চঞ্চলকুমার ঘোষ
কুশীনগর বৌদ্ধদের কাছে পরম পবিত্র স্থান। এর প্রাচীন নাম ছিল কুশাবতী। নগরের প্রান্ত দিয়ে বয়ে যেত হিরণ্যবতী নদী। ভগবান তথাগতের নির্বাণভূমি বলে এখানে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য স্তূপ-বিহার-চৈত্য। কালের রথচক্রে সে সবই হারিয়ে গিয়েছে।
হিউ-এন-সাঙ এলেন কুশীনগরে। বড়ো বিষণ্ণ তঁার মন। মাত্র হাজার বছর ভগবান তথাগত এই মর্তভূমি ত্যাগ করেছেন। এরমধ্যেই ভারতবর্ষের মানুষ তঁাকে ভুলে গিয়েছে।
তঁার স্মৃতিবিজড়িত সর্বত্রই কেন এমন ধ্বংসের করালগ্রাস। সম্রাট অশোক সমস্ত জীবন ধরে ভগবান তথাগতের বাণীকে দিকে দিকে প্রচার করেছেন। তার পরে কি একজনও রাজা-মহারাজা-সম্রাট ভারতবর্ষে জন্ম নিলেন না, যিনি মহামানবের প্রেমের বাণীকে সর্বব্যাপ্ত করতে পারতেন !
ধীর পায়ে কুশীনগরের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললেন হিউ-এন-সাঙ। লুম্বিনীর মতো এও এক পরিত্যক্ত গ্রাম। সঙ্গী পথপ্রদর্শক বললেন, সামান্য দূরে একটা গ্রাম আছে। আজ সেখানে রাত্রিবাস করে কাল প্রভাতে আমরা আবার যাত্রা করব।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, এখানে কি ভগবান বুদ্ধের কোনো স্মৃতিই অবশিষ্ট নেই ?
‘শালবনের মধ্যে বুদ্ধের চৈত্য রয়েছে।’
উদগ্রীব কণ্ঠে হিউ-এন-সাঙ বললেন, এখনই চলো সেই পবিত্র স্থান দর্শন করব।
দ্রুত পায়ে তিনি পথপ্রদর্শককে অনুসরণ করলেন।
সামান্য দূরেই শালবন। তার মাঝে ভগ্নপ্রায় এক বিশাল চৈত্য সংস্কারের অভাবে জীর্ণ হয়ে গিয়েছে। চৈত্যের বহু জায়গায় ফাটল ধরেছে। সেখানে বড়ো বড়ো গাছ ডালপালা মেলে জঙ্গলের মতো হয়ে আছে। চারিদিকে নিস্তব্ধতা। কোনো দিকেই দৃষ্টি নেই হিউ-এন-সাঙ-এর। তঁার সমস্ত অন্তর তথাগতের ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ধীর পায়ে প্রবেশ করলেন চৈত্যের মধ্যে। এখানেই একদিন ভগবান বুদ্ধের মহাপরিণির্বাণ হয়েছিল। চৈত্যের মধ্যে বিশাল এক বেদির উপর শায়িত কুড়ি ফুট বুদ্ধের মহানির্বাণ মূর্তি। চোখ দুটি বোজা। চিরনিদ্রায় বিশ্রাম নিচ্ছেন মহাতাপস।
গভীর আবেগে মূর্তির সামনে নতজানু হলেন হিউ এন-সাঙ। দু-চোখ বেয়ে জলের ধারা নামে। মনে হল যখন চিনে ছিলেন কোনোদিন ভাবতেও পারেননি ভগবান বুদ্ধের শেষ স্পর্শ জুড়ে থাকা এই পরম পবিত্র স্থানে আসতে পারবেন। উদ্বেল কণ্ঠে বলে উঠলেন, আজ আমার জীবন সার্থক হল।
বহুক্ষণ সেখানে বসে থাকেন হিউ-এন-সাঙ। সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে পথপ্রদর্শক। একসময় মৃদুস্বরে বললেন, হে ধর্মগুরু, চলুন আমাদের এখনও অনেক পথ যেতে হবে।
উঠে দাঁড়ালেন হিউ-এন-সাঙ। জিজ্ঞাসা করলেন, এই অপরূপ মূর্তি কে নির্মাণ করেছেন ?
পথপ্রদর্শক বললেন, শুনেছি সম্রাট কুমারগুপ্তের সময় হরিবল নামে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ভগবান বুদ্ধের এই বিরাট মূর্তি নির্মাণ করেন।
মনে মনে শিল্পীর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালেন হিউ-এন-সাঙ। কী অসাধারণ এই সৃষ্টি। মূর্তির মুখের এক-এক দিকে এক-এক ভাবের প্রকাশ। চৈত্যের বাইরে আসতেই হিউ-এন-সাঙ দেখলেন এক বৃদ্ধ শ্রমণ সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দু-জনেই দু-জনকে প্রণাম করলেন। শ্রমণ বললেন, আপনি কোথা থেকে এসেছেন ধর্মগুরু ?
নিজের পরিচয় দিলেন হিউ-এন-সাঙ। মুগ্ধবিস্ময়ে বৃদ্ধ শ্রমণ বলে ওঠেন, আপনাকে দর্শন করে আমার জীবন ধন্য হল। আপনি ভগবান তথাগতের করুণা পেয়েছেন, তাই এত দুর্গম পথ পার হয়ে এই ভারতবর্ষে আসতে পেরেছেন। আপনি মহাজ্ঞানী।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি মহাজ্ঞানী নই। জ্ঞানের সন্ধানে ভগবান তথাগতের দেশে এসেছি। আপনি বহুদিন এখানে আছেন, ভগবান বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের বিষয়ে কিছু বলুন।
বৃদ্ধ বললেন, আমি বিদ্যাশিক্ষা করিনি কোনো পুথি পাঠ করতে পারি না। লোকের মুখে সামান্য যা শুনেছি তাই জানি। সেরকম কথা সকলেই জানেন।
বিনম্র কণ্ঠে হিউ-এন-সাঙ বললেন, হয়তো আমি জানি না। আপনি বলুন।
কিছু ভাবলেন বৃদ্ধ। বললেন, চলুন ওই স্তূপের সামনে বসে তথাগতের কথা বলব।
সামান্য দূরেই দুশো ফুট উঁচু অশোক স্তূপ। স্তূপের সামনে শিলাস্তম্ভ। সেই শিলাস্তম্ভের উপর সম্রাট অশোকের শিলালিপি। ভগবান বুদ্ধের মহানির্বাণের কথা লেখা। কিছুক্ষণ সেই লিপির দিকে চেয়ে থাকেন। এই লিপির ভাষা তঁার অজানা। যদি সম্ভব হয় দেশে ফিরে যাবার আগে এই লিপির ভাষা তিনি আয়ত্ত করবেন।
মুখোমুখি বসলেন হিউ-এন-সাঙ আর বৃদ্ধ শ্রমণ। চারিদিকে শালবন। শালফুল বিছিয়ে আছে চারিদিকে। বাতাসে তার মৃদু গন্ধ।
বৃদ্ধ শ্রমণ কিছুক্ষণ চোখ বুজে প্রার্থনা করলেন। হয়তো ভগবানের কাছে আশীর্বাদ চাইলেন। তারপর শান্ত দৃষ্টি মেলে বললেন, ভগবান বুদ্ধ তখন বৈশালীতে রয়েছেন। প্রতিদিন তিনি সেখানকার নগরবাসীদের উপদেশ দেন। ধনী-দরিদ্র জ্ঞানী-মূর্খ সকলেই তঁার ধর্ম-উপদেশ শোনার জন্যে আসেন। একদিন উপদেশ শেষ করে তিনি বিশ্রাম করছেন এমন সময় বৈশালীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নগরনটী আম্রপালী এসে বললেন, প্রভু আমার একান্ত ইচ্ছা আপনি আগামীকাল আমার গৃহে শিষ্যদের নিয়ে আতিথ্য গ্রহণ করুন।
বুদ্ধ প্রসন্ন মুখে বললেন, তুমি প্রস্তুত থেকো, আমি কাল যথা সময়ে তোমার গৃহে যাব।
অল্পক্ষণের মধ্যেই এই সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। নগরের ধনী এক শ্রেষ্ঠী ভগবান বুদ্ধের কাছে এসে বললেন, আপনি কাল আমার গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করুন।
বুদ্ধ বললেন, আগামীকাল আমি আম্রপালীর গৃহে যাব। সে আমাকে পূর্বে নিমন্ত্রণ করে গিয়েছে। তার পরদিন বেলুনগ্রামের দিকে রওনা হব।
শ্রেষ্ঠী বললেন, এক নগরনটীর গৃহে আমন্ত্রণ রক্ষা করার চেয়ে আমাদের গৃহে আমন্ত্রণ রক্ষা কি আরও সন্মানীয় নয় প্রভু ?
বুদ্ধ গম্ভীর মুখে বললেন, আমি বুদ্ধ। সমস্ত পাপ-পুণ্যের বাইরে আমার অবস্থান। যে পরম ভক্তিভরে আমাকে আহ্বান করে, আমি তার কাছেই যাই।
ভগবান বুদ্ধের কাছে ব্যর্থ হয়ে শ্রেষ্ঠী গেলেন আম্রপালীর কাছে। বললেন, তুমি কাল আমাকে প্রভুর সেবা করবার সুযোগ দাও, তার বিনিময়ে তোমাকে অতুল ঐশ্বর্য দেব।
মৃদু হেসে আম্রপালী বললেন, ভগবান বুদ্ধের চেয়ে বড়ো ঐশ্বর্য আমার কাছে কিছু নেই।
পরদিন ভগবান বুদ্ধ শিষ্যদের নিয়ে এলেন আম্রপালীর আম্রকুঞ্জে। পরম ভক্তিভরে তঁাদের সেবা করলেন আম্রপালী। তারপর বুদ্ধের উদ্দেশ্যে বললেন, প্রভু এই আম্রকানন আমি ভিক্ষুসংঘে দান করলাম।
আম্রপালীকে আশীর্বাদ করে বুদ্ধ পরদিন চলে গেলেন বৈশালীর সামান্য দূরে বেলুন গ্রামে। আপাতত সেখানেই বসবাস করবেন। এখানে আসার পর পীড়ায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। শিষ্যরা সকলেই বিচলিত হয়ে পড়ল। প্রভু কি তাদের ত্যাগ করে চলে যাবেন! বুদ্ধ অনুভব করলেন শিষ্যদের উদ্বেলতা। তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, এখনও আমার মৃত্যুর সময় হয়নি।
নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি দিয়ে দেহের ব্যাধিকে জয় করলেন বুদ্ধ। ক্রমশই অনুভব করছিলেন জীবনের অন্তিম পর্ব এসে গিয়েছে। শিষ্য আনন্দকে বললেন, আমার জীবনকাল আর তিন মাস।
প্রভুর কথা শুনে কেঁদে উঠলেন আনন্দ। বললেন, প্রভু জগতের কল্যাণের জন্যে আরও কিছুদিন জীবনধারণ করুন।
বুদ্ধ বললেন, আমার মুখ দিয়ে যে কথা বার হয়েছে তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করা বা খণ্ডন করা উচিত হবে না।
আনন্দ বললেন, আপনার অবর্তমানে কে আমাদের চালিত করবে ?
বুদ্ধ বললেন, আমি তো আমার ধর্মকে কখনো গোপন রাখিনি। যা অনুভব করেছি তাই সকলের কাছে প্রচার করেছি। আমি মনে করি না ভিক্ষুসংঘ আমার আশ্রিত বা আমিই তাদের পরিচালনা করি।

অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বুদ্ধ বললেন, এখন আমি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। শকট পুরোনো হয়ে গেলে যেমন সবসময় তার সংস্কারের প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনিভাবে এখন পরিচালিত করতে হচ্ছে আমার এই জরাজীর্ণ দেহ।
আনন্দ বললেন, যখন আপনি থাকবেন না, কে আমাদের শিক্ষা দেবে ?
বুদ্ধ বললেন, আমি তোমাদের যে-শিক্ষা দিয়েছি আমার অবর্তমানে সেই শিক্ষাই তোমাদের চালিত করবে। কোনো কিছুর জন্যেই অন্যের উপর নির্ভর করবে না। সবসময়ে ধর্মের আশ্রয় নেবে। ধর্মকে ভিত্তি করে নিজের মধ্যে নিজেই দীপ জ্বালাবে। আত্মদীপ ভব। আত্মপ্রতিষ্ঠ হও, আত্মশরণ হও।
বর্ষাকাল শেষ হয়ে এসেছিল। আকাশে-বাতাসে শরতের মধুর আবেশ। এবার বৈশালীর বেলুন গ্রাম ত্যাগ করার সময় হয়েছে। তিনি এলেন মহাবনস্থ কুটাগরশালায়। আনন্দকে বললেন, তুমি সকল ভিক্ষুকে সংবাদ দাও তারা যেন এখানে এসে উপস্থিত হয়।
সকলে এসে উপস্থিত হতেই বুদ্ধ তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, যে ধর্ম আমি নিজে উপলব্ধি করেছি তাকে আমি তোমাদের মধ্যে প্রচার করেছি। সেই ধর্মই তোমরা পালন করবে। সেই আদর্শকে জগতের কল্যাণে তোমাদের নিজের জীবনে পালন করবে। এই বিশ্বের সব কিছুই অনিত্য। চারপাশের যা-কিছু দেখছ, তার কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। তোমাদের সকল কাজ যেন হয় এই জগতের কল্যাণে, মানুষের মঙ্গলের জন্যে।
গম্ভীর স্বরে উচ্চারণ করলেন,
পরিপক্কো বষো মষহৎ পরিত্তং মম জীবিতং/পহাষ বো গমিসসামি কতং মে সংনমত্তসো।/অপপমত্তা সতিমন্তো সুশীলা হোথ ভিকখবো/সুসমাহিত সঙ্কপপা সচিত্র মনুরকখথ।/যোইমসসিং ধর্ম্মবিনয়ে অপপমত্তো বিহেসসতি/ পহাষ জাতি সংসারং দুকখসন্তং করিসসতি।
(হে ভিক্ষুগণ, এখন আমার বয়স হয়েছে আয়ুও শেষ হয়েছে, এবার তোমাদের ছেড়ে চলে যাব। পরম আশ্রয় আমি তোমাদের জন্যে গড়ে তুলেছি। তোমরা অপ্রমত্ত স্মৃতিমান ও সুশীল হও এবং সৎ সঙ্কল্পরত সুসমাহিত থেকে নিজ চিত্তকে অনুসরণ করো। যে কেউ এই ধম্মশাসনে অপ্রমত্ত হয়ে চলবে সে জন্ম-জন্মান্তর পরিভ্রমণ থেকে মুক্তিলাভ করবে।)
ভিক্ষুদের উপদেশ দিয়ে বুদ্ধ বললেন, আনন্দ এবার চলো আমরা পাবার দিকে যাত্রা করি।
ছোট্ট নগর পাবা। সেখানে এক আম বাগানে সকলের বিশ্রামের আয়োজন করা হল। সেই বাগানের মালিক ছিলেন কর্মকার চুন্দ। ভগবান তার বাগানে রয়েছেন জানতে পেরে আনন্দে ছুটে এলেন। বুদ্ধের চরণবন্দনা করে বললেন, প্রভু আজ সকলে আমার গৃহে আহার করবেন।
বুদ্ধ মৃদু হেসে সম্মতি দিলেন।
গৃহে ফিরেই চুন্দ নানান খাবারের আয়োজন করলেন। তার মধ্যে ছিল শূকর মদ্দব। (এই বস্তুটি নিয়ে নানান বিতর্ক রয়েছে। কারও কারও মনে এটি শূকরের মাংস। অন্য মতে বিশেষ ধরনের উদ্ভিদের রস থেকে প্রস্তুত পানীয়। তবে আপাতদৃষ্টিতে শূকর মদ্দব বলতে শূকরের মাংস বলে মনে হয়। তবে পালি ভাষায় মাংসকে মদ্দব বলা হয় না। এ কালের বহু পণ্ডিতের ধারণা ভগবান বুদ্ধ অসুস্থ দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তাই তঁার শরীর সুস্থ করে তোলবার জন্যে একরকম উত্তেজক খাদ্য প্রস্তুত করেছিলেন চুন্দ। এই ধরনের খাদ্য প্রস্তুত করা যথেষ্ট ব্যয়সাধ্য ছিল। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা ছিলেন নিরামিষভোজী। হত্যা করা কোনো পশুর মাংস তঁারা খেতেন না। কর্মকার চুন্দ ছিলেন বুদ্ধের পরম ভক্ত, নিজেও বৌদ্ধ ধর্মের উপাসক। তিনি নিজের গৃহে ভগবান বুদ্ধকে আমন্ত্রণ করে শূকরের মাংস খেতে দেবেন একথা বিশ্বাস করবার কোনো কারণ নেই।)
চুন্দ বললেন, এই বিশেষ খাবারটি আমি আপনার জন্যে প্রস্তুত করেছি। এতে আপনার শরীরের দুর্বলতা দূর হবে।
কিছু ভাবলেন বুদ্ধ। তারপর বললেন, তুমি আমার জন্যে যে-খাদ্য প্রস্তুত করেছ তা আমি গ্রহণ করছি। এই খাদ্য আর কাউকে দেবে না। অবশিষ্ট যা থাকবে মাটিতে পুঁতে দেবে।
আহারের অল্পক্ষণ পরেই বুদ্ধের রক্ত-আমাশা শুরু হয়ে গেল। তার সঙ্গে প্রবল বেদনা। একটি বারের জন্যেও তা মুখে প্রকাশ করলেন না। শুধু শিষ্যদের বললেন, কুশীনগর চলো।
অবসন্ন শরীর। এক গাছের তলায় বসে পড়লেন বুদ্ধ। বললেন, আনন্দ আমার বড়ো তেষ্টা পেয়েছে। কাছেই একটি নদী রয়েছে। তুমি সেখান থেকে আমার জন্যে পানীয় জল নিয়ে এসো।
আনন্দ বললেন, প্রভু অল্পক্ষণ আগেই দেখলাম প্রায় পাঁচশো গোরুর গাড়ি ওই নদীর দিকে যাচ্ছে। ওরা নদী পার হলে নদীর জল কাদা হয়ে যাবে।
বুদ্ধ বললেন, আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না। তুমি এখনই গিয়ে জল নিয়ে এসো।
আনন্দ নদীর তীরে যেতেই দেখলেন কাচের মতো স্বচ্ছ জল বইছে। বুঝলেন এ সবই ভগবান বুদ্ধের মহিমা।
জল খেয়ে বিশ্রাম করছেন বুদ্ধ। এমন সময় সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন পুক্কুস। তিনি ছিলেন কালাম ঋষির উপাসক। বুদ্ধকে দেখে কাছে এগিয়ে এসে প্রণাম করলেন। বললেন, প্রভু ধ্যান কী, জানতে চাই।
বুদ্ধ তঁাকে শুধু ধ্যানের কথা নয় আরও বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে আরম্ভ করলেন। পুক্কুস উপলব্ধি করলেন তিনি এক মহামানবের সামনে এসেছেন। মনে হল জীবনের এই পরম মুহূর্তটিকে বিনষ্ট করা উচিত নয়। বুদ্ধের পায়ে মাথা রেখে তঁার শরণ নিলেন। বুদ্ধ তঁাকে দীক্ষা দিলেন।
পুক্কুসের কাছে দুটো সোনার জরির কাজ-করা পোশাক ছিল। সে দুটিই তিনি বুদ্ধকে দান করলেন। বললেন, প্রভু আপনি যদি এই পোশাক দেহে ধারণ করেন আমার জীবন ধন্য হয়ে যাবে।
শিষ্যের কাতর অনুরোধে বুদ্ধ সেই পোশাক পরতেই সকলে মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখল ভগবান তথাগতের দেহ থেকে এক উজ্জ্বল আভা বেরিয়ে এল। তার সামনে সেই স্বর্ণময় পোশাকের সব দ্যুতি ম্লান হয়ে গেল।
আনন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, প্রভু আপনার দেহে কীসের এই জ্যোতি ?
বুদ্ধ বললেন, যখন কেউ বোধিলাভ করে বুদ্ধত্ব অর্জন করে, আর যখন মরজগৎ ত্যাগ করে অমৃতলোকে যাত্রা করবার সময় হয়, তখনই তথাগতের দেহ থেকে এই দিব্যপ্রভা বার হয়।
দিন ফুরিয়ে এসেছিল। বুদ্ধ বললেন, চলো এখানে আর বিলম্ব করে লাভ নেই।
কিছু দূরেই স্বচ্ছতোয়া কুকুধা নদী। পায়ে হেঁটেই নদী পারাপার করা যায়। বুদ্ধ তার তীরে একটা পাথরের উপর বসে স্নান করলেন। নদীর ওপারে আম্রকানন। নদী পার হয়ে সেই কাননে প্রবেশ করলেন সকলে। চারিদিকে বনের নির্জনতা। দূর থেকে কোনো পাখির ডাক ভেসে আসছে। ক্রমশই অবসন্ন হয়ে আসছিল বুদ্ধের শরীর। একবার চারদিকে তাকালেন তিনি। হঠাৎ তঁার দৃষ্টি পড়ল চুন্দর দিকে। সকলের পিছনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। অনুভব করলেন তঁার অন্তরের যন্ত্রণা। বললেন, চুন্দ এই ভূমির উপর কিছু পেতে দাও, আমি বিশ্রাম করব।
চুন্দ তাড়াতাড়ি তঁার গায়ের বহুমূল্য চাদর মাটির উপরে বিছিয়ে দিলেন। বুদ্ধ সেখানে শুয়ে বললেন, আনন্দ আমি যখন থাকব না হয়তো তোমাদের মধ্যে কেউ বলবে চুন্দর ঘরের খাবার খেয়ে তথাগত অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন তুমি বলবে, চুন্দর পরম সৌভাগ্য যে স্বয়ং ভগবান তথাগত শেষ আহার তার কাছ থেকেই গ্রহণ করেছেন। একথাও বলবে, তথাগতকে দুটি আহার দানের ফল একই হয়। যখন তিনি বোধিত্ব লাভ করেন আর যখন তিনি মহানির্বাণের পথে যাত্রা করেন। বুদ্ধত্ব লাভের সময় তিনি সুজাতার কাছে পায়েস খেয়েছিলেন, আর অন্তিম আহার গ্রহণ করলেন কর্মকার চুন্দের গৃহে। দু-জনেই সমান সৌভাগ্যবান।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সকলে এগিয়ে চললেন কুশীনগরের দিকে। পথে হিরণ্যবতী নদী। নদী পার হয়ে মল্লদের সীমানা শুরু হয়েছে। সকলেই উদগ্রীব, প্রভু আর কত দূর যাবেন। সামনেই শালবন শুরু হয়েছে। দুটি বিশাল শাল গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মনে হচ্ছে তারা যেন রাজছত্র ধরে রয়েছে। বুদ্ধ গম্ভীর মুখে বলে উঠলেন, এখানেই আমার শেষ শয্যা পেতে দাও।
মুহূর্তে সকলের বুকের মধ্যে বেদনার ঢেউ ওঠে। প্রভু এবার তাদের কাছ থেকে বিদায় নেবেন। চারদিক পরিষ্কার করে শাল গাছের নীচে শয্যা পেতে দেওয়া হল। সেখানে ধীরে ধীরে নিজের অবসন্ন দেহ মেলে দিলেন বুদ্ধ।
দিন ফুরিয়ে সন্ধে নামে। আকাশে বৈশাখী পূর্ণিমার গোল চাঁদ। তার আলোয় সমস্ত বনভূমি প্রকৃতি নদীতট মাঠঘাট প্রান্তর আলোকময় হয়ে উঠেছে। মনে হয় যেন এক স্বর্গীয় পরিমণ্ডল। বুদ্ধ মৃদুস্বরে বললেন, এক বৈশাখী পূর্ণিমায় আমি মর্তভূমে এসেছিলাম। আর এক বৈশাখী পূর্ণিমায় আমি সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে বুদ্ধত্ব অর্জন করেছি। আজ সেই বৈশাখী পূর্ণিমায় আমি পরিনির্বাণের পথে চলেছি।
ভগবান বুদ্ধ এই মরজগৎ ত্যাগ করে চলেছেন। চারিদিকে এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল। মল্লরা দলে দলে এসে ভিড় করতে আরম্ভ করল। সেইসময়ে সেখানে এসে পড়লেন কুশীনগরবাসী একজন। নাম সুভদ্র। ধর্মের বহু বিষয় নিয়ে তঁার মধ্যে বহুদিন ধরেই সংশয় ছিল। কারও কাছেই সে-সংশয়ের নিবারণ করতে পারেননি। যখন শুনলেন বুদ্ধ এই কুশীনগরেই এসেছেন এবং রাত্রির শেষ প্রহরে মহাপরিনির্বাণ লাভ করবেন। তিনি আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করলেন না। বুদ্ধ যেখানে রয়েছেন সেখানে এসে বললেন, আমি ভগবান বুদ্ধের সাক্ষাৎপ্রার্থী। তখন বুদ্ধের দেখাশোনার সব ভার আনন্দর উপর। আনন্দ বললেন, প্রভু এখন বিশ্রাম করছেন। তঁার বিশ্রামের বিঘ্ন করা যাবে না।

সুভদ্র বারংবার অনুরোধ করতে থাকেন। বুদ্ধ শুনতে পেলেন তঁার কণ্ঠস্বর। তিনি আনন্দকে ডেকে বললেন, ওকে আমার কাছে আসতে দাও। আমি ছাড়া কেউ ওর জ্ঞানপিপাসা তৃপ্ত করতে পারবে না।
সুভদ্র এলেন। প্রণাম করলেন শায়িত বুদ্ধকে। তারপর একে একে প্রশ্ন করলেন। শান্তভাবে তঁার সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন বুদ্ধ। তারপর উদাত্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন :
জীবন হল এক যাত্রা
মৃত্যু হল জীবনে ফেরা,
এ বিশ্ব যেন এক পান্থশালা
বহতা বাতাস যেন এক ধূলিকণা।
মনে রেখো জগৎ মায়াময়,
ভোরের শুকতারা সম পুবে মিলায়
গ্রীষ্মের আকাশে যেন বিদ্যুতের চমক
এ জীবন এক কম্পমান শিখা,
শুধু এক স্বপ্ন।
নিজের অন্তরে তৃপ্ত হলেন সুভদ্র। তারপর দীক্ষা নিলেন বুদ্ধের কাছে। তঁার অন্তর জ্ঞানের আলোয় ভরে উঠল।
রাত ক্রমশই শেষ হয়ে আসছিল। বুদ্ধ ভিক্ষুদের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমাদের কারও মনে যদি ধর্ম সম্পর্কে কোনো সংশয়, কোনো জিজ্ঞাসা থাকে প্রশ্ন করতে পারো। যাতে ভবিষ্যতে তোমাদের মনে কোনো অনুতাপ না হয় এই কথা তথাগতের কাছ থেকে আমাদের জানা হয়নি।
কেউ কোনো কথা বলল না। উপস্থিত সকল ভিক্ষু নীরব হয়ে থাকে। আবার একই কথা বললেন বুদ্ধ। এবারও কারও মুখে কোনো কথা নেই। তিন বার প্রশ্ন করলেন বুদ্ধ। সকলেই নীরব। আনন্দ বললেন, প্রভু এই বিরাট সংঘের মধ্যে এমন এক জনও নেই যার অন্তরে আপনার পথ মত বিষয়ে কোনো সংশয় আছে।
বুদ্ধ ধীর কণ্ঠে ভিক্ষুদের উদ্দেশ্যে বললেন, হে ভিক্ষুগণ, আমার কথা মনে রাখবে, এ জগতে সব মিশ্র বস্তুর মধ্যেই নিহিত আছে তার ধ্বংসের কারণ। সুতরাং চুড়ান্ত মুক্তি বা নির্বাণের জন্যে পরিশ্রম করে যাও।
ভগবান বুদ্ধের এটিই অস্তিম বাণী। এর পর আর বুদ্ধের কণ্ঠে কোনো শব্দই শোনা গেল না। একটু একটু করে সমাধিতে মগ্ন হয়ে গেলেন। তঁার শরীর নিস্পন্দ হয়ে গেল।
আনন্দ, বুদ্ধের এই অবস্থা দেখে অনিরুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করলেন, প্রভু কি পরিনির্বাণ লাভ করেছেন ?
অনিরুদ্ধ বললেন, তিনি এখন ধ্যানের একটির পর একটি স্তর অতিক্রম করছেন।
রাত্রি শেষ হয়ে আসে। আকাশ বাতাস বিশ্বচরাচর স্তব্ধ নীরবতায় মগ্ন হয়ে রয়েছে। তারাও যেন প্রতীক্ষা করছে মহামানবের মহাসমাধির। অনিরুদ্ধ স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিলেন বুদ্ধের দিকে। হঠাৎ অনুভব করলেন এক মহা নিস্তব্ধতা। বুঝতে পারলেন মহাপরিনির্বাণ হয়েছে ভগবান তথাগতের।
আনন্দ উচ্চস্বরে কেঁদে উঠলেন, প্রভু আর আমাদের মধ্যে নেই।
কেঁদে উঠল ভিক্ষুরা। প্রভু নেই।
অনিরুদ্ধ বললেন, কে বলেছে ভগবান তথাগত আমাদের মধ্যে নেই। তঁার কোনো মৃত্যু নেই। তিনি এই জড় চৈতন্যের স্তর থেকে অনন্ত মহা চৈতন্যের স্তরে গিয়েছেন মাত্র। তিনি চির আনন্দের জগতে বিলীন হয়ে গিয়েছেন।
দীর্ঘক্ষণ ভগবান বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের কথা বলে নীরব হলেন বৃদ্ধ শ্রমণ। স্থির শান্ত হয়ে ছিলেন হিউ-এন-সাঙ। তঁার মনে হচ্ছিল তিনি যেন কারও কথা শুনছেন না, চোখের সামনে একের-পর-এক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ভগবান বুদ্ধের অন্তিম সংস্কার কোথায় করা হয় ? বৃদ্ধ বললেন, এখান থেকে সামান্য দূরে নদীর তীরে সুগন্ধি কাঠে ভগবান তথাগতের অন্তিম সংস্কার করা হয়। সেখানে স্মারক স্তূপ রয়েছে। আজও সেই জায়গার মাটি কালো রঙের ভস্ম ও কাঠকয়লা মেশানো। বলা হয় কেউ যদি পূর্ণ বিশ্বাস আর শ্রদ্ধা নিয়ে প্রার্থনা জানায় তাহলে আজও সে ভগবান বুদ্ধের কোনো-না-কোনো স্মারক খুঁজে পায়। সেখানেও সম্রাট অশোক স্তূপ নির্মাণ করেন।
বেলা পড়ে এসেছিল। পথপ্রদর্শক বললেন, আর অপেক্ষা করলে বিলম্ব হবে। এখনও বেশ কিছু পথ যেতে হবে। উঠে দাঁড়ালেন হিউ-এন-সাঙ। বৃদ্ধকে করজোড়ে প্রণাম করলেন। এগিয়ে চললেন রাতের আশ্রয়ের সন্ধানে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন