পথই পাহাড় আর মাঠ। কোনো গ্রাম নেই। খাবার নেই। জল নেই।

সামান্য হাসলেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, আমাদের সেখানে যেতেই হবে ।

কিছু ভাবল দু-জন কাঠুরে। একজন বলল, আর অল্পক্ষণ পরেই রাত হবে। অন্ধকারে পথ খুঁজে পাবেন না। আমাদের কুটিরে চলুন। রাতে বিশ্রাম নিয়ে কাল সকালে রওনা হবেন। হিউ-এন-সাঙ-এর সঙ্গীরা সারা দিনের পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। স্বভাবতই তারা বিশ্রাম নিতে চাইছিলেন। বললেন, কাঠুরে যথার্থই বলেছে। কাল সূর্য ওঠাবার আগেই আমরা রওনা হলে মনে হয় রাত্রির আগেই লাল-চাউ নগরে পৌছে যাব। ওরা পায়ে হেঁটে গিয়েছিল। আমরা ঘোড়ায় চড়ে যাব।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, তোমাদের সকলের যখন ইচ্ছা, আজ রাতে এখানেই বিশ্রাম করব।

কাছেই কাঠুরের গ্রাম। েছাটো টিলা। তার কোলে অল্প কয়েকটি ঘর। পাথরের দেওয়াল। ওপরে গাছের ডাল আর পাতার ছাউনি। একটা খালি ঘর। সেখানে তিনজনের থাকার ব্যবস্থা হয়। কাঠুরে দুধ আর ফল নিয়ে আসে। চোখে-মুখে কুণ্ঠা আর সংকোচ।

‘এর বেশি কিছু ঘরে নেই প্রভু।’

দু-হাত বাড়িয়ে তাকে কাছে টেনে নিলেন হিউ-এন-সাঙ। তুমি আমাদের আশ্রয় দিয়েছ। খাবার দিয়েছ। আর বেশি কিছু চাই না।

‘আমরা ভালো কিছু কাজ করতে পারি না প্রভু !’

‘মানুষের সেবা সবচেয়ে ভালো কাজ। তুমি নিশ্চয়ই ভগবান বুদ্ধের আশীর্বাদ পাবে।’

রাত বাড়ে। ধ্যানে বসলেন হিউ-এন-সাঙ। সঙ্গীরা ঘুমিয়ে পড়েছে। অল্প কিছুক্ষণ ধ্যান করলেন। অনুভব করলেন কিছুতেই যেন মনঃসংযম করতে পারছেন না। বার বার হুই-তি’র কথা মনে পড়ছে। কী গভীর অনুরাগ তঁার প্রতি। যদি জানতেন কেউ তঁার সঙ্গী হবে তবে হুই-তিকেই সঙ্গী করতেন।

চারপাশে ঘন অন্ধকার। খড়ের বিছানা। দরজার মাথার ওপর অনেকখানি ফাঁকা। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে আসছে সেখান দিয়ে। ভারী কম্বলে নিজেকে ঢেকে নিলেন হিউ-এন-সাঙ। দরজার বাইরে গাছের গায়ে ঘোড়া বাঁধা। তাদের ঘণ্টার শব্দ আসছে। শুনতে শুনতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ। শেষ রাতে ঘুম ভাঙতেই হিউ-এন-সাঙ দেখলেন তার সঙ্গীরা তখনও ঘুমিয়ে আছে। আপাদমস্তক ঢাকা। কয়েক বার ডাক দিতেই তঁারা উঠে পড়লেন। হিউ-এন-সাঙ বললেন, এবার আমরা যাত্রা করব। এখনও অনেক পথ যেতে হবে।

কাঠুরের কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন তিনজন। রুক্ষ জনহীন পথ। মাঝে মাঝে পাহাড়। কেমন হলুদ বর্ণ, ন্যাড়া, গাছপালা নেই। কনকনে বাতাস চোখে-মুখে ঝাপটা মারছে। শুধু চোখ দুটো বার করে মুখটা ঢেকে নিলেন। জানেন আর কিছু পরে রোদের তাপ বাড়লে ঠাণ্ডা কেটে গিয়ে গরম হাওয়া বইতে শুরু করবে।

পাহাড়ের কোল দিয়ে রাস্তা। এবড়োখেবড়ো পাথুরে মাটি। চলতে অসুবিধে হয়। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে সবাই। পথে মানুষজন চোখে পড়ে না। চিনের সীমান্ত প্রদেশ, স্বভাবতই লোকজন কম। সারাদিন চলতে থাকেন। সন্ধের কিছু আগে একটা গ্রামে এসে পড়লেন। লোকজন নেই। অল্প কয়েকটা ভাঙা ঘর। দেখে বোঝা যায় আগে মানুষজনের বাস ছিল। কোেনা কারণে সবাই অন্যত্র চলে গিয়েছে। একটা ঘরে এসে বসলেন তিনজন। সকলেই ক্লান্ত। মৃদুস্বরে হিউ-এন-সাঙ বললেন, কাল ভোরের আগেই আবার যাত্রা করব।

দীর্ঘ যাত্রাপথ। চাঙ-আন বৌদ্ধ বিহার থেকে যাত্রা করার পর বেশ কয়েক দিন কেটে গিয়েছে। যতই সকলে এগিয়ে চলেছেন অনুভব করছিলেন চারপাশের প্রকৃতির পরিবর্তন। সবুজের চিহ্ন নেই। ভয়ংকর রুক্ষতা। হিউ-এন-সাঙ-এর দুই সঙ্গীর চোখে মুখেই তার ছায়া ফুটে ওঠে। দু-জনেই ক্লান্ত। তাদের মধ্যে ফুটে ওঠে অসহিষ্ণুতার চিহ্ন। মনে হয় যেন বাধ্য হয়েই চলেছে।

একটা গ্রামে এসে পৌঁছলেন। সীমান্ত পারে শেষ বড়ো গ্রাম। এক ধারে েছাটো বৌদ্ধ বিহার। কয়েক জন মাত্র শ্রমণ। মঠের অধ্যক্ষ কোথাও গিয়েছেন। হিউ-এন-সাঙ পরিচয় দেওয়ামাত্রই অপেক্ষাকৃত প্রবীণ একজন সন্ন্যাসী বললেন, আসুন। এই বিহার শুধু আমাদের নয় আপনাদেরও। যতদিন খুশি এখানে থাকতে পারেন।

দু-দিন সেখানে কাটিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লেন সকলে। সমস্ত দিন চলবার পর হঠাৎ চোখে পড়ল সামান্য দূরে কোেনা সেনানিবাস। বিরাট দণ্ডের ওপর রাজচিহ্ন আঁকা পতাকা উড়ছে। সামনে যেতে গিয়েই থমকে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। ঘোড়ার লাগাম ধরে পথের উপর দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাও-চিন তাড়াতাড়ি বললেন, কী হল ভন্তে ?

সরাসরি সামনের দিকে ইশারা করলেন হিউ-এন-সাঙ।

‘আমাদের ওই সেনানিবাসের পাশ দিয়ে যেতে হবে। ওখানে যিনি সেনাধ্যক্ষ রয়েছেন তার কাছে নিশ্চয়ই সম্রাটের আদেশ পৌঁছে গিয়েছে।’

হুই-লি বললেন, সৈনিকরা দেখামাত্রই আমাদের বন্দি করবে।

তাও-চিন বললেন, ভন্তে এইভাবে প্রতিমুহূর্তে বিপদের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে আমাদের ফিরে যাওয়া উচিত।

কিছু ভাবলেন হিউ-এন-সাঙ। তারপর গম্ভীর মুখে বললেন, আমি তো ফিরে যাওয়ার জন্যে আসিনি। সেনাবাহিনীর চেয়েও ভয়ংকর প্রকৃতি আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। শত শত মাইল মরুভূমি। ধুধু বালি। কোনো গ্রাম নেই, নগর নেই, সেই পথ আমাদের পার হতে হবে।

অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে তাও-চিন বললেন, সে পথে মৃত্যু কি অনিবার্য ?

‘অসম্ভব কিছু নয়।’ হিউ-এন-সাঙ শান্তভাবে জবাব দিলেন। ‘আমার মনে হয়। তোমরা মানসিকভাবে এই পথে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত নও।’

হুই-লি বললেন, আমরা এই দুর্গম পথের কথা জানতাম না।

হিউ-এন-সাঙ অনুভব করছিলেন তঁার দুই সঙ্গীই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। বললেন, তোমরা বৌদ্ধ বিহারে ফিরে যাও। কয়েক দিনের পথ। স্বচ্ছন্দে সেখানে পৌঁছে যাবে।

তাও-চিন এবং হুই-লি প্রায় একইসঙ্গে বললেন, আপনাকে ত্যাগ করে বিহারে ফিরে গেলে মহাস্থবির ক্ষুব্ধ হবেন। তিনি আমাদের আদেশ দিয়েছেন আপনার সঙ্গী হতে।

‘তঁার আদেশ তোমরা পালন করেছ। প্রায় এক পক্ষকাল সমস্ত দিন রাত আমার সঙ্গী ছিলে। এবার আমি আদেশ দিচ্ছি। তোমরা ফিরে যাও। মহাস্থবিরকে এই কথাই বলবে।’

দু-জনেই হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে তাকালেন। বিহারে ফিরে যাওয়ার জন্যে তঁারা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। বিহারের নিশ্চিন্ত আরামের জীবন ছেড়ে এই দুর্গম পথের সঙ্গী হবার সামান্যতম ইচ্ছা ছিল না তঁাদের। তাড়াতাড়ি তাও-চিন বললেন, ভন্তে আপনার আদেশ অমান্য করবার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। আপনার যাত্রা শুভ হোক।

তাও-চিন আর মুহূর্তমাত্র বিলম্ব করলেন না। ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন বিহারের দিকে। তাও-চিন চলে যেতেই হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন হুই-লি। বললেন, তাও-চিনের কাছে আমার একখানা পুথি রয়ে গিয়েছে। আমি নিয়েই ফিরে আসছি।

হিউ-এন-সাঙ কোনো জবাব দিলেন না। শুধু নীরব চোখে চেয়ে থাকেন। দুই সঙ্গী ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে চলেছেন। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। এখন তিনি সম্পূর্ণ একা। তবু কোনো ভাবান্তর হল না। তিনি যেন জানতেন তঁাকে একাই এগিয়ে যেতে হবে। চুপ করে প্রতীক্ষা করেন। বেলা পড়ে এসেছে। সৈন্য শিবিরের সামনে কয়েক জন দাঁড়িয়ে কোথাও যাবার উদযোগ করছিল। পথের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলেন হিউ-এন-সাঙ। মনে হল ওরা যদি এই পথে আসে। একপলক চারদিকে তাকালেন, সরু পথ পাহাড়ের নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। ঘোড়া থেকে নেমে লাগাম ধরে এগিয়ে গেলেন। সামান্য দূর গিয়ে পথের চিহ্ন ফুরিয়ে গিয়েছে। চারদিকে বড়ো বড়ো পাথর। স্বচ্ছন্দে বেশ কিছু মানুষ তার আড়ালে লুকিয়ে পড়তে পারে।

ঘোড়ার পিঠ থেকে বোঝা নামিয়ে একটা পাথরের ওপর বসে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ। তেষ্টা পেয়েছে অনেকক্ষণ। পোঁটলা খুলে জলপাত্র নিতে গিয়েই থমকে গেলেন। তার জলপাত্র তাও-চিনের কাছে রয়ে গিয়েছে। উঠে দাঁড়ালেন। আর বিশ্রামের সময় নেই। অন্ধকার হবার আগেই জলের সন্ধান পেতে হবে। একটা খালি পাত্র নিয়ে এগিয়ে গেলেন। সামান্য পথ যেতেই চোখে পড়ল পাহাড়ের গা বেয়ে জলের ধারা নেমেছে। নীচে যেখানে জল গড়িয়ে আসছে তার একটু দূরেই সেনানিবাসের ফটক। সামনে কয়েক জন সৈনিক তির-ধনুক হাতে পাহারা দিচ্ছে। তাদের চোখ এড়িয়ে জলের কাছে যাওয়া অসম্ভব।

বসে রইলেন হিউ-এন-সাঙ। অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত তঁাকে এখানে জলের জন্যে অপেক্ষা করতেই হবে। একটা বড়ো পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে বসলেন। সারা দিনের ক্লান্তিতে বসে থাকতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। যখন ঘুম ভাঙল চারদিকে আবছা অন্ধকার। উঠে দাঁড়িয়ে ভালো করে তাকালেন। কোথাও কোনো সৈনিক চোখে পড়ল না। হয়তো সকলে তঁাবুতে ফিরে গিয়েছে। চারদিক নিস্তব্ধ। পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন হিউ-এন-সাঙ। সন্তর্পণে নেমে এলেন ঝরনার কাছে। খুব বেশি হলে একশো হাত দূরেই সেনানিবাসের পঁািচল। তার গা ঘেঁষে এগিয়ে গেলেন। তেষ্টায় বুকের ভেতর অবধি শুকিয়ে গিয়েছে। ফটক পেরিয়ে ঝরনার সামনে এসে দাঁড়ালেন। দু-হাত কোষ করে জল খেলেন। কী সুস্বাদু জল! সারাদিনের ক্লান্তিটুকু যেন দূর হয়ে যায়। চোখে-মুখে জল দিয়ে কোমরে রাখা খালি পাত্রটা বার করলেন। ঘোড়াটাও সারাদিন জল খায়নি। সামান্য হলেও একটু তেষ্টা মিটবে। নিচু হয়ে জল ভরতেই পায়ের চাপে একটা পাথর গড়িয়ে পড়ল। সামান্য শব্দ ওঠে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেনানিবাসের পাঁচিল থেকে কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে, কে ওখানে ?

হিউ-এন-সাঙ কিছু জবাব দেবার আগেই দু’খানা তির প্রায় তঁার শরীর ছুঁয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে। হিউ-এন-সাঙ বুঝতে পারলেন প্রথম তির লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও পরের তির নিশ্চয়ই তঁাকে বিদ্ধ করবে। মুহূর্তে চিৎকার করে উঠলেন, সৈনিক তির ছুড়ো না, আমি একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। জল নেবার জন্যে এখানে এসেছি।

সেনানিবাস থেকে কোলাহল ভেসে এল।

স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ। বুঝতে পারলেন তিনি ধরা পড়ে গিয়েছেন। পালাবার কোনো পথ নেই। অজানা এক আশঙ্কা মনের মধ্যে জেগে ওঠে। তারপরই অস্ফুটে বললেন, তথাগত তুমি রক্ষা করো।

সেনানিবাসের ফটক খোলার শব্দ ওঠে। কয়েক জন সৈনিক ছুটে আসে। সকলের হাতেই অস্ত্র। একজনের হাতে জুলন্ত মশাল।

হিউ-এন-সাঙ-এর সামনে এসেই থমকে গেল তারা। একজন কর্কশ গলায় বলল, কী পরিচয় ?

মৃদুস্বরে হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি ভগবান বুদ্ধের সামান্য এক অনুরাগী। এর বাইরে আমার কোনো পরিচয় নেই।

কিছু ভাবে সৈনিকরা। একজন বলল, আপনি আমাদের সেনাপতির কাছে চলুন।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, চল, তার কাছেই আমার সবকথা বলব।

কয়েক পা গিয়েই থমকে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। মুখ ফিরিয়ে একজন সৈনিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, পথের পাশে পাথরের আড়ালে আমার ঘোড়াটা বাঁধা আছে। আমারই মতো সেও বড়ো তৃষ্ণার্ত। তোমরা তাকে নিয়ে এসে জল দিলে ভালো হয়।

হিউ-এন-সাঙ-এর ব্যক্তিত্ব, তঁার মধুর কথায় সৈনিকরা আবিষ্ট হয়ে পড়েছিল। একজন সৈনিক বলল, আপনি যান। আমি আপনার ঘোড়া নিয়ে আসছি।

সৈনিকদের সঙ্গে সেনানিবাসের দিকে এগিয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। ফটক পার হয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল এক সার তঁাবু। ডান দিকে একটু দূরে অপেক্ষাকৃত বড়ো একটা তঁাবু। সামনে চারজন প্রহরী। সকলেরই হাতে দীর্ঘ বর্শা। রুক্ষ কঠিন মুখ। একজন সৈনিক প্রহরীদের কিছু বলে তঁাবুর মধ্যে ঢোকে। একটু পরেই ফিরে এসে বলল, আসুন।

তঁাবুর মধ্যে বসেছিলেন সেনাপতি। মধ্য বয়স্ক। সুঠাম স্বাস্থ্য। পরনে সামরিক পোশাক। তঁাবুর চার কোণে চারটি বাতি জ্বলছিল। কোথাও অন্ধকার নেই। সেনাপতি চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন। হিউ-এন-সাঙ-এর দুই ধারে দু-জন প্রহরী। পেছনে  সৈনিক।

সেনাপতি কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে। হালকা আলো এসে পড়েছে তঁার মুখে। কোনও উদ্বেগ নেই, স্থির শান্ত মুখ। দুই চোখে গভীর প্রশান্তি।

সেনাপতির মনে হল এমন গভীর প্রশান্তি এর আগে কোনো মানুষের মুখে দেখেছেন বলে মনে পড়ে না। ইশারায় সৈনিকদের চলে যাবার নির্দেশ দিলেন।

সকলে বার হতেই সেনাপতি বললেন, আপনি এই সেনানিবাসে কেন এসেছেন ?

হিউ-এন-সাঙ সহজভাবে বললেন, আমি এই পথ ধরে চলেছিলাম। অনেক পথ এসে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই ঝরনার জল নেবার জন্যে গিয়েছিলাম।

‘আপনি কোথা থেকে আসছেন ?’

হিউ-এন-সাঙ কিছু ভাবলেন। এখন পরিচয় গোপন করবার কিছু নেই। যা সত্য তাকে প্রকাশ করতেই হবে। বললেন, চাঙ-আন বৌদ্ধবিহার থেকে।

সেনাপতি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি সেই সন্ন্যাসী যিনি মহামান্য সম্রাটের আদেশ অমান্য করে বুদ্ধের দেশে চলেছেন ?

দ্বিধাহীনভাবে হিউ-এন-সাঙ বললেন, আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন।

‘আমি ইতিপূর্বেই আপনার কথা শুনেছি। মহাপণ্ডিত হিসেবে চারদিকে আপনার খ্যাতি। সকলেই আপনার প্রশংসা করেন। আপনি জানেন ভারতবর্ষ এখান থেকে কতদূর? আর কী ভয়ংকর সে পথ ?’

‘জানি সেনাপতি।’

‘এই পথে যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে।’

‘আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না সেনাপতি। মৃত্যু জীবনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।’

হিউ-এন-সাঙ-এর চোখে-মুখে এমন এক দৃঢ়তা ফুটে উঠেছিল কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না সেনাপতি। বুঝতে পারছিলেন তঁার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন যে মানুষটা তিনি আর সকলের চেয়ে আলাদা। বললেন, আপনি দীর্ঘ পথশ্রমে ক্লান্ত। আজ রাতে এখানে বিশ্রাম নিন। কাল আপনার কথা শুনব।

একজন প্রহরীকে ডাক দিলেন সেনাপতি। তোমরা সন্ন্যাসীর বিশ্রামের ব্যবস্থা করো।

নিঃশব্দে ঘর থেকে বার হয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। অন্ধকার রাত আরও গভীর হয়।

সকালের আলো এসে পড়েছিল তঁাবুর মধ্যে। মুখোমুখি বসে হিউ-এন-সাঙ আর সেনাপতি। কথা বলছিলেন সেনাপতি।

‘আমি সম্রাটের আদেশ পেয়েছি। এখন কেমন করে সেই আদেশ উপেক্ষা করে আপনাকে এগিয়ে যাবার অনুমতি দেব। আপনি বৌদ্ধবিহারে ফিরে যান।’

হিউ-এন-সাঙ অবিচলিত কন্ঠে বললেন, আমি মৃত্যুকে স্বীকার করে নেব। তবু ফিরে যাব না। ভগবান বুদ্ধের নির্দেশ পেয়েছি। আমাকে তঁার দেশে যেতেই হবে।

‘কী কারণে আপনি ভারতবর্ষে যেতে চান ?’

‘জ্ঞানের সন্ধানে।’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন হিউ-এন-সাঙ।

সেনাপতি বললেন, চিন সীমান্তের কাছে টুন জুয়ানের বৌদ্ধ বিহারে এক ধর্মগুরু রয়েছেন। তঁার সঙ্গে আমার কয়েক বার সাক্ষাৎ হয়েছে। জ্ঞানী পণ্ডিত। আপনি তঁার কাছে যান। তঁার কাছে প্রকৃত জ্ঞানের সন্ধান পাবেন।

হিউ-এন-সাঙ অনুভব করলেন সেনাপতির মনোভাব। সহজভাবেই বললেন, আমি ছেলেবেলা থেকে বৌদ্ধশাস্ত্র চর্চা করছি। আমাদের দেশের যে সব সন্ন্যাসীরা বৌদ্ধশাস্ত্র চর্চা করেন তঁাদের প্রায় সকলের সঙ্গে কথা বলেছি। ধর্মের উপদেশ নিয়েছি। নিজের সম্পর্কে কিছু বলায় আমি সংকোচ বোধ করি। তবু বলছি। এই মুহূর্তে চিন দেশের যত পণ্ডিত আছেন তঁাদের সকলের জ্ঞান সীমিত। আমি যেটুকু জ্ঞান অর্জন করেছি বর্তমানে তা কারোরই নেই। আমি আমার জ্ঞানের সীমাকে বাড়িয়ে নিতে চাই। আপনি কি মনে করেন টুন জুয়ানের সেই ধর্মগুরু আমাকে সেই শিক্ষা দিতে পারবেন ?

সেনাপতি বললেন, আমাকে মার্জনা করবেন ধর্মগুরু। আমি আপনার খ্যাতির কথা শুনেছি। সামনের পথ কী ভয়ংকর বিপদসঙ্কুল আপনি অনুমান করতে পারবেন না। আপনার মতো মহাপণ্ডিতকে আমি কী করে সেই পথে যাবার অনুমতি দেব ?

হিউ-এন-সাঙ আগের মতোই সহজভাবে বললেন, নিজের দুঃখ কষ্টের কথা ভাবি না সেনাপতি। ভগবান বুদ্ধ যে ধর্মশিক্ষা দিয়েছেন আমি ভারতবর্ষে গিয়ে সেই শিক্ষা লাভ করতে চাই। সেই শিক্ষা আমার চিন দেশের মানুষের মধ্যে প্রচার করব। আমি চাই আমার দেশের সকল মানুষের দুঃখের মুক্তি। আপনি এই মহান কাজে সাহায্য না করে বাধা দিতে চাইছেন। আপনি আমাকে ভারতে যাবার অনুমতি না দিলে আপনার এই সেনানিবাসেই প্রাণ বিসর্জন দেব তবু পিছনে ফিরে যাব না।

আবেগে হিউ-এন-সাঙ-এর গলার স্বর সামান্য কাঁপছিল।

সেনাপতি বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। অনুভব করছিলেন এইরকম একজন মানুষের সাক্ষাৎ তিনি কখনো পাননি। বললেন, আপনি কয়েক দিন এখানে বিশ্রাম করুন। তার মধ্যে আমাকে একটু ভাববার অবকাশ দিন।

হিউ-এন-সাঙ বুঝতে পারছিলেন সেনাপতির সহায়তা না পেলে সীমান্ত পার হওয়া সম্ভব নয়। বললেন, আমার পক্ষে বেশি দিন এখানে অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রবল শীত শুরু হওয়ার আগেই আমি মরু অঞ্চল পার হয়ে যেতে চাই।

সেনাপতি বললেন, এখান থেকে চিন সীমান্ত পর্যন্ত মোট পাঁচটি সেনানিবাস আছে। তাদের দৃষ্টি পেরিয়ে আপনার পক্ষে এক পা যাওয়া সম্ভব নয়।

‘আপনি কি আমাকে সাহায্য করবেন না ?’

সেনাপতি, হিউ-এন-সাঙ-এর অন্তরের আকুতিকে উপলব্ধি করতে পারছিলেন। ধীর কণ্ঠে বললেন, আপনি যে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতবর্ষে চলেছেন আমাদের সকলেরই উচিত আপনাকে সাহায্য করা।

‘তাহলে সমস্যা কোথায় ?’ জিজ্ঞাসা করলেন হিউ-এন-সাঙ।

‘এখান থেকে সীমান্ত পর্যন্ত আরও চারটি সেনাশিবির রয়েছে। প্রথম তিনটি শিবির নিয়ে আপনার কোনো সমস্যা হবে না। আমি তাদের সেনানায়কদের পত্র লিখে দেব। সকলেই ভগবান বুদ্ধের অনুগামী। তঁারা আপনাকে সাহায্য করবে।’

‘আর শেষ শিবির ?’

সামান্য বিচলিত হয়ে পড়লেন সেনানায়ক। বললেন, আসল সমস্যা শেষ সীমান্ত চৌকির সেনাধ্যক্ষকে নিয়ে। তিনি ঘোর বৌদ্ধ বিদ্বেষী। আপনাকে দেখামাত্রই বন্দি করবেন এবং সম্রাটের কাছে পাঠিয়ে দেবেন।

হিউ-এন-সাঙ আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে বললেন, ভগবান বুদ্ধ নিশ্চয়ই আমাকে সাহায্য করবেন।

সেনাপতি অনুভব করছিলেন মানুষটার মধ্যে কী গভীর বিশ্বাস। বললেন, আপনি কয়েক দিন অপেক্ষা করুন, আমি অন্য সেনানিবাসে সংবাদ পাঠাচ্ছি। আপনার যেন কোনো অসুবিধা না হয়।

হিউ-এন-সাঙ অস্ফুটে বললেন, তথাগত আপনার মঙ্গল করুন।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%