চঞ্চলকুমার ঘোষ
হিউ-এন-সাঙ ফিরে চলেছেন স্বদেশে। পনেরো বছর অাগে যে দিন যাত্রা শুরু করেছিলেন সে দিন ছিলেন একা। নিঃসঙ্গ। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। প্রতি পদক্ষেপে ছিল উদ্বেগ, অাশঙ্কা অার মৃত্যুর পদধ্বনি। কি হবে কিছুই জানা ছিল না। শুধু ছিল গভীর বিশ্বাস। ভগবান বুদ্ধ অাছেন। তিনিই পথ দেখাবেন। এক মুহূর্তের জন্যেও সে বিশ্বাস থেকে টলেননি হিউ-এন-সাঙ। তাই হয়তো করুণার ধারায় ভাসিয়ে দিয়েছেন ভগবান বুদ্ধ।
এক বছর অাগে ভারতবষের সীমানা পার হয়েছেন। যে পথ ধরে একদিন গিয়েছিলেন সেই একই পথ। সর্বত্র সম্মান অার শ্রদ্ধা। কত মানুষ তঁার সঙ্গী। তারা নিয়ে চলেছে নানান উপহার, অসংখ্য মূর্তি। ভগবান বুদ্ধের দেহাবশেষ, বেশ কয়েকশো পুথি।
দীর্ঘ পথশ্রমে সামান্য ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন হিউ-এন-সাঙ। মাঝে মাঝেই পথপ্রদর্শককে প্রশ্ন করেন, অার কতদূর অআমার স্বদেশ ভূমি?
‘অামরা এসে গিয়েছি ধর্মগুরু। এই মরু প্রান্তর পার হলেই চিনের সীমান্ত।’
অাবার সেই মরু প্রান্তর। কত দিন অাগের কথা। তবুও চোখ বুজলে সব দেখতে পান। কী ভয়ংকর ছিল সেই পথ। এক ফেঁাটা জল নেই। অাগুন ঝরা সূর্যের তাপে সমস্ত শরীর যেন জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছিল। বার বার মনে পড়ে সেই ঘোড়াটার কথা। সেদিন মরুভূমির পথে তঁার একমাত্র সঙ্গী। অাজ ঘোড়ায় টানা রথে করে চলেছেন। দিনের বেলায় তঁাবু খাটিয়ে সকলে বিশ্রাম করেন। গোটা রাত এগিয়ে চলেন। সঙ্গে পর্যাপ্ত জল, খাবার। কোনো কিছুরই অভাব নেই। নিজের সুখ ক্ষুধা তৃষ্ণার কথা ভাবেন না হিউ-এন-সাঙ। মাঝে মাঝেই মনে হয় সম্রাটের অাদেশ উপেক্ষা করে তিনি ভারতবর্ষে গিয়েছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই রুষ্ট হয়েছেন। যদি কোনো শাস্তি দেন মাথা পেতে নেবেন। সবই ভগবান তথাগতের ইচ্ছা।
নিজের তঁাবুতে বসে প্রজ্ঞাপারমিতার মন্ত্র জপ করছিলেন। কারো পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকালেন। হুই লি এসেছে। সদ্য কৈশোর অতিক্রম করেছে। ইশিককুল থেকে তঁার সর্বক্ষণের সঙ্গী। ছেলেটির মধ্যে জ্ঞানের তীব্র পিপাসা রয়েছে। সেই কারণে তাকে ভালোবাসেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কী হয়েছে হুই লি ?
‘পথপ্রদর্শক বলল অার দু-এক দিনের মধ্যেই চিন সীমান্তে পৌঁছে যাব।’
‘তারপর তুমি কি ইশিককুল ফিরে যাবে? িজজ্ঞাসা করলেন হিউ-এন-সাঙ।’
তাড়াতাড়ি হুই লি বলে ওঠে, অামি সমস্ত জীবন অাপনার সেবা করতে চাই।
হিউ-এন-সাঙ-এর মুখে হাসি ফুটে উঠল। বললেন, ভগবান তথাগতের অাশীর্বাদে অামি যতদিন সক্ষম থাকব কারো সেবার প্রয়োজন হবে না। তবে তুমি অামাকে একটা কাজে সাহায্য করতে পার। সংস্কৃত অার পালি ভাষায় লেখা যেসব পুথি ভারতবর্ষ থেকে নিয়ে এসেছি তার অনুবাদ করতে চাই।
‘অামি সংস্কৃত, পালি কোনোটাই জানি না।’
‘অামি তোমাকে শিক্ষা দেব।’
হুই লির চোখে মুখে অানন্দের উচ্ছ্বাস ফুটে উঠল। হিউ-এন-সাঙ-এর সামনে নতজানু হয়ে বলল, অামি অাপনার সমস্ত কাজের সঙ্গী হয়ে থাকব।
হুই লি-র মাথায় হাত রাখলেন হিউ-এন-সাঙ। প্রসন্ন কণ্ঠে বললেন, কোনো কাজই অামার নয়। সবাই ভগবান তথাগতের। তিনি অামাকে যে পথ দেখিয়েছেন অামরা সেই পথ ধরেই এগিয়ে যাব।
এগিয়ে চলে শোভাযাত্রা। মরুভূমির পথ শেষ হয়ে অাসে। মাঝে মাঝেই বিবর্ণ গুল্ম, কঁাটাগাছ চোখে পড়ে। কিছু ভাবলেন হিউ-এন-সাঙ। একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, যদি অাজ অামরা সমস্ত দিন পথ চলি ?
‘তাহলে কাল সূ্র্যোদয়ের অাগেই চিনের সীমান্তে পৌঁছে যাব।’
অার অপেক্ষা করতে চাইছিলেন না হিউ-এন-সাঙ। উদবেিলত কণ্ঠে বললেন, তাহলে এগিয়ে চল।
সমস্ত রাত সকলে পথ চলেছে। এতটুকু বিশ্রাম নেয়নি। বেলা বাড়ে। রোদের তাপ প্রখর হয়। রুক্ষ প্রান্তর। মরুভূমির মতো ভয়ংকর প্রকৃতি না হলেও পথ চলতে কষ্ট হয়। চলার গতি ধীর হয়ে অাসে। সূর্য মাথার ওপর। কয়েকজন ক্লান্ত হয়ে মাটির উপরেই বসে পড়ে। থমকে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। মুহূর্তে মনে হল এ কি করেছেন তিনি। মাতৃভূমিতে পৌঁছোবার তীব্র অাকাঙ্ক্ষায় সঙ্গীদের কষ্ট িদচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, এই প্রখর রোদে পথ চলা সম্ভব নয়। কোথাও বিশ্রামের অায়োজন কর। সূর্য অস্ত গেলে অামরা যাত্রা করব।
সামান্য দূরেই এক সার খেজুর গাছ। ছোটো বড়ো কিছু পাথর ছড়িয়ে রয়েছে। সেখানেই সকলে বসে পড়ে। পাথরের ফঁাকে অল্প অল্প ছায়া। অনেকে সেখানেই শুয়ে পড়ে। পথশ্রমের ক্লান্তিতে অল্পক্ষণেই ঘুমিয়ে পড়ে। দিন শেষ হয়। সূর্য পশ্চিমাভিমুখী হতে থাকে। রোদের তেজ কমে। মাথার উপর নীল অাকাশ সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। বাতাসের বেগ বাড়ে। দিনের অালো ফিকে হয়ে অাসে। অার অল্পক্ষণেই রাত নামবে।
প্রায় সকলেই ঘুমিয়ে অাছে। গভীর এক প্রশান্তি কুয়াশার মতো অাচ্ছন্ন করে রেখেছে সমস্ত প্রান্তর। দূর থেকে কোনো পাখির ডাক ভেসে অাসছে। তার সুর অমৃতধারার মতো ছড়িয়ে পড়ছে। নিজের তঁাবু থেকে বেরিয়ে অাসেন হিউ-এন-সাঙ। অাকাশে অালো অঁাধািরর খেলা। সেইদিকে তাকিয়ে কিছু প্রার্থনা করলেন। তারপর ডাক দিলেন, উঠে পড় সকলে।
অল্পক্ষণেই সকলে ঘুম থেকে উঠে পড়ে। অাবার যাত্রা শুরু হয়। রাত গভীর হয়। তারায় তারায় ভরা অাকাশ দূরে যেন মাটির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝে পথপ্রদর্শক বলে ওঠে, অামরা এসে গিয়েছি অার বেশি দূর নেই।
চলার গতি বাড়ে।
কেমন যেন অানমনা হয়ে যান হিউ-এন-সাঙ। ষোলো বছর অাগে একদিন এই পথ দিয়ে ভারতবর্ষে গিয়েছিলেন অথচ মনে হয় হচ্ছে সে দিনের কথা। সময় বড়ো দ্রুত বয়ে যায়।
রাত গড়িয়ে চলে। অাকাশের তারার অালো যেন মাটিতে ছাড়িয়ে পড়ে। নিস্তব্ধতার মধ্যে শুধু মানুষ অার রথের চলার শব্দ। মাঝে মাঝে হিউ-এন-সাঙ শিশুর মতো প্রশ্ন করেন, অার কত দূর?
পথপ্রদর্শক অনুভব করে তঁার অন্তরের ব্যাকুলতা। ‘অামরা এসে গিয়েছি ধর্মগুরু। অার কয়েক লি পথ পার হলেই চিনের প্রাচীর। অামি অাগেই একজনকে পাঠিয়ে দিয়েছি। সীমান্তের প্রহরীরা এতক্ষণ নিশ্চয়ই অাপনার সংবাদ পেয়ে গিয়েছে।’
অার কোনো কথা বললেন না হিউ-এন-সাঙ।
মিছিল এগিয়ে চলে। পূব অাকাশে ক্ষীণ অালোর রেখা। দূরে অস্পষ্ট কিছু চোখে পড়ে। কয়েকজন চিৎকার করে ওঠে, ওই তো মহা প্রাচীর।
হিউ-এন-সাঙ কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকেন। তঁার দুই চোখ বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ে। ক্রমশই স্পষ্ট হয় প্রাচীর। সামনে বিরাট ফটক। পথপ্রদর্শক বলে ওঠে, ধর্মগুরু অামরা সীমান্তের পঞ্চম দুর্গে এসে পৌঁছেছি।
পূর্বের অাকাশ অালোকমায়া ভরে উঠেছে। পথ শেষ। অাচমকা সামরিক বাহিনীর বিউগল বেজে ওঠে। কয়েকশো হাত দূরে বিরাট ফটক একটু একটু করে খুলে যায়। সার বেঁধে দঁাড়িয়ে অাছে সৈনিকরা। হিউ-এন-সাঙকে দেখামাত্রই অাকাশ বাতাস মুখরিত করে ধ্বনি ওঠে, ধর্মগুরুর জয়। ধর্মগুরুর জয়।
বিহ্বল হয়ে যান হিউ-এন-সাঙ। একদিন অবরুদ্ধ ছিল এই ফটক। অাজ সেখানেই সকলে তঁাকে স্বাগত জানাচ্ছে। ফটকের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। কতদিন পর অাবার মাতৃভূমির স্পর্শ। অল্পক্ষণ বিহ্বল হয়ে দঁাড়িয়ে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে ভূমিতে নিজেকে মেলে দিলেন।
চারপাশে জয়ধ্বনি, বাজনার শব্দ। কোনো কিছুই যেন তিনি অার শুনতে পাচ্ছেন না। সমস্ত চেতনা জুড়ে এক স্বপ্নের ঘোর। একদিন যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন চাঙ ইয়াং বিহারে। এক জ্যোতির্ময় পুরুষ চলেছেন। যেখানেই তঁার পা পড়ছে সেখানেই অালোর রেণু ছড়িয়ে পড়ছে। সেই অালোর পথ ধরে তিনিও গিয়েেছন বামিয়ান থেকে বুদ্ধগয়া, কপিলাবস্তু থেকে কুশীনগর। রাজগৃহ থেকে নালন্দায়। যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই জ্ঞানের অালোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে তঁার অন্তর। অার কোনো দুঃখ নেই। কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। শুধু প্রার্থনা তোমার অালোয় অালোকময় হয়ে উঠুক অামার স্বদেশবাসী।
ধীরে ধীরে উঠে বসলেন হিউ-এন-সাঙ। মুখ তুলে অাকাশের দিকে তাকালেন। সমস্ত অাকাশ জুড়ে অালোর বন্যা। তিনি এসেছেন। তঁার অদৃশ্য উপস্থিতি জেগে উঠেছে অাকাশে, বাতাসে, প্রতিটি ধুলোকণায়, চারপাশের প্রতিটি মানুষের মধ্যে।
গভীর এক অানন্দের অনুভূতিতে অন্তর থেকে বঁাশির সুরের মতো এক ধ্বনি ভেসে অাসে, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক প্রভু।
বাতাসে তখন তঁার জয়ধ্বনি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন