চঞ্চলকুমার ঘোষ
চিনের প্রাচীর। সামনে এসেই থমকে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। এই প্রাচীর পার হয়ে তাকে যেতে হবে।
বিশাল প্রাচীর। এর আগে কখনো এই প্রাচীর দেখেননি হিউ-এন-সাঙ। কিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। কী বিস্ময়কর সৃষ্টি। পর পর পাথর সাজিয়ে তৈরি হয়েছে আকাশচুম্বী পাঁচিল। ধাপে ধাপে উঠে গিয়েছে আকাশের দিকে। যেমন প্রশস্ত তেমনি বিশাল।
সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন চতুর্থ দুর্গের সেনাধ্যক্ষ। সীমান্ত পার করে দেবার জন্যে নিজেই এসেছেন। সঙ্গে আরও সৈনিক। ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে চেয়ে বললেন, এই প্রাচীর আমাদের দেশের গর্ব। এইরকম প্রাচীর পৃথিবীর আর কোনো দেশে আছে কি না আমার জানা নেই।
হিউ-এন-সাঙ বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে চেয়ে ছিলেন পাঁচিলের দিকে। মাথা উঁচু করে তাকাতে হয়। জিজ্ঞাসা করলেন, এই পাঁচিল কে তৈরি করেছেন জানেন ?
সেনাধ্যক্ষ বললেন, শুনেছি তেরোশো বছর আগে মহাচিনের কোনো এক রাজা এই পাঁচিল তৈরি করেছিলেন। তখন এত বড়ো ছিল না। মাঝে মাঝে পাঁচিল ছিল। সংস্কারের অভাবে ধীরে ধীরে সেই পাঁচিলের বেশিরভাগ অংশই ধ্বংস হয়ে যায়। তারপর মিং বংশের রাজারা এই পাঁচিল তৈরির কাজ আরম্ভ করেন। বহুবছর লেগেছিল এই পাঁচিল শেষ করতে।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, শুনেছি বিদেশি শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করবার জন্যে এই পাঁচিল দেওয়া হয় ?
‘আপনি ঠিকই শুনেছেন ধর্মগুরু। গোটা পাঁচিল জুড়েই সেনাদের চলার রাস্তা। মাঝে মাঝেই চৌকি। সেখান থেকে সৈন্যরা পাহারা দিত। এর উপর দিয়ে স্বচ্ছন্দে চারজন ঘোড়সওয়ার পাশাপাশি যেতে পারে।
‘আমাকে কি এই পাঁচিল পার হয়ে যেতে হবে ?’
‘হ্যাঁ ধর্মগুরু। পাঁচিলের এই অংশের দায়িত্ব আমার ওপর। আসুন আমার সঙ্গে। আমি না এলে এই পাঁচিল পার হয়ে ওপারে আপনার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হতো না।’
সামান্য এগিয়ে গিয়েই ওপরে ওঠার সিঁড়ি। সিঁড়ি গিয়েছে পাঁচিল পর্যন্ত। তারপরই লোহার ফটক। একজন সৈনিক সেখানে দাঁড়িয়ে। সেনাধ্যক্ষ ইশারা করতেই সৈনিক ফটক খুলে দিল। সকলে এগিয়ে চলল। আরও বেশ কয়েক ধাপ গিয়ে পাঁচিলের ওপরে উঠে আসে সকলে। প্রশস্ত পাঁচিল। মাঝখানে চওড়া পাথর বাঁধানো রাস্তা। অন্য প্রান্তে পাঁচিলের বেশ কিছুটা অংশ ভেঙে গিয়েছে। সেখান দিয়ে নীচের দিকে পায়ে চলা পথ নেমে গিয়েছে।
সেনাধ্যক্ষ বললেন, ধর্মগুরু এই পথ ধরে আপনাকে পশ্চিমে এগিয়ে যেতে হবে। এরপর মরুভূমি।
‘মরুভূমি কতদূর ?’
‘কয়েক লি পথ। এখানে গাছপালা আছে। জলও পাবেন। মেষপালকদের কুটিরও পাবেন। তারপরই শুরু হবে গোবি মরুভূমি। শুনেছি হামি পর্যন্ত এই মরুভূমি ছড়িয়ে আছে। তবে আমি কখনো সেখানে যাইনি। যারা এই পথে যাতায়াত করে তারা বলে মাঝে দু-একটি মরুদ্যান আছে। মরুভূমির কোথায়, কতদূরে জানি না। সে মরুদ্যান অচেনা মানুষের পক্ষে নির্ণয় করা কঠিন। সবচেয়ে কঠিন সমস্যা হল পথে কাউকে পাবেন না যে আপনাকে পথের নির্দেশ করতে পারে। গোটা পথটাই আপনাকে অনুমানের উপর নির্ভর করে চলতে হবে।’
এই মুহূর্তে কোনো দুশ্চিন্তায় নিজের মনকে ভারাক্রান্ত করতে চাইছিলেন না হিউ-এন-সাঙ। মৃদুস্বরে বললেন, সমস্তই ভগবান তথাগতের ইচ্ছা।
সেনাধ্যক্ষ আবেগ জড়ানো গলায় বললেন, আবার কি আমাদের দেখা হবে ধর্মগুরু ?
কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ। তারপর বললেন, যদি তথাগতের তাই ইচ্ছা হয় নিশ্চয়ই দেখা হবে।
কিছুক্ষণ হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে তাকিয়ে থাকেন সেনাধ্যক্ষ। গভীর এক শ্রদ্ধা তঁার দৃষ্টিতে। এই মানুষটির জন্যে কিছু করতে পারা জীবনের এক পরম আনন্দ। বললেন, যদি সম্ভব হতো আমিও আপনার সহযাত্রী হতাম।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, এ বিশ্বের সকলকেই আপন পথে চলতে হয়। সকলেই যদি ধর্মপথে যায় তবে দেশ রক্ষা করা, রাজ্য শাসন করার গুরুদায়িত্ব পালন করবে কে। সৎপথে থেকে সৎ আদর্শে চলাই ধর্ম। এবার আমাকে বিদায় দিন সেনাপতি।
সেনাধ্যক্ষ অল্পক্ষণ তাকিয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে। দুস্তর মরুভূমির পথ ধরে এগিয়ে যাবেন মানুষটা। যে পথে প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর পদধ্বনি। সামান্যতম বিকার নেই। কী গভীর প্রশান্তি। ভুলে গেলেন নিজের পদমর্যাদার কথা। ধীরে ধীরে তঁার সামনে নতজানু হলেন।
‘প্রণাম ধর্মগুরু।’
‘ভগবান তথাগত আপনাকে আশীর্বাদ করবেন।’
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিকরাও একে একে প্রণাম করল।
সকলের উদ্দেশ্যেই আশীর্বাদ বচন উচ্চারণ করেন হিউ-এন-সাঙ। একজন সৈনিকের কাছ থেকে ঘোড়ার লাগাম ধরলেন। সেনাপতি বহু জিনিসই তাকে দিতে চেয়েছিলেন। সামান্য জিনিসই নিয়েছেন। একবার আকাশের দিকে তাকালেন। বেলা বাড়ছে। আর অপেক্ষা করতে চাইলেন না। মনে মনে অবলোকিতেশ্বরের উদ্দেশে প্রার্থনা করলেন। তারপর সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এগিয়ে গেলেন। সামান্য দূর গিয়ে একবার পেছনে তাকালেন। আর কাউকে চোখে পড়ল না। মনে মনে নিশ্চিন্ত হলেন। যাত্রাপথে আর কেউ তঁার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারবে না।

সূর্য মাথার উপর। বাতাসে যথেষ্ট তাপ। ঘোড়ার পিঠে সওয়ারি হলেন হিউ-এন-সাঙ। এই কয়েক দিনে অনুভব করেছেন চেহারায় েছাটোখাটো হলেও তঁার এই ঘোড়া যথেষ্ট শক্তিশালী। যেকোনো পথেই স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারে। যদিও চলার গতি অতি ধীর।

এগিয়ে চললেন হিউ-এন-সাঙ। পথ বলে কিছু নেই। তবে সামান্য কিছু চিহ্ন দেখে অনুমান করতে পারলেন মানুষের যাতায়াত আছে। জানেন যারা পশু চরায় পাথরের ফাঁকে গাছ খুঁজে বেড়ায়। পশুর নাদ ইতস্তত ছড়ানো। এখন অবশ্য সে রকম কোনো গাছ চোখে পড়ল না। মাঝে মাঝে েছাটোখাটো ঝোপ। জলের অভাবে কেমন হলুদ বর্ণ, তবুও আশ্চর্য তাদের জীবনীশক্তি।
মাঝে মাঝেই থমকে যায় ঘোড়া। মুখ বাড়িয়ে সামনে যা পায় তাই খায়। বাঁধা দেন না হিউ-এন-সাঙ। জানেন এর পর আর কিছুই পাওয়া যাবে না। যতক্ষণ ঘোড়া খায় মাটিতে নেমে অপেক্ষা করেন। অবোধ জীব। শুধু ভার বইবার জন্যে তঁার সঙ্গে এই দুস্তর মরুভূমির পথে চলেছে।
ক্রমশই গাছপালা ফুরিয়ে আসছিল। মাটির চিহ্নও শেষ। এখন শুধু বালি আর বালি। বুঝতে পারছিলেন মরুভূমির পথ শুরু হয়েছে। বেশ কয়েক ঘণ্টা পথ চলেছেন। রোদের তাপে যথেষ্ট ক্লান্তি অনুভব করছিলেন। একটা পাথরের আড়ালে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন। খুব তেষ্টা পেয়েছিল, সামান্য জল খেলেন। ঘোড়াকে জল দিলেন। যেটুকু জল আর খাবার আছে হামিতে না পৌঁছনো পর্যন্ত এই দিয়েই পথের প্রয়োজন মেটাতে হবে। কোনোভাবেই এক ফোঁটা জল, এক বিন্দু খাবার অপচয় করা যাবে না।
আবার পথ চলতে আরম্ভ করলেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপ বাড়ছিল। এতক্ষণ যত সহজভাবে পথ চলছিলেন আর তা সম্ভব হচ্ছিল না। প্রখর তাপে চোখের সামনে সব কেমন ঝাপসা হয়ে আসছিল। চারপাশের বালি থেকে যেন বাষ্প উঠছে। সামান্য দূরেও সব ঘোলাটে। পোশাক ভেদ করে কেউ সারা শরীরে ছ্যাঁকা দিচ্ছে। পা দুটো অবশ লাগে। ঘোড়াটাও মাঝে মাঝে প্রবল বেগে মাথা নাড়ছে। সেও আর চলতে চাইছে না।
হিউ-এন-সাঙ অনুভব করলেন এইভাবে আর চলা সম্ভব নয়। তিনি দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। পূর্ব-পশ্চিম উত্তর-দক্ষিণ সব একাকার হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ চোখে পড়ল সামান্য দূরে একটা পাথরের ঘর। অবাক লাগছিল হিউ-এন-সাঙ-এর। এই মরুভূমিতে ঘর !
চোখের বিভ্রম নয় তো। শুনেছিলেন মরুভূমিতে দৃষ্টি বিভ্রম হয়। চোখের সামনে বহু কিছু দৃশ্য দেখা যায়। কাছে গেলে সব শূন্য। এই পাথরের ঘরকে তো দৃষ্টি বিভ্রম বলে মনে হচ্ছে না। কয়েক বার চোখ মুছলেন। না স্পষ্টই চোখে পড়ছে। পর পর পাথর সাজানো। খানিকটা ভাঙা, মাথার ওপরের অর্ধেক নেই। খুব বেশি হলে কয়েক-শো হাত হবে।
ঘোড়া আর চলতে চাইছে না। টানতে আরম্ভ করলেন। আর কিছু না হোক ওখানে অন্তত ছায়াটকু পাবেন। রোদের তাপ কমলে আবার যাত্রা করবেন। ঘোড়া দু-এক পা গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ে। আলতো করে তার পিঠে হাত বোলান হিউ-এন-সাঙ। নরম গলায় বললেন, তোর খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি। আর একটু চল। সামনে ওই পাথরের বাড়িটা দেখছিস, ওখানে গেলে ছায়া পাবি, বিশ্রাম পাবি। এই প্রখর রোদে আর বার হব না।
হিউ-এন-সাঙ-এর কথায় কাজ হয়। সে যেন সব বুঝতে পারে। এবার আর টানবার দরকার হয় না। নিজেই এগিয়ে চলে ঘোড়া।
যতখানি সামনে ভেবেছিলেন পাথরের ঘর তার চেয়ে বেশ অনেকখানি দূর। কাছে এসেই থমকে গেলেন। ঘর মনে হলেও পাশাপাশি কয়েকটি দেওয়াল ছাড়া আর কিছু নেই। একটি দেওয়াল এমন ভাবে রয়েছে তাকেই ছাদ ভেবে ভুল করেছিলেন হিউ-এন-সাঙ। ভেতরে ইতস্তত ভেড়ার নাদ। মাটির পাত্র। ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো। বুঝতে পারলেন যারা ভেড়া চরায় তারা এখানে বিশ্রাম নেবার জন্যে এসেছিল। তিনি কোথায় বিশ্রাম করবেন। মাথার ওপর রোদ ঝরে পড়ছে। একটু যদি ছায়া পেতেন।
একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে ঘোড়াটা। তার পিঠের ওপর থেকে সব মালপত্র নামিয়ে নিলেন হিউ-এন-সাঙ। চারদিকে রোদ। সামান্য একটু ছায়া প্রয়োজন। একটু ভাবলেন। একটা পশমের চাদর বার করে দুই দেওয়ালের ওপর টাঙিয়ে দিলেন। সামান্য ছায়া। চারদিক থেকে গরম হাওয়া এসে আছড়ে পড়ছে দেওয়ালের গায়ে। মাটির ওপরেই বসে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ।
প্রবল এক অস্থিরতা। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সবেমাত্র কয়েক ঘণ্টা মরুভূমির পথ পার হয়েছেন। এখনও কত পথ। মরুভূমির আরও গভীরে যেতে হবে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। রাত না আসা পর্যন্ত এইভাবে বসে থাকতে হবে। নিজের ঝোলা থেকে একখানি পুথি বার করলেন। ভগবান বুদ্ধের জীবনের নানান কাহিনি। সব কাহিনিই মনকে উদ্বুদ্ধ করে। কয়েক দিন আগে যেখানে শেষ করেছিলেন সেইখান থেকে শুরু করলেন।
তখন গৌতম বুদ্ধ শ্রাবস্তি নগরে ছিলেন। প্রতিদিন তিনি নগরের সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে ভিক্ষা করতেন। সেই নগরে থাকতেন এক ব্রাহ্মণ, নাম ভরদ্বাজ। যেমন অহংকারী তেমনি দাম্ভিক। ব্রাহ্মণ ছাড়া সকলের প্রতিই ছিল তঁার তীব্র ঘৃণা। বিশেষত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। তাদের দেখামাত্রই কটু কথা বলতেন। একদিন নিজের ঘরে যজ্ঞ করছিলেন ভরদ্বাজ, এমন সময় বুদ্ধ তঁার যজ্ঞের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তঁাকে দেখামাত্রই রাগে ফেটে পড়লেন ভরদ্বাজ। ভিক্ষুর এত সাহস তঁার যজ্ঞস্থলিতে এসে দাঁড়িয়েছে। বুদ্ধের উদ্দেশে গালাগালি দিতে দিতে বলে উঠলেন, তুমি এক বৃষল।
বুদ্ধ এত গালাগালিতেও সামান্যতম বিচলিত হলেন না। হাসি মুখে বললেন, ভরদ্বাজ তুমি কি জানো বৃষল শব্দের অর্থ কী ?
বুদ্ধ তঁাকে এভাবে প্রশ্ন করবে ভাবেননি ভরদ্বাজ। বৃষল শব্দের সঠিক অর্থ তঁারও জানা ছিল না। কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। তারপর বললেন, আমি জানি না।
মৃদু হাসলেন বুদ্ধ। তারপর বললেন, যে ব্যক্তি কিছুই দান করে না। শ্রমণ ভিক্ষুদের তার বদলে গালিগালাজ করে, অপমান করে গৃহের দ্বার থেকে তাড়িয়ে দেয় তাকেই বলে বৃষল। যে ব্যক্তি ব্যভিচারে নিজেকে লিপ্ত রাখে, তাকে বৃষল বলে। যে ব্যক্তি নিজে সিদ্ধপুরুষ না হয়েও অন্যের কাছে নিজেকে সিদ্ধ বলে প্রমাণ করতে চায়, সে হল সবচেয়ে নিকৃষ্টতম বৃষল। কোনো মানুষই বৃষল নয়। তার কর্মই তাকে বৃষল করে। জন্ম বা ধর্ম নয়। নীচ বংশে জন্মেও কেউ যদি সৎকর্ম করে তবে সে হয় ব্রাহ্মণ। আর ব্রাহ্মণ বংশে জন্মেও যদি কেউ হীন কাজ করে তবে তার চরম অধঃপতন হয়। সে যথার্থ অর্থেই বৃষল।
চমকে উঠলেন ভরদ্বাজ। এমন কথা কোনোদিন কারও কাছে শোনেননি। অনুভব করলেন তঁার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি সাধারণ কেউ নয়। তীব্র ঘৃণা আর অনুশোচনায় মন থেকে সব অহংকার দূর হয়ে গেল। বু্দ্ধের পায়ে লুটিয়ে পড়ে উচ্চারণ করলেন ত্রিশরণ।
বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি
ধর্মং শরণং গচ্ছামি
সংঘং শরণং গচ্ছামি।
আবিষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন হিউ-এন-সাঙ। ধীরে ধীরে ভুলে গেলেন চারপাশের জগৎ। একটু একটু করে মনের মধ্যে ভেসে ওঠে বুদ্ধের গোটা জীবন। তিনি যেন সব দেখতে পাচ্ছেন। সেই দূর অতীত। বুদ্ধ চলেছেন। বোধিবৃক্ষের নীচে বসে লাভ করেছেন পরম জ্ঞান। উপলব্ধি করেছেন, জীবের সকল কামনা বাসনাই তার আত্মাকে খণ্ডিত করে। আর এই খণ্ডিত আত্মাই দেহের সীমার মধ্যে মানুষের চেতনাকে বন্দি করে রাখে। তাই মানুষ অনন্তের সন্ধান পায় না। যে মানুষ সব কামনা বাসনা থেকে নিজের অন্তরকে মুক্ত করতে পেয়েছেন, একমাত্র সেই মানুষই নির্বাণ লাভ করতে পারে।
উপলব্ধির পরম আনন্দে বুদ্ধ বলে উঠেছিলেন, আমার জন্ম-জন্মান্তরের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে। আজ আমি সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করেছি। ভেঙে গিয়েছে লোহার খাঁচা। অন্ধকারের বুকে শুধুই আলো। এই পরম মুক্তি, এই নির্বাণ লাভের আনন্দ শুধু আমার নয়, এ আনন্দ সকলের। সমস্ত মানুষের মধ্যেই বিলিয়ে দিতে হবে এই আনন্দ। মুছে দিতে হবে কামনা বাসনা লোভ লালসায় পূর্ণ মানুষের মনের অন্ধকার।
পরমুহূর্তেই ভাবনা জেগে ওঠে, মানুষ কী তঁার উপদেশ গ্রহণ করবে। তঁার উপলব্ধ সত্যকে জানবো ? যে গভীর সাধনায় তিনি সত্যকে জেনেছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে তো সেই সাধনার শক্তি নেই। তা ছাড়া তাদের বোধই বা কোথায়। এদের কাছে উপদেশ দেওয়ার অর্থ পাথরের ওপর বীজ ছড়ানো। সে বীজ কখনো ফসল ফলাবে না। পাথরের ওপরেই প্রখর তাপে শুকিয়ে যাবে। এইসব মানুষের কাছে ধর্ম প্রচারের কোনো অর্থ হয় না। শুধুই পণ্ডশ্রম।
মনের মধ্যে ভাবনা জেগে উঠতেই স্থির করলেন বুদ্ধ আর কোনো জনপদে যাবেন না। কোেনা নির্জন প্রান্তে তপস্যা করেই কাটিয়ে দেবেন। লোকালয় ছেড়ে এগিয়ে চললেন অরণ্য প্রান্তরের দিকে। বেশ কিছু দূর গিয়েছেন। সূর্যের তাপে ক্লান্তি অনুভব করছিলেন। চোখে পড়ল পথের ধারে বিরাট একটা গাছ। ফলে ভরে আছে। পাশেই দিঘি। চারদিক শান্ত। মানুষের গ্রাম নেই। বড়ো ভালো লাগে বুদ্ধের। নিজের মনেই বললেন, এখানেই কয়েক দিন বিশ্রাম নেব। কেউ বিরক্ত করবার নেই। জল আছে, খাবার ফল আছে। কোনো ভাবনাচিন্তা নেই। কোনো কাজ কর্ম নেই। শুধু ধ্যান আর ধ্যান।
ধ্যানে বসলেন বুদ্ধ। অল্পক্ষণ পরেই আশ্চর্য হয়ে গেলেন। কিছুতেই মনঃসংযম করতে পারছেন না। আবার চেষ্টা করলেন। এবারও তাই। এমন তো কখনো হয় না। ধ্যানে বসামাত্রই তো সেই পরম সত্তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। তবে কী কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে। ভাবনার কোনো তল পেলেন না। আরও কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। আবার নিজের মনকে একাগ্র করে ধ্যানে বসলেন। মুহূর্তে নিজের অন্তর মধ্যে কেউ যেন বলে ওঠে, তুমি ভুল পথে চলেছ।
চমকে উঠলেন বুদ্ধ। কীসের ভুল ? মনের মধ্যে শুনতে পেলেন সেই কণ্ঠস্বর, হে বুদ্ধ, তোমার এই জ্ঞান কি শুধু তোমার জন্যে? স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের কথাই ভাবছ। সংসারের সেই হতাশ, দুঃখী মানুষদের কথা একবারের জন্যেও ভাববে না।
বুদ্ধ বললেন, আমি তাদের জন্য কী করব ?
তোমার যে জ্ঞান তা সমাজের সকল মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দাও। এমন বহু মানুষ আছে যাদের অন্তর নরম মাটির মতন। সেখানে তোমার উপদেশের বীজ পড়লে তা বিকশিত হবেই। তারা তোমার উপদেশকে চারধারে প্রচার করবে। পাথরেও বার বার আঘাত করলে সেখানেও ক্ষয় হয়। পাথর ক্ষয়েও মাটি হয়। তুমি এগিয়ে যাও। সকল মানুষের কাছে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দাও। যতই নিকৃষ্ট হোক সকলেরই অধিকার আছে আলো পাবার।
অদৃশ্য কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যায়। মুহূর্তে চেতনার জগতে ফিরে এলেন বুদ্ধ। তঁার ভুল বুঝতে পেরেছেন। উঠে দাঁড়ালেন। আবার এগিয়ে চললেন। জানেন এই পথ গিয়েছে গঙ্গার কুলে বারাণসীতে। প্রাচীন এই নগরী জ্ঞানের তীর্থক্ষেত্র। সেখানে গিয়ে যদি নিজের ধর্মমত প্রচার করতে পারেন। তবেই তা ছড়িয়ে পড়বে সমস্ত দেশে।
অনেকখানি পথ গিয়েছেন। হঠাৎ কানে এল এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর। কেউ ওম মন্ত্র ধ্বনি করতে করতে পথ ধরে এগিয়ে চলেছে।
এক ব্রাহ্মণ, নাম উপক। যেমন অহংকারী তেমনি আত্মগর্বী। বুদ্ধকে দেখামাত্রই উপক জিজ্ঞাসা করল, কে তুমি ?
বুদ্ধ প্রসন্ন মুখে বললেন, আমি বুদ্ধ।
‘বুদ্ধ কথার অর্থ কী জান ?’
‘জানি। যিনি বোধ লাভ করেছেন, যিনি প্রকৃতই জ্ঞানী।’
উপকের চোখে মুখে তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটে উঠল।
‘তুমি নিজেকে জ্ঞানী ভাব। জানো ব্রহ্মের স্বরূপ কী ?’
বুদ্ধ অনুভব করছিলেন উপকের অহংকার। কোনো উত্তেজনা ফুটে উঠল না তঁার মধ্যে। আগের মতোই শান্তভাবে বললেন, ব্রহ্ম হচ্ছে সেই পরম জ্ঞান যাকে উপলব্ধি করতে হয়।
‘কী করে মানুষ তাকে উপলব্ধি করতে পারে ?’
‘সৎচিন্তা, সৎকর্ম, কামনা শূন্য মন, মোহের মুক্তির মধ্যে দিয়ে সেই পরম সত্যকে জানা যায়।’
বুদ্ধের কথা শুনে আশ্চর্য হয় উপক। এমন সহজ সরলভাবে কেউ কোনোদিন ব্রহ্মের কথা বলেনি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। কী শান্ত সৌম্য চেহারা। মনে হল এমন মানুষ আগে কখনো দেখেননি। জিজ্ঞাসা করল, তুমি কার শিষ্য?
বুদ্ধ বললেন, আমার কোনো গুরু নেই। সাধনা আর প্রজ্ঞার মধ্যে দিয়ে যে জ্ঞান লাভ করেছি, তাই সব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই।
মুহূর্তে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল উপক। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, যার গুরু নেই তার কোনো শিক্ষাই হয়নি। গুরু ছাড়া জ্ঞান অসম্পূর্ণ। তুমি মুর্খ, অহংকারী তাই নিজেকে জ্ঞানী ভাব।
আর সেখানে অপেক্ষা করে না উপক। মৃদু হাসলেন বুদ্ধ। তারপর আবার এগিয়ে চললেন। দিন শেষের অন্ধকার নেমে আসে। তার মধ্যে একটু একটু করে দূরে মিলিয়ে যান।
মৃদুস্পর্শে চেতনার জগতে ফিরে এলেন হিউ-এন-সাঙ। মুখ ফেরালেন। কখন নিঃশব্দে তঁার পাশে ঘোড়া এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেননি। তার গায়ে হাত রাখলেন। বেলা শেষ। সূর্য ডুবে গিয়েছে।
এখনও চারদিকে আগুনের মতো তাপপ্রবাহ। যদিও মাথার ওপর তাপ নেই। আচ্ছাদনটুকু খুলে নিয়ে ঘর থেকে বার হলেন। রাতের বেলায় যতদূর সম্ভব যেতে হবে। আজ এখানে এই ভাঙা ঘরটুকু পেলেন। কাল কী পাবেন কে জানে!
সোজা পশ্চিমে হাঁটতে আরম্ভ ধরলেন। উঁচু-নীচু বালির ঢেউ। দিকশূন্য প্রান্তর। মনে হচ্ছে কোথাও এর শেষ নেই, সীমা নেই। আস্তে আস্তে রাত নামে। কালো অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে। কেমন বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ। আকাশে দু-একটি তারা ফুটেছে। গাঢ় হিরের দ্যুতির মতো জ্বলছে। আকাশের ওই তারা দেখে কীভাবে দিক নির্ণয় করবেন ভেবে পান না। যদিও পুথিতে অনেক কিছু পড়েছিলেন। পুথি আর বাস্তবের মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান এই প্রথম অনুভব করলেন। কিছুটা গিয়ে থমকে গেলেন। যদি দিক ভুল হয়। পশ্চিমের পরিবর্তে উত্তরে কিংবা দক্ষিণে এগিয়ে যান। চতুর্থ দুর্গের সেনাপতি যেভাবে তঁাকে নির্দেশ দিয়েছেন তাতে তঁাকে পশ্চিম অভিমুখেই যেতে হবে। ঘোড়াও দাঁড়িয়ে পড়েছে। কিছু ভাবলেন হিউ-এন-সাঙ। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া তার আর কোনো পথ নেই। বালির ওপরেই চাদর পাতলেন। রাতের মতন এখানেই বিশ্রাম। শেষ রাতে ঘুম ভেঙে গেল। বাতাস বরফের মতো ঠান্ডা। আর অপেক্ষা করলেন না। পুব দিকে মৃদু আলোর আভা। ভোরের আলো ফোটবার আগেই আবার চলতে আরম্ভ করলেন। দু-জনেই সামান্য জল আর খাবার খেয়ে নিয়েছেন।

সূর্যকে দেখে দিক ঠিক করেন। মাঝে মাঝে কেমন বিভ্রম লাগে। মনে হয় কেউ যেন তঁার সঙ্গে চলেছে। ভালো করে তাকাতেই দেখতে পেলেন নিজের ছায়া। ঘোড়ার সঙ্গে এও তঁার এক সঙ্গী। যতই বেলা বাড়ে রোদ বাড়ে। চারদিকে বালির চেহারা পালটাতে থাকে। কেমন ভয় ধরানো ভয়ংকর ভাব। গাছপালা বাড়িঘরের কোনো চিহ্ন নেই। এতদূর আসা পর্যন্ত কোনো প্রাণের অস্তিত্ব অবধি চোখে পড়েনি। আচমকা বালির মধ্যে কিছু একটা পড়ে থাকতে দেখে থমকে গেলেন। অর্ধেক বালি চাপা। তাড়াতাড়ি সামনে গিয়ে বালি সরাতেই শিউরে উঠলেন। একটা মৃত মানুষের কঙ্কাল।
অল্পক্ষণের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়লেন। কোনা হতভাগ্য মানুষ এই পথে চলেছিল। গন্তব্যে পৌঁছবার আগেই বালির সমুদ্রে তার চিরসমাধি ঘটল। আত্মীয় পরিজন, পরিবারের মানুষজন কেউ জানল না। কোথায় হারিয়ে গেল মানুষটা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর হতভাগ্য মানুষটার জন্যে প্রার্থনা করলেন হিউ-এন-সাঙ।

আবার চলতে আরম্ভ করলেন। যতই চলেছেন কেমন অবসন্ন হয়ে আসছে দেহ মন। গরম হাওয়ার স্রোত এসে এরই মধ্যে চোখে-মুখে ঝাপটা মারছে। নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন। কী ভয়ংকর লাগে সূর্যকে। অথচ এর আগে কোনোদিন মনে হয়নি সূর্যের এমন ভয়ংকর রুক্ষ রূপ। অসীম শূন্য আকাশ। একটা পাখিও সেখানে চোখে পড়ে না। সমস্ত আকাশ জুড়ে যেন জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড ভেসে বেড়াচ্ছে। আর কারও স্থান নেই সেখানে।
টলতে টলতে এগিয়ে চলেন হিউ-এন-সাঙ।
তাপ এখন আর শুধু বাইরে নয়। ভেতর থেকেও যেন বেরিয়ে আসছে। সূর্য মাথার উপর। আপাদমস্তক মোটা চাদরে নিজেকে ঢেকে নিলেন। ঘোড়াকেও ঢেকে দিলেন। ভয়ংকর তাপ থেকে যেটুকু নিজেেদরকে বাঁচানো যায়। কোন দিকে চলেছেন, কী করে চলেছেন কিছুই জানেন না। শুধু চলেছেন। হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে অল্প কিছু গাছ। একটা েছাটো টিলা। তবে কী ওখানেই মরুদ্যান! সঙ্গেসঙ্গে মনে পড়ল চতুর্থ দুর্গের একজন বলেছিল একদিন চলার পর মরুদ্যান পাবেন।
মনে মনে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ। ওখানে গেলে ছায়া পাবেন। জল পাবেন। বিশ্রাম পাবেন। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওখানে তঁাকে পৌঁছতেই হবে।
হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন। ঘোড়াও যেন বুঝতে পেরেছিল সামনে মরুদ্যান। সেও চলার গতি বাড়ায়। কতক্ষণ ধরে চলতে থাকেন দু-জন। সময়ের কোনো হিসাব থাকে না। শুধু শরীরটাকে যেন টেনে নিয়ে চলা। হঠাৎ খেয়াল হয় তিনি তো এতটুকুও মরুদ্যানের কাছে আসেননি। প্রথম দেখার পর থেকে সেই একই দূরত্ব রয়েছে। তবে কি চোখের বিভ্রম না মনের ভুল ?
কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। হঠাৎ মনে হল, এই কী মরীচিকা, যা মানুষের দৃষ্টিবিভ্রম ঘটায়। তারপর ধীরে ধীরে তাকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যায়। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ। দুই হাত আকাশের দিকে তুলে নিজের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে বলে উঠলেন, হে তথাগত রক্ষা করো।
মুহূর্তে বিচিত্র ঘটনা ঘটে গেল। সমস্ত আকাশ যেন কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল। চারদিকে ঝোড়ো হাওয়া। অস্থিরভাবে মাথা নাড়ায় ঘোড়া। হিউ-এন-সাঙ বুঝতে পারলেন ঝড় আসছে। এই ঝড়ের কথা তিনি আগেই শুনেছেন। মরুভূমির এই ঝড় বড়ো ভয়ংকর। মাটিতে বসে পড়েছে ঘোড়া। তার পাশেই বসে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ। আপাদমস্তক কম্বলে ঢেকে নিলেন নিজেদের। কী প্রবল গর্জন।
কম্বলের ফাঁক দিয়ে একপলক বাইরের দিকে তাকালেন হিউ-এন-সাঙ। ঠিক যেন মস্ত একটা দানব উন্মত্তের মতো নেচে চলেছে। তার সেই নাচের তালে মাটি আকাশ একাকার। চারদিক ধূলিঝড়ে অন্ধকার। কতক্ষণ সেই ধূলিঝড় চলল জানেন না। অর্ধমৃতের মতো বালির উপরে বসে থাকেন। বুঝতে পারছিলেন আর এভাবে চলা সম্ভব নয়। নিশ্চিত মৃত্যু সামনে।
একসময় ঝড় শান্ত হয়। বাতাসের প্রবল গর্জন থামে। আস্তে আস্তে কম্বলের বাইরে বেরিয়ে এলেন হিউ-এন-সাঙ। ঘোড়াও উঠে দাঁড়াল। বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ। ধূলিঝড়ে মরুভূমির চেহারা একেবারে অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। তাদের ঘিরে বালির পাহাড়। আশ্চর্য লাগে হিউ-এন-সাঙ-এর। আর সামান্য কয়েক হাত এগিয়ে এলেই ওই বালির পাহাড়ের তলায় তারা চাপা পড়ে যেতেন। কোনোভাবেই প্রাণ নিয়ে বার হয়ে আসতে পারতেন না। হয়তো এ সবই ভগবান তথাগাতের করুণা।
তেষ্টায় বুকের ভেতর অবধি জ্বালা করছিল। ঝোলা থেকে জলের বড়ো পাত্র বার করলেন। মুখের সামনে নিয়ে আসতেই মুখ বাড়ায় ঘোড়া। সেও তৃষ্ণার্ত। কিছু বোঝার আগেই হাত থেকে জলের পাত্র ছিটকে পড়ল মাটিতে। রুক্ষ বালি, মুহূর্তে সবটুকু জল শুষে নেয়।
হায় হায় করে উঠলেন হিউ এন-সাঙ। এবার কী হবে। আর তো চলা সম্ভব নয়। জল ছাড়া এই দুস্তর মরুভূমির পথ কী করে পার হবেন।
বিভ্রান্তের মতো কিছুক্ষণ শূন্য জলপাত্রের দিকে তাকিয়ে থাকেন। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। যদিও তার তাপ তেজ কিছুমাত্র কম বলে মনে হচ্ছে না। পায়ের তলার বালি থেকে আগুনের ভাপ উঠে আসছে। মনে হচ্ছে পোশাক ভেদ করে সমস্ত শরীর পুড়িয়ে দিচ্ছে। অসহায় লাগে নিজেকে। সমস্ত শরীর জুড়ে তীব্র জ্বালা শুরু হয়েছে। পাশে দাঁড়ানো ঘোড়াটার দিকে চোখ পড়ল। অবসন্ন ভাব। মাথা ঝুলে পড়েছে। সারা শরীর অল্প অল্প কাঁপছে। পেটটা চুপসে ভেতরের দিকে ঢুকে গিয়েছে। কেমন মায়া লাগে। এই জীবটা শুধু তারই জন্যে কত কষ্ট পাচ্ছে।
কিছুক্ষণ ভাবলেন হিউ-এন-সাঙ। যে প্রবল মানসিক শক্তি নিয়ে তিনি যাত্রা করেছিলেন সেই শক্তি যেন আর খুঁজে পাচ্ছেন না। আর কতদূর গেলে এই বালির পৃথিবী শেষ হবে কিছুই জানেন না। সীমাহীন এই মরুভূমির পথ পার হয়ে কবে কখন মরুদ্যানের সন্ধান পাবেন তাও জানেন না। সঙ্গে আর এক ফোঁটা জল নেই। খাবার ছাড়া কয়েক দিন চলা সম্ভব। জল ছাড়া এই মরুভূমির দেশে কতদূর যাবেন। মরুদ্যান খুঁজে পাবার আগেই নিশ্চিত মৃত্যু। অজানা ভয় একটু একটু করে মনের ওপর ছায়া ফেলে।
চুপ করে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। মনে হল এখনও সময় আছে। সামনে সুযোগ আছে। ফিরে গেলে জীবন বাঁচবে। নতুন করে প্রস্তুতি নিয়ে বার হওয়া সম্ভব। একবার যদি মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ নেমে আসে, তখন সমস্তই শেষ হয়ে যাবে। নিভে যাবে সব আশা-আকাঙ্ক্ষা। না, আর কিছু ভাববেন না। মনস্থির করে নিলেন হিউ-এন-সাঙ। ফিরে যাবেন চতুর্থ দুর্গে। রাতের মধ্যেই যদি প্রাচীরের কাছে পৌঁছতে পারেন জল পাবেন। এখন জলটুকু বড়ো প্রয়োজন। ঘোড়াটাও মাঝে মাঝে মাথা নেড়ে কিছু বলতে চাইছে। হিউ-এন-সাঙ-এর মনে হল সেও হয়তো বলছে ফিরে চল। তার পিঠের ওপর হাত রাখলেন।
‘চল ফিরেই চল। আমার জন্যে তুই কেন মারা যাবি। তোর মৃত্যুর পাপ আমাকেও স্পর্শ করবে।’
আর অপেক্ষা করলেন না, হিউ-এন-সাঙ। মুখ ফেরালেন ঘোড়ার। হতাশ আর বিষন্নভাবে ফিরে চললেন পূর্ব দিকে। সূর্যের তেজ স্তিমিত হয়ে এসেছিল।
দু-ক্রোশ যেতেই সূর্য অস্ত গেল। ক্লান্তিতে পা দুটো যেন আর চলতে চাইছিল না। তবু থামলেন না হিউ-এন-সাঙ। রাত শেষ হবার আগে যে ভাবেই হোক মরুভূমি পার হয়ে যেতে হবে।
একটু একটু করে অন্ধকার নামে। আকাশে তারা ফোটে। বেশ কিছুটা পথ পার হয়ে এসেছিলেন। হঠাৎ মনে হল আর পা দুটো যেন চলতে চাইছে না। ক্লান্তিতে সারা শরীর ভেঙে আসছে। ঘোড়াটাও থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বার বার মাটির ওপর বসে পড়তে চাইছে।
‘বুঝতে পারছি তুইও আর চলতে পারছিস না। তোর আর দোষ কী। জল নেই, খাবার নেই। কতক্ষণ চলবি। একটু বিশ্রাম নিলে আবার চলতে পারবি। কাল সকালেই আমরা পাঁচিলের কাছে পৌঁছে যাব। ওখানে জল আছে, ঘাস আছে। তখন আর কষ্ট হবে না।’
ঘোড়ার পিঠ থেকে বোঝাটা নামিয়ে নিয়ে বালির ওপরেই বসে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ। এখনও বালির তাপ কমেনি। তবু তার ওপরেই শরীর মেলে দিলেন। চোখ দুটো বুজে আসে। অল্পক্ষণ সেইভাবে কেটে যায়। সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। আচমকা মনে হল কেউ যেন খুব কাছ থেকে কথা বলছে। চমকে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ। এই জনমানবহীন মরুভূমিতে কে কথা বলবে। কান পাততেই শুনতে পেলেন অপরিচিত কণ্ঠস্বর। ‘তুই ভগবান বুদ্ধের আহ্বান উপেক্ষা করে ফিরে চলেছিস ?’
অনুভব করলেন হিউ-এন-সাঙ এই কণ্ঠস্বর তঁাকে উদ্দেশ্য করেই। কোনো দ্বিধা না করেই বললেন, আমি নিরুপায়। আর এগিয়ে চলার অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু। অনিবার্য মৃত্যুকে বরণ করার কোনো অর্থ হয় না।
সেই অপরিচিত কণ্ঠস্বর বলে ওঠে, ‘মৃত্যু ! সে তো জীবনের অনিবার্য পরিণতি। পৃথিবীর কোন আশ্রয় আছে যেখানে গেলে মৃত্যুকে রোধ করা যায় ?’
হিউ-এন-সাঙ বললেন, নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তার দিকে এগিয়ে যেতে হবে ?
‘ছিঃ, রক্ত মাংসের এই দেহের প্রতি এত মমতা যে তার জন্যে নিজের কর্তব্য কর্ম থেকে বিরত হবি।’ অপরিচিত কণ্ঠস্বরে তীব্র ঘৃণা ফুটে ওঠে।
চমকে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ। মুহূর্তে তন্দ্রার ঘোরটুকু কেটে গেল। তীব্র ঘৃণায় নিজেকে ধিক্কার দিয়ে উঠলেন। এ আমি কোন পথে চলেছি প্রভু। তারপরই আকাশের দিকে মুখ তুলে বলে ওঠেন, আমাকে ক্ষমা করো প্রভু। আমি মৃত্যুভয়ে লক্ষ্যপথ থেকে সরে এসেছি। আমার জীবন গেলেও আর এই ভ্রান্তি হবে না। দু-চোখ বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন। চারপাশের পরিবেশ একটু একটু করে শীতল হয়ে আসে। সারাদিনের প্রবল ক্লান্তি আর তৃষ্ণাটুকু যেন অনুভব করছেন না। উঠে দাঁড়ালেন হিউ-এন-সাঙ। পাশে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়ার দিকে চেয়ে বললেন, চল এই রাত শেষ হবার আগেই আমাদের যতদূর সম্ভব এগিয়ে যেতে হবে। আমি পথের সন্ধান জানি না। ভগবান তথাগতই আমাদের পথ নির্দেশ করবেন।
আবার পশ্চিমে মুখ ফেরালেন হিউ-এন-সাঙ। তারপর এগিয়ে চললেন। মাঝে মাঝে ঘোড়ার দিকে চেয়ে স্নেহের সুরে বলেন, তোর খুব কষ্ট হচ্ছে। আর কষ্ট হবে না। সকাল হলেই আমরা মরুদ্যানের সন্ধান পেয়ে যাব।
রাত শেষ হয়ে সূর্য ওঠে। বেলা বাড়ে। যত বেলা বাড়ে ততই দু-জনেই অবসন্ন হয়ে পড়েন। হঠাৎ এক জায়গায় চোখে পড়ে বালির ওপর মৃত মানুষ আর পশুর কঙ্কাল। মুখ ফিরিয়ে নিলেন হিউ-এন-সাঙ। নিজের মনেই প্রজ্ঞাপারমিতা থেকে মন্ত্র পড়তে থাকেন। আমাদের রক্ষা করো তথাগত।
চলতে চলতে হঠাৎ থমকে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। আচমকা ধোঁয়ার মতো বাতাসে কী যেন ভেসে এসে চারদিক আচ্ছন্ন করে দিল। আবার সেই বালি ঝড়। ভালো করে কিছু বোঝার আগেই মনে হল কারা যেন তীব্র বেগে ছুটে আসছে। অবাক লাগে হিউ-এন-সাঙ-এর। এই জনমানবহীন প্রান্তরে কারা আসছে। তবে কি তাতার দস্যুদল ? শুনেছেন মরুভূমির রুক্ষ প্রান্তরের চেয়েও ভয়ংকর ওরা। হিংস্র চিতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ওদের হাত থেকে কেউ রক্ষা পায় না।
কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না হিউ-এন-সাঙ। জানেন পালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই ধুধু প্রান্তরের যেখানেই লুকিয়ে থাকুন ওদের চোখে ধরা পড়বেনই। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সেই ধোঁয়াশার আবরণ সামনে আসতেই দেখলেন অসংখ্য সৈনিক। ঘোড়ার পিঠে বসে আছে সকলে। মাথায় সোনািল শিরস্ত্রাণ। বুকে বর্ম। হাতে দীর্ঘ বর্শা চকচক করছে। সামনে সাদা ঘোড়ায় চড়ে একজন সেনানায়ক। তার হাতে লাল নিশান, পিছনে সৈনিকরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মনে হচ্ছে প্রাণহীন কিছু মূর্তি।
হিউ-এন-সাঙ বুঝে উঠতে পারেন না ওরা কারা। এই মরুভূমির মধ্যে দিয়ে কোথায় চলেছে। আবার চলতে চলতে স্থির হয়ে গিয়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়াটাও কেমন অস্থির হয়ে গিয়েছে। ভয় সন্ত্রস্ত ভাব।
অল্পক্ষণ। কারোর চোখের পলক পড়ে না। আচমকা দমকা হাওয়া আসে। এক পলকের জন্যে চোখ বন্ধ করেন হিউ-এন-সাঙ। চোখ খুলতেই চরম বিস্ময়ের পালা। কোথাও কেউ নেই, অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে ঘোড়সওয়ারের দল! শুধু বালি আর বালি। চারদিক শূন্য। হিউ-এন-সাঙ-এর মনে হল হয়তো তঁার চোখের ভুল কিংবা মনের ভ্রান্তি। নয়তো এক মুহূর্তে কোথায় হারিয়ে যাবে বিরাট সৈন্যদল ? (প্রচলিত কাহিনি, মরু পর্যটকরা মরুভূমিতে তপ্ত আবহাওয়া ও মরীচিকার জন্যে এ ধরনের নানান অপ্রাকৃত কাল্পনিক দৃশ্য দেখতে পান)
আবার এগিয়ে চললেন হিউ-এন-সাঙ। চারদিন তিনরাত কেটে গেল। আর চলতে পারছেন না। প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছে শরীরটাকে কেউ টেনে নিয়ে চলেছে। যেকোনো সময় এই শরীর থেকে প্রাণটুকু বেরিয়ে আসবে।
বালির উপরেই লুটিয়ে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ। সারা শরীর স্থির হয়ে আসে। প্রার্থনা করবার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন। দু-চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। অস্ফুটে শুধু বললেন, হে তথাগত বুদ্ধ, আমি ধন মান কোনো ঐশ্বর্য চাইনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম পবিত্র ভারতভূমিতে গিয়ে আপনার কথা জানব। আপনি পৃথিবীর সব মানুষের দুঃখকে দূর করতে চেয়েছেন। আমার দুঃখ কি আপনি দেখবেন না। আর কিছু বলতে পারলেন না হিউ-এন-সাঙ। চেতনা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

অচেতন অবস্থায় বহুক্ষণ কেটে যায়। এক সময় জ্ঞান ফিরতেই মনে হল তাকে ঘিরে বরফের মতো ঠাণ্ডা হাওয়ার স্রোত বইছে। কয়েক দিনের অমানুষিক পথশ্রমের ক্লান্তি-ক্ষুধা-তৃষ্ণা কিছু আর অনুভব করছেন না। শরীর মন জুড়ে গভীর এক প্রশান্তি নেমে এসেছে। চোখ মেলে দেখলেন সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে তঁার ঘোড়া। চাঁদের আলো পড়েছে তার গায়ে। চোখ দুটো বোজা। হয়তো ঘুমিয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে আরামে বিশ্রাম নিচ্ছে।
হিউ-এন-সাঙ-এর মনে হল বাকি রাতটুকু এখানেই বিশ্রাম নেবেন। বালির ওপরেই কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন। অল্প অল্প হাওয়া বইছে। অল্পক্ষণেই আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। রাত বেড়ে চলে। আচমকা ঘুম ভেঙে গেল। দেখলেন ভয়ংকর চেহারার একটা দানব তঁার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক হাতে বর্শা অন্য হাতে পতাকা। দানবের চোখদুটো আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল বাতাসে উড়ছে। সে চিৎকার করে বলছে তুমি না ভগবান বুদ্ধের অনুগামী। তবে কেন তঁার ধর্ম পালন করছ না ?

দ্বিধাগ্রস্ত ভীত হিউ-এন-সাঙ জবাব দিলেন আমি কখনো তঁার ধর্মপথ থেকে বিচ্যুত হইনি।
এবার আরও ক্রুদ্ধস্বরে বলে ওঠে দানব, তবে নিজের কর্তব্যকর্ম ভুলে কেন ঘুমিয়ে আছ ?
মুহূর্তে নিজের ভুল বুঝতে পারেন হিউ-এন-সাঙ। করজোড়ে বললেন, আমাকে মার্জনা করুন হে শক্তিমান।
এবার শান্ত হয় দানব। বলে, যাও এগিয়ে চল নিজের গন্তব্যে।
উঠে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ। নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হল। স্থির করলেন যতদিন না ভারতবর্ষে পৌঁছতে পারছেন ততদিন আর বিশ্রামের অবকাশ নেই। শুধুই এগিয়ে চলা।
শুরু হল পথ চলা। আকাশের নক্ষত্র দেখে পথ অনুমান করেন। এখন আর কোনো কিছুই ভাবেন না হিউ-এন-সাঙ। নিজের সব ইচ্ছা তথাগতের ওপর সমর্পণ করেছেন। তঁার ইচ্ছাই পূর্ণ হবে।
বেশ কয়েক লি পথ পার হয়েছেন। তঁাকে নিঃশব্দে অনুসরণ করে চলেছে ঘোড়া। দীর্ঘ পথে একটি বারের জন্যেও সে অবাধ্য হয়নি। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল ঘোড়া। হিউ-এন-সাঙ লাগাম ধরে টান দিতেই অন্যদিকে মুখ ফেরাল। অবাক হলেন হিউ-এন-সাঙ। এমন আচরণ তো কখনো করেনি ঘোড়া। জোরে টান দিলেন। ঘোড়া মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চলেছে। কয়েক বার চেষ্টা করলেন হিউ-এন-সাঙ। তবু ফেরাতে পারলেন না।
ভাবলেন হিউ-এন-সাঙ। ঘোড়া কী তঁাকে পথ নির্দেশ করছে না তার স্বাভাবিক শক্তি দিয়ে কিছু অনুভব করছে। হয়তো সবই ভগবান তথাগতের ইচ্ছা। আর বাধা দিলেন না। ঘোড়া যে পথে চলেছে সেই পথে এগিয়ে চললেন। চারদিকে তখনও অন্ধকার। বাতাসে শীতল আমেজ। পথ চলতে কোনো কষ্ট হয় না।
রাত ফুরিয়ে আসে। আরও কয়েক লি পথ পার হয়ে যান। পূব আকাশের কোণে একটু একটু করে আলো ফোটে। পশ্চিমে তখনও অন্ধকার, তারই মধ্যে চোখে পড়ে সামান্য দূরে এক সার গাছ। ভালো করে তাকালেন হিউ-এন-সাঙ। চোখের ভুল নয় তো। এর আগেও তো কতবার কত দৃশ্য দেখেছেন_সবই মরীচিকা।
ঘোড়ার কোনো দ্বিধা নেই। তার চলার গতি বেড়ে গিয়েছে। তাল পান না হিউ-এন-সাঙ। যন্ত্রের মতো শরীরটাকে টেনে নিয়ে যান। একটু একটু করে আলো ছড়ায়। এবার স্পষ্ট চোখে পড়ে একসার খেজুর গাছ। কয়েকটা ভাঙা ঘর। মরুভূমির মধ্যে সবুজ এক দ্বীপ। আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ, মরুদ্যান, মরুদ্যান !
তারপরই উন্মত্তের মতো ছুটতে আরম্ভ করলেন সেই দিকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন