বামিয়ান

চঞ্চলকুমার ঘোষ

শীত শেষ হয়ে এসেছিল। সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার ভারতবর্ষের দিকে যাত্রা করলেন হিউ-এন-সাঙ।

সামনে দুর্লঙ্ঘ্য হিন্দুকুশ পর্বতমালা।

হিউ-এন-সাঙ লিখেছেন : আমার যাত্রাপথে এই পথই ছিল সবচেয়ে কঠিন। মরুভূমির চেয়েও কঠিন। তুষার নদীর চেয়েও ভয়ংকর। সর্বক্ষণ তুষারঝড় বইছে। তার সঙ্গে রয়েছে নানান অশরীরী শক্তির উপদ্রব। করুণাময় বুদ্ধের করুণায় সব কিছু আমি অতিক্রম করে হিন্দুকুশ পর্বতমালার মাঝে মনোরম উপত্যকা বামিয়ানে এসে উপস্থিত হলাম।

‘বামিয়ান’ নামটা দেখেই থমকে গেল অমিতাভ।

মাত্র কয়েক বছর আগে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ওঠা এক নাম। হাজার বছরের বুদ্ধমূর্তি ভেঙে দিয়ে মুসলিম ধর্মের জয়পতাকা ওড়াতে চেয়েছিল হিংস্র তালিবানরা। বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। কারও কথায় কান দেয়নি বর্বর তালিবানরা।

খবরের কাগজে তখন অনেক খবর বের হয়েছিল। বেশিরভাগই পড়া হয়নি। অনেক দিন পর হারিয়ে যাওয়া কিছু জিনিস খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

কম্পিউটার খোলে। ইন্টারনেটের দৌলতে গোটা বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারই আজ হাতের মুঠোয়। এক এক সময় মনে হয় যদি হিউ-এন-সাঙ-এর সময় কম্পিউটার থাকত তিনি তো চিনে বসেই মাউস ক্লিক করতেন, হাতের মুঠোয় পেয়ে যেতেন দুনিয়ার সব পুথি, সব সংবাদ। তাহলে কি প্রাণ বিপন্ন করে ভারতবর্ষে আসতেন ?

কয়েক মুহূর্ত ভাবে অমিতাভ। যদি হিউ-এন-সাঙ-এর সঙ্গে তার দেখা হত, তঁাকে যদি এই প্রশ্নটাই করত, কী জবাব দিতেন তিনি ?

কম্পিউটারের মাউসে ক্লিক করতে গিয়েও থমকে গেল। চোখ বুজে মনটাকে ভাসিয়ে দিল। স্বপ্নের মতো একটা ঘোর। এবার স্পষ্ট দেখতে পায় সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন হিউ-এন-সাঙ। পরনে আলখাল্লা। মাথায় ঢাকা। হাসিমুখে বললেন, কী বলছ অমিতাভ ?

মনের মধ্যে জেগে ওঠা জিজ্ঞাসা। কথা বলে অমিতাভ।

একমুখ প্রসন্ন হাসি ছড়িয়ে হিউ-এন-সাঙ বললেন, তোমাদের ওই বইয়ের পাতার কালো অক্ষর, কিংবা কম্পিউটারের স্ক্রিনে ফুটে ওঠা অক্ষর, এর বাইরেও দেখার, জানার, উপলব্ধির বিরাট এক জগৎ রয়েছে। শুধু বই পড়ে কি তাকে জানা যায় ? তার জন্যে যে ঘরের বাইরে বার হতেই হয়। এই যে তুমি আমার বই পড়ছ, কত কিছু জানছ। যদি আমি ঘরের বাইরে না বার হতাম তাহলে কেমন করে লিখতাম ? শুধু যদি অন্যের কথা শুনতাম, অন্যের লেখা পড়ে বই লিখতাম সে-লেখা তো আমার হত না, অন্যের হত।

একটু থামলেন হিউ-এন-সাঙ। তারপর বললেন, আমি যদি বামিয়ানে না যেতাম তোমরা কি জানতে পারতে সেখানে কী ছিল ?

মাথা নাড়ে অমিতাভ। আমরা কিছুই জানতে পারতাম না। সব তো শয়তানগুলো ধ্বংস করে দিল।

মুচকি হাসলেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, সেইজন্যেই তো আমি ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখে লিখেছিলাম। যাতে কালের ধর্মে সব কিছু ধ্বংস হলেও তোমরা অন্তত জানতে পারবে কী ছিল সেখানে।

থামলেন হিউ-এন-সাঙ।

এক মুহূর্ত। কিছু জিজ্ঞাসা করতে গিয়েই থেমে গেল অমিতাভ। অদৃশ্য হয়ে গিয়েছেন তিনি।

আস্তে আস্তে চোখ খোলে। মাউসে ক্লিক করে। টাইপ করে_বামিয়ান। একটু একটু করে কম্পিউটারের পর্দায় ফুটে ওঠে কত লেখা, কত ছবি।

পাহাড়ের গায়ে বিরাট এক গুহা। সেখানে দণ্ডায়মান বুদ্ধের বিরাট মূর্তি। মানুষের এক মহত্তম সৃষ্টি।

ছবির নীচেই শুরু হয়েছে বামিয়ানের কথা। প্রাচীন যে সিল্ক রুট, তারই পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের সংযোজন ভূমি। আধুনিক আফগানিস্থানের রাজধানী কাবুলের কয়েক-শো কিলোমিটার দূরে নিতান্তই ছোটো পাহাড়ি শহর। বছরের ছ-মাস প্রবল শীত। বেশিরভাগ অঞ্চলই বরফে ঢাকা থাকে। স্থানীয় মানুষেরা প্রবল প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে এখানে বেঁচে থাকে। তবুও বৌদ্ধ সংস্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে বামিয়ানের খ্যাতি। পূর্ব ও পশ্চিমের মিলনক্ষেত্র। এখানকার স্থাপত্য, শিল্পকর্মে দেখা যায় গ্রিক-তুর্কি-চৈনিক-ভারতীয় সংস্কৃতির এক মিশ্র প্রভাব যা, পৃথিবীর আর কোথাও নেই।

প্রায় দেড় হাজার বছর আগে এখানে দশটি সংঘারাম গড়ে উঠেছিল। সেখানে কমবেশি প্রায় এক হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু থাকতেন। তঁাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন শিল্পী। কেউ ধ্যান-জপের মধ্যে ভগবান বুদ্ধের আরাধনা করতেন। আর শিল্পীরা নিজেদের সব সৃষ্টিশক্তি, মেধা, পরিশ্রম উজাড় করে দিতেন বুদ্ধের নানা রূপ গড়ে তোলবার জন্যে। সেই ছিল তঁাদের সাধনা, তঁাদের পূজা।

সেইসময় তঁারা পাহাড় কেটে তৈরি করলেন দুটি গুহা। একটি বড়ো, আরেকটি ছোটো। সম্ভবত ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে বড়ো গুহায় তৈরি হয় ভগবান বুদ্ধের একশো পঁচাত্তর (১৭৫) ফুট উঁচু মূর্তি। একে বলা হত দীপঙ্কর বুদ্ধ। স্থানীয় মানুষরা বলত ‘সলসল’, যার অর্থ পৃথিবীর আলো। হালকা লাল রঙের এই মূর্তি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মনোলিথিক মূর্তি। এর পাশের গুহায় একশো ফুট উঁচু মূর্তিকে বলা হত সামামা, যার অর্থ বিশ্বজননী। বিচিত্র রঙের আভা ফুটে উঠত এই মূর্তির গা থেকে। এই ছোটো মূর্তি তৈরি হয় ৫৫০ খ্রিস্টাব্দে। যখন হিউ-এন-সাঙ এখানে এসেছিলেন তখন এই বুদ্ধমূর্তির সর্বাঙ্গে ছিল সোনা, হিরে, মুক্তো-মাণিক্যের অলংকার। এই দুটি মূর্তি ছাড়াও আরও একটি মূর্তি দেখেছিলেন তিনি। মহানির্বাণ মূর্তি। তঁার অনুমান এটি একহাজার ফুটের কম নয়। যদিও পরবর্তীকালে এই মূর্তির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ক্রমশই বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ক্ষীণ হয়ে এল বামিয়ানের প্রান্তরে। ঢেউয়ের মতো একের-পর-এক সেখানে এসে আছড়ে পড়ল হূণ-মোগল-পাঠান। সমস্ত মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ইসলাম ধর্ম। গজনির সুলতান মামুদ, সম্রাট ঔরঙ্গজেব-এর মতো, আরও অনেক মুসলিম শাসকের কাছে মিথ্যে হয়ে গেল ভগবান বুদ্ধের প্রেম-করুণা। তবুও সামান্য কিছু ক্ষতি হওয়া ছাড়া প্রায় অক্ষতই ছিল সেই মুর্তি। গত একশো বছর ধরে সারা পৃথিবীর মানুষ আসতেন বামিয়ানের উন্মুক্ত প্রান্তরে বুদ্ধের এই আশ্চর্য সুন্দর মূর্তি দর্শন করবার জন্যে।

তারপর আফগানিস্থানের ইতিহাস শুধুই রক্তক্ষয়ের ইতিহাস। ধর্মান্ধ তালিবানরা ক্ষমতায় এসেই জেহাদ ঘোষণা করল তালিবান রাজত্বে অন্য কোনো ধর্মের স্থান নেই। লাদেন, মোল্লা ওমর আদেশ দিল, ভেঙে ফ্যালো বুদ্ধের এই মূর্তি। সমস্ত বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠল। বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করেই ২ মার্চ, ২০০১ মূর্তি ভাঙার কাজ শুরু হল। কামানের গোলায় ধ্বংস হয়ে গেল মানবসভ্যতার এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

ইতিহাসের নির্মম পরিহাসে, দু-বছরের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেল অত্যাচারী লাদেন আর তার তালিবান শক্তি।

পরবর্তীকালে বহু শিল্প-বিশেষজ্ঞ সেখানে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন কমবেশি ষোলোটা গুহা, যেখানে পাথরের গায়ে আঁকা হয়েছে নানান ছবি। আশ্চর্য তাদের সুষমা। বহু বিশেষজ্ঞের অভিমত, এই ছবিগুলি পৃথিবীর আদিমতম তেলরঙের ছবির নিদর্শন।

অনেকক্ষণ ধরে কম্পিউটার দেখছিল অমিতাভ। এবার বন্ধ করে উঠে পড়ল। মনটা কেমন ভার হয়ে আসে। চুপ করে ভাবে যদি সে হিউ-এন-সাঙ-এর সঙ্গী হতে পারত, দেখত মানুষের কী মহান সৃষ্টি! শুধু বুদ্ধকে প্রণাম করত না, প্রণাম করত সেই মহান শিল্পীদের।

হিউ-এন-সাঙ, তঁার মনেও কি এই একই ভাব জেগে উঠেছিল ?

বই খোলে অমিতাভ। নিজের অনুভবের কথা লেখেননি হিউ-এন-সাঙ। হয়তো তখন তঁার মন জুড়ে শুধু এক ভাব আর ভাবনা_বামিয়ানের সীমান্ত পার হয়ে এবার তিনি ভারতবর্ষের মাটিতে পা রাখবেন।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%