বুদ্ধগয়া

চঞ্চলকুমার ঘোষ

হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে কাশী, মুসলিমদের কাছে মক্কা, খ্রিস্টানদের বেথলেহেম, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে তেমনই মহাতীর্থ বুদ্ধগয়া।

গয়া থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরে নৈরঞ্জনা নদীর তীরে উরুবেলা গ্রাম। নৈরঞ্জনা নদী এখান থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ফল্গুর সঙ্গে মিশেছে। দুই তীরেই ছায়াশীতল বাগান। মাঝে মাঝে গ্রাম।

গৃহত্যাগের পর সিদ্ধার্থ কয়েক বছর ধরে নানান গুরুর কাছে তপস্যা করলেন। কোথাও পেলেন না তঁার আকাঙ্ক্ষিত মুক্তির পথ। মনে হল গুরুর কাছে যে-জ্ঞান লাভ করছেন তা নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী, কোনো গভীর সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। সিদ্ধার্থ অনুভব করলেন, যে-জ্ঞানের সন্ধানে তিনি ঘুরছেন কারও পক্ষেই তা দেওয়া সম্ভব নয়। আত্মশক্তিতেই তঁাকে অর্জন করতে হবে। সমস্ত গুরুর সংস্রব ত্যাগ করে তিনি এলেন নৈরঞ্জনা নদীর তীরে। তখন সেখানে গভীর বন, মানুষের কোলাহল নেই। বুদ্ধ স্থির করলেন এখানেই তপস্যা করবেন।

সেখানে তখন তপস্যা করতেন পাঁচ তপস্বী। তঁারা বললেন সিদ্ধার্থকে, আরও কঠিন কঠোর তপস্যা করতে হবে। যখন মানুষ সত্যিকারের জ্ঞান অর্জন করে তখনই তার মধ্যে আসে প্রজ্ঞা, আর এই প্রজ্ঞাই মানুষকে পৌঁছে দেয় পরম সত্যের দেশে। আর তার জন্যে প্রয়োজন কঠোর ইন্দ্রিয় সংযম আর আত্মনিগ্রহ।

সেই তপস্বীদের কথায় নৈরঞ্জনা নদীতে স্নান করে ধ্যানে বসলেন সিদ্ধার্থ। প্রথমে দাঁতে দাঁত চেপে তালুতে জিহ্বা স্পর্শ করে কয়েক মাস ধ্যান করলেন। কখনো নিশ্বাস বন্ধ করে থাকতেন। তখন তঁাকে দেখে মনে হত মৃত। তপস্বীদের কেউ বলতেন সিদ্ধার্থের মৃত্যু হয়েছে। আবার কেউ বলতেন এখনও মৃত্যু হয়নি, তবে খুব শীঘ্রই মৃত্যু হবে।

এমনি করে ছয় বছর কেটে গেল। এই সময়ের কথা তিনি পরবর্তীকালে শিষ্যদের বলেছেন, ‘‘তখন আমার চরম আত্মনিগ্রহের অবস্থা। বহুদিন একটি চালের দানা বা একটি ফল খেয়ে কাটিয়েছি, কোনোদিন তাও খাইনি, কখনো দিনের পর দিন উপবাসে কেটেছে। স্নান করিনি, দেহের স্তরে স্তরে ধুলো জমেছে। শীত, গ্রীষ্ম, হেমন্ত দিন-রাত্রি কখনো উন্মুক্ত আকাশের নীচে, কখনো বনের মধ্যে নগ্ন অবস্থায় কাটিয়েছি। কখনো শ্মশানে মৃতদেহের পাশে শুয়েছি। বালকরা আমার গায়ে মল-মূত্র ত্যাগ করেছে। কানের মধ্যে শলাকা ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমি কখনো তাদের অমঙ্গল কামনা করিনি। এইভাবে চলতে চলতে আমার দেহ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে উঠল। হাত দুটো গাছের মরা ডালের মতো সরু হয়ে উঠল। গায়ের সব লোম, মাথার সব চুল ঝরে পড়ল। একটু একটু করে দেহ মনের সব অনুভূতিও হারিয়ে যেতে লাগল। শুধু প্রাণটুকু শরীরের মধ্যে রয়ে গেল।”

এমনি করে ছয় বছর কেটে গেল, তবুও সিদ্ধার্থ সেই পরম জ্ঞান বা বোধিলাভ করতে পারলেন না। তঁার অন্তরমধ্যে জমে থাকা অন্ধকারে জ্বলে উঠল না জ্ঞানের আলো। কেবলই মনে হতে লাগল, তিনি প্রতি মুহূর্তে শুনতে পাচ্ছেন জন্ম-মৃত্যু আর কর্মচক্রের বিরামহীন এক ধ্বনি। এই বিশ্বজগতের মাঝে সবকিছুই গতিশীল। একটি জিজ্ঞাসা বিরাট হয়ে উঠল, এই গতির কি কোনো শেষ নেই ? এই নিত্যগতিশীল, পরিবর্তনশীল বিশ্বে স্থির অক্ষয় বস্তু কী, যাকে বেদান্তে বলছে ব্রহ্ম বা পরমাত্মা ?

সেই পাঁচ তপস্বী যাঁরা সিদ্ধার্থের সেবা করতেন, বিশ্বাস করতেন একদিন তিনি সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে পারবেন, তঁারা ক্রমশই হতাশ হয়ে পড়লেন। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে আরম্ভ করলেন, সিদ্ধার্থর মৃত্যু আসন্ন। অল্প দিনের মধ্যেই তিনি প্রাণত্যাগ করবেন।

একদিন ভোরবেলায় তঁার ধ্যান ভাঙতেই দৃষ্টি পড়ল সামনে বয়ে চলা নৈরঞ্জনা নদীর দিকে। টলটল করছে জল। মনে হল কতদিন ওই জলে স্নান করেননি, দেহে এত ক্লেদ জমেছে, স্নান করলে ক্লেদমুক্ত হতো দেহ।

চলবার ক্ষমতা নেই। প্রায় বুকে হেঁটে নদীতে গেলেন। জলে নেমে স্নান করলেন। শরীর এত দুর্বল জল থেকে আর উঠতে পারছেন না। ভাবনা শুরু হল, তবে কি নদীর জলেই তঁার মৃত্যু হবে ? হঠাৎ আশ্চর্য একটা ঘটনা ঘটল। নদীর তীরেই ছিল একটা বড়ো গাছ। সব ডালই অনেক উঁচুতে। আচমকা একটা ডাল নীচু হয়ে সিদ্ধার্থের নাগালের মধ্যে এসে গেল। অতি কষ্টে ডাল চেপে ধরে তীরে উঠে এলেন।

স্নান করে নিজের আসনে এসে বসতেই মনে হল শুধু দেহ নয়, মনের মধ্যেও স্বচ্ছতা এসেছে। মুহূর্তে এক অনুভূতি জেগে ওঠে, এই আত্মনিগ্রহ সাধনায় সিদ্ধিলাভের পথ নয়। এইভাবে যদি তঁার মৃত্যু হয়, তবে কী করে তিনি সেই পরম সত্যকে জানতে পারবেন, কিংবা জন্ম-মৃত্যুর চির রহস্যকে ভেদ করতে পারবেন। সেইসময় পাঁচ তপস্বী এসে দাঁড়ালেন সিদ্ধার্থের কাছে। সিদ্ধার্থ তঁাদের বললেন, আমি উপলব্ধি করছি আত্মনিগ্রহের পথে মুক্তি নেই। আমি এই পথ ত্যাগ করলাম।

তপস্বীরা সকলেই ক্ষুব্ধ বিরক্ত হয়ে উঠলেন। তঁাদের মনে হল সিদ্ধার্থ তঁার সাধনার পথ থেকে সরে এসেছেন। ছয় বছরেও যিনি সিদ্ধিলাভ করতে পারলেন না, তঁার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়।

সকলে সিদ্ধার্থকে ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেলেন। সেই সময় উরুবিল্বের কাছে এক গ্রাম ছিল, নাম সেনানী। গ্রামের সকলেই কৃষিকাজ ও পশুপালন করত। সেই গ্রামের যিনি প্রধান ছিলেন, তঁার একটি মাত্র কন্যা ছিল। নাম সুজাতা। সুজাতা ছিলেন রূপবতী ও ধার্মিক। একদিন সুজাতা বৃক্ষদেবতার কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, যদি মনের মতো স্বামী আর পুত্রসন্তান পাই তবে প্রতি বছর তোমার পুজো করব।

কয়েক বছরের মধ্যেই সুজাতার মনের ইচ্ছা পূর্ণ হল। স্বামী-সন্তানের সুখ পেয়ে মন ভরে উঠেছিল তঁার। সেদিন ছিল বৃক্ষদেবতার পুজোর দিন। স্নান করে শুদ্ধচিত্তে সুজাতা সুগন্ধি চালের পােয়স রাঁধল। বাড়ির এক দাসী পুর্ণাকে বলল, তুই গাছতলায় গিয়ে পরিষ্কার করে আয়। পুর্ণা জানত বিশেষ একটি গাছকে সুজাতা পুজো করে। গাছতলায় এসে দাঁড়াতেই পূর্ণা দেখল শীর্ণ দেহ একজন গাছের তলায় বসে ধ্যান করছেন। গ্রামের সহজ সরল মেয়ে পুর্ণার মনে হল বৃক্ষদেবতা মানুষের রূপ ধরে এখানে বসে আছেন। সে ফিরে এসে সুজাতাকে সব বলতেই আনন্দে উচ্ছল হলেন সুজাতা। সোনার পাত্রে পায়েস নিয়ে এসে দাঁড়ালেন বৃক্ষের নীচে। দেখলেন একজন সন্ন্যাসী বসে আছেন। সুজাতারও মনে হল বৃক্ষদেবতাই সন্ন্যাসীর রূপ ধারণ করে আছেন। সামনে এগিয়ে এসে নতজানু হয়ে বললেন, দেব আমি এই পায়েস আর পানীয় আপনাকে দান করলাম, এই দান গ্রহণ করুন। এই বৃক্ষদেবতাকে পুজো দিয়ে আমার যেমন মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে, এই পায়েস ভক্ষণ করলে আপনারও মনোবাসনা পূর্ণ হবে।

স্বর্ণপাত্র পূর্ণ পায়েস আর পানীয় জল সিদ্ধার্থের সামনে নামিয়ে রেখে তঁাকে প্রণাম করে নিজের কুটিরে ফিরে গেলেন।

সুজাতা চলে যেতেই সিদ্ধার্থের মনে হল, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় যখন তিনি কাতর হয়ে পড়েছেন, তখন এই মেয়েটি তঁাকে পায়েস দিল। হয়তো এ পূর্বনির্দিষ্ট ছিল। মনের সব সংশয় কাটিয়ে সেই পায়েস খেলেন। মুহূর্তে তঁার সমস্ত শরীরে বিচিত্র এক শক্তি অনুভব করলেন। জেগে উঠল সজীবতা। প্রাণশক্তিতে উদ্দীপিত হয়ে উঠল সিদ্ধার্থের দেহ-মন। মনে হল এবার নিশ্চয়ই তঁার সিদ্ধিলাভ হবে। অথচ ছয় বছর তিনি এই বৃক্ষচ্ছায়ায় তপস্যা করছেন, কোনোদিন তো তার একথা মনে হয়নি। হয়তো সাধনায় সিদ্ধিলাভের সময় হয়েছে।

উঠে দাঁড়ালেন সিদ্ধার্থ। সেইসময়ে একটি লোক মাথায় করে ঘাসের বোঝা নিয়ে গৃহে ফিরছিল। সিদ্ধার্থকে দেখেই তার মনে ভক্তিভাব জেগে উঠল। পরম শ্রদ্ধায় সিদ্ধার্থের বসার স্থানে কিছুটা ঘাস বিছিয়ে দিয়ে চলে গেল। সেই ঘাসের উপর পদ্মাসনে বসলেন সিদ্ধার্থ। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে। ধ্যান শুরু করতেই সিদ্ধার্থের সমস্ত অন্তর বিচলিত হয়ে পড়ল। শান্ত দিঘির জল যেমন হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে, সমস্ত অতীত তার সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে প্রকট হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। কপিলাবস্তুর রাজগৃহ, সুন্দরী নারীর দল, রাজসুখ, স্ত্রী গোপার দুরন্ত যৌবন, সেই যৌবনের মাদকতায় ভেসে যাওয়া, পিতার অবর্তমানে রাজসিংহাসন, সব যেন পিছনের পথে টেনে নিয়ে চলে। কেউ যেন বলতে থাকে, ওখানেই সুখ, ওখানেই আনন্দ, জীবনের পরিপূর্ণতা।

স্তব্ধ হয়ে যান সিদ্ধার্থ। এক দিকে সিদ্ধির আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে কামনা-বাসনা তঁাকে প্রলুব্ধ করে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে অতীতে। কঠোর আত্মনিগ্রহ করে ষড়রিপুকে এতদিন অবদমিত করে রেখেছিলেন, আজ তারাই বিদ্রোহে ফেটে পড়তে চাইছে।

যে-শক্তি তঁাকে ছ-বছরের সাধনার মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছিল, সেই শক্তিকে জাগিয়ে তুললেন সিদ্ধার্থ। মনকে সংযত করলেন। শান্ত একাগ্রচিত্তে ধ্যানে বসলেন।

পৃথিবীর সব পাপ অনাচার মিথ্যাচার-এর প্রভু, শয়তান ‘মার’-এর সিংহাসন টলে উঠল। রাগে গর্জন করে উঠল ‘মার’। সব ধ্বংস করে দেব। কার এত শক্তি আমার প্রভুত্বকে খর্ব করে।

নরক থেকে উঠে এল ‘মার’। রক্তবর্ণ লাল পোশাক। চোখে-মুখে হিংস্রতার আগুন জ্বলছে। সিদ্ধার্থের সামনে এসে বলল, আমি মার, ত্রিভুবনে কেউ আমাকে জয় করতে পারেনি। তুমি আমাকে স্বীকার কর। আমি তোমাকে স্বর্গের ঐশ্বর্য দেব। পৃথিবীর রাজা করে দেব।

সিদ্ধার্থ বলে উঠলেন, হে মার, আমি জন্ম-জন্মান্তর ধরে সাধনা করছি। এই জন্মে আমি বুদ্ধ হব। এই আমার প্রতিজ্ঞা। কোনো কিছুই আমাকে লক্ষ্য থেকে চ্যুত করতে পারবে না।

মার বলে ওঠে, তোমার এ শরীর ধ্বংস হবে।

সিদ্ধার্থ দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, তবুও আমি এই আসন ছেড়ে উঠব না।

ভয়ংকর ক্রোধে হুংকার দেয় ‘মার’। চারদিক অন্ধকার হয়ে এল। বজ্রের গর্জন। বিদ্যুৎচমক। অট্টহাসি। হঠাৎ আগুন জ্বলে ওঠে। তার লেলিহান শিখা ধেয়ে আসে। সব যেন জ্বলিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিতে চাইছে।

অচল অনড় সিদ্ধার্থ। নিজের সব শক্তি প্রয়োগ করেও ব্যর্থ ‘মার’। এবার সামনে এসে দাঁড়াল, কখনো মা গৌতমীর রূপ ধরে, কখনো পত্নী যশোধারার রূপ ধরে। কেঁদে কেঁদে লুটিয়ে পড়ে। কী তাদের আকুল প্রার্থনা। ঘরে ফিরে চল।

সামান্যতম অনুভূতি জাগে না সিদ্ধার্থের মনে। এবার আসে মারের দুই মেয়ে কামনা আর ছলাকলা। নিজেদের যৌবন মেলে ধরে সিদ্ধার্থের সামনে। নাচে গানে মোহিত করতে চায়।

হিমালয়ের মতোই অটল অনড় আজ সিদ্ধার্থ। কার সাধ্য তঁার ধ্যান ভাঙায়। দর্প চূর্ণ হয় ‘মারের’। পরাজিত হয় সে। পালিয়ে যায় নরকের অন্ধকারে। মুহূর্তে সব আঁধার কেটে যায়। আবার চাঁদের আলোয় ভরে ওঠে আকাশ মাটি জল। বাতাসে ভাসে ফুলের গন্ধ। বিশ্বময় প্রাণের জোয়ার।

আকাশ পূর্ণ হয়ে চাঁদের আলোয়। আস্তে আস্তে তঁার চেতনার স্তর পার্থিব জগতের সমস্ত বন্ধন ছিঁড়ে, বুদ্ধির সীমানা অতিক্রম করে শুদ্ধ বোধের প্রথম স্তরে উত্তীর্ণ হয়। যে বোধের আলো তঁার মধ্যে জেগে উঠল তাতে বোধিসত্ত্ব দেখলেন এই জন্মের আগে বিভিন্ন জন্মে তঁার কর্ম-পাপ-পুণ্য। সেই জন্মের শিক্ষা, অনুভব, অনুভূতি, উপলব্ধির প্রকাশ। ধীরে ধীরে বোধির এই স্তর উত্তীর্ণ হয়ে গেলেন বোধিসত্ত্ব সিদ্ধার্থ। এবার নতুন এক চেতনা উপলব্ধি। কী দেখলেন সেখানে ?

দেখলেন জীবন আর মৃত্যুর এক অবিরাম চক্র। চির-ঘূর্ণায়মান এই চক্রের মধ্যে থেকে মানুষের মুক্তি নেই। অসীম শূন্য এক জগতের মধ্যে থেকে মানুষ বার বার জন্মগ্রহণ করছে। এই জন্মের অর্থই মরজগতের সমস্ত যন্ত্রণা ভোগ করা। জীবন মানেই যন্ত্রণা। এর থেকে উদ্ধার পাওয়া অসম্ভব। এই যন্ত্রণার মধ্যে দিয়েই একদিন তাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। জীব স্বেচ্ছায় নিজের অজান্তেই অনন্তকাল ধরে এই দুঃখ-বেদনার জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছে।

বোধিসত্ত্ব সিদ্ধার্থ দেখলেন জীবনের আরেক দিক, যে-মানুষ সৎকাজের জন্যে পুণ্য সঞ্চয় করে স্বর্গে যায় সেই স্বর্গসুখও ক্ষণস্থায়ী। কারণ স্বর্গভোগের কামনা থেকেই এই পুণ্যলাভ। এখানেই প্রকৃত সত্য_কামনা থেকে যা-কিছু পাওয়া যায় তা ক্ষণস্থায়ী, তা কখনো অক্ষয় চিরন্তন হতে পারে না।

সিদ্ধার্থ দেখলেন স্বর্গ ও নরক। একজন পাপী মানুষ তার পাপ কাজের জন্যে কী দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করে চলেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর এই পরম যন্ত্রণার পরও মানুষ নতুন জন্মের কামনা করছে। স্বর্গ-মর্ত্য-নরককে ঘিরে এক ঘূর্ণায়মান চক্র, যে-চক্রের মধ্যে মানুষ জন্মজন্মান্তর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে। তার কোনো মুক্তি নেই। এক জন্মের কর্ম তার পরের জন্মের কর্মকে প্রভাবিত করছে।

এইভাবে সিদ্ধার্থ বোধের আরেক ধাপে উত্তীর্ণ হলেন। তঁার চেতনা অনুভব আরও স্বচ্ছ হয়ে উঠল। তিনি দেখলেন যে-আত্মাকে বলা হচ্ছে অনন্ত অভিন্ন, সেই আত্মা অসংখ্য অংশে বিভক্ত হয়ে তঁার সামনে উপস্থিত হয়েছে। কারণ মানুষ যখন আত্মার মধ্যে দিয়ে অমরত্ব কামনা করছে, তখনই তার মধ্যে অনন্ত আত্মার ক্ষুদ্ররূপ প্রকাশ পাচ্ছে। অথচ এই মরজগতের প্রাণী জানে না আত্মার পূর্ণতার মধ্যেই রয়েছে অমৃতের স্পর্শ, চির অমরত্বের সন্ধান। আর আত্মার খণ্ডতা মানেই মৃত্যু আর পুনর্জন্ম।

নিজের উপলব্ধি থেকে সিদ্ধার্থ আরও অনুভব করলেন, মানবদেহ যখনই কোনো বস্তুর সংস্পর্শে আসে তখনই তার মধ্যে কামনার সৃষ্টি হয়। এই কামনাই মানুষের মধ্যে আসক্তির জন্ম দেয়। সেই আসক্তিই নিয়ে আসে মায়া। এই মায়াই তাকে ঠেলে দেয় অসৎ কর্মে। আবার সেই অসৎ কর্মই কারণ হয় নবজন্মের, আর জন্ম মানেই জরা-ব্যাধি-মৃত্যু।

ধীরে ধীরে এক পরমসত্য লাভ করলেন সিদ্ধার্থ। পৃথিবীতে ভালো-মন্দ যা-কিছু ঘটে, তার কারণ আছে। যে-কারণের পিছনে শুভ বোধ রয়েছে, তা শুভ ফল দান করে। কারণ শেষ হলেই কর্মের শেষ হয়।

মানুষ অবিদ্যার অন্ধকারে ডুবে আছে তাই সে জগতের অনিত্যতার কথা জানতে পারে না। সে তার সমস্ত চেতনাকে দেহের খঁাচায় বন্দি করে রেখে কেবল অনিত্য ও নশ্বর বস্তুকে পেতে চায়। সব দুঃখের কারণ যে কামনা-বাসনা, সেই কামনাকে অন্তর থেকে ধ্বংস করলেই মানুষ নির্বাণলাভ করতে পারে। মানুষ যখন নির্বাণলাভ করে তখনই সে জন্ম-জরা-ব্যাধি-মৃত্যুর দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পায়।

এই ধ্যানের মধ্যে সাত দিন কেটে গেল বোধিসত্ত্ব সিদ্ধার্থের। তিনি ধীরে ধীরে চেতনার সাতটি স্তর অতিক্রম করে গেলেন। এই সাত দিনে তিনি একটি বারের জন্যেও নিজের আসন ছেড়ে উঠলেন না ; কোনো কিছুই গ্রহণ করলেন না।

একসময় তঁার মধ্যেকার চেতনা তঁাকে পৌঁছে দিল চূড়ান্ত সত্যোপলব্ধির স্তরে। তঁার মনে হল এতদিন ধরে তিনি যে-সত্যের সন্ধান করছেন সেই সত্যের সন্ধান পেয়েছেন। জগৎ ও জীবনের সব রহস্যই আজ তার কাছে সূর্যের আলোর মতোই প্রকাশমান।

নিজের অন্তরেই তিনি বলে উঠলেন, আমার জন্ম, জন্মান্তরের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হল এতদিনে। আমি সমস্ত জরা-ব্যাধি-মৃত্যুর বন্ধনকে ছিন্ন করেছি। আমি উপলব্ধি করেছি_পরম আনন্দের স্বাদ। এই মহাজ্ঞান, এই বোধ, উপলব্ধিই চরম। এর উপরে আর কোনো সত্য নেই।

ডান হাত প্রসারিত করলেন পৃথিবীর দিকে। সকল মানুষকে তিনি অভয় দিচ্ছেন। বাঁ হাত তুলে ধরলেন আকাশের দিকে। প্রসন্ন করলেন দেবতাদের। জগৎ সংসার তঁার জয়গানে মুখর হয়ে উঠল। তিনি এখন বুদ্ধ।

“জন্ম জন্মান্তর পথে ফিরিয়াছি, পাইনি সন্ধান। / সে কোথা গোপন আছে, এ গৃহ যে করেছ নির্মাণ। /পুনঃ পুনঃ দুঃখ পেয়ে দেখা তব পেয়েছি এবার।/ হে গৃহ কারক। গৃহ না পারিবি রুচিবারে আর, /ভেঙেছে তোমার স্তম্ভ, চুরমার, গৃহভিত্তিচয়,/সংস্কার বিগত চিত্ত, তৃষ্ণা, আদি পাইয়াছি ক্ষয়।’’ বুদ্ধদেব (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর)

এই বোধের আলোয় বোধিসত্ত্ব সিদ্ধার্থ গৌতম হয়ে উঠলেন মহাজ্ঞানী বুদ্ধ। যে-বৃক্ষের তলায় বসে সেই পরমজ্ঞানকে উপলব্ধি করলেন সেই বৃক্ষ সমস্ত বৌদ্ধ জগতের কাছে পরম পবিত্র বোধিবৃক্ষ।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%