পল্লবী সেনগুপ্ত
মোবাইলের সেট করা এলাম বাজায় ঘুমটা ভেঙ্গে গেল আকাশের। ঘুম ভাংতেই আবার একবার মোবাইল স্ক্রিনে চোখে পড়ল আজকের দিনটা। আজ ৩রা ডিসেম্বর। আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে ঊর্মি আকাশের জীবনে প্রবেশ করেছিল ওর স্ত্রী হিসেবে। ঊর্মির সাথে যে ওর বিয়ে হতে পারে এ ভাবনা তো ছেড়েই দিয়েছিল আকাশ , ও শুধু চেয়েছিল ভাল থাক ওর ভালবাসার মানুষটা। তাই প্রথববার যখন ঊর্মি টেলিফোনে হুট করে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল ওকে তখন প্রথমে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারে নি আকাশ ।
তারপরেও দেখা করে ঊর্মিকে অনেক বুঝিয়েছিল এই বিয়েটা ঊর্মি মন থেকে করছে না এমনটাই সেদিন বারবার মনে হয়েছিল ওর।
-''দ্যাখ ঊর্মি আমি তোর বেস্টফ্রেন্ড আমি তাই তোর প্রিয় বন্ধু হয়েই থাকতে চাই। কেন এর মাঝে নতুন করে জটিলতা বাড়াতে চাইছিস তুই? আমি জানি হঠাৎ হয়তো তোর জীবনে আচমকা আছড়ে পড়েছে তোর অজানা কিছু পারিবারিক সত্যি। হয়তো সেই কারণে খুব বিচলিত তুই, কিন্তু তা বলে বিয়ের মত জিনিস নিয়ে প্লিজ এভাবে হঠকারিতা করিস না''।
-''আকাশ আমি ভাবতেই পারি নি যে আমি যে মানুষটাকে আমি চিরকাল ঘৃণা করে এসেছি সেই আসলে আমার জন্মদাত্রী। যে বাবাকে আমি ভেবে এসেছি আমার মায়ের মৃত্যুর কারণ আসলে সে আজও জীবনে আমার মাকেই ধ্রুবতারা করে রেখেছে। আমি সত্যি খুব খারাপ রে। শুধু নিজের মত করে সব টা ভাবি। আর কারোর ভাবনটা বুঝতে পারি না।
সবাই বলছে আমি স্কিতজফ্রেনিক। মেঘ বলে কেউ নেই। কিন্তু আমি জানি মেঘ কতটা সত্যি ছিল আমার জীবনে। কিন্তু তেমন এটাও তো ঠিক যে মেঘ যদি সত্যি আমায় ভালবাসত তাহলে কি পারত এভাবে হারিয়ে যেতে! সবাই আমায় নিয়ে খুব চিন্তায়। আমি কোনদিন আমার মা বাবাকে ভালবাসতে পারিনি আকাশ, কিন্তু ওরা আমায় উজাড় করে ভালবেসে গেছে। তাই আজ আমিও ওদের আমায় নিয়ে অহরহ এই দুশ্চিন্তার প্রকোপ থেকে মুক্ত করতে চাই। ওদেরও তো বয়স হচ্ছে বল।
তাছাড়া মেঘ এভাবে হারিয়ে যাওয়ায় আমার জীবনে যে আকস্মিক শূন্যতা এসেছিল সেটা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। আস্তে আস্তে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছিলাম আমি। আর তাই আমার জীবনে আজ এমন একটা মানুষ চাই যে শক্ত করে আমার হাত ধরে থেকে আমাকে আবার জীবনের মূলস্রোতে ফিরিয়ে দেবে। আর সেই ভরসার মানুষটা আমার জীবনে তুই ছাড়া আর কে হতে পারে বল! তবে তুই যদি ফিরিয়ে দিস তবে আমি জোর করব না তোকে। হয়তো আবার হারিয়ে যাব অন্ধকারেই''।
না ঊর্মিকে ফিরিয়ে দেবার মত ক্ষমতা কোনদিন ছিল না আকাশের। সেদিনও তাই পারেনি ও স্বাভাবিক ভাবেই। নিয়ম উয়াপাচার মেনেই মাস খানেকের মধ্যেই বিয়েটা হয়ে গেছিল ওদের।
বিয়ের পর পরও আকাশ খুব একটা স্বচ্ছন্দ হতে পারত না ঊর্মির কাছে। ওর বারবার মনে হত আসলে তো ঊর্মি ওকে চায় নি। চেয়েছিল মেঘ কে। মেঘ যদি কাল্পনিক চরিত্র হয়ও বা, এটা তো ঠিক যে ঊর্মি আকাশকে আসলে চায়নি প্রাথমিকভাবে।
হয়তো খানিকটা এই ভাবনার জেরেই নিজেকে ঊর্মির থেকে সচেতনভাবেই কিছুটা সরিয়ে রেখেছিল আকাশ। কিন্তু বিয়ের দিন পনেরো পর ছিল আকাশের জন্মদিন। সেদিন রাতে ঊর্মি নিজে থেকেই এসে ধরা দিয়েছিল আকাশের কাছে।
-''কেন আমার থেকে সরে সরে থাক তুমি? আমায় কি তবে তুমি স্ত্রী হিসেবে মানতে পার নি''?
ঊর্মির মুখে প্রথমবার নিজের জন্য ' তুমি ' ডাকটায় এক অমোঘ আহ্বান দেখেছিল আকাশ। আর সেদিন পারে নি ও নিজেকে সংযমের বাঁধে বাঁধতে। কাছে টেনে নিয়েছিল নিজের ভালবাসার নারীকে। সেদিন ভোর রাতে ঊর্মি ওর বুকে মাথা রেখে বলেছিল
-''আমি মা হতে চাই আকাশ। আমায় একটা সন্তান দেবে? খুব তাড়াতাড়ি''। ঊর্মির চাওয়া মেনে নিয়ে ওকে পরম আদরে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিল আকাশ।
কিন্তু ঈশ্বর হয়তো আকাশের সুখ চাননি। কেটে গেল এর পর মাস ছয়েক। হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও ঊর্মি সন্তানসম্ভবা হচ্ছিল না কিছুতেই। আকাশ বুঝতে পারছিল আবার আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে ঊর্মি। অধৈর্য হয়ে যাচ্ছে ও। সব সময় খিটখিট করছে। আকাশকেও খুব একটা সহ্য করতে পারছে না আর। ঊর্মির মানসিক কষ্টটা বুঝেই ওরা দুজন মিলে গিয়েছিল নাম করা ডাক্তারের কাছে। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা হল। সব কিছুর পরে দেখা গেল ঊর্মির কোন সমস্যা নেই, সমস্যাটা আকাশের। ওর স্পারম কাউন্ট এতই কম যে বাবা হওয়া সম্ভব নয় ওর পক্ষে। রিপোর্টটা নিমেষে যেন মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল ওকে লজ্জায়। ধিক্কার জেগেছিল নিজেরই নিজের পুরুষত্বের ওপর। নিজের স্ত্রীকে একটা সন্তান দেবার ক্ষমতাও নেই ওর!
এর পরেও আরও বেশি আঘাত অপেক্ষা করেছিল ওর জন্য। এর দিন পনেরো পর অফিসের কাজে অন্য শহরে গেছিল আকাশ। ঊর্মি জানত দশদিন পর ফিরবে ও। কিন্তু কাজ মিটে যাওয়ায় ও ফিরেছিল সাত দিন পরেই। সেটা আগে থেকে জানায়নি ঊর্মিকে। ভেবেছিল হুট করে পৌঁছে চমকে দেবে ঊর্মিকে। গিয়েওছিল তাই। প্লেন থেকে নেমে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ঢুকেছিল ঊর্মিকে চমকে দেবে বলে। কিন্তু ঊর্মিকে চমকান হয়নি। উল্টে চমকেছিল ও নিজেই।
সেই দৃশ্যটা মনে পড়লে আজও বুকের বাম দিকটা যন্ত্রণায় টনটন করে ওঠে কেমন যেন। নিজের হাতে আঁকা মেঘের সেই পুরনো ছবি বুকে চেপে হাউহাউ করে কাঁদছে ঊর্মি আর বিলাপ করছে পাগলের মত।
-''কেন তুমি চলে গেলে মেঘ আমায় অসম্পূর্ণ করে দিয়ে? আমি যে কিছুতেই তোমায় ভুলতে পারছি না হাজার চেষ্টা করেও। সত্যি কি তুমি নেই? কেন তুমি আর ফিরে এলে না বল। আমি তো নতুন করে সব শুরু করতে চেয়েছিলাম তোমায় ভুলে। সব কিছু স্মৃতি ভোলার জন্য আমি একটা নিজের অংশ চেয়েছিলা, নিজের সন্তান সেটাও যে আমি পাব না কোনদিন''।
নিঃশব্দে ঊর্মির চোখের আড়ালে চলে গেছিল আকাশ। ঊর্মি সেদিন টেরও পায়নি ওর উপস্থিতি। তারপর থেকে আরও অনেক মানসিক দূরত্ব বেড়ে গেছে ওদের মধ্যে। আকাশ সব সময় এখন পালিয়ে থাকতে চায় ঊর্মির থেকে। সত্যি তো ও ঊর্মির অপরাধী। ওর চোখে চোখ রাখতেই লজ্জা করে আজকাল। ঊর্মিও ভীষণ এড়িয়ে চলে আকাশকে। আকাশ জানে আজও ওর মন জুড়ে শুধুই মেঘ।
মাঝে মাঝে খুব আফসোস হয় আকাশের। কেন বিয়েটা করতে গেল ঊর্মিকে! বিয়েটা না হলে অন্তত ও ঊর্মির প্রিয় বন্ধু হয়ে তো থাকত। এই ভাঙ্গা চোরা দাম্পত্যটা তো খুন করে ফেলেছে সেই নির্ভেজাল বন্ধুত্বটাকেও।
বিছানায় আস্তে আস্তে উঠে বসল আকাশ। আজ ওদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী। ইচ্ছে করেই আজ শহর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে ও অফিস ট্যুর নিয়ে ঊর্মির সামনে না থাকার জন্য। এখন ও পুনে শহরে। আগামীকাল যাবে মুম্বাই। একটা বিজনেস মিটিং আছে এক নামজাদা ক্লায়েন্টের সাথে। তারপর ক্লায়েন্টের সাথে যেতে হবে এক ঝাঁ চকচকে ডিস্ক পার্টিতে। এত কিছুর পর মিলবে ছুটি।
মোবাইলটা আনমনে টিপল আকাশ। অমনি স্ক্রিনে ভেসে উঠল ঊর্মির হাসিমুখের ছবি। এটাই অয়ালপেপার ওর ফোনের। ভীষণ ইচ্ছে করছে একবার ওকে ফোন করে উইশ করতে। কিন্তু কি লাভ! যে বিয়েটা মেয়েটাকে কষ্ট ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি সেই বিয়ে নিয়ে আদিখ্যেতা কেন সহ্য করবে ও!
কিন্তু আকাশ যে ওকে আজও সেই আগের মতই ভালবাসে। সেটা কি আদৌ বোঝে ও ? আকাশের ভাগ্যেও কোনদিন কি জুটবে নিজের প্রিয়তমার নিঃশর্ত ভালবাসা?
ঊর্মির ছবিটার দিকে কয়েক মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে রইল আকাশ। অস্ফুটে বলল
-''ভাল থেকো ঊর্মি। ঈশ্বর তোমার সব মনকামনা পূরণ করুন''।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।