চঞ্চলকুমার ঘোষ
পুণ্যসলিলা গঙ্গার তীরে অনন্ত ভারত-আত্মার মূর্ত রূপ বারাণসী। বলা হয় বিশ্বের প্রাচীনতম শহর। কালকে উপেক্ষা করে আজও গঙ্গার প্রবাহিত ধারার মতোই বহমান। পুরাণে বলে স্বয়ং শিব-পার্বতী নিজেদের বাসের জন্যে সৃষ্টি করেন এই পুণ্যভূমি। তাই শিব এখানে নিত্য বিরাজমান। তিন হাজার বছর আগে এখানে নগর স্থাপন করেন রাজা সুহোত্রোর পুত্র কাশ্য। তঁার নাম থেকেই নগরের নাম হয় কাশী। দক্ষিণমুখী বরুণা আর পশ্চিমবাহিনী অসি নদী এসে মিশেছে গঙ্গায়। অসি আর বরুণার সঙ্গমের মধ্যে কাশীর আরেক নাম বারাণসী। কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসের বারাণসীর বাইরের রূপের পরিবর্তন ঘটলেও, তার প্রাণসত্তা, তার চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিশ্বের মানুষের কাছে এই শহর এক পবিত্রতার প্রতীক। জ্ঞানীগুণী মানুষরা এখানে আসেন আত্মোপলব্ধির আশায়। কবি শিল্পী সাহিত্যিকরা এখানে খুঁজে পান এক চিরন্তন ভারত সংস্কৃতির মূর্ত রূপ।
অতীত যুগে বারাণসী ছিল শিক্ষা সংস্কৃতির সর্বোচ্চ শিখরে। গঙ্গার তীরে বারাণসী হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন সকলের কাছেই এক পরম পবিত্র তীর্থভূমি। এখানে কত মন্দির আছে তার কোনো হিসাব নেই। কেউ বলেন এক হাজার কেউ বলেন দু-হাজার। প্রধান মন্দির বাবা বিশ্বনাথের। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ভক্তের ভিড়। আর রয়েছে গঙ্গার ঘাট। সেই সুদূর অতীত থেকে এই গঙ্গাকে অবলম্বন করেই বেড়ে উঠেছে বারাণসীর জনজীবন, তার সংস্কৃতি, ধর্ম, শিক্ষা, লোকাচার। প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় সংস্কৃতির এক চিরন্তন ধারা আজও প্রত্যক্ষ করা যায় এই গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে বারাণসী। তারই প্রান্তে গঙ্গার কূল ধরে উত্তর থেকে দক্ষিণে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঘাট। প্রতিটি ঘাটের আলাদা নাম। রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য। প্রতিটি ঘাট ঘিরেই জন্ম নিয়েছে নানান কিংবদন্তি, মানুষের মহান কীর্তিকাহিনি। উত্তর থেকে দক্ষিণে রয়েছে পর পর ঘাট। রাজ, প্রহ্লাদ, ত্রিলোচন, গাইঘাট, পঞ্চগঙ্গা, রাম, মণিকর্ণিকা, ললিতা, মীর, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, দশাশ্বমেধ, রানা, কেদার, হরিশ্চন্দ্র, হনুমান, শিবালা, আনন্দময়ী, তুলসী, অসি, নগোয়া। এইসব ঘাটে ভোর থেকে রাত্রি পর্যন্ত জীবনের যে বিচিত্র ছবি দেখা যায় বিশ্বে কোথাও তার তুলনা নেই।
এই বারাণসীতে বুদ্ধদেব এসেছিলেন কি না জানা যায় না। তবে বোধিলাভের পর তঁার মনে হয়েছিল কোথা থেকে তিনি ধর্মপ্রচার শুরু করবেন। কে তঁার ধর্মের মর্মকথা উপলব্ধি করতে পারবে। এইসব ভাবনায় যখন তিনি বিচলিত, হঠাৎ তঁার মানসপটে ভেসে উঠল এক দৈবমূর্তি। সেই মূর্তি বুদ্ধকে বললেন, হে বুদ্ধ, তুমি এই জগতের মাঝে তোমার ধর্মকে প্রচার করো। এখনও পৃথিবীর বহু মানুষ অজ্ঞানতার অন্ধকারে ডুবে আছে। তাদের কাছে তুমি জ্ঞানের আলো জ্বেলে দেবে। তারা তোমার কথা শুনবে। তারা উপলব্ধি করবে তোমার সত্যকে।
বুদ্ধ বললেন, সকল মানুষ তো সমান বুদ্ধিমান নয়। তাদের চেতনার স্তরও তো সমান নয়।
সেই মূর্তি বলল, সরোবরে অনেক পদ্ম ফোটে। সব পদ্ম জলের উপরে ভেসে ওঠে না। সমানভাবে ফোটে না। তবে সকলেই মাথা উঁচু করে ভেসে উঠতে চায়। তেমনি সকলের চেতনক্ষমতা সমান না হলেও জ্ঞানের আলো পাবার অধিকার সকলেরই আছে। তোমাকে এই সকলের কাছেই জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে হবে। এই কথা বলে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই মূর্তি।
বুদ্ধের মনের সব সংশয় কেটে গেল। তিনি মুহূর্তে স্থির করলেন দীর্ঘ সাত বছর তপস্যা করে যে-সত্যের সন্ধান পেয়েছেন তা প্রকাশ করবেন পূর্বের গুরুদের কাছে আর সেই পাঁচ তপস্বীর কাছে, যারা তঁাকে সুজাতার দেওয়া পায়েস খেতে দেখে উপহাস করেছিল। সকলেই বারাণসী চলে গিয়েছেন। তা ছাড়া বারাণসী দেশের জ্ঞানীগুণী মানুষের আশ্রয়স্থল। যদি তঁাদের মধ্যে নিজের মতবাদকে প্রচার করতে পারেন এবং যদি তঁারা সেই মতবাদ গ্রহণ করেন তবে অল্পদিনেই তা সমস্ত ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়বে। এই ভাবনায় তিনি উরুবেলা থেকে বারাণসী যাত্রা করলেন।
বুদ্ধ বারাণসীতে যাত্রার প্রায় হাজার বছর পর (৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের একেবারে প্রথম দিকে) হিউ-এন-সাঙ বারাণসীতে এসেছিলেন। তিনি লিখেছেন গঙ্গা তীরে অবস্থিত এই শহরের দৈর্ঘ্য দশ লি, প্রস্থ পাঁচ লি। শহরে বহু মানুষের বাস। তাদের বেশিরভাগই সম্পদশালী। তাদের গৃহে নানান ধনরত্নে পূর্ণ। এখানকার জলবায়ু বড়ো মনোরম। নগরের চারিদিকে কৃষিখেত। এখানে প্রচুর ফসল হয়। পথের দু-ধারে বড়ো বড়ো বাগান। ফলের গাছ। এখানকার বেশিরভাগ লোকই অন্য ধর্মের মানুষ। তবে সামান্য হলেও বেশ কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এখানে বাস করেন। প্রায় ত্রিশটি বৌদ্ধ বিহার রয়েছে।
নগর জুড়ে রয়েছে অসংখ্য মন্দির। এত মন্দির আর কোথাও আছে কি না জানা নেই। মন্দিরের চারিদিকে ফুলের বাগান, কোনো কোনো মন্দিরের সংলগ্ন রয়েছে পুষ্করিণী। নগর জুড়ে সাধু সন্ন্যাসীর ভিড়। কত হাজার সাধু রয়েছেন তারও কোনো হিসাব নেই। এঁদের মধ্যে বেশিরভাগই শিবের উপাসক। তঁারা গায়ে ছাই মাখেন। মাথায় জটা। কারও মাথায় চুল নেই। কিছু সাধু নগ্ন অবস্থায় থাকেন। তঁারা জৈন সম্প্রদায়ের। কিছু সাধু আছেন যাঁরা কঠোর তপস্যা করেন। সমস্ত নগর জুড়েই এক ধর্মীয় পরিমণ্ডল।
তবে হিউ-এন-সাঙ এই নগরের কুড়িটি বড়ো বড়ো দেবমন্দিরের কথা বলেছেন। এদের মধ্যে প্রায় একশো ফুট উঁচু দেবমূর্তির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। (নাম না করলেও বোঝা যায় মূর্তিটি ছিল শিবের ) একেবারে জীবন্ত মূর্তি। দেখে যেমন বিস্ময় লাগে, তেমনই মন একইসঙ্গে ভয় আর ভক্তিতে পূর্ণ হয়। গুপ্ত যুগে ভারতীয় শিল্পের কতখানি উন্নতি হয়েছিল হিউ এন-সাঙ-এর এই প্রশস্তি থেকে বোঝা যায়।
পরবর্তীকালে এই মূর্তির আর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সম্ভবত মুসলিম রাজত্বকালে এটি ধ্বংস করা হয়। এ ছাড়াও এখানে ছিল বরুণা নদীর পশ্চিমে অশোক স্তূপ। স্তূপের সামনে সবুজ এক পাথরের স্তম্ভ। সেখানে বুদ্ধের ছবি রয়েছে। হিউ-এন-সাঙ-এর রচনা থেকেই অতীত বারাণসীর কথা জানা যায়। বারাণসী থেকে হিউ-এন-সাঙ যাত্রা করলেন সারনাথে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন