পল্লবী সেনগুপ্ত
ভাড়ার ক্যাবটা সাঁই সাঁই করে ছুটছে। মনে হচ্ছে নরম আবছা সন্ধ্যটাকে যেন চাকায় পিষে দৌড়াচ্ছে এক দুর্দান্ত দানব নিজের লক্ষ্যপূরণের পথে। প্রতিবারই এমনটা মনে হয় নয়নের যে কোন নতুন ক্লায়েন্টের কাছে যাবার সময়। সাধারণত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্লায়েন্টের সাথে কলকাতা শহর ছাড়িয়ে, একটু আউটসকার্ট বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কোন নির্জন রিসোর্টেই সময় কাটাবার জন্য যেতে হয় ওকে। দেখতে দেখতে তে বেশ অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেল তবুও প্রতিবার নতুন ক্লায়েন্ট মিট থাকলেই কেমন যেন অদ্ভুত একটা বিচ্ছিরি তেঁতো অনুভূতি খেলা করতে থাকে ওর বুকের মধ্যে। কেন যে এতগুলো বছর পের হয়ে যাবার পরেও আজও পুরোপুরি অভ্যস্ত হতে পারল না ও কে জানে!
আসলে একজন মানুষ থেকে শুধুমাত্রই একটা রক্ত মাংসের শরীরে পরিণত হতে পারাটা তো কখনই তো খুব সহজ হতে পারে না। অন্তত নয়নের মত একজন মানুষের পক্ষে তো সেটা সহজ নয়ই। তবুও ও সেই প্রথমদিন থেকেই চেষ্টা করে গেছে নিরন্তর একটু একটু করে। হয়তো খানিকটা সফলও হয়েছে সেই চেষ্টা বিগত বছরগুলোর প্রতিটা দিনে। নিরন্তর মানিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টার একটা অনিবার্য মূল্য তো থাকেই।
এই কয়েকটা বছরে কেমন ঝড়ের মত যেন কেটে গেল ওর জীবনটা। খোলনালচে বদলে গেল একটা ছেলে। কত কিছু নতুন শিখল, জানল। নিজেকেও চিনতে পারল নতুন করে। নিজের বদলে যাওয়া অনুভূতিগুলোকে নিয়ে অভিযোজন করে যে ও বাঁচতে পারে সেটা বুঝল ধীরে ধীরে।
আজকের পেশাদার এসকর্ট নয়ন বিশ্বাস কে ছিল আদতে? একটা নিদারুণ গ্রাম্য ছেলে। যে জীবনসংগ্রাম করে চেনা ছকেই কাটিয়ে দেবে ভেবেছিল জীবনটা। কিন্তু মানুষের ভাবনা আর বাস্তব এর মধ্যে যে সাত আকাশ ব্যবধান থাকে তখন কি ছাই আর সে সব ও জানত!
নিজের ভালবাসার মানুষগুলোকে ধরে রাখতে পারে নি ও, হারিয়ে গিয়েছিল সেই ভাসা চোখ আর পানপাতা মুখের মেয়েটার কাছ থেকেও।সব হারিয়ে নিঃস্ব হবার পর আর ওর মনের জোর ছিল না জীবনের শেষ আপনজনটাকে হারিয়ে ফেলারও। তাই এই সিদ্ধান্ত সেদিন নিতে দেরি করে নি ও। কম সময়ে বেশি টাকা রোজগারের জন্য সেদিন শুধু এই একটা পথই খোলা ছিল ওর সামনে। নিজেকে বিক্রি করে দেওয়া। নিজের মাংস রক্তের হৃৎপিণ্ডটাকে নিজের হাতে ছিঁড়ে ফেলে একটা শরীরে পরিণত হতে পারার বিকল্প গ্রহণ করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না ওর।
যে পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকি আমরা সেই পৃথিবীর কোণায় কোণায় যে কত অন্ধকার ছড়িয়ে থেকে, অজানা পরিচ্ছেদ লুকিয়ে থাকে তার কতটুকুই বা জানতে পারি আমরা! এই কথাটাই আজকাল বড্ড তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় নয়নকে।
ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত ও কলকাতা শহরের নিষিদ্ধ পল্লীর কথা অনেকবারই শুনেছে অনেকের কাছেই। এ এমন এক জায়গা যেখানে নাকি নারীরা শুধুই ভোগ্য পণ্য। নারীর সেখানে শরীর ছাড়া আর কোন অস্তিত্বই নাকি থাকেনা। কত টিভি সিরিয়াল, সিনেমা, গল্প, উপন্যাস, থিয়েটার, যাত্রা পালা এসবে তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে যৌনকর্মী মেয়েদের হাহাকার, সংগ্রাম আর রোজনামচার কথা। একটা মেয়ের প্রতিবার নিজের শরীরটা হাত বদল হতে থাকলে হৃদয়ের অলিন্দের ব্যাথাটা যে ঠিক কেমন হয় সেটা অনেক গল্প উপন্যাসে পড়েছিল নয়ন। কিন্তু পুরুষ? নিজের শরীরটা ক্রমাগত বিক্রি করতে করতে একজন পুরুষের বুকের গভীরের রক্তক্ষরণ নিয়ে তো কোন মর্মস্পর্শী সিনেমা বা গল্প হয় না।
পুরুষকেও শরীর বিক্রি করতে হয়? প্রথববার ব্যাপারটা শুনেই আকাশ থেকে পড়েছিল নয়ন। তারপর আস্তে আস্তে আবছা ছবিটা পরিষ্কার হল চোখের সামনে। কলকাতা সহ ভারতবর্ষের বহু বড় শহরেই এখন ভীষণ চাহিদা পুরুষ যৌন কর্মীর। গোপনে হলেও বেশ রমরমিয়েই চলছে এই কালো ধান্দা।
আসলে প্রযুক্তি যতই উন্নতির শিখরে পৌঁছে যাক না কেন, মানুষের একাকীত্ব আর মানসিক অবসাদ যেন তার সাথে বেড়ে চলেছে পাল্লা দিয়ে। নয়ন যদি এই পেশায় না আসত তাহলে হয়তো কোনদিন জানতেই পারত না অলিতে গলিতে মাথায় চওড়া সিঁদুর টানা অনেক মহিলাই একনাগাড়ে স্বামীদের উপেক্ষা, ব্যস্ততা ইত্যাদির শিকার হতে হতে আস্তে আস্তে নিজের একাকীত্ব কাটাতে খুঁজে নিচ্ছেন বন্ধুত্ব ও জৈবিক তাগিদা মেটানোর জন্য বেছে নিচ্ছেন নয়নদের মত কাজ করে থাকা মানুষদের। আর তাই জন্যই করে খাচ্ছে নয়নদের এজেন্সির মত অনেক কোম্পানি ও ছেলেরা।
টানা এক বছর ধরে ঘষা মাজা ও ট্রেনিং পর্বের মাধ্যমে পেশার উপযুক্ত করে তোলার কাজ। তারপর আস্তে আস্তে ক্লায়েন্ট এর কাছে পাঠান শুরু হল ওকে। বেশিরভাগ ক্লায়েন্টই প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে। কেউ কেউ তো আরও সিনিয়র। তবুও শারীরিক সুখের জন্য এরা ভাড়া করে নয়নদের। ও লক্ষ্য করেছে বেশিরভাগ মহিলা গুলোর চোখের মধ্যেই খেলা করে কেমন যেন একটা গুমরে থাকা যৌন ক্ষিদের পাশাপাশি সব কিছু ভেংগেচুড়ে জ্বালা মেটানোর প্রবণতা।
ঝট করে অভ্যাসমত নিজের মোবাইল বের করে আজকের ক্লায়েন্টের নাম পরিচয় দেখে নিল নয়ন। ক্লায়েন্টের কাছে পৌঁছানোর আগে এগুলো ওদের এজেন্সি মেসেজ করে দেয় সবিস্তারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নকল পরিচয়। কারণ এজেন্সি সকলকে প্রতিশ্রুতি দেয় একশো শতাংশ গোপনীয়তা রক্ষার। তাই ক্লায়েন্টের বানানো নামটাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করাটা এই ক্ষেত্রে দস্তুর।
কিন্তু আজ ক্লায়েন্টের নাম আর বয়স দুটো দেখেই কেমন যেন থমকে গেল নয়ন। এটা কি আদৌ ভুয়ো নাম? না মনে তো হচ্ছে না। বানানো নামগুলোর সাধারণত নিজস্ব একটা প্যাটার্ন থাকে। কিন্তু এই নামটা তো ঠিক সেইরকম লাগছে না। আর বয়সও তো বেশ কম। এরকম একজন কম বয়সী মেয়ে তো চাইলেই নিজের বয়ফ্রেন্ড কে নিয়ে এনজয় করতে পারেন। এরকম বয়সী একজন মহিলার হঠাত যৌনকর্মী প্রয়োজন হল কেন?
-''আপনার লোকেশন এসে গেছে স্যার''। ড্রাইভারের কথায় একটু চমকে উঠল নয়ন। গাড়ি থেকে নামল ধীর পায়ে। এসে গেছে সত্যি ওর গন্তব্য। আস্তে আস্তে পৌঁছে গেল ও নির্জন রিসোর্টের নির্দিষ্ট রুম নম্বর মিলিয়ে।
ডোরবেল টিপতেই দরজা খুলে গেল। নয়ন হাসল নিজের পেশাদারী ঢঙে। তারপর অভ্যস্ত কণ্ঠে বলল
-''ম্যাম আমি নয়ন বিশ্বাস। 'ফ্রেন্ড এন্ড ফ্রেন্ড' এজেন্সি থেকে এসেছি। নাউ এট ইয়োর সার্ভিস''।
-''তিস্তা। আমি তিস্তা''। নয়নের কথা শেষ হতেই বলল ক্লায়েন্ট। এবার মেয়েটার দিকে ভাল করে তাকাল নয়ন। হাতকাটা কুর্তি আর লেগিন্স পরা। বেশ সুন্দরী। মেয়েটাকে দেখে বেশ নার্ভাস মনে হচ্ছে। ঠোঁট দুটো কাঁপছে অল্প অল্প। মাথার ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম। চোখে কেমন যেন একটা সর্বহারার দৃষ্টি। চোখ দুটো এবার নামিয়ে নিল নয়ন। এমন মায়াবী দুঃখী দৃষ্টিকে যে বড় ভয় ওর। মেয়েটার মুখের আদলে কার সাথে যেন মিল? তার সাথে কি যার থেকে পালিয়ে বেঁচেছিল নয়ন? নাকি মিলটা তার সাথে যাকে একদিন বিসর্জন দিয়েছিল নিজের হাতে?
এলোমেলো ভাবনাগুলো মাথা থেকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করল ও। মেয়েটা খাটের কোণা খামচে কেমন যেন ভেবলে দাঁড়িয়ে আছে। এই ধরণের পরিস্থিতে ওদেরই এগিয়ে যেতে হয় ক্লায়েন্টকে স্বচ্ছন্দ করার জন্য। তাই করল যথারীতি ও। এগিয়ে গেল ক্লায়েন্টের দিকে। হাত বাড়িয়ে কাঁধ ছুঁল ওর। মেকি উষ্ণতা মাখিয়ে চাপ দিল অল্প করে।
এবার শক খাওয়ার মত ছিটকে গেল মেয়েটা। অবাক লাগল নয়নের। একি! এত সাধুপুরুষ তো কেন যৌনকর্মী ভাড়া নিয়েছে সে! মেয়েটা এবার নয়নকে চমকে দিয়ে দুম করে আছড়ে পড়ল বিছানায়। বালিশ খামচে ধরে কাঁদছে হুহু করে। কান্নার দমকে ফুলে ফুলে উঠছে ওর পেলব শরীরটা।
অনেক অভিজ্ঞতাই কর্মজীবনে হয়েছে নয়নের। কিন্তু এমনটা এই প্রথম। না মেয়েটার শরীরটা দেখে মোটেই কামভাব জাগছে না নয়নের। বরঞ্চ মন দ্রবীভূত হচ্ছে অদ্ভুত এক মায়ায়। ওর কান্নার ধরনটাও যে একজনের সাথে বড় মেলে। বিছানায় মেয়েটার পাশে এবার আস্তে করে বসল নয়ন। হাত রাখল নরম করে ওর মাথায়। না, এবার আর হাত সরাল না সে। উল্টে আরও বেড়ে গেল যেন তার কান্নার দমক।
নয়ন চেনে এই কান্নার সুর। এই কান্না সব পেয়েও হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা থেকে আসে। ঠিক নয়নের নিজের বুক থেকে বেরিয়ে আসা কান্নার মত শব্দটা। আস্তে আস্তে তিস্তার মাথায় আলগোছে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে নয়ন। কথা বলছে না কিছু। আর তিস্তা শুধু কেঁদেই চলেছে। যেন আজ রাতেই ও উজাড় করে দেবে বুকে চেপে রাখা এত বছরের সবটুকু ধারাল যন্ত্রণা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।