চঞ্চলকুমার ঘোষ
ভগবান বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত রাজগৃহ। এই রাজগৃহকে ঘিরে রয়েছে কত কাহিনি, পুরাণকথা, ইতিহাস। রাজগৃহ বা বর্তমান রাজগির, হিন্দু-মুসলমান, জৈন-বৌদ্ধ ধর্মের এক মিলনভূমি। মহাভারতে আছে এই রাজ্য একসময় মগধরাজ জরাসন্ধের রাজধানী ছিল। তখন এর নাম ছিল গিরিব্রজ। চারিদিকে গিরি অর্থাৎ পাহাড়ের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্রবাদ আছে এখানে ভীম আর জরাসন্ধের মধ্যে অাঠাশ দিন ধরে দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলেছিল। শেষপর্যন্ত জরাসন্ধের মৃত্যু হয়।
পরবর্তীকালে মহারাজ বিম্বিসার খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকে এখানে নগর স্থাপন করে রাজধানী করেন। তারপর বহু শত বছর ধরে রাজগৃহ ছিল মগধ সাম্রাজ্যের রাজধানী।
সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করে বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করতে করতে এলেন এই রাজগৃহে। নগরে প্রবেশ করে ধনী-দরিদ্রের কোনো বিচার না করে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে লাগলেন। তঁার অপরূপ দেহলাবণ্য দেখে নগরবাসীদের মনে নানান ভাবনার সূচনা হল। কারও মনে হল ইনি ছদ্মবেশী দেবতা। কারও মনে হল অশুভ কোনো শক্তি, সুন্দর রূপধারণ করে নগর ধ্বংস করতে এসেছেন। নগররক্ষীরা তখনই মহারাজ বিম্বিসারকে সংবাদ দিল। তিনি তাদের বললেন, তোমরা গোপনে ভিক্ষুককে অনুসরণ করো। তিনি যদি অমনুষ্য হন, নগরের বাইরে গিয়ে অন্তর্ধান করবেন। যদি দেবতা হন তবে আকাশপথে অদৃশ্য হবেন। যদি নাগ হন তবে ভূমিতে প্রবেশ করবেন। আর যদি মনুষ্য হন কোথাও বসে ভিক্ষালব্ধ অন্ন ভোজন করবেন।
রাজপুরুষরা তঁাকে অনুসরণ করল। সিদ্ধার্থ তখন নগরের বাইরে একটা পাহাড়ের উপর ভিক্ষান্ন খেতে বসেছেন। যেইমাত্র ভিক্ষান্ন মুখে দিয়েছেন ঘৃণায় তঁার বমি হবার উপক্রম হল। কারণ রাজসুখে তিনি মানুষ। এইসব সাধারণ খাবার কোনোদিনই খাননি। একবার মনে হল এই ভিক্ষান্ন ফেলে দেবেন। পরমুহূর্তেই মনে হল, এতদিন তিনি ছিলেন রাজকুমার, এখন তিনি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। ভিক্ষান্নেই তঁার জীবন অতিবাহিত হবে। নিজের আচরণের জন্যে নিজেকে ধিক্কার দিলেন।
এদিকে রাজপুরুষরা তখন মহারাজ বিম্বিসারের কাছে গিয়ে সব সংবাদ দিলেন। মহারাজ তখন নিজেই গেলেন সিদ্ধার্থের কাছে। তঁার ব্যক্তিত্বপূর্ণ সৌন্দর্য আর মধুর বাক্যে মুগ্ধ হলেন মহারাজ বিম্বিসার। তিনি বললেন, তুমি তরুণ। তোমার চোখে-মুখে রাজবংশের সকল চিহ্ন রয়েছে। এই অল্প বয়সে কেন তুমি সংসারত্যাগ করেছ। আমি তোমাকে রাজপদ, অর্থ, ধনসম্পদ দিচ্ছি। তুমি এখানে থাকো।
সিদ্ধার্থ শান্তভাবে বললেন, রাজন আমি কপিলাবস্তুর রাজা শুদ্ধোধনের পুত্র। আমি স্বেচ্ছায় রাজসুখ ত্যাগ করেছি। পার্থিব সম্পদের প্রতি আর কোনো মোহ নেই আমার। আমি বুদ্ধত্ব অর্জন করবার জন্যে গৃহত্যাগ করেছি। বুদ্ধত্ব লাভই আমার সাধনা, আমার সিদ্ধি।
সিদ্ধার্থের কথা শুনে মহারাজ বিম্বিসার বললেন, সিদ্ধার্থ আপনার পিতা আমার পরম মিত্র। আপনাকে দর্শন করে আমার জীবন ধন্য হল। যেদিন আপনি বুদ্ধত্ব লাভ করবেন সেদিন আমি আপনার শরণাগত হব। আপনি আমাকে কথা দিন বুদ্ধত্ব লাভ করে আপনি আমাকে দর্শন দেবেন। সিদ্ধার্থ প্রসন্নকণ্ঠে বললেন, আপনার ইচ্ছাই পূর্ণ হবে মহারাজ।
হিউ-এন-সাঙ যখন রাজগৃহে আসেন তখন চারদিক ঘন সবুজ হয়ে আছে। একদিকে ছিল উষ্ণ প্রস্রবণ। একটি বড়ো জলাশয়ে এসে সেই জল জমা হত। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন সেখানে রোগমুক্তির জন্যে স্নান করতে আসে। চারদিকে ছড়ানো বহু স্তূপ ও বিহার। অনেক সাধুসন্ন্যাসীর বাস রয়েছে এখানে। উষ্ণ ধারার পশ্চিমে পিপ্পল গুহা_সেখানে বুদ্ধ ছিলেন। উত্তরদিকে এক লি দূরে কলন্দ বেণুবন। এখানে বুদ্ধ বহুবার এসেছেন। হিউ-এন-সাঙ সেখানে ভগ্ন বিহার দেখেছিলেন।
একদিন রাজগৃহে ছিলেন হিউ-এন-সাঙ। এবার তঁার গন্তব্যস্থল নালন্দা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন