পল্লবী সেনগুপ্ত
রঙ মাখা ক্যানভাসটার সামনে অপলক দৃষ্টি মেলে এক মনে কি যেন দেখেই চলেছে ঊর্মি। ছবিটা অনেকটা শেষ হয়ে এসেছে। সব কিছু হুবুহু স্বপ্নের রঙেই সাজিয়ে তুলেছে ও। শুধু একটুর জন্য যেন অসম্পূর্ণ লাগছে ফ্রেমটা।
একটা লালচে আবীর ধোয়া আকাশ। গৃহাভিমুখী সূর্য বিদায় নিচ্ছে ছেঁড়া ছেঁড়া তুলোর মত ছড়িয়ে থাকা মেঘগুলোর ফাঁক গলে।একটা কাঁচের মত স্বচ্ছ টলটলে নীল জলের নদী। আকাশ জোড়া ঘরমুখো পাখীর কলরব। আর? নদীর পাড়ে পিঠ করে বসে থাকা একজন মানুষ নিবিষ্ট মনে বেহালার ছড় টনে সৃষ্টি করছে একটা অদ্ভুত মাদকতার সুর। যে সুরটা আসলে ঊর্মির বড্ড চেনা। যে সুরটা যেন গত জন্ম থেকে তাড়া করে চলেছে ওকে।
এই সুরটা কি তবে সত্যি জন্ম জন্মান্তরের চেনা? মাঝে মাঝে মনে হয় ঊর্মির। কে আছে ওই সুরের আড়ালে? কেন বারবার ছোটবেলা থেকেই এই স্বপ্নটা বারবার ফিরে ফিরে আসে ওর কাছে? কেন? বেহালা বাজান মানুষটার মুখ কোনবার দেখতে পায় না ও? প্রতিবার যখনই ও দেখতে যায় ওই মানুষটার মুখ ঠিক তখনই সব সময় ভেঙে যায় কেন ওর স্বপ্নটা?
অনেকগুলো প্রশ্ন। আর এই সব কটার উত্তরই খুঁজে চলেছে ও অনেক দিন থেকে। কিন্তু পায় নি। জানাও নেই কোথায় আছে এই উত্তরগুলো।
—''ঊর্মি শুয়ে পড় নি তুমি এখনও? আগামীকাল থেকে তোমার একটা নতুন জীবন শুরু হচ্ছে। নতুন কলেজ শুরু হবে তোমার। তাই আজ এভাবে রাত জাগা তোমার ঠিক নয়।''
আবার! আবার শুরু হয়েছে শ্রুতি রায়ের জ্ঞান। কখন যেন সে চলে এসেছে ঊর্মির ঘরে। রাগে গা টা রিরি করে জ্বলে উঠল ওর । এত বছরেও কি এই মহিলা বোঝেন নি যে ঊর্মি তাকে একদম অপছন্দ করে।অবশ্য এত কিছু ও বুঝলে তো হয়েই যেত। আশ্চর্য রকম নির্লজ্জ এই মহিলা। অবশ্য যাকে নিজের সংসার গড়ার জন্য নিজের দিদির সংসার ভাংতে হয় তাকে নির্লজ্জ বললে বোধ হয় ওই 'নির্লজ্জ' শব্দটাও অপমান বোধ করবে।
—''আমি জানি আমার আগামীকাল থেকে কলেজজীবন শুরু। তাই দায়িত্ব আমারও আছে। আমায় নিয়ে তোমায় মাথা ঘামাতে হবে না ছোট মা''।
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন শ্রুতি রায়, কিন্তু ঊর্মি সুযোগ দিল না। বেশ দৃঢ় স্বরে বলল
—''আমি ঠিক ঘুমিয়ে পড়ব। তুমি ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়''। এবার আর কিছু বলতে পারলেন না শ্রুতি দেবী। নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন ঊর্মির ঘর ছেড়ে।
ভদ্রমহিলা বেরিয়ে যেতেই মায়ের ছবির সামনে আছড়ে পড়ল ঊর্মি। কাঁদছে পাগলের মত
—''মা আমায় কেন তুমি তোমার সাথে নিয়ে মরে গেলে না? আমার যে এই পৃথিবীতে একটুও থাকতে ইচ্ছে করে না''।
মাকে বড্ড আবছা আবছা মনে পড়ে ঊর্মির, মা ওকে খুব আদর করতেন। তবে মাত্র পাঁচ বছর বয়স মাতৃবিয়োগ হয়েছিল ওর। তারপর থেকেই মনে একটা শূন্যতা তৈরি হচ্ছিল। হয়তো আরও সেই জন্যই বাবা আর শ্রুতির বিয়েটা কোনদিন মেনে নিতে পারে নি ও। নিজের দিদিকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়ে তার ঘরেই বসে সংসার কছে ওই মহিলা।
অনর্গল প্রলাপ বকছে ঊর্মি। কাঁদছে। পাগলের মত। কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়ল একসময়।
আবার এল সেই স্বপ্ন। যথারীতি ঊর্মি আস্তে আস্তে এগোচ্ছে ওই বেহালা বাজান মানুষটার দিকে।
—''কেন? কেন আমায় ছেড়ে চলে যাও তুমি বারবার। বল? বল ''। পাগলের মত ঝাঁকাচ্ছে ঊর্মি তাকে।
ধীরে ধীরে মানুষটা আজ মুখ ফেরাল ঊর্মির দিকে। আর অমনি চমকে উঠল ঊর্মি। এ কে? এ কে তো ও চেনে না।
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ঊর্মি, কিন্তু বলা হল না, তার আগেই মোবাইল ফোন বেজে উঠল । আর স্বপ্নটাও গেল ভেঙ্গে।
অপ্রয়োজনীয় ফোনটার পর্ব শেষ করতেই মনটা ফের বিষিয়ে উঠল ওর। আজ প্রথমবার স্বপ্নে হলেও এসেছিল সে, হয়তো নিজের মুখটা ঊর্মিকে দেখাবে বলেই।
বিছানায় বসে এবার তিরতির কাঁপছে ঊর্মি। এই স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা লোকটা আসলে কে? কোথায় ও খুঁজবে তাকে? কেন সে আজ দেখিয়ে গেল নিজের মুখ? নিজের বাস্তব জীবনে কোনদিনও কি খুঁজে পাবে ঊর্মি ওই মুখটাকে?
এতদিন তো ঊর্মি বাড়ির গণ্ডি আর স্কুলের পরিসরের বাইরে কোথাও পা রাখে নি। এই প্রথম কলেজে যাওয়ার মাধ্যমে বৃহত্তর পৃথিবীর সাথে যোগ স্থাপন হবে ওর। আচ্ছা কলেজ জীবনের আঙিনাতেই কোন ভাবে লুকিয়ে নেই তো স্বপ্নে লুকিয়ে থাকা মানুষকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনার কোন যোগসূত্র?
ভাবনাটা মাথায় আস্তেই হৃদয়টা কেমন যেন দুলে উঠল ঊর্মির। তবে কি সত্যি জীবনের সব একাকীত্ব আর শূন্যতা পেরিয়ে তাকে কাছে পাবার দিন এসে গেছে?
হ্যাঁ তাই। ঊর্মির ষষ্ঠইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে এবার বদলে যাবে ঊর্মির জীবন। ও খুঁজে পেতে চলেছে নিজের মনের আর স্বপ্নের মানুষ। আর কয়েক দিনের মধ্যেই চারপাশটা একদম বদলে যাবে ওর। ঊর্মিও এবার রঙ তুলিতে ফুটিয়ে তুলবে ভালবাসার এক অনবদ্য জলছবি, যে জলছবি শুধু অমূর্ত ভাবনায় লুকিয়ে থাকে না ; ভালবাসার এ জলছবিকে ছুঁয়ে দেখা যায় আর অনুভব করা যায় এর প্রতিটি রঙ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।