চঞ্চলকুমার ঘোষ
মুখোমুখি বসে হুই-তি এবং হিউ-এন-সাঙ। সামান্য দূরে একটি দীপ জ্বলছিল। তার স্তিমিত আলো ছড়িয়ে পড়েছিল কক্ষের মধ্যে। একই শয্যার উপর বসে আছেন দু-জন। শয্যার এক পাশে চামড়ার একটি পেটিকা। হুই-তির চোখে-মুখে চাপা উত্তেজনার আভা।
‘আমি সংবাদ পেয়েছি সীমান্তের আগে প্রতি কুড়ি কিলোমিটার অন্তর প্রহরীরা প্রতিটি যাত্রীকে তল্লাসি করে। অনুমতিপত্র ছাড়া কাউকে আর এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না।
হিউ-এন-সাঙ-এর মধ্যে কোনো ভাবান্তর হল না। তঁার চোখে-মুখে পরম প্রশান্তি। হুই-তির দিকে তাকিয়ে বললেন, পথের বাধার কথা আমি ভাবি না।
‘কিন্তু সে বাধা আপনি কী করে অতিক্রম করবেন ?’
হিউ-এন-সাঙ অনুভব করলেন হুই-তির অন্তরের দুর্ভাবনা। বললেন, সময় অবস্থা অনুসারে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কখন কী বাধা আসবে তা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। তা ছাড়া জীবনে মহৎ কোনো কিছু অর্জন করতে গেলে সব সময়েই প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়।
হুই-তি অনুভব করতে পারছিলেন সামনে বসে থাকা মানুষটির মধ্যে কী গভীর আত্মপ্রত্যয়। কোনোভাবেই তঁার বিশ্বাসকে টলানো সম্ভব হবে না। বললেন, আমি কি আপনার সঙ্গী হতে পারি না ?
সামান্য অসহিষ্ণু হলেন হিউ-এন-সাঙ।
‘আগেও আমি তোমাকে বলেছি ঈশ্বরের যাত্রাপথে কেউ কারও সঙ্গী হতে পারে না।’
‘আমি কি কোনোদিন তথাগতের দেশে যেতে পারব না ?’
‘যদি তোমার অন্তর জুড়ে ব্যাকুলতা জেগে ওঠে। ভগবান তথাগতের আশীর্বাদ পাও, তবে নিশ্চয়ই সেই পবিত্রভূমি দর্শন করতে পারবে।’
আর কোনো কথা বললেন না হুই-তি। তিনি জানেন তঁার অন্তরে ভন্তের মতো ব্যাকুলতা নেই। শুধু তিনি কেন, চারপাশে যাঁদের দেখেন তঁাদের অধিকাংশই খানিকটা যান্ত্রিকভাবে উপাসনা করেন।
হঠাৎ সামান্য বিচলিত হয়ে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ। মনে হল অনেক রাত্রি হয়েছে। বললেন, আমি ধ্যানে বসব। তুমি ঘুমিয়ে পড়।
হিউ-এন-সাঙ-এর কণ্ঠস্বরে এমন এক আদেশের সুর ছিল, যা অগ্রাহ্য করবার সাহস হল না হুই-তি’র। ধীরে ধীরে নিজের বিছানায় এসে বসলেন। তারপর একপাশে রাখা পশমের গরম কম্বলে আপাদমস্তক ঢেকে নিলেন।
স্থির হয়ে তঁার দিকে তাকিয়ে ছিলেন হিউ-এন-সাঙ। বহুদিনের এক স্মৃতি মনের মধ্যে ভেসে আসে। শীতের সময় সব ভাইবোন এক বিছানায় গাদাগাদি করে শুতেন। সারাদিন মাঠের কাজ সেরে ফিরে আসতেন পিতা। সন্ধের সামান্য পরেই শুয়ে পড়তেন। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে হিউ-এন-সাঙ শুনতে পেতেন, কী প্রবল গর্জনে বাবা নাক ডাকছেন। বাবা মা দুজনেই মারা গিয়েছেন। কতই বা বয়েস তখন হিউ-এন-সাঙ-এর। মা মারা গেলেন তখন চার বছর, আর বাবা মারা যাওয়ার সময় নয় বছর। মায়ের কথা কিছুই মনে পড়ে না। আবছা একটা মুখ। সে মায়ের না অন্য কারও কে জানে। বাবার কথা মনে পড়ে। ছোটোখাটো শান্ত মানুষ। সারাদিন কাজ করতেন। উৎসবের সময় নতুন জামা কাপড় নিয়ে আসতেন। ভাইবোনেরা সব কেমন আছে কে জানে। গত কয়েক বছর ধরে গোটা চিন দেশ জুড়ে যে বিক্ষোভ বিদ্রোহ লুঠপাট হত্যাকাণ্ড চলেছিল, সবাই কে কোথায় চলে গিয়েছে কিছুই জানেন না। মাঝে মাঝে মনে হয় যদি তাদের সংবাদটুকু পেতেন তারা সকলেই বেঁচে আছে। এর বেশি কিছু চাওয়ার নেই তঁার। তাহলেই খুশি হতেন। বহুবার তাদের কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করেছেন।

হঠাৎ চমকে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ। এখনও ফেলে আসা অতীত জীবনের কথা ভাবছেন! না আর এসব কথা ভাববেন না। তঁার সামনে এখন একটাই ভাবনা_ভগবান বুদ্ধের দেশ, ভারতবর্ষ।

চুপ করে বসে থাকেন। আজ আর ধ্যানেও মন বসে না। কপিলাবস্তু থেকে সারনাথ, রাজগৃহ, সব যেন ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে চলেছে। কতদিন আগের কথা তবু তিনি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। তঁার দুই চোখে মুগ্ধ বিস্ময়।
হিমালয়ের কোলে কপিলাবস্তু। আশ্চর্য সুন্দর একটা দেশ। প্রাসাদে রাজা শুদ্ধোদন আর রানি মহামায়া মুখোমুখি বসে আছেন। রানি বলছেন, মহারাজ গতকাল রাতে আমি এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখলাম। আমি তখন সোনার পালঙ্কে ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম সারাটা আকাশ আলোয় ভরে আছে। সেই আলোর মধ্যে ভেসে এল ছোট্ট এক সাদা হাতি। তার শুঁড়ে ধরা সাদা পদ্ম। আস্তে আস্তে সেই সাদা হাতি নেমে এসে আমার শরীরের মধ্যে মিশে গেল। তারপরই ঘুম ভেঙে গেল। এমন স্বপ্ন তো আগে কোনোদিন দেখিনি মহারাজ। কী অর্থ এর ?
সকাল হতেই রাজা শুদ্ধোদন ডাক দিলেন তঁার সভার পণ্ডিতদের। তঁারা গণনা করে বললেন, রানি মহামায়ার গর্ভে যিনি আসছেন তিনি এই পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি রাজচক্রবর্তী হবেন। তিনি এমন এক মহাকীর্তি স্থাপন করবেন যার কোনোদিন ক্ষয় হবে না।
রাজপুরী জুড়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। দিন যায়। মাস যায়। দশ মাস পার হয়ে গেল।
রানি পালকিতে করে চলেছেন বাপের বাড়ি। দু-ধারে সখী আর প্রহরীর দল। চলতে চলতে তারা সকলে এসে পড়ে লুম্বিনীর বিরাট বাগানে। চারদিকে কত ফল ফুল গাছ। হঠাৎ থমকে গেল পালকি। গাছের নীচে পালকি রাখা হল। রানির প্রসব বেদনা উঠেছে। রানি পালকি থেকে বার হয়ে একটা গাছের নীচে এসে দাঁড়ালেন। সেই মুহূর্তে জন্ম নিলেন বুদ্ধদেব। ঠিক যেন আকাশের চাঁদ। মহামায়ার কোল আলো করে পৃথিবীতে আবির্ভাব হল তঁার।
হিউ-এন-সাঙ আশ্চর্য হয়ে দেখতে থাকেন পৃথিবীর ওপর দিয়ে পা ফেলে এগিয়ে চলেছেন সেই শিশু। যেখানে তঁার কোমল পা পড়ছে সেখানে ফুটে উঠছে পদ্ম। আকাশ থেকে আলোর বৃষ্টি ঝরে পড়ছে। আরও কত দৃশ্য। ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে উঠছেন সিদ্ধার্থ। বিরাট এক বাগান। সেখানে স্থির হয়ে বসে রয়েছেন। কোথা থেকে িতরবিদ্ধ এক রাজহাঁস এসে পড়ল তঁার কোলে। তিনি পরম মমতায় তার সেবা করছেন। পূর্ণ যৌবন সিদ্ধার্থের। ঘরে সুন্দরী স্ত্রী যশোধরা। পুত্র রাহুল। চারদিকে সুখ ঐশ্বর্য বিলাস। কোথাও দুঃখের কোনো চিহ্ন নেই।
একদিন নগরের পথে রথে করে চলেছেন সিদ্ধার্থ। তঁার মুখে প্রসন্ন হাসি। কী সুন্দর এই পৃথিবী। হঠাৎ চমকে উঠে দেখলেন তঁার রথের সামনে এক বৃদ্ধ। কঙ্কালসার দেহ। বয়েসের ভারে নুয়ে পড়েছে। চলার শক্তি নেই। তবু লাঠি হাতে চলেছে। নিরুপায় অসহায়।
কোনোদিন এমন দৃশ্য দেখেননি সিদ্ধার্থ। প্রশ্ন করলেন সারথি ছন্দককে, এ কে?
ছন্দক উত্তর দিলেন, ও জরা। জীবনের সব কিছুকে ঝরিয়ে দেয়। শুকিয়ে দেয়। সকল মানুষের জীবনেই একদিন জরা আসবে।
‘এই অবস্থা কি আমার, আমার যুবতী স্ত্রীরও হবে ?’ সিদ্ধার্থের মধ্যে প্রবল জিজ্ঞাসা জেগে ওঠে।
ছন্দক জবাব দেয়, হ্যাঁ যুবরাজ, এই জরা বার্ধক্য থেকে কারও মুক্তি নেই। মানুষের জীবনের এ এক স্বাভাবিক পরিণতি।
বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন সিদ্ধার্থ। এই কী জীবন!
আবার একদিন চলেছেন রথে করে। হঠাৎ দেখলেন পথের পাশে একটা মানুষ পড়ে আছে। যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। কুঁকড়ে যাচ্ছে তার সারা শরীর। জিজ্ঞাসা করলেন সিদ্ধার্থ, ওর কী হয়েছে ?
‘ও এক রুগ্ন অসুস্থ মানুষ। ব্যাধির যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আর্তনাদ করছে।’
বিস্মিত সিদ্ধার্থ জিজ্ঞাসা করলেন, এই ব্যাধি থেকে কি মুক্তি নেই ?
‘না যুবরাজ, যতদিন দেহ থাকবে ততদিন ব্যাধি থাকবে। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই ব্যাধি অবশ্যম্ভাবী।’
বিরাট এক জিজ্ঞাসা জেগে ওঠে তঁার মনের মধ্যে। কেন এই ব্যাধি ? কেন এই জরা। নিজের অন্তরে অস্থির হয়ে ওঠেন। রাজপ্রাসাদে মন বসে না।
আবার একদিন পথে বার হয়েছেন। হঠাৎ চোখে পড়ল পথের পাশে একটা দেহ। সাদা কাপড়ে ঢাকা। তাকে ঘিরে সকলে কাঁদছে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন সিদ্ধার্থ। অস্ফুটে বললেন, ওরা কেন কাঁদছে ছন্দক ?
‘ওদের কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু হয়েছে।’
‘মৃত্যু কী ?’
‘জীবনের অন্তিম পরিণতি। সকল মানুষেরই একদিন মৃত্যু হবে। ধনী, নির্ধন, রাজা, প্রজা পৃথিবীর কারোরই মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তি নেই। চন্দ্র সূর্যের মতোই জীবনের এ এক পরম সত্য।’
বিহ্বল সিদ্ধার্থ। এই জরা-ব্যাধি-মৃত্যু থেকে মুক্তি। কে দেবে সেই মুক্তিপথের সন্ধান ?
উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ান। হঠাৎ একদিন চোখে পড়ল রাজউদ্যানের সামনে একটি লোক একাকি চলেছেন। পরনে তঁার পীত বসন। হাতে ভিক্ষা পাত্র। কোনো বেশভূষা নেই। নেই কোনো পারিপাট্য। তঁার মুখে ফুটে উঠেছে শান্ত অপার্থিব এক সৌন্দর্য। সিদ্ধার্থের মনে হল এমন মানুষ আগে কোনোদিন তিনি দেখেননি। তঁাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, কে আপনি ?
মানুষটি বললেন, আমি সন্ন্যাসী। সংসারের সব কিছুই অনিত্য। জীবনের সর্ব ক্ষেত্রেই জরা ব্যাধি মৃত্যুর অপ্রতিহত গতি। তাই সংসারের সব বন্ধন চিরদিনের জন্যে ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়েছি। আমার কোনো আসক্তি নেই। লোভ নেই। এই ভিক্ষাপাত্র ছাড়া আর কোনো সম্বল নেই। তাই মৃত্যুভয়ও নেই।
‘কোথায় চলেছেন আপনি ?’
‘জীবনের যে অবিনশ্বর সুখ আনন্দ, আমি তারই সন্ধানে চলেছি।’
চলে যান সন্ন্যাসী। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন সিদ্ধার্থ। এই প্রথম অনুভব করলেন তঁার অশান্ত হৃদয়ে শান্তির সুমধুর পরশ।
সেদিন আষাঢ় পূর্ণিমার পুণ্য তিথি। অস্থির হয়ে ওঠেন সিদ্ধার্থ। অন্তরে শুনতে পাচ্ছেন ঘর ছাড়ার আহ্বান। সন্ধ্যা পার হয়। রাত্রি নামে। ঘুমিয়ে পড়ে প্রাসাদের সকলে। নিজের কক্ষ থেকে বার হয়ে এলেন সিদ্ধার্থ।
পাশেই পত্নী যশোধরার কক্ষ। প্রদীপের মৃদু আলোয় দেখলেন নবজাত সন্তান রাহুলকে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে যশোধরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মনের মধ্যে মুহূর্তের বিচ্ছেদ বেদনা জেগে ওঠে। তারপরই ক্ষণিকের দুর্বলতা মুছে ফেলে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। সামনে রাজউদ্যান। সেখানে দাঁড়িয়ে তঁার প্রিয় অশ্ব কান্তক আর সারথি ছন্দক। তাদের পূর্বেই নির্দেশ দিয়েছিলেন সিদ্ধার্থ। চারদিকে ঘন অন্ধকার তার মধ্যে বিদ্যুতের চমক। সেই আলোয় তঁারা পথ চলেন। এই যাত্রাই ‘মহাভিনিষ্ক্রমণ’
আরও কত দৃশ্য। দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে যান হিউ-এন-সাঙ।
‘ভন্তে’
হুই-তির ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এলেন হিউ-এন-সাঙ। বিছানায় উঠে বসেছেন হুই-তি।
হিউ-এন-সাঙ অনুভব করলেন তঁার আসন্ন বিচ্ছেদ বেদনায় কাতর হয়ে পড়েছেন হুই-তি। কিছু বলবার আগেই হুই-তি বললেন, আমি বোধহয় আপনার ধ্যান ভঙ্গ করে দিলাম।
শান্তভাবে হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি ধ্যানে বসিনি। কল্পনায় ভেসে গিয়েছিলাম কপিলাবস্তু, রাজগৃহ, বুদ্ধগয়ায়। দেখছিলাম তথাগতের জীবন। কী আশ্চর্য সুন্দর সেই দৃশ্য!
হুই-তির দুই চোখে জলের ধারা।
‘আপনি ভগবান তথাগতের কথা বলুন। বাকি রাতটুকু তঁার কথা শুনতে চাই। আপনি যখন এখান থেকে চলে যাবেন, ভগবান তথাগতের কথা কেউ এমন সুন্দর করে বলবেন না।’
হিউ-এন-সাঙ খানিকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন। তারপর বললেন, ভগবান তথাগতের জীবনকথা বলে শেষ করা যায় না। আমি মানসচক্ষে দেখছিলাম তিনি বোধিবৃক্ষের নীচে বসে বুদ্ধত্ব লাভ করেছেন।
‘সেই বোধিবৃক্ষ কি এখনও আছে’?
‘আমি জানি না। তবে মহাত্মা ফা-হিয়েন লিখেছেন তিনি দর্শন করেছিলেন সেই বোধিবৃক্ষ।’
হুই-তি অপলক চোখে চেয়ে থাকেন সামনের দিকে। যেন তিনি দেখতে পাচ্ছেন সেই বোধিবৃক্ষ।
হিউ-এন-সাঙ-এর দৃষ্টি ছিল না হুই-তির দিকে। তিনি আপন মনে বলে চলেছেন, শুনেছি সম্রাট অশোকের কন্যা সিংহলে বোধিবৃক্ষের একখানি চারা কোনো বৌদ্ধ বিহারে স্থাপন করেছিলেন।
মুহূর্তে হুই-তির মধ্যে অদ্ভুত এক আবেগ জেগে ওঠে।
‘যদি সম্ভব হয় আপনিও তার একটি চারা নিয়ে আসবেন। আমাদের এই বিহারের প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হবে। সমস্ত চিন দেশের মানুষ এসে প্রণত হবে।’
কোনো জবাব দিলেন না হিউ-এন-সাঙ। মনের মধ্যে একটি ভাবনা ক্রমশই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। যে স্বপ্ন নিয়ে ভারতবর্ষে যাচ্ছেন যদি সেই স্বপ্ন পূরণ না হয়। মহাত্মা ফা-হিয়েন প্রায় দুশো বছর আগে ভারতে গিয়েছিলেন। তারপর কত ঋতু পার হয়ে গিয়েছে, কত রাজনৈতিক উত্থান-পতন, নিজের দেশেই তো কত পরিবর্তন দেখলেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা ব্যবসায়ীদের মুখ থেকে শুনেছেন সম্রাট অশোকের সময়ে বৌদ্ধধর্মের যে বিজয়পতাকা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল আজ তা অনেক ম্রিয়মান। এই হয়তো ইতিহাসের নিয়ম।
হুই-তি জিজ্ঞাসা করলেন, ভগবান বুদ্ধের ধর্ম ছাড়া কি ভারতবর্ষে আর কোনো ধর্ম আছে ?
‘হ্যাঁ আছে। শুনেছি সেখানকার প্রধান ধর্ম হিন্দু ধর্ম। ভগবান বুদ্ধের বহু আগে থেকেই ভারতবর্ষের মানুষ সেই ধর্ম পালন করে।’
‘কী আছে, সেই ধর্মে ?’
‘জানি না। তবে আমার অনুমান সেই ধর্মের মধ্যে মানুষ তাদের জীবনের পথ খুঁজে পায়নি তাই ভগবান বুদ্ধের পথ অনুসরণ করেছেন।’
হুই-তি বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন ভন্তে। তথাগতের ধর্ম, শিক্ষা সকল মানুষকে মুক্তির পথ দেখিয়েছে।
‘তা ছাড়া তঁার ধর্মমত উপদেশ সহজ সরল। একদিন মানুক্য নামে এক ব্যক্তি ভগবান বুদ্ধের কাছে এসেছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন প্রভু আমি কিছু জিজ্ঞাসা নিয়ে এসেছি। আপনি তার উত্তর দিন। বুদ্ধ বললেন, বল কী তোমার জিজ্ঞাসা। মানুক্য বললেন, এই জগৎ কী ? দেহ আত্মা কী ? মৃত্যুর পর আত্মা কোথায় যায় ? বুদ্ধ তখন বললেন, যদি কারও শরীরে তির এসে বিদ্ধ হয়, সে কী বলে যতক্ষণ না আমি জানতে পারছি এই িতর কে তৈরি করেছে, কে এই িতর ছুড়েছে ততক্ষণ আমি শরীর থেকে তির মুক্ত করব না। মানুক্য বলল, না প্রভু সকলের আগে সে তীর মুক্ত করবে। ভগবান বুদ্ধ বললেন, তুমি যে বিষয়ে জানতে চাইছ আমি সে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করিনি কারণ মানুষ প্রতিমুহূর্তে দুঃখের জ্বালায় পুড়ে মরছে। আমি শুধু তাদের বলি কী করে তারা দুঃখের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে। মানুক্য তুমি যা জানতে চেয়েছ তা বড়ো জটিল আর তর্কের বিষয়। একমাত্র পরম জ্ঞানীরাই সে বিষয় উপলব্ধি করতে পারে। সাধারণ মানুষের সে যোগ্যতা নেই। যা তাদের জীবনে কাজে লাগে আমি শুধু সে কথাই বলি। আর বলি অহিংসা আর প্রেমের কথা।’
আপ্লুত হয়ে যান হুই-তি। বললেন, ভগবান তথাগতের অহিংসা মন্ত্র কী ?
হিউ-এন-সাঙ প্রসন্ন কণ্ঠে বললেন, তাহলে তোমাকে বাছাগোটা আর পূর্ণর কাহিনি শোনাই। একদিন বাছাগোটা নামে এক সাধু ভগবান বুদ্ধর কাছে এসে প্রশ্ন করলেন, অহং কী ? অহিংসা আর অহং কি এক বস্তু ? বুদ্ধ কোনো জবাব দিলেন না। তিনি নীরব হয়ে বসে রইলেন। পরে তঁার শিষ্য আনন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি বাছাগোটার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না কেন প্রভু ? বুদ্ধ তখন বললেন, অহং যেমন মানুষের বোধ, অহিংসা তেমনি মানুষের উপলব্ধি। তাত্ত্বিক আলোচনায় কখনোই এর প্রকৃতস্বরূপ উপলব্ধি করা যায় না। কর্ম আর জীবন সাধনার মধ্যেই এর প্রকাশ। সেই কারণেই আমি কোনো কথা না বলে নীরব হয়েছিলাম। কোনো কথা বললেন না আনন্দ। বুদ্ধ উপলব্ধি করলেন তঁার কথার অর্থ ধরতে পারেনি আনন্দ। তখন তিনি তঁার এক শিষ্য পূর্ণকে ডেকে পাঠালেন। পূর্ণ এসে প্রণাম করতেই তিনি বললেন, তোমাকে ভয়ংকর আদিবাসীদের কাছে ধর্ম প্রচারের জন্যে পাঠানো হবে।
পূর্ণ হাসি মুখে জবাব দিলেন, এ আমার পরম সৌভাগ্য।
এবার বুদ্ধ তঁাকে পরীক্ষা করবার জন্যে বললেন, তুমি যেখানে যাচ্ছ সেখানকার লোকেরা যদি তোমাকে গালিগালাজ করে, বিদ্রুপ করে, তখন তুমি কী করবে ?
পূর্ণ বলল, তাহলে মনে করব ওরা তো আমাকে কোনো আঘাত করেনি। আমি হাসি মুখে তাদের উপদেশ দেব।
‘বুদ্ধ বললেন, যদি তারা তোমাকে আঘাত করে ?’
‘তবুও তাদের উপদেশ দেব, কারণ তারা তো আমাকে হত্যা করেনি।’
বুদ্ধ প্রসন্ন হাসিতে বললেন, যদি তারা তোমাকে হত্যা করে ?
‘মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও তাদের জন্যে মঙ্গল প্রার্থনা করব।’
বুদ্ধ তখন আনন্দর দিকে তাকিয়ে বললেন, এই হচ্ছে অহং আর অহিংসার যথার্থ জ্ঞান। এ কোনো উপদেশে লাভ করা যায় না। উপলব্ধিও করা যায় না।
কোনো কথা বললেন না হুই-তি। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন নিজের শয্যায়। তারপর ধীর পদক্ষেপে উঠে এলেন হিউ-এন-সাঙ-এর কাছে। নতমস্তকে প্রণাম করলেন।
রাত্রি শেষ হয়ে এসেছে। কক্ষের মাথার ওপরের ছিদ্র দিয়ে সামান্য আলোর আভা এসে পড়ে।
হিউ-এন-সাঙ, হুই-তির মাথার ওপর হাত দিয়ে বললেন, চল প্রার্থনা কক্ষে যাই। তারপর আমি যাত্রা করব। ভগবান তথাগত তোমার মঙ্গল করুন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন