পল্লবী সেনগুপ্ত
ঘুম ভাঙতেই বিছানা হাতড়াল আঁখি। না মেয়েটা বিছানায় নেই। কোথায় গেল আবার? তড়িঘড়ি খাট থেকে নেমে ও দৌড়ে গেল মিষ্টি দিদির ঘরের দিকে। হ্যাঁ যা ভেবেছে ঠিক তাই। মেয়েটা এখানেই। মিষ্টিদি মেয়েকে জড়িয়ে চুমু খাচ্ছে ওর গালে।
-''মিষ্টিদি ও এখানে চলে এল কখন? আর তুমি আমায় ডাক নি কেন''?
-''কেন? কেন তোকে ডাকব? আমার মেয়ে আমার কাছে এসেছে। তোকে কেন ডাকব আমি? কেন সব সময় তুই কেড়ে নিতে চাস ওকে আমার থেকে? তুই কি ভেবেছিস আঁখি আমার মেয়ে, আমার বর, সংসার সব কেড়ে নিয়ে তুই রানী হয়ে বসবি আমার জায়গায়? আমার মরার দিন গুনছিস তাই না? তবে তুই ও শুনে রাখ আমার বরকে তুই নিজের রূপ, যৌবন দিয়ে মোহিত করে ফেললেও আমার মেয়ে তোর কোনদিন হবে না। ও সারা জীবন ঘেন্না করবে তোকে। ও আসলে আমারই মেয়ে।'' হিংস্র চোখে এক রাশ ঘেন্না মিশিয়ে কথা গুলো বলল মিষ্টিদি।
ঝাং করে কেমন যেন মাথাটা গরম হয়ে গেল আঁখির। কি ভাবছে ওই মহিলা ওকে? ও কেন কেড়ে নিতে চাইবে মিষ্টির সংসার? ও যা করেছে আর যা করছে সবটাই অনিদাদার কথায়, ওদের ভালোর জন্যই। তবু সব সময় কেন এত খারাপ কথা শুনবে ও? তাই না চাইতেও মুখ থেকে আজ কড়া কথা বেরিয়েই গেল আঁখির।
-''কাকে আমার মেয়ে আমার মেয়ে বলছ তুমি? কিছু মনে কর না মিষ্টি দি, তুমি হয়তো ভুলে গেছ আমি না থাকলে ও মেয়ে তোমার কোলে আসতই না। আমার গর্ভেই বেড়ে উঠেছিল ও। তাই''
-''কি বললি তুই? এত বড় কথা বললি তুই? শোন তোর গর্ভে বেড়ে উঠলেও আমি আসল মা ওর। আমারই রক্ত বইছে ওর শরীরে। তুই শুধু তোর গর্ভটা ভাড়া দিয়েছিলি মাত্র। আমার বাবা মা তোকে খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করেছে তাই তার বিনিময়ে তোর গর্ভটা শুধু ব্যবহার করেছিলাম আমরা মাত্র।
কিন্তু তুই তবু আজ কেন এত বড় বড় কথা বলছিস জানিস, কারণ আমার স্বামীকে হাত করে ফেলেছিস তুই। আসলে দোষ তো আমারই হয়েছিল। বাচ্চা হয়ে যাবার পর আমার উচিত ছিল ঘাড় ধাক্কা মেরে তোকে বের করে দেওয়া। কিন্তু আমি সেটা করিনি। তোকে বিশ্বাস করেছিলাম। নিজের সংসারে রেখে দিয়েছিলাম। আর তুই তাই আজ আমাকেই ছোবল মারছিস।''
-''মিষ্টিদি তুমি ভালবেসে আমাকে মোটেই তোমার সংসারে রাখনি। তুমি চিরকালই রুগ্ন, কমজোরি। তাই এই মেয়ে একা হাতে মানুষ করার ঝক্কি তুমি একা পোহাতে চাও নি। আর সেইজন্যই আমার ইমোশানে নানা সুড়সুড়ি দিয়ে আমায় এখানে রেখে দিয়ে আমায় দিয়ে ও মেয়েকে বড় করে নিতে চেয়েছিলে। আসলে তোমার মনটা বড় ছোট গো। নইলে কি আর তুমি অনিদাদাকে সন্দেহ করতে! যে মানুষটা রাতদিন শুধু তোমায় ভাল করার চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছে তাকেই কিনা তুমি এভাবে সন্দেহ করতে পারলে!''
-''কি বললি? কি বললি তুই''? সপাটে এক চড় কষাল এবার আঁখির গালে মিষ্টি।
-''মিষ্টি দিইই ''চিৎকার করে উঠেছে প্রতিবাদে আঁখিও।
-''কোনদিন ভাল হবে না তোর। আমার ক্ষতি করে, আমার সব কিছু কেড়ে নিয়ে কোনদিন ভাল থাকতে পারবি না তুই সারাজীবন যন্ত্রণার আগুনে, না পাওয়ার ব্যথায় জ্বলে পুড়ে মরতে হবে তোকে।''
হিংস্র আগুন ঝরছে মিষ্টি দিদির দু চোখ দিয়ে। সব কিছু দেখে কেমন যেন ভেবলে গেছে ছোট্ট মেয়েটাও। অবশ্য এই দৃশ্য আজকে নতুন কিছু নয়। আজকাল প্রায়ই চলে মিষ্টিদিদির এমন হিংস্রতা। নিজের স্বামী আর আঁখিকে সন্দেহ করতে করতে প্রতি মুহূর্তে সন্দেহের আগুনে জ্বলে পুড়ে মরছে ও। কতবার অনিদাদা বোঝাবার চেষ্টা করেছে ওকে। আঁখিও তো কম চেষ্টা করেনি ওর মনের আগুন নেভাবার। কিন্তু কিছুতেই কিছু হবার নয় যেন।
বাচ্চা মেয়েটার বিস্ফারিত চোখের দিকে এবার আবার চোখ পড়ল আঁখির।
-''চল সোনা তুমি আমার সাথে চল ওইঘরে''। ওর হাত ধরে টেনে নিল আঁখি।
-''না। আমি মায়ের কাছে থাকব''। আবার বলল সে। প্রতিবার এই কথাটা ওর মুখে শুনলেই বুকের মাঝে কেমন যেন রক্তক্ষরণ হয় আঁখির। শুধু মিষ্টি দিদিই কি ওর মা? শুধু বায়োলজিক্যাল মাদার ই সব কিছু? আর যে নয় মাস গর্ভে ধরল ওকে সে কিচ্ছু নয়? কেউ নয়? কিন্তু এই সব অনুভব কোনদিনই সামনে আসতে দিতে চায়নি ও। আজও চায় না। ওকে মিষ্টিদিদির থেকে সরিয়ে নিতে হয় কারণ অনি দাদা চায় না এমন অসুস্থ অবস্থায় ও ওর মায়ের কাছে যাক। না সেটা মিশি দিদির শারীরিক অসুস্থতার জন্য নয়, মানসিক অসুস্থতার জন্য।
বেশ কিছুদিন হল ক্যান্সার ধরা পড়েছে মিষ্টি দিদির। চিকিৎসা চলছে পুরো দমে। ভীষণ রকম কড়া চিকিৎসা। কেমোথেরাপি, রেডিয়েশান আরও অনেক কিছু। আর এই সব কিছুর প্রভাবে মাথার সব চুল একেবারে উঠে গেছে ওর, চেহারা ভেঙ্গে গেছে পুরোপুরি, মাঝে মাঝেই বমি হয়, প্রায়ই শরীর ঝিমঝিম করে। আর নিজের এই সব শারীরিক পরিবর্তন, কঠিন অসুখ এগুলোই যেন মেনে নিতে পারছে না মেয়েটা। সম্পূর্ণ ভাবে মানসিক অবসাদে চলে গেছে ও। সারাক্ষণ সন্দেহ করে অনিদাদাকে আঁখিকে নিয়ে। অনিদাদা ভীষণ কষ্টে আছে। ও বলছে মিষ্টিদিদির এই পরিবর্তন বা মানসিক অবসাদ নাকি খুব অস্বাভাবিক নয় এই অবস্থায়। কিন্তু এই রকম অবস্থায় ছোট মেয়েটাকে ওর কাছে বেশি যেতে দেওয়া যাবে না। একটু ভাল হোক ও, তারপর আবার মেয়েকে কাছে পাবে ও। আঁখির ওপরই তাই ওকে সামলে রাখার দায়িত্ব এখন। আর সেটাই যেন আরও সহ্য করতে পারছে না মিষ্টি।
ছোট মেয়েটাকে নিয়ে পাশের ঘরে চলে এল আঁখি। জোর করে ওকে চেপে ধরে শুয়ে দেবার চেষ্টা করল এবার। কিন্তু কেমন যেন থমকে গেল ওই ছোট শিশুটার চোখের দিকে তাকিয়ে।
-''তুমি কেন আমায় যেতে দাও না আমায় মায়ের কাছে? কেন জোর করে ধরে রাখতে চাও আমায়? আমি মাকেই বেশি ভালবাসি। তোমায় না। কোনদিন বাসবও না তোমায়''। কি সাংঘাতিক গনগনে ঘৃণার লেলিহান শিখা ছোট দুটো চোখের তারায়।
-''তুমি জোর করলেই কি আমি মায়ের মত করে ভালবাসব তোমায়? কোনদিন না। কেন জোর কর আমায়''?
বুকের কাছটায় মুচরে উঠছে আঁখির। এসব কি বলছে মেয়েটা? ও জোর করছে! ও কি সত্যি তবে বাড়াবাড়ি করছে কিছু নিজের মমত্ববোধের তাগিদে? কিন্তু ও তো নিজের সবটুকু উজাড় করে ভালবাসে এই মেয়েকে। এ তো ওরই সন্তান।
-''শোন মা ''কিছু একটা বলতে গেলে আঁখি।''
-''আমি কিচ্ছু শুনব না। আমার তোমায় একদম পচা লাগে তোমাকে''। পাশ ফিরে শক্ত কাঠ হয়ে পড়ে রইল মেয়ে বিছানায়।
চোখের দু কূল ছাপিয়ে জল উপচাচ্ছে আঁখির। কানে স্পন্দিত হচ্ছে একটু আগে মিষ্টি দিদির বলা কথাগুলো 'সারাজীবন যন্ত্রণার আগুনে জ্বলে মরবি তুই'। এই মেয়ের চোখে নিজের জন্য ঘেন্না দেখতে পাবার চেয়ে বড় অভিশাপ আর কি হতে পারে ওর জন্য? কবে শেষ হবে এই যন্ত্রণা আঁখির?
এতটা লিখে ল্যাপটপটা বন্ধ করলেন এই মুহূর্তের নাম করা উপন্যাসিক আঁখি শ্রুতি রায়। চোখ দুটো ভিজে সপ সপ করছে।
অনেকদিন ধরে এক পাতা এক পাতা লিখে চলেছে শ্রুতি উপন্যাসটা। কিন্তু শেষটা আর করতে পারছে না। বুঝতেই পারছে না কোথায় আর কিভাবে সমাপ্তি ঘটাবে এই উপন্যাসের। আসলে শ্রুতির জীবনের মত এই উপন্যাসের শেষের ছেঁড়া পাতাটাও তো হারিয়ে গেছে। তাই কিছুতেই শেষটুকু খুঁজে পাচ্ছে না ও। লিখে উঠতেও পারছে না। অনেকদিন থেকেই ইচ্ছে ছিল নিজের জীবনের না পাওয়া আর যন্ত্রণাগুলো শব্দে সাজিয়ে একটা উপন্যাস লেখার। কল্পকাহিনী লিখে অর্থ আর যশ উপার্জন তো অনেক হল। এবার খানিক না হয় সত্যি অভিজ্ঞতাই লিপিবদ্ধ হল। শ্রুতির জীবন তো আর কোন উপন্যাসের থেকে কিছু কম ঘটনাবহুল নয়। তবে শ্রুতির জীবনে শুধুই ট্রাজেডি, তাই উপন্যাসের আঁখিও কি শেষ অবধি ট্র্যাজিক হিরোইনই হবে?
এখনও পর্যন্ত নিজের জীবনের মুহূর্তগুলোই সাজিয়েছে ও উপন্যাসের পাতায় গল্পের আকারে। আঁখি শ্রুতি হয়েছে আঁখি, ডক্টর অনিশ রায়—অনি দাদা, মনোরমা—মিষ্টিদি, মাসি মেসো তো নিজেদের স্বমহিমাতেই বিরাজমান।
উপন্যাসটা লিখতে লিখতে পুরনো দিনগুলো যেন চোখের সামনে একদম ছবির মত দেখতে পাচ্ছিল ও। মিষ্টিদি মানে মনোরমার দেওয়া অভিশাপ একেবারে ফলে গেছে। সারাজীবন যন্ত্রণায় জ্বলেছে আঁখিশ্রুতি। ঊর্মি আজীবন ঘেন্না করেছে ওকে। আর অনিশ রায়! না আজও সে জানে না সেই ছিল শ্রুতির প্রথম ও শেষ প্রেম। নিজের সব অনুভূতিকে বুকের মাঝে লুকিয়ে রেখে শুধু সেই মানুষটার সব চাওয়াগুলোকে সম্মান করে গেছে ও। ভুল করেও কোনদিন বাইরে আসতে দেয়নি নিজের অনুভূতিগুলোকে, কষ্টগুলোকে।
মনোরমা আত্মহত্যা করেছিল শেষমেস নিজের মানসিক অবসাদের জেরে। সুইসাইড নোটএ লিখেছিল
-'আমি জানি আমি আজ বড্ড বাড়তি সবার মাঝে। আমি হয়তো সত্যি প্রতিনিয়ত সকলের সাথে অবিচার করে চলেছি নিজের রোগ ভোগ আর জ্বালার তাড়নায়। এই দুর্বহ জীবন আমি একেবারেই আর বয়ে বেড়াতে পারছি না অনীশ।
তোমরা ভাল থেকো। আমার ঊর্মিকে ভাল রেখ। আমি জানি আঁখি যেমনই হোক ও ঊর্মিকে ভালবাসে। তাই আঁখির কাছে আমার শেষ ইচ্ছা জানালাম। আমার মেয়েটাকে কোনদিন কষ্ট পেতে দিস না তুই।
মনোরমার মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল আঁখিশ্রুতি, কোনদিন ঊর্মিকে কোন কষ্ট পেতে দেবে না ও। নিজের প্রতিজ্ঞা পালনের সব চেষ্টা আজীবন করে গেছে। কিন্তু তবুও ব্যর্থ ও। ঊর্মি কোনদিন ভাল থাকেনি ওর কাছে। ওকে কোনদিন নিজের কাছে ঘেঁষতেই দেয়নি। একরাশ ঘৃণার দেওয়াল তুলে সব সময় তৈরি করে রেখেছে দুর্ভেদ্য ব্যবধান। মনোরমাই আজও ওর মন জুড়ে। নিজে একা একাই গুমরে কষ্ট পেয়ে গেছে ও চিরকাল।
আর আজ! আজ যেটা হয়েছে তার জন্য তো আঁখি নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করে উঠতে পারবে না। ঊর্মি এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ ভাবে মানসিক রোগী। চিকিৎসাও চলছে ওর। জটিল মানসিক বিকার স্কিতজোফ্রেনিয়ার শিকার ও। নিজের কাল্পনিক প্রেমিক মেঘের অস্তিত্ব নিয়ে কল্পনায় বিভোর সে। তার অনুপস্থিতি কিছুতেই মানবে না। ওর মতে সেই কাল্পনিক মেঘ নাকি ভীষণ ভাবে সত্যি।
মেয়ের চিকিৎসার জন্য অনীশ সব টুকু উজাড় করতেও রাজী। ডাক্তাররা বলছেন মানসিক শূন্যতা আর একাকীত্ব থেকেই হয়েছে আস্তে আস্তে এমন। কাল্পনিক জগতে ডুবে গেছিল মেয়েটা আস্তে আস্তে বাস্তব পৃথিবী ছেড়ে।
-''তুমি আমার মেয়েটাকেও সামলাতে পারলে না! আজ মনে হচ্ছে তোমায় বিয়ে করাটাই আমার সব থেকে বড় ভুল হয়েছিল। ভুল হয়েছিল তোমায় ভরসা করা। আসলে তুমি কোনদিন ঊর্মির মা ছিলেই না। তুমি শুধু মনোরমার সাথে প্রতিযোগিতা করতে চেয়েছিলে। আমি আজও বিশ্বাস করি মনোরমাকে হিংসা করতে তুমি''। মেয়ের স্কিতজফ্রেনিয়ার কথা জানার পর এটাই ছিল অনীশ রায়ের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া।
শ্রুতি শুধু যন্ত্রণায় আর অপমানে নিজের ঠেঁট কামড়েছিল সেদিন। মনে পড়ে গেছিল মনোরমার সেই অভিশাপ
-' সারাজীবন না পাবার আগুনে জ্বলবি। তুই 'হ্যাঁ অপ্রাপ্তি। সারাজীবন তো সেই নিয়েই বাঁচল আঁখিশ্রুতি।
শুধুমাত্র মেয়ে মানুষ করার জন্য বাড়ির সকলের উদ্যোগে মনোরমার মৃত্যুর পর অনীশ রায়ের সাথে বিয়েটা হয়েছিল ওর। কিন্তু বিয়ের রাতেই অনীশ জানিয়েছিল মনোরমাকে সে কোনদিন ভুলতে পারবে না। তাই তার জায়গায় আর কাউকে বসাতেও পারবে না। সবটা শুনেও বুকে একটা গভীর ক্ষত নিয়ে সরে গেছিল শ্রুতি। তারপর থেকে ভুল করেও কোনদিন কাছে আসার চেষ্টা করে নি ও মানুষটার। অনীশ ও ঘোচাবার চেষ্টা করে নি ব্যবধান। তাই এক ছাদের নিচে থেকেও বন্ধুত্বের সীমা ছাড়িয়ে আজ পর্যন্ত এগোতে পারেনি ওদের সম্পর্কটা। থমকে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক জায়গাতেই। কিন্তু ঊর্মি! ওকে তো ভাল রাখার সবটুকু চেষ্টা করেছিল আঁখি। তাহলে কেন পারল না? কোথায় ভুল হল? সত্যি কি জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল মেয়েটার? কিভাবে কাল্পনিক মেঘকে বাস্তবে নিয়ে আসবে ওঁরা? কে আসবে ওর মেয়েটার জীবনে?
টিং টং করে জলতরঙ্গ ধ্বনি তুলে হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। ভাবনাটা ছিঁড়ে গেল আঁখির। দেওয়াল ঘড়ি বলছে সময় বিকাল পাঁচটা। মেয়েটা পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছে। আয়াও রয়েছে সেখানে। আঁখি উঠে গিয়ে খুলল দরজাটা। ওপারে দাঁড়িয়ে বেশ টল ডার্ক হ্যান্ডসাম একটা কমবয়সী ছেলে। মুখটা একটু চেনাই লাগল আঁখির। এ কি আগে কখনও এসেছিল এই বাড়িতে? ঊর্মির বন্ধু কি? ছেলেটার চোখ দুটো ভীষণ উদ্বিগ্ন লাগছে।
-''আপনি মানে তুমি কে? কাকে চাই?'' গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করল আঁখি।
-''আনটি আমি আকাশ। আমি ঊর্মির বন্ধু। আমি ঊর্মির সাথে একবার দেখা করতে চাই। কেমন আছে এখন ও? ও কি এখানেই আছে''? এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলল ছেলেটা।
আকাশ নামটা শুনেই ঝাং করে মনে পড়ে গেল আঁখির।অসুস্থতার শুরুতে পাগলের মত প্রলাপ করত ঊর্মি। বলত আকাশ পারবে। একমাত্র ও পারবে আমার মেঘকে খুঁজে দিতে। কিন্তু আকাশও তো হারিয়ে গেছে।
ও। তার মানে আকাশ অন্তত কাল্পনিক কেউ নয়। আসলে আঁখিকে তো কোনদিন ঊর্মি জানায়নি ভুল করেও নিজের কোন বন্ধু বা ওর জীবনে থাকা কোন মানুষের কথা। সত্যি কি আকাশ পারবে কোন আলো জ্বালাতে অন্ধকারে ডুবে যাওয়া ওর মেয়েটার জীবনে?
-''আগের থেকে এখন অনেক ভাল''। বলল আঁখিশ্রুতি।
-''আমি ওর সাথে দেখা করতে চাই আনটি। কথা বলতে চাই। ডিটেলে জানতে চাই কি হয়েছে ওর? আমি অনেকদিন দূরে ছিলাম। কিন্তু আর না এবার আমি ওকে সুস্থ দেখে তবেই যাব। ছেলেটার চোখে চোখ রাখল আঁখি। ঘন আবেগ ভাসছে ওর চোখে উদ্বেগের সাথে। ঠিক এই আবেগটাই ওর চোখেও ছিল একদিন। হয়তো আজও আছে। শুধু সেটা কোনদিন দেখতে পায়নি অনীশ। ঊর্মিও কি দেখতে পায়নি আকাশের ভালবাসাটা? সেজন্যই কি ছুটে মরেছে কল্পনার প্রেমের দিকে বাস্তবের ভালবাসা ছেড়ে?না ঊর্মিকে প্রেমহীনতায় ভুগতে দেবে না আঁখি। আকাশ পারবে। ওর মন বলছে আকাশই পারবে আবার নিজের ভালবাসা দিয়ে ওর মেয়েটাকে জীবনের মূলস্রোতে ফিরিয়ে দিতে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।