পল্লবী সেনগুপ্ত
—''আজিজ, আজিজ কি করলি এটা তুই? তুই রোজা রাখার সময় খাবার খেয়ে ফেললি? হে আল্লাহ! কি হবে এই ছেলের! এ তো জাহান্নামে যাবে। আল্লাহ তুমি মাফ করো এই ছেলেটাকে''। ছেলেকে মুড়ি চিবাতে দেখে হা হা করে উঠল সালমা।
আজিজ মায়ের এই হা হুতাশ দেখে একটুও বিচলিত হল না। উল্টে আরও হাসছে খিক খিক করে।
—''কেন কি করবে তোমার আল্লাহ আমার? আমায় জাহান্নামে পাঠাবে? এমনিতেও বা কোন জন্নতে আছি আমি''? বলেই ফের মুড়ি খাওয়ায় মন দিল আজিজ।
—''তুই চুপ কর। ছি! ছি! এই তুই মুসলমান ঘরের ছেলে আছিস? তুই জানিস তোর নানাজান মানে আমার আব্বু কত নিষ্ঠা করতেন এই রমদানের সময়? তুই আমায়ও কি কোনদিন দেখেছিস রোজা নিয়ে ছেলেখেলা করতে''? চিৎকার করেই যাচ্ছে সালমা।
—''না দেখিনি। সব সময়তেই দেখেছি তুমি নিয়ম করে নামাজ পর, মসজিদে যাও। ভক্তির তোমার শেষ নেই। কিন্তু তাতে লাভটা কি হয়েছে? তোমার আল্লাহ কি আমাদের জীবনে কিছু ম্যাজিক ঘটিয়েছে কখনো? না ঘটায় নি। আমরা যেমন অন্ধকারে ছিলাম, তেমনি থেকে গেছি। তুমিও শুধু লাঞ্ছনাই পেয়ে গেছ আজ পর্যন্ত আমিও তাই-ই পেয়ে গেছি।একজন কুমারী মা হিসাবে তুমি আর কুমারী মায়ের ছেলে হিসাবে আমি সমাজে চিরকাল হাসি, ঠাট্টা আর ব্যঙ্গ বিদ্রূপের পাত্রই হয়ে এসেছি। তাই তোমার? আল্লাহকে আমি মানি না। আর মানবও না মা''। এবার গলা শক্ত হয়ে উঠেছে আজিজের।
—''মা! ফের আমায় মা বলেছিস তুই? তোকে আমি বারবার বলেছি না মা শুনতে ঘেন্না হয় আমার। মা ডাকটা শুনলেই আমার বেইমান জাতটার কথা মনে পড়ে যায়। বেইমান হিন্দুর জাত। মা ওরা বলে। তুই কেন বলবি? আম্মি ছাড়া আর যেন কিছু না শুনি আমি''। গলার পারদ এবার আরও চরল সালমার।
—''ভিত্তিহীন কথা বার্তা বল না। কোন যুগে আটকে রয়েছে তুমি? হিন্দুর জাত, মুসলমানের জাত বলে আলাদা কিছু হয় না। যা থাকে তা আসলে আমাদের মনে। আমরা মানে মানুষরা ইচ্ছা করেই নিজের জাতের লোকদের ধোয়া তুলসি পাতা সাজিয়ে আর বাকীদের ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে দিই। কিন্তু এটা ঠিক নয়। হিন্দুদের কিছু মানুষ খারাপ থাকতেই পারে, কিন্তু তা বলে সবাই তো আর খারাপ নয়। তেমনি আমাদের জাতেও তো ভাল খারাপ মিশিয়েই লোকজন থাকে''।
—''সেই তো। তুই তো হিন্দুর ধামা ধরবিই। আসলে তো তোর শিরায় বইছে ওই বেইমান হিন্দু বাঙ্গালি লোকটার রক্তই। আর তোকে কে শেখাচ্ছে এসব? প্রেম করছিস তুই''?
—''এর জন্য প্রেম করার দরকার নেই। একটু চারপাশে তাকালেই দেখা যায়। আমি জাত ধর্ম মানি না। আমার কাছে মা আর আম্মির কোন পার্থক্য নেই। আর রইল বাকী ঈশ্বরের ভজনা? সেটা নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না''। এবার একটু বেশিই রুক্ষ শোনাল আজিজের গলাটা।
—''আমি বুঝেছি আজিজ । কিন্তু আমিও তোকে সাফ জানিয়ে দিলাম প্রেম পিরিতের আশনাই তোমার আমি সহ্য করব না। বিয়ে করার স্বপ্ন দেখছিস তুই? শোন আজিজ এসব আমি মেনে নেব না। কিছুতেই না''। হিস্টিরিয়া রোগীর মত হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে চেঁচাচ্ছে সালমা।
পলকেই চোখের সামনে একটা মুখ ভেসে উঠল আজিজের চোখের সামনে। কয়েক সেকেন্ডের মাথাতেই আবার মিলিয়ে গেল সেটা।
—''মা, মা তুমি শান্ত হও। কেন এমন করছ? মা মা''... সালমাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে আজিজ।
—''না মা বিশ্বাস কর আমি প্রেম করছি না। বিয়েও করব না''। মাকে আশ্বাস দিতে আপ্রাণ লড়ে যাচ্ছে ছেলেটা।
এবার একটু শান্ত হল সালমা। কি অদ্ভুত ভাবে যেন চেপে রেখেছে ছেলের হাত।
মনে মনে হাসছে আজিজ। বিয়ে! না এসব আকাশ কুসুম ভাবনা নিয়ে ও একফেঁটাও ভাবে না ও । কিন্তু বিয়ে করতে পারবে না বলে, বা জন্ম থেকেই ওর ভাগ্যটা একেবারে নষ্ট বলে তো ওর কাউকে ভাল লাগবে না বা ভালবাসার ইচ্ছা করবে না এমন হয় না।
হ্যাঁ আজকাল ওকে ভাল লাগে আজিজের। বড্ড বেশি ভাল লাগে, আর এত বেশি ভাললাগাটাকেই বোধ হয় ভালবাসা বলে। হ্যাঁ ওকে ভালবেসে ফেলেছে আজিজ। কিন্তু এই ভালবাসাটা আসলে অন্যায় সেটা যে ও হাড়ে হাড়ে জানে।
না যেভাবেই হোক ওকে ভুলতে হবে। ভুলতেই হবে। কিন্তু ওকে ভুলতে গেলেই কেন যেন আরও বেশি করে মনে পড়ে যায় ওকে।
একনাগাড়ে বকবক করেই যাচ্ছে সালমা। বিশ্ব সংসারের প্রতি রাগ ওর। বিশেষ করে হিন্দুদের প্রতি। অবশ্য যদি কোন বড়লোকের ছেলে দু দিনের জন্য গ্রামে বেড়াতে এসে একটা গরীব ঘরের সোজা সরল মেয়ের মনকে খেলনা বানিয়ে খেলা ধুলা করে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় তার শরীরে একটা অন্য প্রাণ সহ, তাহলে কোন মেয়েরই বা বিশ্ব সংসারের প্রতি বিশ্বাস থাকে!
কিন্তু ঈশ্বর বিশ্বাস আজও অটল মানুষটার। আজিজ ঈশ্বর মানে না। জাত ধর্ম কিচ্ছু মানে না।
সালমা খক খক করে কাশছে আবার। কেন যে কাশিটা সারছে না কিছুতেই। এবার মাকে একদিন ডাক্তারখানায় নিয়ে যেতেই হবে। না, মাকে ভাল রাখবেই ও। মানুষটা অনেক করেছেন ছেলের জন্য। এবার ছেলের পালা। নিজের ক্ষুদ্র পরিসরের চেষ্টায় যতটুকু হয় আর কি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।