পল্লবী সেনগুপ্ত
মুম্বাইয়ের হোটেলের বন্ধ ঘরেই ভীষণ অস্থিরভাবে পায়চারি করছে আকাশ। আজ যে ঠিক কি হতে চলেছে কিছুই বুঝতে পারছে না যেন। কব্জি উল্টে একবার ঘড়ি দেখল। প্রায় সাড়ে আটটা বাজে তার মানে ঊর্মি আর নয়নের এতক্ষণে দেখা হয়ে গেছে নিশ্চয়। কিন্তু তারপর? তারপর কি হল? নয়ন কি সত্যি পারবে সবটা সামলাতে? শীততাপ নিয়ন্ত্রিত মুম্বাইয়ের হোটেল রুমেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে আকাশের কপালে।
দিন চারেক আগ হঠাৎ করেই আচমকা এলোমেলো হয়ে গেছিল আকাশের জানা চেনা বিশ্বাস নিয়ে বাঁচার পৃথিবীটা। ক্লায়েন্টকে দৈহিক সুখ দেবার জন্য যে যৌনকর্মীকে নিয়ে এসেছিল সৈকত তাকে দেখে পায়ের নিচের জমিই সরে গিয়েছিল আকাশের। তাকে যে হুবুহু ঊর্মির কল্পনায় বেঁচে থাকা মেঘের মতই দেখতে। এও কি করে সম্ভব? তবে কি মেঘই নয়ন? জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল সেদিন আকাশ।
চেতনা ফিরে এসেছিল পরের দিন। চোখ মেলতেই সামনে দেখতে পেয়েছিল সৈকতকে। ভীরু গলায় ও বলেছিল
-''এখন কেমন লাগছে আকাশ দা?''
-''কে? কে ওই ছেলেটা? কোথা থেকে পেয়েছিস ওকে? সব সত্যি করে বল আমায়। ওকে আমার ভীষণ দরকার।'' পাগলের মত এক ঝাঁক প্রশ্ন নিয়ে দুর্বল শরীরেই ও ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সৈকতের ওপর। থতমত খেয়ে গেছিল সৈকত। বিধ্বস্ত স্বরে বলেছিল
-''এমন কেন করছ আকাশদা? কার কথা বলছ? ডাক্তার ডেকেছিলাম আমি। উনি বলেছেন এখন তোমার পক্ষে বেশি উত্তেজনা ঠিক নয়''।
-''তাহলে বল। বল কে? নয়ন''?
-''নয়ন একজন অতি সাধারণ যৌনকর্মী। ফ্রেন্ড এন্ড ফ্রেন্ড নামের এক গোপন সংস্থার থেকে ওকে আমি যোগাড় করেছিলাম। ও দারুন এক্সপার্ট শুনেছি। জনসনও খুশি। আগামীকাল উনি ডিল সাইন করবেন আমাদের কোম্পানির সাথে''।
-''ডিল সাইন পরে হবে। তার আগে ওকে আমার চাই। তুই ওকে ভাড়া কর আবার। এবার আমার জন্য। আমার একটা গোটা রাত চাই ওকে''। অস্থির গলায় বলে উঠেছিল আকাশ।
চমকে গেছিল সৈকত। আকাশের মুখে এমন অদ্ভুত কথা শুনে। বিস্ফারিত গলায় বলেছিল
-''এসব কি বলছ তুমি? মাথার ঠিক আছে তোমার?''
-''যা বলছি তাই কর। এটা সিনিয়র এর অর্ডার তোর জন্য। টাকা পয়সা নিয়ে ভাবতে হবে না। শুধু ব্যাপারটা গোপন থাকা চাই''
সৈকত ওর অর্ডার রেখেছিল। পরের দিন রাতেই নয়ন বিশ্বাস এর একটা রাত ও বুক করে নিয়েছিল নিজের সিনিয়র এর জন্য।
বন্ধ হোটেল রুমে ও পৌঁছান মাত্রই সেদিন পেশাদারী চালে নয়ন বলেছিল
-''বলুন স্যার কিভাবে আমি আপনাকে স্যাটিসফাই করতে পারি''?
কয়েক মুহূর্ত ওর দিকে তাকিয়েছিল আকাশ। তারপর নিজের মোবাইল এগিয়ে দিয়েছিল ওর সামনে, যেখানে অয়ালপেপারে চকচক করছিল ঊর্মির ছবি।
-''কেন? কেন ছেড়ে পালিয়েছিলে এই নিরপরাধ মেয়েটাকে? কেন নিজের মিথ্যা পরিচয় দিয়ে প্রেমের খেলা খেলে ঠকিয়েছিলে এই মেয়েটাকে?'' হিংস্র গলায় সেদিন বলেছিল আকাশ।
এক মুহূর্ত ছবিটা দেখে নিরুত্তাপ গলায় নয়ন বলেছিল
-''ইনি কে? আমি চিনিনা স্যার। এসব কি বলছেন কি আপনি''?
-''একদম নাটক করবে না। পুলিশে দেব আমি তোমায়। এটা ঊর্মি। চেন না? ন্যাকা সাজতে লজ্জা করছে না''?
-''বিশ্বাস করুন স্যার আমি সত্যি এই মহিলাকে চিনি না। আমার যা পেশা তাতে আমায় অনেক সময় অনেক মহিলার সাথে সময় কাটাতে হয় এটা ঠিক, আর এটাও ঠিক যে তদের সকলের মুখ বা পরিচয় আমার পক্ষে মনে রাখা সম্ভব নয়; কিন্তু আপনি যার ছবি দেখাচ্ছেন তার মত সুন্দরী ইয়ং ক্লায়েন্ট পেলে হয়তো আমার মনে থাকত। এনাকে আমি সত্যি চিনিনা।
আর বাকি রইল ভালবাসার কথা, আমরা দেহব্যবসা করি স্যার। প্রেম ভালবাসা আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে না। আপানাদের মত বড় ঘরের ছেলেদের সাথে কি আমাদের গুলিয়ে ফেললে চলবে বলুন। আমাদের শুধু শরীর থাকে, মন নয়।। প্রেমের অভিনয় করার জন্যও তো মনের কোণে মিথ্যা করে হলেও ভালবাসার রঙ ছড়াতে হয়, সেই ক্ষমতা বা যোগ্যতাটুকুও বা আমাদের দেবে কে? আর ভুল পরিচয় বলছেন? আমাদের ঠিক ভুল সব রকম পরিচয়ই শুধু একটা সেটা হল শরীর।
পেশাগত কারণে ক্লায়েন্টদের পরিচয় আমাদের গোপন রাখতেই হয়। তাই এই মহিলা কোনদিন আমাদের সার্ভিস নিয়ে থাকলেও সেটা জানাতে আমি বাধ্য হইনি। আপনি আমায় আজ রাতে নিয়েছেন। তাই আমি শুধুই আপনাকে শারীরিক সুখ দিতে চুক্তিবদ্ধ। তবুও আপনাকে কেন এত কথা বললাম জানেন? কারণ আপনার চোখে একটা ভালবাসারা অসহায় ছটফটানি ছিল। নিজেরা কোনদিন ভালবাসা না পেলেও সেই ভালবাসার রঙ চিনে নিতে ভুল হয় না আমাদের। কে হন এই মহিলা আপনার? কপালে তো সিঁদুর দেখছি। আপনার স্ত্রী নয় তো? নিজের স্ত্রী যৌনকর্মীর সাথে প্রেম করবে এমন পরিস্থিতি কেন ডেকে আনেন আপনারা? সব তো আছে আপনাদের। ভালবাসাও আছে হয়তো। তাও কেন এত জটিলতা? ইগো''?
ছেলেটার কথা শুনে কেমন যেন মাথা ঝাং করে জ্বলে গেছিল আকাশের। কলার চেপে ধরেছিল ওর। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলেছিল
-'''' ইউ সোয়াইন!''
ছেলেটা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলেছিল
-''স্যার আপনি অন্য কারোর রাগ হয়তো আমার ওপর উগরাচ্ছেন। আপনি শান্ত হন। বিশ্বাস করুন আমরা এতটাও খারাপ নই। নিজেদের সম্পর্ক কোনদিন হয় না বলেই হয়তো আমরা সম্পর্কের মর্যাদা দিতে জানি। আপনি আমায় বলতে পারেন। হতেও তো পারে হয়তো কোন কাজে লেগে গেলাম আপনার''।
ছেলেটার কথার মধ্যে কি যেন একটা অদ্ভুত সম্মোহন ছিল সেদিন যেটা এড়াতে পারেনি আকাশ। আবেগের সংযমের বাঁধটা কেমন যেন নুয়ে পড়েছিল ওর। কেন কে জানে সেদিন সবটা খুলে বলেই ফেলেছিল ছেলেটাকে। ঊর্মি আর ওর সম্পর্কের মাঝখানে মেঘ নামক এক আধা বাস্তব চরিত্রের আলো ছায়া হয়ে ঝুলে থাকার কথাটা বলে কে জানে কেন বেশ খানিক হাল্কা লেগেছিল সেদিন।
-''দেখ আমি হাম দিল দে চুকে সনমের অজয় দেবগন নই আর আমার জীবনটাও সঞ্জয় লীলা বনশালির কোন ছবি নয় যে আমি নিজের স্ত্রীকে, ভালবাসার মানুষকে তার প্রেমিকের হাতে তুলে দেব। তাই মেঘকে খুঁজে পেলেও আমি এমন কিছু করতে পারব না। কিন্তু আমি শুধু জানতে চাইব কেন সে এভাবে তছনছ করে দিল আমার ঊর্মির জীবনটা? কে জানে হয়তো খুনই করে ফেলব তাকে।'' বলতে বলতে সেদিন কান্নায় গলা বুজে এসেছিল আকাশের।
-''আমি বুঝতে পারছি স্যার। মারাত্মক জটিল সমীকরণের মাঝে আটকে রয়েছে আপনার আর আপনার স্ত্রীয়ের সম্পর্ক। ঊর্মিলা ম্যাম সত্যি ভাগ্যবান যে তিনি আপনার মত এত ভালবাসা বুকে জমিয়ে রাখা একজন স্বামী পেয়েছেন। কিন্তু তবুও কেউ সুখে নেই আপনারা। আসলে উপরে বসে থাকা ওই ভগবান নামের লোকটা কার জন্য যে কি ঠিক করে রাখেন তা আসলে কেউ জানে না। হয়তো উনিই চান এবার শেষ হোক আপনাদের জীবনের কালো অধ্যায়, তাই হয়তো তিনি আমার আর আপনার দেখা করিয়েছেন। হয়তো আঁধার ফুরিয়ে আলো ফুটবে বলেই আমার চেহারার সাথে অনেকটা মিল আপনার মিসেস এর কল্পনায় বা স্বপ্নে থাকা সেই মানুষের। আপনি কিছু চিন্তা করবেন না। আমি সত্যি খুশি হব যদি একটা ক্ষয়ে হতে বসা দাম্পত্যকে বাঁচিয়ে তুলতে পারি। আমি দেখা করব ওনার সাথে। আর সেই দেখার পর মেঘ নামটাকেই মনে প্রাণে ঘৃণা করবেন আপনার স্ত্রী। ভুলেই যাবেন প্রেমের অদ্ভুত ফ্যান্টাসিকে।''
শেষ পর্যন্ত ওই অচেনা দেহব্যবসায়ী ছেলেটাকে সত্যি অনেকটা ভরসা করে ফেলেছে আকাশ। ওর কথামতই আজ কলকাতার নামজাদা হোটেলে রুম বুক করে নিয়েছে ও। ঊর্মিকে পাঠিয়েছে সেখানে, বলেছে মেঘ নাকি আসবে আজ ঊর্মির কাছে। নয়নও বলেছে ঠিক সে পৌঁছে যাবে সময়মত।কিন্তু নির্ধারিত সময় তো পেরিয়ে গেছে বেশ খানিকক্ষণ হল। কি হলটা কি ওখানে? কই আকাশের কাছে তো কোন ফোন এল না। তবে? অন্যমনস্ক ভাবেই হাতে মোবাইলটা তুলে নিল আকাশ, আর ঠিক তখনই দ্রিম দ্রিম করে বেজে উঠল ওর মুঠো ফোন। স্ক্রিনে ভাসছে ঊর্মির নম্বর। হৃৎপিণ্ডটা কেমন যেন ছলাত করে উঠল ওর। দুরুদুরু বুকে ফোন চাপল কানে।
-''হ্যালো ''বলল কাঁপা গলায়।
-''আকাশ, আকাশ তুমি কবে ফিরবে কলকাতায়? প্লিজ ফিরে এস তাড়াতাড়ি। আমার যে ভীষণ এখন দরকার তোমায় নিজের পাশে।'' হাউহাউ করে বাচ্চাদের মত করে কাঁদছে ঊর্মি। বহুদিন পর আবার ঊর্মি নিজে থেকে ফোন করেছে ওকে। ডাকছে ওকে এমন আকুল হয়ে। মনের ভেতর একটা ভেজা গন্ধ অনুভব করছে আকাশ। গলার কাছটা বুজে আসছে কেমন যেন। তবুও কথা বলার চেষ্টা করল ও। বলতে চাইল
-''তোর এই ডাকটার জন্যই তো আমি যুগযুগ ধরে অপেক্ষা করে বসে আছি ঊর্মি''। কিন্তু বলতে পারল না এত কিছু, শুধু অস্ফুটে বলল
-''আসছি। খুব তাড়াতাড়ি আসছি।''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।