পল্লবী সেনগুপ্ত
আজ আকাশী নীল রঙের ঢাকাই জামদানীটা পরেছে ঊর্মি। একদিন আকাশই ওকে জন্মদিনে এনে দিয়েছিল এটা। তখনো বিবাহ নামক এই বন্ধনে আবদ্ধ হয়নি ওরা।
-''আকাশ এই আকাশী নীল রঙটা না মেঘের খুব পছন্দ জানিস? কেন তুই আবার এই রঙ এনে দিলি আমায়''? শাড়িটা হাতে পেয়ে জলভরা চোখে এটাই বলেছিল ঊর্মি। তখন ওর মেঘ বিরহে পাগল হরিণীর দশা।
আকাশ সেদিন ওর চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলেছিল
-''আকাশী যে আমারও বড় প্রিয়। তাই তো দিলাম।''
-''কিন্তু আমি যে মেঘ ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারি না। ভাবতে চাইও না। যদি কোনদিন মেঘ ফিরে আসে তবেই আবার সাজব, তবেই আবার বাঁচার ইচ্ছা ফিরে আসবে আমার কাছে''।
-''বেশ। তবে না হয় মেঘের জন্যই পরিস এটা, যেদিন মেঘ ফিরে আসবে সেদিনই পরিস। আমি মেঘকে খুঁজে নিয়ে আসব যেদিন সেদিন সাজিস আকাশ নীলে। আর আমি লুকিয়ে দেখব তোকে মানে তোদের। তোকে হাসি মুখে দেখতে আমারও যে ভীষণ ভাল লাগে''।
হ্যাঁ আকাশ এক সময় কথা দিয়েছিল ও নিজেই মেঘকে খুঁজে আনবে। কিন্তু তারপর পেরিয়ে গেছে অনেকটা সময়। পরিস্থিতি অনেক পাল্টে গেছে ঊর্মির জীবনে। আস্তে আস্তে ঊর্মি মেনে নিতে চেষ্টা করেছে হয়তো সত্যি মেঘ ওর জীবনের অলীক মায়া ছিল, যে আর কোনদিন ফিরবে না। কিন্তু মনের একটা ঘুমন্ত কোণা থেকে তবু কে যেন বলে উঠত বারবার
-''না একদিন সে ফিরবেই। সে অলীক নয়। সে আছে। সে ভীষণ ভাবে সত্যি।''
এখনও ঊর্মি বিশ্বাস করতে পারছে না। মেঘ সত্যি ফিরে এসেছে। সত্যি আবার ঊর্মি ছুঁতে পারবে তার স্বপ্নের মানুষকে। একটা কথা মেঘ প্রায়ই বলত
-''স্বপ্ন দেখতে তো সকলেই পারে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে ভালবাসতে পারে না সকলে। আর স্বপ্নকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করা তো আরওই কঠিন। যে সর্বান্তকরণে নিজের প্রাণে স্বপ্নকে বিশ্বাস করে, সেই ছুঁতে পারে স্বপ্নের সীমানা''।
আজ ঊর্মির চীৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে
-''হ্যাঁ মেঘই আমার স্বপ্ন। আমার ভালবাসা। তাকে আমি শুধু বিশ্বাস করিনি, তাকে নিজের জীবনের বিশ্বাসের ধ্রুবতারা বানিয়ে তুলেছিলাম সেইজন্যই হয়তো আজ সে শুধু আমার হতে চলেছে''। আর সেই মানুষকে ওকে ওর কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে ওর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, আকাশ।
রোজকার মতই জীবনের আরও একটা রঙচটা ধুসর সকাল দিয়েই শুরু হয়েছিল ঊর্মির আজকের দিনটা। কিন্তু একটা ফোন নিমেষে পাল্টে দিল সবটুকু। প্রায় চারদিন আকাশের কোন ফোন আসে নি। তাতে অবশ্য খুব একটা হেলদোল ছিল না ঊর্মির। কারণ ওদের মধ্যে এখন মানসিক দূরত্ব এখন প্রায় কয়েকশো যোজন। তাই ওর ফোন না আসাটা মোটেই খুব একটা চিন্তিত করেনি ওকে। আজ দুপুরের দিকে প্রায় চারদিন পর মোবাইলে আকাশের ইনকাইমিং কল দেখে ফোনটা একটু বিরক্ত ভাবেই তুলেছিল ও।
-''এতদিনে হঠাৎ মনে হল বাড়ি বলেও কোন পদার্থ আছে তোমার জীবনে''?
-''ঊর্মি আমি তাকে খুঁজে পেয়েছি। মেঘকে আমি পেয়ে গেছি।''
মুহূর্তের জন্য যেন হৃৎপিণ্ডটা থেমে গেছিল ঊর্মির। কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না ঠিক। কি বলছে আকাশ? কাঁপা গলায় বলেছিল
-''মানে''?
-''মানে মেঘ সত্যি আছে। আমি তাকে দেখতে পেয়েছি মুম্বাইয়ের একটা পার্টিতে। আমি কথা বলেছি তার সাথে। আমি আমার কথা রেখেছি ঊর্মি। আমি খুঁজে পেয়েছি দিয়েছি তাকে। আজ বিকালের ফ্লাইটে কলকাতা যাচ্ছে মেঘ। হোটেল সেরামিক এর ৬০৪ নম্বর রুম বুক করে দিয়েছি আমি তোমার জন্য। সেখানেই পৌঁছে যাবে মেঘ ঠিক সময়মত তোমার কাছে। তুমিও সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে সেখানে চলে যেও''। ব্যস আর কিছু বলে নি আকাশ। কেটে গিয়েছিল ফোন। প্রথমটায় কিছু বুঝতে পারছিল না ঊর্মি। তারপর খানিক ধাতস্থ হয়ে বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল আকাশকে। কিন্তু ওর ফোন সুইচ অফ।
অবশেষে ঘর ছেড়ে অভিসারের পথে বেরিয়েই পড়েছে ঊর্মি। কোন বিবাহ বন্ধন, কোন সমাজ আজ আর আটকাতে পারেনি ওকে। আজ যে ওর নিজের ভালবাসার কাছে নিজেকে সমর্পণ করার দিন।
-'' ম্যাডাম আপনার লোকেশন এসে গেছে''। ভাড়ার ক্যাবের চালকের ডাকে হুঁশ ফিরে পেল ঊর্মি। ভাড়া মিটিয়ে চলে গেল হোটেলের ভেতর।
সমস্ত নিয়ম কানুন সেরে এখন ঊর্মি হোটেল সেরামিকের ৬০৪ নম্বর ঘরে। বুকের ভেতর কেউ যেন লক্ষ হাতুড়ি পিটাচ্ছে ওর। কখন সে আসবে? এক দম বন্ধ করা অপেক্ষা নিয়ে দরজার দিকে চেয়ে বসে আছে ও। এক একটা মুহূর্তকে যেন মনে হচ্ছে এক একটা দিন প্রায় আধঘণ্টা কেটে গেছে। হাল্কা তন্দ্রায় জড়িয়ে এসেছে ঊর্মির চোখ। হঠাৎ দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। ধড়মড় করে উঠে বসল ও।
-''কে''? কাঁপা গলায় বলল।
-''মিসেস ঊর্মিলা?'' বলল কেউ দরজার ওপার থেকে।
ভাল লাগায় দমটা বন্ধ হয়ে আসছে ঊর্মির। দরজার ওপারে থাকা মানুষটার কণ্ঠস্বর দূর করে দিয়েছে ওর সবটুকু সন্দেহ।
প্রায় একছুটেগিয়ে দরজাটা খুলে দিল ও। ওইদিকে দাঁড়িয়ে আছে ওর স্বপ্নে দেখা সেই মানুষটা, যাকে শুধু একটাবার ছুঁয়ে দেখার জন্য অপেক্ষামান চাতকের মত এতগুলো বছর ধরে ছটফট করে গেছে ঊর্মি। সে ঢুকে এল ঘরের ভিতর। দরজাটা বন্ধ করে দিল সশব্দে।
-''মেঘ! মেঘ কেন এতদিন আমায় ছেড়ে দূরে ছিলে তুমি? কেন? আমি কি অপরাধ করেছিলাম বল''? ভেজা গলায় আছড়ে পড়ল ঊর্মি।
-''ম্যাডাম আপনার একটু ভুল হচ্ছে। আমার নাম মেঘ নয়। আমার নাম নয়ন বিশ্বাস? আপনিই ঊর্মিলা ম্যাডাম তো''?
-''হ্যাঁ আমিই তোমার ঊর্মি মেঘ। কিন্তু এসব কি বলছ তুমি? নয়ন মানে? কে নয়ন? কিসের নয়ন''?
-''একি! আপনি তো কিছুই জানেন না মনে হচ্ছে। শুনুন ম্যাডাম আপনার স্বামী মানে আকাশ স্যার আমায় এখানে আসতে বলেছেন।''
-''জানি মেঘ। আকাশ তোমায় খুঁজে পেয়েছে। তাই তো ও আজ মিলিয়ে দিতে চায় আমাদের''।
-''হ্যাঁ মিলতেই তো এসেছি''। এবার মেঘের ঠোঁটের কোণে ঊর্মি দেখতে পেল অচেনা একটা হাসি।
-''শুনুন ম্যাডাম মিলিত হবার খেলায় আমি যথেষ্ট অভিজ্ঞ। সেই নিয়ে চিন্তা করতে হবে না আপনাকে। আমি বেশ কয়েকছর ধরে সফল ভাবেই করছি যৌনকর্মীর কাজটা। আমার নাম নয়ন বিশ্বাস। পয়সার বিনিময়ে মহিলাদের শারীরিক চাহিদা পূরণ করাই আমার প্রধান কাজ।
আপনার স্বামীর সাথে আমার মুম্বাইতেই আমার দেখা হয় একটা পার্টি। উনিও আমায় মেঘ বা ওরকম কিছু একটা নামেই ডাকছিলেন। আমি বারবার বলা সত্ত্বেও শুনছিলেন না। একটু পাগলাটে লোক বোধ হয়।
আমায় অনেক বড়সড় কি সব গল্প শোনালেন। আমি ওত বুঝিনি। বুঝতে চাইও নি। তবে যতটুকু মনে হল আপনার সাথে ওনার সম্পর্ক ভাল না।আপনি ওনাকে নিয়ে খুশি নন। তাই আপনার অন্য একজনকে চাই। সেইজন্যই বোধ হয় উনি আমাকে আপনার কাছে পাঠাতে খুব ব্যস্ত ছিলেন। আসলে আমি ওনার ক্লায়েন্টকে এমন খুশি করেছি যে উনি বিজনেস কনট্র্যাক্ট পেয়ে গেছেন। তাই বোধ হয় বেশ ভরসা আমার প্রতি। উনি আমায় মেঘ মেঘ বলে কেন ডাকছিলেন জানি না। তবে বেশ কিছু টাকা দিলেন। বললেন আপনার কাছে এলেই নাকি আপনি সব বুঝিয়ে বলবেন আমায়।
কিন্তু বোঝাবুঝির তো কিছু নেই ম্যাডাম। আপনি ক্লায়েন্ট আর আমি আপনাকে সার্ভিস দেব। তবে সত্যি কথা বলতে কি আপনার মত এমন সুন্দরী কম বয়সী ক্লায়েন্ট খুব একটা তো পাওয়া যায় না। তাই আমারও বেশ লেগেছে আপনাকে। এরকম ক্লায়েন্টের শরীর নিয়ে খেলা করতে পারাটাও বেশ মজার। আমি তাই আপনার থেকে কম রেটই নেব, চিন্তা করবেন না''। একটা কামুক দৃষ্টি খেলছে ঊর্মির সামনে দাঁড়ান লোকটার দুই চোখে।
চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে ঊর্মির। এটা কে? মেঘের মত দেখতে হলেও মেঘের আড়ালে এ কোন পিশাচ? কিভাবে আকাশ একে মেঘ ভাবতে পারল? কেন পাঠাল ওকে ওর কাছে? আসলে আকাশ তো কোনদিন মেঘকে দেখেইনি। তাই ঊর্মি নিজেই শুধু বাহ্যিক মিল দেখে যদি একে মেঘ ভেবে ভুল করতে পারে তবে আকাশের আর দোষ কোথায়?
-''ম্যাডাম বলুন কিভাবে আপনাকে খুশি করতে পারি আমি''? লোকটা আস্তে আস্তে এগোচ্ছে ঊর্মির দিকে। আর ওর মনে হচ্ছে চোখের সামনে যেন বালির ঘরের মত ভেঙ্গে পড়ছে ওর মনের মণিকোঠায় সযত্নে লালিত ওর স্বপ্নের টুকরোগুলো। না এই যৌনকর্মীটা ওর স্বপ্নে দেখা সেই মানুষ হতে পারে না। ওর মেঘ হতেই পারে না।
-''ম্যাডাম আই রিয়েলি লাইক ইউ''। কথাটা শেষ করেই লোকটা ক্ষিপ্র নেকড়ের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল ঊর্মির ওপর হোটেলের বন্ধ ঘরে। জোর করে ঠোঁটে ঠোঁট ঘষছে ঊর্মির। বুকের ওপর থেকে বল প্রয়োগ করে সরিয়ে দিল ঊর্মির আঁচল।
নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে এবার নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ঊর্মি। সপাটে এক চড় কষাল লোকটার গালে। এক দলা থুতু ছিটিয়ে দিল তার মুখে। হিংস্র চোখে তাকিয়ে বলল
-''আর একবার জোর করে আমায় ছোঁয়ার চেষ্টা করলে খুন করে দেব ঠিক ওই মুহূর্তেই''।
পাগলের মত করে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঊর্মি খুলে ফেলল হোটেলের ঘরের বন্ধ দরজাটা। লোকটার ঘৃণ্য ঠেঁটের ছোঁয়ায় অসম্ভব গা গুলাচ্ছে। চোখ দিয়ে শ্রাবণের অবাধ্য বৃষ্টিধারা বয়েই চলেছে ওর। না, এই ছোঁয়া ওর মেঘের হতে পারে না। ওর মেঘ এর আসল পরিচয় কিনা সে একটা যৌনকর্মী! না এটা হতেই পারে না। এই লোকটা মেঘ, ওর স্বপ্নের মানুষ হতেই পারে না। মেঘ সত্যি হারিয়ে গেছে আজ মর্মে মর্মে বুঝছে ও। সত্যি হয়তো মেঘ বলে কেউ ছিলই না। এবার থেকে এটাই বিশ্বাস করবে ও। মেঘ একজন বিকৃত কাম যৌনকর্মী এটা যে কোনভাবেই মানতে পারবে না ও প্রাণ থাকতে।
পাগলের মত রাস্তা দিয়ে দৌড়াচ্ছে ঊর্মি। আজ থেকে কোন স্বপ্ন কল্পনায় আর ও বাঁচবে না এবার থেকে ও বাঁচবে বাস্তবের মাটিতে, আজ যেন ঈশ্বর ওকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন স্বপ্ন স্বপ্নই হয়। সুন্দর অথচ ক্ষণস্থায়ী। স্বপ্ন আর বাস্তবকে জোর করে মিলিয়ে দিতে চাইলেও হয়তো এভাবেই তা কদর্য হয়ে ওঠে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।