পল্লবী সেনগুপ্ত
মানুষ এর সহ্যক্ষমতা যে ঠিক কতখানি সেটা হয়তো অনেক সময় সে নিজেও জানতে পারে না। সঠিক পরিস্থিতি এলে সেটা সে বুঝতে পারে— এমন একটা কথা বহু বছর আগে কার কাছে যেন শুনেছিল আঁখি।
আর এখন সেটা ও উপলব্ধি করছে নিজের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত দিয়ে। দেখতে দেখতে অবলীলায় ওর চোখের সামনে দিয়ে পর হয়ে গেল অনি দাদা। গত সপ্তাহে বিয়ে হয়ে গেল অনি দাদা আর মিষ্টি দিদির। আর ওকে নীরব দর্শকের মত সবটা দেখতে হল চোখের সামনে, হাসতে হল সকলের সাথে গোটা বিয়ে বাড়িতে। সাজতে হল, বিয়ের নানা উপাচারে অংশগ্রহণও করতে হল যথারীতি। আর যেটা করতে হল সেটা হল নিখুঁত অভিনয়। আনন্দ পাবার অভিনয়। তবে আঁখি সত্যি আনন্দ পেতে চেয়েছিল। মিষ্টিদিদি যে ওর বড় আপনার, তার বিয়েতে তো ওর আনন্দ পাবারই কথা ছিল। কিন্তু যা হবার কথা থাকে তার কতটুকুই বা হয়? নিজের হৃদয়ের প্রথম ভালবাসা যাকে নিবেদন করে মেয়েরা, তাকে অন্যর হতে দেখে কোনদিন তারা সুখি হতে পারে না।
আজকাল ক্রমাগত হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় আঁখির । কিন্তু সেটা যথাসম্ভব আড়াল করে রাখতে হয় ওকে। তবু মাঝে মাঝে ব্যর্থ হচ্ছে আজকাল ওর অভিনয়। মণি মাসী ইদানীং মাঝে সাঝেই প্রশ্ন করছেন
—''কিরে আঁখি আজকাল কি হয়েছে বল তো তোর? সব সময় কেমন যেন গুমরে থাকিস?''
মণি মাসীর মুখে এই সব প্রশ্নগুলো শুনলেই আতঙ্কে কেঁপে ওঠে কেমন যেন ও। এই বুঝি ধরা পড়ে গেল ওর সবটুকু। কিন্তু না ধরা পড়লে তো চলবে না, যে মানুষগুলো এতদিন ওর মত একটা অনাথ মেয়েকে পরম ভালবাসায় মানুষ করেছেন, পড়াশুনা শিখিয়েছেন, সর্বোপরি ভালবাসা দিয়েছেন তাদের মনে যে আঘাত কিছুতেই দিতে পারবে না আঁখি ।
তবে মাসী সত্যি বড্ড ভাল মানুষ। তাই নিজে প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর খুঁজে নেন তিনি।
—''জানি রে। সব বুঝি। মিষ্টি দিদি চলে যাচ্ছে বিয়ে করেতাই তোর মন খারাপ তাই তো? সেইজন্য মন তো আমারও খারাপ রে। কিন্তু কি আর করা যাবে বল। শুধু কি শ্বশুরবাড়ি? মেয়েটা তো আমার বেশ কিছুদিনের জন্য কত দূরে বিদেশে চলে যাবে। মন তো তাই আমারও মানছে না রে। কিন্তু মেয়েদের তো জীবনটাই যে এমন রে মা। মিষ্টির পর তো এবার তোর পালা। তোকেও তো আমাকে পাঠাতেই হবে তোর স্বামীর ঘরে''।
নিজের বিয়ের কথা মাসীর মুখে শুনলেই শিউরে ওঠে আঁখি। মাসী কি সত্যি ওর বিয়ে নিয়ে ভাবছে নাকি? কিন্তু ও তো বিয়ে করতে পারবে না কোন মতেই। ওর বুক জুড়ে যে শুধু আর শুধুমাত্র অনি দাদা।
আজ বিয়ের সাত দিন পর আবার এ বাড়িতে এসেছে ওরা অষ্টমঙ্গলা করতে। মিষ্টি দির মাথায় চওড়া সিঁদুর, যেটা শুধুই ওর। অনিদাদার নাম লেখা সিঁদুর। ওদের সামনে জোর করে চোয়াল ফাঁক করে হাসলেও বুকের ভেতর যেন লক্ষ হূলের দংশন টের পাচ্ছিল আঁখি। সারাদিন অনেক হাসি আনন্দ হল, খাওয়া দাওয়া হল, নিয়ম আচারও হল। এখন এই দুপুরের দিকে একটু শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে সবাই। আঁখিরও এখন বিশ্রাম নেবারই কথা। কিন্তু দু চোখের পাতা এক হবার জন্য মনের যে আরামটুকু প্রয়োজন সেটা যে চিরতরে হারিয়ে গেছে ওর।
বারন্দার গ্রিলটা ধরে দাঁড়িয়ে বিষণ্ণ ধূসর দুপুরটাকে একদৃষ্টে দেখছিল আঁখি। হঠাৎ কাঁধে স্নেহের পরিচিত স্পর্শ। মিষ্টি দিদি কখন যেন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
—''কিরে আঁখি কি হয়েছে তোর''?
—''কি হবে? কিচ্ছু হয় নি তো''? নিজের শুকনো স্বরটাকে লুকাবার আপ্রাণ চেষ্টা করল ও।
—''লুকাচ্ছিস আমার কাছে? এসে থেকেই তো দেখছি তোকে কেমন যেন উদাস হয়ে রয়েছিস। ভাল করে কথা বলছিস না। ঠিক করে খাচ্ছিসও না। কেমন যেন জোর করে হাসছিস মেকি হাসি''।
—''না দিদি আমার কিচ্ছু হয় নি বিশ্বাস কর''।
—''মিথ্যা কথা বলছিস আমার কাছে! তুই কি ভেবেছিস আমি কিছু জানতে পারব না তুই না বললেই''।
এবার প্রমাদ গুনল আঁখি। এসব কি বলছে মিষ্টিদি? কি জেনেছে ও?
—''শোন আমি জানি কেন তোর এত মন খারাপ। আমি বিদেশ চলে যাব বলে তাই তো''?
এবার একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল আঁখি।
—''তোকে একদম মন খারাপ করতে হবে না। কারণ তোর জন্য একটা নিদারুণ ভাল খবর আছে। আমি অনিকে বলেছি, বাবা মাকেও বলেছি। তুই শুনলেই চমকে যাবি। তুইও আমাদের সাথে বিদেশ যাচ্ছিস। অনি সব ব্যবস্থা প্রায় করেই ফেলেছে। তুই ওখানে কিছুদিন থাকবি। তারপর চলে আসবি। আমি ওখানে তো কাউকে চিনি না। আমিই বা একা একা কি করব বল? অনি তো বেরিয়ে যাবে আর আমি কি একা একা সারাদিন ভূতের মত বসে থাকব নাকি? আস্তে আস্তে আমি কোন কাজে বা পড়াশুনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লে না হয় তুই ফিরে আসিস। হি হি আসছে মিষ্টি।
—''কি! এসব কি বলছ তুমি? না না এটা অসম্ভব। এটা কখনোই হতে পারে না''। তীব্র প্রতিবাদে প্রবলভাবে মাথা ঝাঁকাচ্ছে আঁখি।
—''কেন রে মা লজ্জা কিসের? দিদি বলছে যখন যা না। দিদিরও ভাল লাগবে আর তোরও বিদেশ ঘোরা হয়ে যাবে। আমরা তো এক্ষুনি আর যেতে পারব না এখানকার সব কাজ কম্ম ফেলে। তুই গেলে আমি খানিক নিশ্চিন্তও হব। অনি তো সারাদিন নিজের কাজেই ব্যস্ত থাকবে। আমার মেয়েটা বিদেশ বিভুঁইয়ে একা একা কি করবে বল তো''! মণি মাসীও এবার গলা মেলালেন মিষ্টিদিদির সাথে।
—''না না মাসী এটা কিছুতেই হয় না। উফফ! আমি কিছুতেই বোঝাতে পারছি না''।
—''এতে এত বোঝাবুঝির কি আছে আঁখি? তোমার দিদি চায় তুমি চল। আমিও তাই চাই। আমি অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে তোমার জন্য ভিসা পাসপোর্ট সব কিছু ব্যবস্থা করছি আর তুমি কিনা.........
কেন আঁখি? তুমি কি ভয় পাচ্ছ? আমাদের ঠিক বিশ্বাস করতে পারছ না? সেটা হলে অবশ্য আলাদা কথা। তেমন হলে আর জোর করব না তোমায়। কিন্তু সব ব্যবস্থা করে ফেলার পরেও তুমি না গেলে খুব খারাপ লাগবে শুধু এইটুকুই বলতে পারি''।
বুকের মধ্যে এবার ঝমঝম বৃষ্টি হচ্ছে আঁখির। অনি দাদা ওকে বলছে! সে নিয়ে যেতে চায় ওকে! এবার কি করে আটকাবে ও আর নিজেকে! অনি দাদার কথায় যে ও সব করতে পারে, এমনকি নিজের প্রাণটাও হাসিমুখে দিয়ে দিতে পারে।
হাউহাউ করে এবার বোকার মত কেঁদে ফেলল আঁখি। মিষ্টিদিদি এসে জড়িয়ে ধরল ওকে।
—''কেন তোরা আমায় এত ভালবাসিস মিষ্টিদিদি? কেন আমায় নিয়ে এত কিছু ভাবিস? আমি যে এসবের যোগ্য নই। আমি যে খুব খারাপ''। পাগলের মত বলেই যাচ্ছে আঁখি আর ওর দিদি হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ওর মাথায় পরম মমতা আর স্নেহের পরশ মাখিয়ে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।