গভীর গহন এক রাত

চঞ্চলকুমার ঘোষ

িচন েদশের দক্ষিণে চাঙ-আন নগর। েছাটো নগর। নগরের প্রান্তে মহাবোধি বৌদ্ধ বিহার। সমস্ত বিহার জুড়ে ছড়িয়ে আছে শান্ত নিস্তব্ধতা। বিহারের সব সন্ন্যাসীরাই ঘুমিয়ে আছেন।

শুধু বিহারের নির্জন এক কক্ষে বসেছিলেন তিনি। চোখে ঘুম নেই। অধিকাংশ রাতই তঁার এই ভাবে কেটে যায়। সমস্ত অন্তর জুড়ে অস্থির উন্মাদনা। কোনো কাজে মন বসে না। আসলে গভীর এক অতৃপ্তি আর তৃষ্ণা। যা জেনেছেন, যা শুনেছেন তাতে পূর্ণ হয়নি তঁার হৃদয়। মনের মধ্যে দানা বেঁধে উঠেছে কত অসংখ্য জিজ্ঞাসা। জানেন আরও কিছু আছে, যাকে তিনি জানতে চান, অনুভব করতে চান। তঁার চারপাশে যাঁরা আছেন তঁারা বিদ্বান, সর্বোত্তম সম্মানের যোগ্য কিন্তু কেউ একজনও নেই, যাঁরা তঁার অনন্ত তৃষ্ণাকে পূর্ণ করতে পারেন।

দীর্ঘক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকেন। হঠাৎ মুখ তুলে তাকালেন। চারদিকে অন্ধকার। এই অন্ধকারের মধ্যে সময়ের কোনো হিসাব নেই। এখন রাতের কত প্রহর তিনি জানেন না। তবে অনুমান করতে পারেন মধ্যরাত্রি পার হয়ে গিয়েছে। মনে হল ধ্যানে বসবেন। তাতে মনের এই উদ্বেলতা থেকে সাময়িক মুক্তি পাবেন। তারপর...। আবার সেই উদ্বেলতা, অস্থিরতা_শূন্য জায়গায় যেমন বাতাস ছুটে আসে। চিন্তাস্রোতের ঢেউ এসে আগের মতোই আছড়ে পড়বে মনের মধ্যে।

আর কতক্ষণ এইভাবে বসে থাকবেন। ভালো লাগে না। উঠে দাঁড়ালেন। বিশাল কক্ষ। কক্ষের মধ্যে জমাট অন্ধকার। এত গাঢ় সে অন্ধকার, কোনো কিছুই চোখে পড়ে না। তবুও তঁার অসুবিধে হয় না। তিনি জানেন কক্ষের আয়তন। কোথায় কী আছে। আসলে তঁার অন্তরমধ্যে সব ছবি আঁকা। একটিমাত্র দরজা। তিনি যেখানে বসে আছেন ঠিক তার একেবারে সামনে। ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন সেই দিকে।

কক্ষের দুই ধারে দু-জনের বিছানা। তিনি আর হুই-তি। হুই-তি নিতান্তই কিশোর। সবেমাত্র সতেরোয় পা দিয়েছে। তঁাকে স্নেহ করেন। হুই-তির নাক ডাকার শব্দে ঘরের শান্ত বাতাস ক্ষীণভাবে আন্দোলিত হচ্ছিল। সেই দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। ভারী শীতবস্ত্রের নীচে কেমন করে হুই-তি ঘুমিয়ে আছে তাও তিনি যেন দেখতে পাচ্ছেন। গভীর ঘুম। ভোরের ঘণ্টাধ্বনির আগে তার এই ঘুম ভাঙবে না। বড়ো নিশ্চিন্ত এই ঘুম। ওই বয়েসেও তঁার এমন ঘুম হত না। এক এক সময় মনে হয় তিনি তো এদের মতোই হতে পারতেন। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত একই নিয়ম মেনে চলা। আচার্যরা যা শিক্ষা দেবেন তাই, কোনো জিজ্ঞাসা ছাড়াই মেনে নেওয়া। কেমন এক বেদনার ছায়া পড়ে নিজের মধ্যে। পরমুহূর্তে নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দেন। পৃথিবীর সব মানুষ বোধহয় সমান হয় না।

হুই-তির বিছানা পার হয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। একটি পদক্ষেপও ভুল হল না। বন্ধ দরজা। নিচু হয়ে দরজার আগলে হাত রাখলেন। আগল খুলে চাপ দিতেই সামান্য ফাঁক হল কপাট। মুহূর্তে তিনি অনুভব করলেন বাইরের হিমেল বাতাসের স্পর্শ। পশমের পোশাকের প্রান্তটুকু তুলে দিলেন মাথার উপর। দরজা খুলে বার হয়ে এলেন। জানেন কক্ষের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে হুই-তি। সাবধানে দরজার কপাট বন্ধ করে দিলেন।

সামনে অনেকখানি প্রশস্ত অলিন্দ। এখন চারদিক নিস্তব্ধ। নিস্তব্ধতা এত গাঢ় যে নিজের নিশ্বাসের শব্দটুকুও স্পষ্ট শোনা যায়। দিনেরবেলায় এই অলিন্দ, ভিক্ষুদের চলাচল, তাদের পদশব্দ, তঁাদের মন্ত্রধ্বনিতে মুখর হয়ে থাকে।

কিছুক্ষণের জন্য তিনি স্থির হয়ে রইলেন। হয়তো কিছু ভাবলেন। জানেন এখন সকলেই ঘুমিয়ে আছেন। তবুও একবার চারদিকে তাকালেন। মধ্যরাতে নিজের এই উপস্থিতি কারও কাছে প্রকাশ করতে চান না।

সামনের অলিন্দটুকু অনেকখানি দীর্ঘ। দু-দিকেই পর পর কক্ষ। সব কক্ষেরই দরজা বন্ধ। প্রত্যেকটিই বৌদ্ধ শ্রমণদের বাসস্থান। অলিন্দের দুই প্রান্তে দু-টি পাথরের উপর প্রদীপ জ্বলছিল। তার মৃদু আলোর আভা ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিক। বড়ো স্তিমিত, তবু সবকিছু চোখে পড়ে। অলিন্দের দুই ধারে কারুকার্যময় পাথরের থাম।। প্রত্যেকটি থামের গায়েই ভগবান বুদ্ধের জীবনকালের নানা দৃশ্য খোদাই করা। কোনোটিই স্পষ্ট নয়। সবগুলোই স্থূল শিল্পকর্মের নমুনা। অপটু কোনো শিল্পীর সৃষ্টি। মাঝখানে একটি কুলুঙ্গির মধ্যে অবলোকিতেশ্বরের মূর্তি। ভগবান বুদ্ধের এই রূপ বড়ো ভালো লাগে। হাতের মুদ্রায় সকলকে যেন বলছেন তোমরা আমার শরণ নাও, জীবনের সকল দুঃখ থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাবে। প্রদীপের ক্ষীণ আলো কুলুঙ্গির মধ্যে প্রবেশ করেনি। সেখানে অন্ধকার। মূর্তিটি এক হাতের বেশি নয়। কালো পাথরের এই মূর্তির সামনে এসে দাঁড়ালেই আশ্চর্য অনুভূতি জেগে ওঠে। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই মুহূর্তে কোনো কিছু ভালো করে চোখে পড়ছিল না। তবুও মাথা নিচু করে প্রণাম করলেন। আবার সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন।

অলিন্দের একেবারে প্রান্তে একটি বাতি জ্বলছিল। সেখানে পথ দুটি ভাগ হয়েছে। একটি প্রার্থনা কক্ষের, অপরটি বিহারের মূল ফটকের দিকে গিয়েছে। এখন ফটক বন্ধ। সেই দিকে অন্ধকার। প্রার্থনা কক্ষের সামনে একটি দীপ জ্বলছিল। বাতাসে তার পোড়া গন্ধ। এই অবরুদ্ধ অলিন্দ, যেখানে কখনো সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না, বাতাস খেলা করে না, পাথরের পরতে পরতে জমে থাকা শ্যাওলার বিচিত্র গন্ধ। এ সব কিছুতেই তিনি অভ্যস্ত। বাইরের মানুষের কাছে অসহনীয় হলেও তঁার কোনো অনুভূতি জাগে না।

তিনি প্রার্থনা কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন। কাঠের বন্ধ দরজা। বিশাল। প্রায় ছাদ স্পর্শ করেছে। ততখানিই প্রশস্ত। নীচ থেকে উপর পর্যন্ত সমস্ত দরজা জুড়েই কারুকার্য। বিশেষ বিশেষ উপলক্ষ্যে সম্পূর্ণ দরজা খোলা হয়। একদিকে ছোটো কাটা অংশ। এই কাটা অংশ দিয়ে সকলে যাতায়াত করে। এখন সেটিও বন্ধ। সামনের হাতল ধরে কয়েক বার টান দিতেই সেই ছোটো দরজাটি খুলে গেল। মাথা নত করলেন তিনি। অস্ফুটে কিছু উচ্চরণ করলেন। তঁার ঠোঁট দুটি সামান্য নড়ে উঠল। তারপর ধীরে কক্ষের মধ্যে পা বাড়িয়ে দিলেন। বিশাল কক্ষ। কয়েক-শো মানুষ স্বচ্ছন্দে এখানে একসঙ্গে প্রার্থনা করতে পারে। কক্ষের একদিকে সাদা পাথরের বেদি। তার উপর ভগবান বুদ্ধের ধ্যানরত মূর্তি। বিশাল সে মূর্তি। চোখ দুটি বন্ধ। সামনে চারটি বাতি জ্বলছে। এ বাতি কখনো নেভানো হয় না।

তিনি নতমস্তকে তথাগতের সামনে এসে দাঁড়ালেন। কোনো দিকেই তঁার দৃষ্টি নেই। দীপশিখায় এই প্রথম উদ্ভাসিত হয়ে উঠলেন মানুষটি। দীর্ঘদেহ। তারুণ্যের দীপ্তিতে উজ্জ্বল। সবেমাত্র সাতাশ অতিক্রম করেছেন। শান্ত সৌম্য বুদ্ধিদীপ্ত মুখ। পরনে পীতবর্ণের রেশম বস্ত্র। পা দুটি ছাড়া সমস্ত দেহই আবৃত।

ধীরে ধীরে দৃষ্টি মেলে ধরলেন ভগবান বুদ্ধের মুখের দিকে। কী গভীর প্রশান্তি! যা দুঃখকে জয় করে। তাপকে শীতল করে। প্রশমিত করে অন্তর বেদনার সকল জ্বালা। তৃষিত মানুষের নিবারিত হয় তৃষ্ণা। সকল শান্তির আশ্রয়স্থল ওই মুখমণ্ডল। নতজানু হলেন তিনি। তঁার সমস্ত অন্তর জুড়ে বেদনার গাঢ় ছায়া। অসহায় এক যন্ত্রণা। তঁার আকাঙ্ক্ষা। তঁার স্বপ্ন। তিনি জানেন না অনাগত ভবিষ্যৎ। শুধু জানেন এই বিশ্বপ্রকৃতির কেউ তঁার সঙ্গী নয়। তিনি একা। একমাত্র সম্বল ভগবান তথাগতের আশীর্বাদ। সেই আশীর্বাদ কি করুণাধারার মতো তঁার উপরে নেমে আসবে না  ? এই অন্তর্ভেদী যন্ত্রণাকে বয়ে নিয়ে যেতে হবে আরও কতদিন ? নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকেন। কক্ষের শীতল বাতাসে তঁার ঠোঁট দুটি কেঁপে ওঠে।

রাত শেষ হয়ে আসে। আর অল্পক্ষণ পরেই বিহারের সকলে জেগে উঠবে। শ্রমণেরা আসবেন এই প্রার্থনা কক্ষে। সমবেত মন্ত্রধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠবে সমস্ত বিহার। শুরু হবে দিনের কর্মচাঞ্চল্য। চারটি বাতিদানের দুটি প্রদীপ প্রায় নিভু নিভু। পাশে রাখা একটি কাঠি দিয়ে শিখাটিকে সামান্য বাড়িয়ে দিলেন তিনি, তারপর ধীর পদক্ষেপে বার হয়ে এলেন। ছোটো দরজাটি বন্ধ করলেন। এই মুহূর্তে আর শয়নকক্ষে যেতে মন চাইছিল না। প্রার্থনাকক্ষের বিপরীত পথ ধরলেন। অন্ধকার অলিন্দ। সহজভাবেই পথ চলেন। প্রতিটি পদক্ষেপের স্থানই তঁার জানা। একেবারে শেষে উপরের কক্ষে যাবার সিঁড়ি। দু-ধারে দেওয়াল। কোনো বাতি নেই। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। দেওয়ালে হাত রেখে সাবধানে উঠে এলেন। এখানে ওপরের জাফরি দিয়ে সামান্য আলো এসে পড়েছে। আবছাভাবে সবকিছু চোখে পড়ছে। একদিকে গ্রন্থাগার ভবন। কয়েক-শো পুথির সম্ভার রয়েছে। প্রত্যেকটি পুথিই তঁার এত পরিচিত, অন্ধকারেও নির্ভুলভাবে তাকে চিহ্নিত করতে পারেন। প্রতিটি পুথিই তঁার পড়া। যদিও এইমুহূর্তে কোনো পুথিই তঁার মনকে আকর্ষণ করে না। গ্রন্থাগার অতিক্রম করে আরেকটি দরজা। বন্ধ কপাট। শিকল খুললেন। সামান্য চাপ দিতেই মুক্ত হল কপাট। সামনে খোলা ছাদ। মাথার উপর সামান্য আচ্ছাদন। চারদিক খোলা। আচ্ছাদনের নীচে পাথরের বেদি। তার উপর কয়েকটি আসন পাতা। একটির উপরে এসে বসলেন। বরফের মতো কনকনে বাতাস বইছে।

শেষরাতের অন্ধকার ফিকে হয়ে এসেছে। ক্ষীণদীপ্ত চাঁদ। কয়েকটি তারা আকাশে এখনও জ্বলজ্বল করছে। হিমেল বাতাসে সমস্ত শরীর জুড়ে কম্পন লাগে। তবু ভালো লাগে। অন্ধকার কক্ষে পাথরের চার দেওয়ালের চেয়ে এই মুক্ত পৃথিবী অনেক মনোরম। এই পৃথিবীই তঁাকে প্রতিমুহূর্তে আকর্ষণ করে চলেছে। মুখ তুলে তাকালেন। চারদিকে পাহাড়। তার ওপারে আরও পাহাড়। ওই পাহাড়ের সীমানা পেরিয়ে অহরহ এক ডাক প্রতিমুহূর্তে শুনতে পাচ্ছেন। কার কাছে প্রকাশ করবেন সেই ব্যাকুলতা। সকলে বিদ্রূপ করে। উপহাস করে। ভয় দেখায়। ভয়ংকর সে যাত্রা পথ। মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর। দ্বিধান্বিত অন্তর।

মুখ ফেরালেন দক্ষিণ আকাশে। উজ্জ্বল একটি তারা। হীরকখণ্ডের মতো জ্বলজ্বল করছে। কয়েকদিন ধরেই ওই তারাটিকে দেখছেন। ও কি কোনো বার্তা নিয়ে এসেছে  ? নিজের অন্তরে নিজেই প্রশ্ন করেন। উত্তর পান না। শুধু জিজ্ঞাসা আর অসহায় আর্তি। ভগবান তথাগত কি তঁার ডাক শুনবেন না  ? দু-চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নামে।

দু-একটি রাতজাগা পাখি মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়। পাহাড়গুলো প্রহরীর মতো স্থির। চুপ করে বসে থাকেন তিনি। পশমের আবরণটুকু আরেকটু মাথার উপর টেনে দিলেন। কপালের অনাবৃত অংশটুকু ঢাকা পড়ে যায়। জোরে বাতাস বয়। দু-চোখে তন্দ্রা নামে। হয়তো বা ঘুমের ঘোর। কতদিন এখানেই তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। ভোরের আলোয় ঘুম ভেঙেছে।

কয়েক মুহূর্ত কিংবা দীর্ঘক্ষণ। আচমকা ঘুম ভেঙে গেল। দূর থেকে যেন কোনো শব্দ ভেসে আসছে। শুনতে পাচ্ছেন চারপাশে প্রবল শব্দতরঙ্গ। ভালো করে ঘুমের ঘোর কাটেনি। তবুও অনুভব করবার চেষ্টা করলেন তিনি কোথায়। তিনি শুয়ে ছিলেন বিহারের ছাদে, পাথরের বেদির উপর। তাহলে এ শব্দতরঙ্গ কোথা থেকে আসছে ?

চোখ মেলে তাকালেন। মুখ ফেরালেন। বিস্ময়ে চমকে উঠলেন। এ তো, যেখানে শুয়ে ছিলেন সেই পাথরের কঠিন শয্যা নয়, কোমল এক শয্যা! চারপাশে ঘন অন্ধকার। আলো নেই। সব কিছু অদৃশ্য। মনের সমস্ত অনুভূতি নিস্ক্রিয় হয়ে গিয়েছে। শুধু শুনতে পাচ্ছেন সমুদ্র তরঙ্গের গর্জন আর বয়ে চলা প্রবল বাতাসের শব্দ। তরঙ্গের তালে তালে তঁার দেহ উঠছে আর নামছে। মাথার উপর নক্ষত্রেরা টিপটিপ করে জ্বলছে।

তিনি ভেসে চলেছেন, কিন্তু কোথায়? ওই নক্ষত্রের দেশে না মৃত্যুর পরপারে ? দেহ-মন জুড়ে আতঙ্কের নিঃশব্দ স্রোত বয়ে যায়। ভয়ে শিউরে উঠলেন। তবে কি তঁার জীবনের শেষক্ষণ এসে গিয়েছে ?

মুহূর্তে বিশ্ব-চরাচর জুড়ে আলোড়ন শুরু হয়ে গেল। সমুদ্রের প্রবল গর্জন। ঝোড়ো বাতাসের দাপাদাপি। হিমশীতল বরফের স্রোত। কারা ভয়ংকর উল্লাসে চিৎকার করছে। তারা বলছে, আমরা জরা, আমরা ব্যাধি, আমরা মৃত্যু। হিংস্র শিকাির কুকুরের মতো লকলক করছে তাদের দাঁত আর জিভ। সব কিছুকে যেন ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলতে চাইছে। সকলে পালাতে চাইছে তাদের কাছ থেকে। কেউ পালাতে পারছে না। সব ঝরে পড়ছে। নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ঝড়ের সামনে টুকরো পাতার মতো। চারদিকে শুধু হাহাকার।

আতঙ্কে নিজের অস্তিত্বের সত্তাটুকু বিলুপ্ত হয়ে আসে। প্রাণের ব্যাকুলতায় তঁার কণ্ঠ থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে এল_প্রভু রক্ষা কর। রক্ষা কর।

কয়েক পল মাত্র। তারপরই সব শান্ত। ঘন অন্ধকারের বুক চিরে ফুটে উঠল আলোর রেখা। বাতাসে ফুলের সৌরভ। ক্ষীণ মন্ত্রধ্বনি। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন। একটি শ্বেতপদ্ম, তার উপরে শুয়ে আছেন তিনি। মুগ্ধ বিস্ময়। ধীরে ধীরে চেতনার জগতে ফিরে এলেন। এ তিনি কোথায় ?

উঠে দাঁড়ালেন। চারদিকে তাকালেন। বিরাট এক পর্বতশৃঙ্গের উপর তিনি বসে আছেন। চারদিকে বিশাল উন্মুক্ত পৃথিবী। দূর প্রসারিত প্রকৃতির মাঝে কত বিচিত্র রং। বিচিত্র দৃশ্য। কী গভীর এক আশ্চর্যময়তা। উত্তরে মুখ ফেরালেন। শুধু সারি সারি পাহাড়। প্রাণ নেই, সবুজের চিহ্ন নেই। বেশিক্ষণ দৃষ্টি মেলা যায় না। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলেন। সময়ের স্রোত বয়ে চলে।

হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে পশ্চিমে। থমকে গেলেন। ধূলিধূসর ধুধু মরুভূমি। একফোঁটা জল নেই। চারদিকে ছড়িয়ে আছে কঙ্কাল আর মরা মানুষের হাড়। মৃত্যুর মতো সর্বগ্রাসী রুক্ষতা। সহ্য করতে পারেন না।

মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তাকালেন পুবে। ঘন গাঢ় কুয়াশার আবরণ। এত গাঢ় সামান্য দূরেও দৃষ্টি থমকে যায়। নরকের অন্ধকার। অস্থির হয়ে ওঠেন মানুষটা। কোথায় জীবন। বুকের মধ্যে এখনও ক্ষীণ আশা। নিজের অজান্তেই দৃষ্টি যায় দক্ষিণে। দু-চোখ মেলে তাকাতেই বিস্ময়ের পলক পড়ে না। সামনে দীর্ঘ পর্বতমালা পার হয়ে দৃষ্টি ভেসে চলেছে।

তিনি দেখতে পাচ্ছেন। চোখের সামনে সব স্পষ্ট। দিনের আলোর মতো। জ্যোতির্ময় এক পুরুষ চলেছেন। তঁাকে ঘিরে দিব্যদ্যুতির বলয়। দীর্ঘ আয়ত চোখ। গভীর প্রশান্ত মুখ। করুণার ধারায় উদ্ভাসিত, তিনি চলেছেন। হাতে ভিক্ষাপাত্র। তঁাকে অনুসরণ করে চলেছেন শত সহস্র মানুষ_সন্ন্যাসী, ভিক্ষু, সাধারণ নাগরিক, সৈনিক, রাজনর্তকী, মন্ত্রী, সেনাপতি, রাজা। সকলের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে একই মন্ত্রধ্বনি। তঁারা চলেছেন।

মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকেন।

সেই আশ্চর্য পুরুষ চলেছেন। কপিলাবস্তু থেকে বুদ্ধগয়া, তারপর সারনাথ, রাজগৃহ, মগধ থেকে বারাণসী...কত নগর গ্রাম, বন, উপবন। যে পথে তিনি চলেছেন উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে সেই পথ। যেন আলোর রেণু ছড়িয়ে দিয়ে চলেছেন।

নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলেন না। উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন, আমাকে তোমার সঙ্গী কর প্রভু।

সেই জ্যোতির্ময় পুরুষ মুখ ফেরালেন। জগতের সব প্রেম যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে তঁার দুই চোখে। মনে হল ওই দৃষ্টির মাঝে সকলকে যেন আহ্বান করছেন।

তিনি বিবশ। চেতনার গভীর থেকে ধ্বনি জেগে ওঠে, আমি যাব তোমার কাছে। ওই আলোর পথ ধরে।

অধ্যায় ১ / ৪৬
সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%