চঞ্চলকুমার ঘোষ
বইটা বন্ধ করে অমিতাভ। হিউ-এন-সাঙ-এর জীবনকথা পড়তে পড়তে এত নিবিষ্ট হয়ে গিয়েছিল ঘড়ির কাঁটা কখন ভোর পেরিয়ে সকাল হয়ে গিয়েছিল খেয়ালই করেনি। বইটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। একটা ভাবনা মনের মধ্যে ভেসে ওঠে। সময়টা যদি চৌদ্দোশো বছর পিছিয়ে নিয়ে যেতে পারত।
হিউ-এন-সাঙ তৃতীয় দুর্গ পার হয়ে চলেছেন চতুর্থ দুর্গের দিকে। চাঙ-আন বৌদ্ধবিহার থেকে বার হবার পর একমাস পার হয়ে গিয়েছে।
অমিতাভ মুখ ধুয়ে চায়ের কাপ নিয়ে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। আজ ছুটি। বিরক্ত করবার কেউ নেই। আবার বই খোলে। মন ভাসিয়ে দেয় হিমালয় পেরিয়ে চিনের সীমান্ত দেশে।
ঘোড়ায় চড়ে চলেছিলেন হিউ-এন-সাঙ। পাহাড়ের মাঝে পথ। মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম। দীনদরিদ্র মানুষের বাস। তিন দুর্গের সেনাধ্যক্ষরাই প্রচুর জিনিস দিয়েছেন। বেশির ভাগই গ্রামের মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন হিউ-এন-সাঙ।
সারা সকাল ধরে চলেছেন হিউ-এন-সাঙ। মাথার ওপর প্রখর রোদের তাপ। ঘোড়াটাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আগের দিন একটা পাথরে ধাক্কা লেগে চোট পেয়েছিল ঘোড়াটা। তারপর থেকেই খুঁড়িয়ে চলেছে। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছেন সামনের সেনানিবাসে গিয়ে দু-চারদিন ঘোড়াটাকে বিশ্রাম দেবেন। এর পর আরও দীর্ঘ পথ। সামনে এক জায়গায় কয়েকটা বড়ো গাছ। মাটিতে তার ছায়া। অল্প অল্প ঘাস। মুখ তুলে সেই দিকে ঘাড় নাড়ে ঘোড়াটা। আলতো করে চাপড় মারেন ঘোড়ার গায়ে।
‘চল আমিও তোর সঙ্গে ওখানে গিয়ে একটু বিশ্রাম করব’। ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ। ঘোড়ার লাগাম আলগা করে দিলেন। গাছের ছায়ায় ক্লান্ত শরীরটা জুড়িয়ে আসে। ঘাসের ওপরেই শুয়ে পড়লেন। চারদিকে শান্ত। মানুষজন নেই। জানেন কেউ এখানে তঁাকে বিরক্ত করবে না। নিশ্চিন্তে চোখ বুজলেন হিউ-এন-সাঙ। অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ ঘোড়ার ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। তাড়াতাড়ি চোখ মেলে তাকালেন।সামনে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ। উশকো খুশকো চুল। গায়ে লম্বা কালো আলখাল্লা। বৃদ্ধের সঙ্গেও একটা ঘোড়া। েরাগা লম্বা গলা। গায়ের সব লোম ঝরে গিয়েছে। বুড়ো মানুষটার মতোই বুড়িয়ে যাওয়া ভাব।
বৃদ্ধ অবাক চোখে হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে তাকিয়ে ছিল।
‘কে তুমি ? এখানে কী করছ?’
‘আমি একজন বৌদ্ধ শ্রমণ।’ মৃদুস্বরে জবাব দিলেন হিউ-এন-সাঙ।
‘বৌদ্ধ শ্রমণ।’ কয়েক বার বিড় বিড় করে। বলে ওঠে বৃদ্ধ। শ্রমণ, তা এদিকে কোথায় চলেছ ? সেনানিবাস ছাড়া তো এদিকে আর কিছু নেই।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন হিউ-এন-সাঙ। একবার মনে হল বৃদ্ধের কাছে অন্য কিছু বলবেন। তারপরই মনে হল কী প্রয়োজন সত্য গোপন করে। বললেন, আমি ভগবান বুদ্ধের দেশ ভারতবর্ষে যাব।
কেমন যেন চমকে ওঠে বৃদ্ধ। চোখ দুটাকে বড়ো বড়ো করে বলল, সে তো অনেকদূর। কোনো মানুষ সেখানে যেতে পারে না। তুমি কেমন করে সেখানে যাবে ?
মানুষটার কথা বলার ভঙ্গিতে কৌতুক লাগছিল হিউ-এন-সাঙ-এর। বললেন, এই ঘোড়ার পিঠে চড়ে ভারতবর্ষে যাব।
মাথার ঝাঁকড়া চুল নাড়িয়ে হেসে ওঠে বৃদ্ধ। তোমার এই ঘোড়া নিয়ে মরুভূমি পার হবে। একবার ধুলোর ঝড় উঠলেই তোমার ঘোড়া একেবারে কুপোকাত হয়ে যাবে। আর মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে না।
‘তুমি কী করে জানলে আমার ঘোড়া মরুভূমিতে চলতে পারবে না ?’
‘চল্লিশ বছর ঘরে এত ঘোড়া নাড়াচাড়া করেছি, ঘোড়ার ছায়া দেখলেই বলে দিতে পারি কেমন ঘোড়া।’
ঘোড়ার ব্যাপারে প্রায় কিছুই জানেন না হিউ-এন-সাঙ। বললেন, আমার এ ঘোড়া কি মরুভূমি পার হতে পারবে না ?
‘আরে এ হচ্ছে রাজা-মহারাজের আরামের ঘোড়া। কষ্ট করতে পারে না।’
বৃদ্ধের কথা মনে ধরে হিউ-এন-সাঙ-এর। মাত্র তিনশো লি পথ পার হয়েছেন। এরই মধ্যে ঘোড়াটা কেমন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে আর চলতে পারছে না। বললেন, এর চেয়ে ভালো ঘোড়া কোথায় পাব। যা পেয়েছি তাই নিয়ে চলতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে ওঠে বৃদ্ধ।
‘আমি তোমাকে ঘোড়া দেব। তুমি কত কষ্ট করে ভারতবর্ষে যাবে। আমি তোমার জন্যে এইটুকু করতে পারব না।’
চমকে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ। কয়েক মাস আগে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি কোথাও চলেছেন। পথে এক বৃদ্ধ তারই মতন জীর্ণ ঘোড়া নিয়ে চলেছে। সে নিজের ঘোড়া দিয়ে হিউ-এন-সাঙ-এর ঘোড়া বদল করল। তারপরই মানুষটা কোথায় চলে গেল। তবে কি এই বৃদ্ধই সেই স্বপ্নের ঘোড়াওয়ালা। কে জানে এই হয়তো ভবিতব্য। কিছুক্ষণ চুপ করে বললেন, তুমি আমাকে ঘোড়া দেবে তার বিনিময়ে আমি কী দেব ? তোমাকে দেবার মতো আমার কিছু নেই।
লাফ দিয়ে উঠল বৃদ্ধ। কে বলেছে নেই। তোমার ঘোড়া আমায় দেবে, আমার ঘোড়া তুমি নেবে।
‘তোমার এই হাড় জিরজিরে ঘোড়া !’
চোখ নাচায় বৃদ্ধ। দেখে তাই মনে হচ্ছে, মরুভূমির রাস্তায় চলতে এর চেয়ে ভালো ঘোড়া আর নেই। তুমি যদি মরুভূমি পার হতে চাও তবে তোমাকে এই ঘোড়ায় চড়েই যেতে হবে। আমি বলছি তুমি এই ঘোড়াটা নাও, তোমার সুবিধা হবে।
হিউ-এন-সাঙ অস্ফুটে বললেন, বেশ তোমার কথাই মেনে নিলাম। হয়তো ভগবান বুদ্ধের তাই ইচ্ছে।
হিউ-এন-সাঙ সম্মতি দিতেই আর অপেক্ষা করল না বৃদ্ধ। এক লাফে হিউ-এন-সাঙ-এর ঘোড়ার ওপর উঠে পড়ল। পাছে হিউ-এন-সাঙ বাধা দেন মুহূর্তমাত্র দেরি না করে প্রবল বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ।
একটু একটু করে দূরে চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যায় বৃদ্ধ। এবার মুখ ফিরিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়াটার দিকে তাকালেন হিউ-এন-সাঙ। চুপ করে দাঁড়িয়ে যেন অপেক্ষা করছে নতুন যাত্রাপথের। উঠে দাঁড়ালেন তিনি। সন্ধের আগেই যদি চতুর্থ সেনানিবাসে পৌঁছতে পারেন।
ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলেন। দুটি পেটিকা নিজের পিঠে বেঁধে নিলেন। লাগামে টান দিতেই চলতে আরম্ভ করল ঘোড়া। অসম্ভব ধীর। তবে পাহাড়ি পথে স্বচ্ছন্দে এগিয়ে চলে।
সন্ধের কিছু আগেই দূর থেকে চোখে পড়ল চতুর্থ সেনানিবাসের মাথার ওপর পতাকা উড়ছে। যখন সেনানিবাসের ফটকের সামনে গিয়ে পৌঁছলেন সন্ধে হয়ে গিয়েছে। বন্ধ ফটক। ঘোড়া থেকে নেমে ডাক দিলেন হিউ-এন-সাঙ, কেউ আছেন ?
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফটকের ছোট্ট কুঠুরি খুলে একটা মুখ বার হল। কর্কশ কণ্ঠস্বরে বলল, কী চাই ?
হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু। আজকের রাতটুকু আশ্রয় চাই।
ভেতর থেকে সৈনিক বলে ওঠে, এখানে বাইরের কাউকে আশ্রয় দেওয়া হয় না। হিউ-এন-সাঙ তার পোশাকের ভেতর থেকে আগের সেনানায়কের পত্র বার করলেন।
‘এই পত্রখানা মহামান্য সেনানায়কের কাছে পৌঁছে দাও’।
সৈনিক সামান্য ইতস্তুত করে বলল, কার পত্র ?
‘তৃতীয় সেনানিবাসের সেনাপতির পত্র।’
‘ঠিক আছে আপনি অপেক্ষা করুন। আমি আসছি।’
পত্র নিয়ে ভেতরে চলে যায় প্রহরী। নিঃশব্দে অপেক্ষা করেন হিউ-এন-সাঙ। মনে মনে স্থির করেন যদি সেনাপতি আশ্রয় না দেন তবে আর এখানে অপেক্ষা করবেন না। এই রাত্রির অন্ধকারেই যতদূর সম্ভব এগিয়ে যাবেন।
কিছুক্ষণ পরেই ফটক খোলার শব্দে মুখ ফেরালেন। সামনে দাঁড়িয়ে চারজন সৈন্য। একজন বলল, আসুন সেনাধ্যক্ষ আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।
বিশাল তঁাবুতে বসে ছিলেন সেনাপতি। বয়সে প্রবীণ। হিউ-এন-সাঙ তঁাবুতে ঢুকতেই বললেন, আসুন। আমি ইতিপূর্বেই আপনার আসবার সংবাদ পেয়েছি।
‘আমি আজকের রাতটুকুর জন্যে আশ্রয় চাই। কাল প্রভাতেই আবার যাত্রা করব।’
‘আপনি বহুদূর থেকে এসেছেন, কয়েক দিন এখানে বিশ্রাম করুন। তারপর যাত্রা করবেন।’
হিউ-এন-সাঙ অনুভব করলেন সেনাধ্যক্ষের সঙ্গে বিবাদ করে সীমান্ত পথ অতিক্রম করা সম্ভব নয়। বললেন, মহামান্য সেনাধ্যক্ষর যা ইচ্ছা তাই হবে।
সকালের উপাসনা শেষ করে নিজের তঁাবুতে বসে ছিলেন হিউ-এন-সাঙ। হঠাৎ মৃদু পদশব্দে মুখ তুলে তাকালেন। সামনে দাঁড়িয়ে সেনাধ্যক্ষ।
‘প্রণাম ধর্মগুরু। কাল রাতে আপনার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। তাই সাক্ষাৎ করতে এলাম।’ সেনাধ্যক্ষের কণ্ঠস্বরে অকপট শ্রদ্ধা।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, সৎ মানুষের সান্নিধ্য সব সময়েই সুখকর।
সেনাধ্যক্ষ মৃদুস্বরে বললেন, আমাদের এই সৈনিকের জীবন। এখানে আপনার মতো পরম জ্ঞানী মানুষের সঙ্গ কখনো পাই না। বৌদ্ধ হয়েও বুদ্ধের কথা প্রায় কিছুই জানি না। অনুগ্রহ করে যদি সেই মহাতাপসের কথা কিছু বলেন।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, নিশ্চয় বলব। আমি যে কয়েক দিন আপনার কাছে থাকব আমি তঁার জীবন, ধর্মকথা বলব।
কয়েক দিন কেটে যায়। ধর্মকথা বলেন হিউ-এন-সাঙ। মুগ্ধ হয়ে শোনেন সেনাধ্যক্ষ।
‘ধর্মগুরু আপনার মুখে বুদ্ধের কথা শুনতে বড়ো ভালো লাগছে। আপনি অারও কয়েক দিন এখানে থাকুন।’
নিজের অন্তরে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন হিউ-এন-সাঙ। প্রতিমুহূর্তে তঁার একটিই কামনা কত শীঘ্র ভারতবর্ষে পৌঁছবেন।
‘সে হয় না সেনাপতি। আমার সমস্ত মন প্রাণ ভারতবর্ষে যাওয়ার জন্যে উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছে। প্রতিটি দিন আমার কাছে মূল্যবান। জীবনের সীমা তো অনন্ত নয়।’
‘আমাকে মার্জনা করবেন ধর্মগুরু। আপনার সঙ্গ আমার মন প্রাণকে গভীর আনন্দে পূর্ণ করে দিয়েছে। তাই আপনাকে ছেড়ে দিতে মন চাইছে না।’
‘ভারতবর্ষ থেকে ফিরে এলে নিশ্চয়ই আমাদের সাক্ষাৎ হবে। আপনি আমার যাত্রার ব্যবস্থা করুন। শুনেছি পঞ্চম দুর্গের সেনাধ্যক্ষ বৌদ্ধধর্ম বিদ্বেষী। তিনি নিশ্চয়ই আমাকে সীমান্ত অতিক্রম করতে দেবেন না। হয়তো সম্রাটের আদেশে আমাকে বন্দি করে রাজধানীতে পাঠিয়ে দেবেন।’
চিন্তিত মুখে সেনাধ্যক্ষ বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন মহাত্মন। সম্রাটের আদেশ আমরাও পেয়েছি। তবুও আপনাকে বন্দি করিনি তঁার কারণ আপনি যে মহান উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষে চলেছেন তা যদি পূর্ণ হয় তবে সমস্ত চিন দেশের মানুষের কল্যাণ হবে। আপনার জ্ঞানের আলোয় আমরাও আলোকিত হব। সমস্যা হল পঞ্চম দুর্গের পথ আপনি কেমন করে পার হবেন ?
‘আর কোনো পথ নেই ?’
‘না। ওই একটিমাত্র পথ দিয়েই মধ্য এশিয়ার মানুষ চিন দেশে আসেন। চিনের মানুষ এশিয়ায় যান। আর সব দিকেই মহাপ্রাচীর। সে প্রাচীর কেমন করে পার হবেন!’
চিন্তিত মুখে হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমাকে পথের সন্ধান পেতেই হবে।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন সেনানায়ক। তঁার চোখে মুখেও উদ্েবগ। বললেন, আর একটি পথ আছে। তবে সে পথে যাওয়া অসম্ভব।
‘কেন অসম্ভব ?’
‘অন্তত হাজার লি পথ আরও যেতে হবে।’
‘তার জন্যে আমি ভাবনা করি না। সে পথ আমি অতিক্রম করে যাব।’
‘পথের দূরত্বের কথা আমি ভাবছি না, ধর্মগুরু। আমার ভাবনা অন্য বিষয়ে।’
হিউ-এন-সাঙ অনুভব করছিলেন সেনাধ্যক্ষের মনের উদ্বেলতা। বললেন, আপনি নিঃসংকোচে বলতে পারেন। কোনো সমস্যাই আমার মনকে বিচলিত করতে পারবে না।
‘আপনি কি জানেন সে পথ গিয়েছে গোবি মরুভূমির মধ্যে দিয়ে। সেখানে শুধু বালির প্রান্তর। কোনো লোকালয় নেই, মানুষের বসতি নেই। খাবার জল নেই। পথের কোনো নিশানা নেই। একমাত্র তাতাররা ওই পথে যায়। তারা যেমন হিংস্র তেমনি বর্বর। আপনাকে দেখামাত্রই খুন করে সর্বস্ব লুঠ করবে।
সামান্য বিচলিত হলেন হিউ-এন-সাঙ। মনের মধ্যে ভাবনা জেগে ওঠে কীভাবে এই দুর্গম পথ পার হবেন। মৃত্যুকে ভয় করেন না। সে তো অবশ্যম্ভাবী। অন্তরের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন, সে তো দেহের সঙ্গেই শেষ হয়ে যাবে।
রাতে ঘুম আসে না। ধ্যানে বসলেন। বার বার মনসংযমে বিঘ্ন ঘটে। অস্থিরভাবে তঁাবুর মধ্যে পায়চারি করতে থাকেন। শেষ রাতে অবসন্ন দেহে শুতেই ঘুমিয়ে পড়লেন। গাঢ় ঘুম। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল খুব কাছেই কারা যেন সুর করে মন্ত্র পড়ছে। চোখ মেলে তাকালেন। আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠে এগিয়ে গেলেন। দেখলেন বিশাল প্রান্তর জুড়ে প্রাসাদের মতো অট্টালিকা। সারি সারি কক্ষ। প্রশস্ত অলিন্দ। কয়েক জন তরুণ পরনে সাদা পোশাক। মুণ্ডিত মস্তক। ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে। সকলেই শান্ত। চোখে মুখে প্রসন্নতা। ওরা কোথায় চলেছে। কাউকে কোনো প্রশ্ন করলেন না হিউ-এন-সাঙ। নিঃশব্দে তাদের অনুসরণ করলেন। দীর্ঘ অলিন্দের একেবারে প্রান্তে বিশাল একটি কক্ষ। একে একে সকলে সেই কক্ষে প্রবেশ করল। তাদের অনুসরণ করে সকলের একেবারে পিছনে গিয়ে বসলেন হিউ-এন-সাঙ। অল্পক্ষণ পরেই কক্ষে ঢুকলেন একজন প্রবীণ আচার্য। চোখে-মুখে আশ্চর্য দীপ্তি আর প্রজ্ঞা। উঁচু পাথরের বেদির ওপর বসে তিনি পাঠ দিতে আরম্ভ করলেন। হিউ-এন-সাঙ-এর মনে হল তঁার প্রতিটি কথায় সূর্যের আলোর মতো জ্ঞানের বিচ্ছরণ হচ্ছে। নিচু গলায় একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, কে এই আচার্য ?
কিছু উত্তর দিল সে। শুনতে পেলেন না হিউ-এন-সাঙ।
মুহূর্তে ঘুম ভেঙে গেল হিউ-এন-সাঙ-এর। বিছানার উপর উঠে বসলেন। এ কীসের স্বপ্ন দেখলেন তিনি। কোনো বিদ্যালয়। যেখানে সকলে শিক্ষা লাভ করছে। আর ওই আচার্যের আসনে বসে থাকা মানুষটি কে ? গভীর জ্ঞানে উদ্ভাসিত তঁার প্রতিটি কথা। দেখে বোঝা যায়, চিন দেশের কেউ নন। তবে কি ভারতবর্ষের কোনো জ্ঞানপীঠ। সকলের সঙ্গে তিনিও সেখানে শিক্ষা পাচ্ছেন। এ কি ওইখানে যাওয়ার কোনো ইঙ্গিত!
আরও কিছুক্ষণ বসে রইলেন। রাত শেষ হয়ে এসেছিল। ভোরের আলোর দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য এক অনুভূতি জেগে ওঠে। কোনো সংশয় নেই। দ্বিধা নেই। ধীরে ধীরে মনকে শক্ত করলেন। ওই মরুভূমির পথ ধরেই তিনি এগিয়ে যাবেন। পোশাক পরিবর্তন করে সেনাধ্যক্ষের তঁাবুতে এলেন।
‘বলুন ধর্মগুরু কী স্থির করলেন ?’
‘আমি মনস্থির করেছি। মরুভূমির পথ ধরেই ভারতবর্ষে যাব।’
হিউ-এন-সাঙ-এর কণ্ঠস্বরে এমন এক গভীর আত্মপ্রত্যয় ফুটে উঠেছিল, সেনাধ্যক্ষ বুঝতে পারলেন কোনোভাবেই আর তঁাকে ফেরানো সম্ভব নয়। তবুও শেষবারের মতো তাকে নিবৃত্ত করবার জন্যে বললেন, কোনো পথপ্রদর্শক ছাড়া কীভাবে মরুভূমির মধ্যে পথের সন্ধান পাবেন ?
সামান্য হাসলেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, দিনের বেলায় সূর্য, রাতের বেলায় চাঁদ, তারারা আমাকে পথ দেখাবে।
‘তাহলে কবে আপনি যাত্রা করতে চান ?’
‘সম্ভব হলে কালই।’
‘আজ আপনি বিশ্রাম নিন। কাল আমি নিজে আপনাকে সীমান্ত প্রদেশ পার করে দেব।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন