লৌহকপাট

চঞ্চলকুমার ঘোষ

কয়েক দিন রাজআবাসে রয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। প্রতিদিন উন্মুক্ত আঙিনায় এসে বসেন। নগরের শত শত মানুষ এসে তঁার ধর্ম-উপদেশ শোনে। স্বয়ং রাজা, রাজপরিবারের সকলেও তঁার কাছে ধর্মকথা শোনেন।

এক পক্ষকাল কেটে যায়। রাজার কাছে বিদায় নিয়ে আবার নতুন পথে যাত্রা শুরু করলেন হিউ-এন-সাঙ। রাজা তঁাকে নতুন পথপ্রদর্শক, পথের প্রয়োজনীয় সব কিছুই দিয়েছেন।

এবার আর মরুপ্রান্তর নয়। শুরু হল পার্বত্য প্রান্তর।

এই পর্যন্ত পড়ে থামল অমিতাভ। সমরখন্দ থেকে হিউ-এন-সাঙ যে-শহরে এসে উঠেছিলেন তার নাম কেশ। কিন্তু মানচিত্রে কোথাও কেশ নামে কোনো শহর নেই। অল্প কিছুদিন আগে এক মহিলা লেখিকা হিউ-এন-সাঙ-এর পথ ধরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তঁার লেখা ভ্রমণবৃত্তান্তের পাতা ওলটাতে ওলটাতে এক জায়গায় এসে থমকে গেল অমিতাভ। তিনি লিখছেন : আমি আজ সমরখন্দ থেকে প্রাচীন কেশ নগরে এসে পৌঁছোলাম। এখন এই শহরের নাম শাহরিয়াব। পথে জেরাফান নদী। শহরের পথে প্রায়ই চোখে পড়ছিল গাধায়-টানা গাড়ি। পথ থেকে দু-ধারে ন্যাড়া পাহাড়ের সার। মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছিল পপলার গাছের সারি। পুরোনো দিনের ভাঙা প্রাসাদ। এক জায়গায় নানা রঙের স্তূপ করা নুন। লাল, সবুজ, কালো, সাদা_এইসব নুন বহু যুগ ধরেই চিন, তিব্বত ও রাশিয়ার নানান প্রান্তে বিক্রির জন্যে যায়। সম্ভবত এই পথ ধরেই হিউ-এন-সাঙ-এর সময়েও নানা পণ্য নিয়ে ব্যবসায়ীরা যেতেন দূর দূর দেশে। হিউ-এন-সাঙ যখন এখানে আসেন তখন এই অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের কোনো প্রভাব ছিল না। যদিও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বৌদ্ধ বিহারের বেশ কিছু চিহ্ন সেখানে দেখতে পান। এর থেকে বোঝা যায় বৌদ্ধ ধর্মের কী ব্যাপক বিরাট প্রসার ঘটেছিল।

বইটা বন্ধ করে আবার হিউ-এন-সাঙ-এর ভ্রমণবৃত্তান্তের বই খোলে অমিতাভ।

কেশ শহর থেকে যাত্রা করলেন হিউ-এন-সাঙ। এরপর থেকেই শুরু হল পার্বত্য উপত্যকা। এর মধ্যে দিয়ে সরু পথ। এই পথ যেমন খাড়াই তেমনি বিপজ্জনক। প্রাণহীন রুক্ষ পাথর ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। কোনো গাছ এমনকী ঘাস পর্যন্ত নেই। এক ফোঁটা জলের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। মৃত্যুর মতো নিস্তব্ধতা। প্রায় তিনশো লি পথ চলার পর তঁারা এসে পড়লেন ‘লোহার কপাট’-এ। পামির মালভূমির মাঝে এই গিরিপথ। দু-ধারে আকাশছোঁয়া খাড়াই পাহাড়। এত খাড়াই যে, কোনো মানুষের সেখানে পা রাখা অসাধ্য। দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে মাত্র কয়েক হাত চওড়া সরু পথ। মানুষ, ঘোড়া সারিবদ্ধভাবে সে-পথে চলাচল করে। সেই গুহাপথের মুখে বিরাট কপাট। গোটা কপাটটাই লোহার আচ্ছাদনে মোড়া। চারিদিকে অসংখ্য ছোটো ছোটো ঘণ্টা। যাতে শত্রুসেনা সেই পথে আসতে না পারে, তাই তৈরি হয়েছে এই লৌহকপাট।

দীর্ঘ এই গিরিপথ পার হয়ে হিউ-এন-সাঙ এসে পৌঁছোলেন বক্ষ নদীর তীরে কুন্দুজ নগরে। এই নগরের শাসনকর্তা ছিলেন তুরস্ক সম্রাটের আত্মীয়। সম্রাটের সঙ্গে হিউ-এন-সাঙ-এর পরিচয় আছে জেনে সাদরে অভ্যর্থনা করলেন।

কয়েক দিন সেখানে রয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। তঁার ইচ্ছা ছিল কুন্দুজ থেকে সোজা রওনা হবেন গান্ধার। কুন্দুজের শাসনকর্তা বললেন, ধর্মগুরু আপনি গান্ধার যাওয়ার আগে একটি বার বালখ ঘুরে আসুন।

‘বালখ! কী আছে সেখানে?’ জিজ্ঞাসা করলেন হিউ-এন-সাঙ।

শাসনকর্তা বললেন, ‘বালখ’ বৌদ্ধ ধর্মের এক পরম পবিত্র স্থান। বহু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী সেখানে থাকেন। সেখানে ভগবান বুদ্ধের এত পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে, সকলেই এই নগরকে পরম শ্রদ্ধায় বলে ছোটো রাজগৃহ। আমার মনে হয় সেই পবিত্র স্থানে গেলে আপনার নিশ্চয়ই ভালো লাগবে।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি নিশ্চয়ই বালখ যাব। কিন্তু কোন পথে সেখানে যাব ?

শাসনকর্তা বললেন, আপনার চিন্তার কোনো কারণ নেই ধর্মগুরু। বালখ আমার রাজত্বের সীমানার মধ্যেই। আমিই আপনার সেখানে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করব।

খুশি হলেন হিউ-এন-সাঙ। পরদিনই তিনি রওনা হলেন বালখ। ছোটো নগর, সুন্দর পরিবেশ।

নগরে ঢোকার মুখেই বিরাট সংঘারাম। অপূর্ব তার শিল্পশৈলী। হিউ-এন-সাঙ-এর আসার সংবাদ আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল। বৌদ্ধভিক্ষু ও সন্ন্যাসীরা সমবেতভাবে তঁাকে অভ্যর্থনা করে সংঘরামের ভিতর নিয়ে গেলেন। প্রধান ধর্মাধিকারক বললেন, আমি ইতিপূর্বেই আপনার কথা শুনেছি। আপনার মতো মহাজ্ঞানীর সান্নিধ্য পেয়ে আমরা ধন্য।

মৃদু হেসে হিউ-এন-সাঙ বললেন, এই পবিত্র স্থানে এসে আমিও ধন্য। শুনেছি এখানে ভগবান বুদ্ধের কিছু স্মৃতিচিহ্ন আছে।

প্রধান ধর্মাধিকারক বললেন, আপনি ঠিকই শুনেছেন। হিউ-এন-সাঙ ব্যগ্রভাবে বললেন, সেই মহামানবের পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন দেখবার জন্যে আমি ব্যাকুল হয়ে উঠেছি।

প্রধান ধর্মাধিকারক তঁাকে নিয়ে চললেন। নব সংঘরামের মধ্যে সুসজ্জিত এক কক্ষ রয়েছে। তার মধ্যে উঁচু পাথরের বেদি। তার উপর ধ্যানমগ্ন ভগবান বুদ্ধের মূর্তি। তার সামনে তিনটি সোনার পাত্র। দুটি ছোটো, একটি কয়েক হাত লম্বা। একটি পাত্রে রয়েছে মাটির গেলাস। আরেকটি পাত্রে দাঁত। লম্বা পাত্রটিতে কেশ ঘাসের ঝাঁটা।

প্রধান ধর্মাধিকারক বললেন, এই তিনটিই ভগবান বুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন।

বিস্ময়ে অভিভূত হিউ-এন-সাঙ। তঁার সমস্ত দেহ-মন জুড়ে বিচিত্র এক আবেগ। পাথরের উপরেই ভূমিষ্ঠ হলেন। তঁার দু-চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নেমে আসে। কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞাসা করলেন, এই অমূল্য সম্পদ আপনারা কোথা থেকে সংগ্রহ করলেন ?

কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন প্রধান ধর্মাধিকারক। তারপর বললেন, শুনেছি বহু পূর্বে কোনো বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ভারতবর্ষ থেকে এখানে এসেছিলেন। তিনিই এই মহাদান করেন। এখান থেকে কিছু দূরে আরও দুটি স্তূপ আছে। তথাগতের দেহের চুল ও নখের উপর সেই দুটি স্তূপ গড়ে উঠেছে।

চরম বিস্ময়ে হিউ-এন-সাঙ জিজ্ঞাসা করলেন, তথাগতের দেহের অংশ কোথায় সংগ্রহ করা হয়েছিল ?

‘ভগবান বুদ্ধ মহাজ্ঞান লাভ করার পর দু-জন ব্যবসায়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তঁারা বুদ্ধকে মধু ও আরও কিছু খাবার দিলেন। বুদ্ধের কাছে ধর্ম-উপদেশ শুনে তঁাদের অন্তর শ্রদ্ধায়-ভক্তিতে পূর্ণ হয়ে উঠল। করজোড়ে প্রার্থনা করলেন, আপনার কিছু চিহ্ন দান করুন প্রভু। বুদ্ধ তঁাদের নিজের নখ আর চুল দিলেন। সেই ব্যবসায়ীরা দেশে ফিরে এসে সেই নখ আর চুলের উপর ধর্মস্তূপ তৈরি করলেন।’

প্রসন্নচিত্তে হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি সেই পবিত্র স্তূপ দর্শন করেই ভারতবর্ষের দিকে যাত্রা করব।

দ্রুত যাত্রার মনস্থির করেও এক মাস সেখানে রয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%