পঞ্চদশ অধ্যায়

পল্লবী সেনগুপ্ত

ভিক্টোরিয়া মেমরিয়াল এর রঙ চটা বেঞ্চটায় একা একাই বসেছিল ঊর্মি। অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে মেঘের জন্য। কিন্তু মেঘের দেখা নেই। মেঘকে একদম বুঝতে পারে না ও। কেমন যেন গভীর দুর্ভেদ্য সমুদ্রের মত লাগে ওকে। যাকে মাপা যায় না, বোঝা যায় না। মেঘ সত্যি ভালবাসে তো ওকে? আজকাল এই প্রশ্নটাই যেন সব সময় তাড়া করে বেড়াচ্ছে ওকে। আর তাড়াবেই না বা কেন? এই সব কিছুর জন্য তো মেঘ একাই দায়ী।

মেঘের নিজস্ব কোন ফোন নেই। কোন কন্টাক্ট নম্বর বা যোগাযোগের কোন মাধ্যম নেই। শুধু ও নিজে যখন চাইবে তখনই সে ঊর্মিকে ফোন করবে অচেনা কোন নম্বর থেকে। দু চার মিনিট কথা বলবে। আর তারপর হারিয়ে যাবে আবার। হ্যাঁ হারিয়ে যাওয়াই তো। যে মানুষটা সব সময় নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে, কখনও ধরা পড়তেই চায় না তার সাথে হারিয়ে যাওয়া মানুষের আর কি পার্থক্য আছে! আজকালকার দিনেও নাকি নিজস্ব মোবাইল নেই মেঘের। ভাবা যায় এমন একটা কথা!

—''মেঘ কেন তুমি একটা মোবাইল ফোন নেবে না? তোমার কি ইচ্ছা করে না মাঝ রাত্তিরে ওই এক আকাশ ভর্তি তারাদের সাক্ষী রেখে আমার সাথে হাবিজাবি গল্প করে যেতে?'' কতবার এই কথাটা ওকে বলেছে ঊর্মি।

আর প্রতিবার একই উত্তর মেঘের!

—''আমি সত্যি বড্ড গরীব। সামান্য একটা বইয়ের দোকান আমার। তাও বাংলা গল্পের বইয়ের। বাংলা বইয়ের এখন যে কেমন মরা বাজার তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। যদি পারতে তাহলে বুঝতে একটা মোবাইল ফোন পোষা আমার মত চালচুলো হীন দোকানদারের কাছে বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়।''

—''মোটেই তা নয়। তুমি ব্যবসা করছ। নানা প্রয়োজনে ফোন লাগতে পারে তোমার। যারা বইয়ের ব্যবসা করেন তারা ফোন রাখেন না নাকি''!

—''কে জানে! তা রাখেন হয়তো। কিন্তু আমাকে যে ফোন করার কেউ নেই। আমার ভাল মন্দ এই এত বড় পৃথিবীতে হয়তো কারোরই জানার নেই''।

মেঘের এই কথাটা শুনে সেদিন চোখ ফেটে জল এসেছিল ঊর্মির। ভীষণ নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল ওকে। ও কি সত্যি বোঝে না ঊর্মি ওকে কতটা ভালবাসে! মেঘ ছাড়া আর কে আছে ঊর্মির এই গোটা দুনিয়ায় ভালবাসার মত। নিজের জীবনের সমস্ত অধ্যায়ের কথা ওকে বলার পরেও মেঘ এটা বলতে পারল! সেদিন ঊর্মির মনে হয়েছিল কেন মেঘ এত নির্দয় হল! ইচ্ছা করেছিল মেঘকে ছেড়ে চলে যেতে। কিন্তু সে উপায় যে ওর নেই। এই মেঘই যে ওর সাত রাজার ধন এক মানিক। এই ভালবাসার মানুষটাকেই তো যুগযুগ ধরে খুঁজে বেড়িয়েছে পাগলের মত। মেঘই তো সেই সুরের স্রষ্টা যে সুর ঊর্মিকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে সেই কোন যুগ থেকে। মেঘই তো ঊর্মির স্বপ্নে দেখা সেই ভালবাসার মানুষ যে বারবার ওর স্বপ্নে ফিরে এসে ওকে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে ভালবাসার বৃষ্টিতে।

প্রথমবার মেঘকে দেখার পর, ওর গিটারের সুর শোনার পর খুশিতে পাগল হয়ে গেছিল ঊর্মি। মনে হয়েছিল এই বার বুঝি খোঁজ শেষ হল ওর। ঊর্মি সেদিন ভেবেছিল এইভাবেই বোধ হয় স্বপ্নে লুকিয়ে থাকা ভালবাসা হঠাৎ করেই একদিন আছড়ে পড়ে বাস্তবের মাটিতে। তবে একই সাথে ওর ভয়ও করেছিল বড্ড। মেঘ যদি ওকে ভালবাসতে না চায়! যদি মেঘের জীবনে অন্য কোন নারী থেকে থাকে!

কিন্তু ঈশ্বর ওর প্রতি অতটাও নির্মম হন নি। ঊর্মির ভালবাসার ডাকে সাড়া দিয়েছিল মেঘ। একটা বৃষ্টি ভেজা দুপুরে, ঝাঁপ ফেলা দোকানের আড়ালে মেঘ ওর ঠোঁটে এঁকে দিয়েছিল ভালবাসার স্বীকৃতি চিহ্ন। কিন্তু তাও মেঘ কেন এত দুরের মানুষ হয়ে থাকতে চায়? কিছু প্রশ্নের উত্তর সত্যি খুঁজে পায় না ঊর্মি।

—''ঊর্মি'' ডাকটা শুনেই চমকে তাকাল ও। কখন যেন মেঘ এসে সামনে দাঁড়িয়েছে।

—''মেঘ মেঘ''। হঠাৎ যেন শব্দগুলো কেমন যেন জড়িয়ে যাচ্ছে ঊর্মির।

মেঘ এসে বসল এবার ঊর্মির পাশে। আর অমনি ঊর্মি দুহাতে অঁকড়ে ধরল ওকে পরম নির্ভরতায়।

—''জান মেঘ আমার খুব একা লাগছে। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। আকাশ চলে গেল। আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আমায় একা করে দিয়ে চলে গেল''। জলের বড় বড় ফেঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছে ঊর্মির গালদুটো।

—''যে যাবার সে তো যাবেই ঊর্মি। মেনে নিতে হয় সেটা। এই বিশ্বে কোন কিছুই যে চিরস্থায়ী নয়, শুধু স্বপ্ন ছাড়া। তুমি যদি একা হতে না চাও তবে একটা স্বপ্ন খুঁজে নাও। এমন একটা স্বপ্ন যা তোমায় কখনও একা হতে দেবে না''।

—''আমি জানি মেঘ তুমি স্বপ্নে বিশ্বাস কর। তুমি তো আগেও আমায় কতবার বলেছ নিঃসঙ্গ মানুষকেও বিনা পয়সায় শুধু সুখ খুঁজে দিতে পারে একটা আকাশ রঙের স্বপ্ন। আমিও তাই এখন সব সময় স্বপ্ন দেখি মেঘ। তোমায় নিজের করে পাবার স্বপ্ন''।

—''কে বলল আমি স্বপ্নে বিশ্বাস করি? আমি স্বপ্নে নয়, স্বপ্ন ভঙ্গে বিশ্বাস করি। আমি স্বপ্ন দেখাতে পারি, কিন্তু দেখতে পারি না''। কথাগুলো বলেই কেমন যেন অদ্ভুত ভাবে হাসল মেঘ।

—''তার মানে? এসবের অর্থ কি''? মেঘের চোখের দিকে তাকিয়ে এবার সরাসরি প্রশ্ন করল ঊর্মি।

—''তুমি কি আমায় আদৌ ভালবাস সত্যি করে? কেন এমন কথা বল বারবার? কেন তোমার কোন ফোন নম্বর নেই? কেন আজকাল বই পাড়ায় বেশির ভাগ দিনেই তালা ঝোলে তোমার বইয়ের দোকানে? বল বল ''

হঠাৎ যেন হিংস্র হয়ে উঠেছে ঊর্মি। ভুলেই গেছে বাহ্যজ্ঞান।

আস্তে করে ঊর্মির হাতটা সরিয়ে দিল মেঘ।হাউহাউ করে কাঁদছে ঊর্মি এবার বাচ্চা মেয়ের মত। কাঁদতে কাঁদতেই মাথা রাখল ওর বুকে।

—''আমি তোমায় খুব ভালবাসি মেঘ। তুমি ছাড়া আর কে আছে আমার নিঃস্বার্থ ভালবাসার মানুষ? প্লিজ আমায় এভাবে কষ্ট দিও না''।

মেঘকে আঁকড়ে ধরে পাগলের মত অনেক কথা বলে যাচ্ছে ঊর্মি, কিন্তু ও লক্ষ্যই করল না আজ যেন মেঘ স্থবির এক মূর্তি। ঊর্মির স্পর্শ, ঊর্মির কান্না, যন্ত্রণা কোন কিছুই আজ যেন ছুঁতেই পারছে না ওকে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%