অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী

চঞ্চলকুমার ঘোষ

কনৌজ থেকে যাত্রা শুরু করলেন হিউ-এন-সাঙ। এবার গন্তব্যস্থল অযোধ্যা। প্রাচীন নাম শাকেত। চিনা ভাষায় অযোধ্যার নাম অ-ইউ-তে। শ্রীরামের জন্মভূমি অযোধ্যা তাই হিন্দুদের কাছে এক পবিত্র তীর্থ। হিউ-এন-সাঙ অযোধ্যায় এসেছিলেন কারণ এখানেই ছিল মহাযানী পণ্ডিত বসুবন্ধুর কর্মক্ষেত্র।

হিউ-এন-সাঙ-এর জন্মের দুশো বছর আগে বসুবন্ধু গান্ধার প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, পরে তিনি অযোধ্যায় আসেন। প্রথমে বসুবন্ধু ছিলেন হীনযানী মতে বিশ্বাসী। তিনি হীনযানী দর্শনের উপর অভিধর্মকশশাস্ত্র নামে বিরাট এক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। হিউ-এন-সাঙ চিনা ভাষায় তার অনুবাদ করেন। বৌদ্ধ ধর্মের বহু গ্রন্থের মতো এই বইটিও পাওয়া যায় না। একমাত্র পাওয়া যায় হিউ-এন-সাঙ চিনা ভাষায় যে অনুবাদ করেছিলেন সেই গ্রন্থটি।

বসুবন্ধু পরবর্তীকালে অযোধ্যায় আসেন। গুরু মৈত্রেয়নাথের মহাযান মত গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে বসুবন্ধু মহাযানী যোগাচার মত স্থাপন করেন।

হিউ-এন-সাঙ সঙ্গীদের নিয়ে অযোধ্যা নগরে প্রবেশ করলেন। তখন শীতকাল। ফল-ফুল-শস্যে ভরে আছে চারদিক। মনোরম আবহাওয়া। দুই সম্প্রদায়ের মানুষই এখানে রয়েছেন।

হিউ-এন-সাঙ-এর আগমনবার্তা পেয়ে সকলে তঁাকে স্বাগত জানায়। একটি বিহারে তঁার থাকার ব্যবস্থা করা হল। সেই বিহারের প্রধান ভিক্ষু নিজেই তঁার বিশ্রামের আয়োজন করলেন। সকলের এই আন্তরিকতাটুকু ভালো লাগে হিউ-এন-সাঙ-এর। তিনি বললেন, আমি মহাজ্ঞানী বসুবন্ধুর বিষয়ে জানবার জন্যে এখানে এসেছি। আমি তঁার দার্শনিক মতবাদে গভীরভাবে বিশ্বাস করি। শুনেছি এখানে তঁার দীর্ঘজীবন কেটেছিল।

প্রধান ভিক্ষু বললেন, আপনি ঠিকই শুনেছেন। তাই মহাগুরুর স্মৃতিবিজড়িত বহু স্থান আজও এখানে রয়েছে। এখন বিশ্রাম করুন। আগামীকাল আমরা সেই পবিত্র স্থান দর্শন করব।

পরদিন সকালে বের হলেন হিউ-এন-সাঙ। সঙ্গী প্রধান ভিক্ষু ও আরও কিছু বৌদ্ধ শ্রমণ। নগরের উত্তরে বিশাল এক বিহার। বেশিরভাগ অংশই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। প্রধান ভিক্ষু বললেন, এই পবিত্র স্থানে ভগবান বুদ্ধ তিন মাস ছিলেন। শুধু শিষ্য নয়, নগরের মানুষদের কাছেও তঁার ধর্ম-উপদেশ দিতেন। তঁারই স্মরণে সম্রাট অশোক এখানে দুশো ফুট উঁচু এক স্তূপ নির্মাণ করেন।

সেখানে প্রার্থনা করে কিছুক্ষণ ধ্যানস্থ হয়ে রইলেন হিউ-এন-সাঙ। ভগবান বুদ্ধের স্পর্শ বিজড়িত পবিত্র ভূমি। মনের মধ্যে এক অপূর্ব আনন্দ জাগে। দীর্ঘক্ষণ সেখানে বসে থাকেন, বেলা বাড়ে।

প্রধান ভিক্ষু বললেন, এবার আমরা বসুবন্ধুর ধর্মবিহারে যাব। সকলেই পদব্রজে এগিয়ে চলেন। অনেকখানি পথ। পথে আরও কিছু বৌদ্ধ শ্রমণ সঙ্গী হন। সকলেই হিউ-এন-সাঙ-এর সন্নিধ্যটুকু পেতে চান। জানতে চান তঁার দীর্ঘ ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা।

নগরের আরেক প্রান্তে বিশাল আমের বাগান। কোনো কোলাহল নেই। শান্ত পরিবেশ। এই বাগানের মাঝখানে এক বিহারের ভগ্নস্তূপ। প্রধান ভিক্ষু বললেন, এইখানে ছিল বসুবন্ধুর সাধনাক্ষেত্র। তঁাকে নিয়ে নানান কাহিনি রয়েছে।

একটি পাথরের উপর বসলেন সকলে। হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি সেই কাহিনি শুনতে চাই।

প্রধান ভিক্ষু বললেন, বসুবন্ধুর এক ভাই ছিলেন অসঙ্গ। তিনিও ছিলেন মহাজ্ঞানী ধার্মিক। ভগবান বুদ্ধের কোনো এক জন্মে দুই ভাই ছিলেন তঁার একান্ত সঙ্গী। একবার তিন জনের মধ্যে কথা হয়েছিল মৃত্যুর পর যিনি প্রথম স্বর্গে যাবেন তিনি স্বর্গ থেকে পরে ফিরে এসে অন্যদের কাছে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলবেন। সকলেই স্বর্গে গিয়ে সেকথা ভুলে গিয়েছিলেন। বহু জন্ম পর বসুবন্ধু ও অসঙ্গ যখন পৃথিবীতে বাস করছেন, তখন তঁাদের পূর্বকথা স্মরণ হল। কিন্তু স্বর্গবাসের সব কিছুই তঁারা বিস্মৃত হয়েছেন। মনে হল ভগবান বুদ্ধ স্বর্গে রয়েছেন, যদি তঁার স্মরণ নেওয়া যায় একমাত্র তবেই স্বর্গবাসের অভিজ্ঞতার কথা জানা যাবে। সাধনায় বসলেন বসুবন্ধু। রাতের গভীরে তিনি ধ্যানযোগে স্বর্গে যেতেন, বুদ্ধের কাছে যা শিক্ষা পেতেন তা সংগ্রহ করে রচনা করলেন যোগাচার ভূমি শাস্ত্র ।

হিউ-এন-সাঙ জানতেন মানুষের লৌকিক বিষয়ের চেয়ে অলৌকিক বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ বেশি। তাই কোনো প্রতিবাদ করলেন না।

অল্প কয়েক দিন অযোধ্যায় থেকে আবার যাত্রা করলেন হিউ-এন-সাঙ। এবার গন্তব্যস্থান প্রয়াগ_গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর মিলনক্ষেত্র।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%