পল্লবী সেনগুপ্ত
মনের ভেতরটা অনেকদিন পর আজ বেশ ফুরফুরে লাগছে আকাশের। অবশেষে অনেকদিন পর নিজেকে বেশ সফল মনে হচ্ছে। ইদানীং নানা ঘাত প্রতিঘাতে জর্জরিত হতে হতে কেমন যেন নিজেকে অপদার্থ লাগতে শুরু করেছিল ওর। তাই আজ এই পেশাদারি সাফল্যটা অনেকটা শান্তি দিচ্ছে ওকে।
বিদেশ থেকে ক্লায়েন্ট এসেছে মুম্বাইতে শুধু আকাশের সাথে বিজনেস মিটিং এর জন্যই। কয়েক কোটি টাকার ডিল। এই ডিল পাকা হলে আকাশের কোম্পানিতে অন্যরকম সম্মানের জায়গা তৈরি হয়ে যাবে। তবে আজ যে মিটিং হল তাতে তো সব কিছু বেশ ইতিবাচকই মনে হল। ফাইনাল ডিল সই সাবুদ হবে আগামীকাল। তার আগে আজ ক্লায়েন্টকে একটু তুইয়ে রাখতে হবে আর কি। সেইজন্যই তো আজ রাতে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মুম্বাইয়ের ঝাঁ চকচকে পার্টিতে, তারপর খাওয়ানো হবে তাকে দামী রেস্তরাঁতে ডিনার।
টেবিলে রাখা জলের গ্লাসটায় একটা শান্তি চুমুক দিল আকাশ। আর ঠিক তখনই ঝঙ্কার তুলে বেজে উঠল ওর মোবাইল ফোনটা। স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে সৈকতের নম্বর। সৈকত ওর অফিসে জুনিয়র হলেও আকাশের সাথে সম্পর্কটা অনেকটাই বন্ধুর মত। আজকের পরদেশি ক্লায়েন্টকে খুশি করার ব্যবস্থাপনা সাজানোর দায়িত্ব আকাশ ওকেই দিয়েছে। ছেলেটা সত্যি বেশ করিতকর্মা। একদম গুছিয়ে গাছিয়ে সব সময় পালন করে নিজের সবটুকু দায়িত্ব।
—''হ্যাঁ সৈকত বল''। ফোন কানে চাপল আকাশ।
—''আকাশদা সব ব্যবস্থা একেবারে করে ফেলেছি। দামী ডিস্ক, রেস্টুরেন্ট সব বুক করে ফেলেছি ক্লায়েন্টের জন্য। আমাদের চকচকে ব্যবস্থাপনায় পুরো ফিদা হয়ে যাবে লোকটা। দৌড়ে দৌড়ে আগামীকাল ডিল সাইন করে দেবে''।
—''আমার তোর ওপর পুরোপুরি আস্থা আছে ভাই''। অল্প হাসল আকাশ।
—''শোন দাদা, শুধু ডিস্ক , পার্টি বা ডিনার নয়। আর একটা যা ব্যবস্থা করেছি না, পুরো জমে ক্ষীর হয়ে যাবে সবটা''।
—''মানে? এসব কি বলছিস''?
—''শোন দাদা, আমি খুব ভাল করে খোঁজ লাগিয়ে নিয়েছি লোকটার ব্যাপারে। লোকটা হচ্ছে বিশুদ্ধ গে মানে সমকামী আর কি। সব জায়গাতেই সে কথা খোলাখুলি স্বীকার করেন এই মহাপুরুষ। আর ভারতীয় ছোকরাদের প্রতি ওনার একটু বাড়তি মোহও আছে। সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগিয়ে পটাতে হবে লোকটাকে।
আমি একজন জিগেলো ভাড়া করে নিয়েছি দাদা। এ বেশ হাইপ্রোফাইল পুরুষ যৌনকর্মী। পুরো খুশি করে দেবে আমাদের ক্লায়েন্টকে আজ রাতে। সব কথা হয়ে গেছে আমার। এই নয়ন বিশ্বাস সত্যি নাম করা এই ক্ষেত্রে। ''অদ্ভুত দুষ্টুমি খেলা করছে সৈকতের গলায়।
গা টা কেমন গুলিয়ে উঠল আকাশের। এ সব কি বলছে সৈকত। ছি! কিন্তু পরক্ষনেই মনে পড়ল বস বারবার বলে দিয়েছিল যে ভাবেই হোক এই ক্লায়েন্টকে ইম্প্রেস করতেই হবে।তাতে যা যা করা দরকার তাই যেন করা হয়।
—''কি হল আকাশদা? কিছু বলছ না কেন''? একটু অধৈর্য হয়েছে সৈকত আকাশকে নীরব দেখে।
—''হুম বুঝলাম''।
—''শোন তোমায় আমি ডিস্কের ঠিকানা মেসেজ করে দিচ্ছি। ওখানেই থাকবে নয়ন। তুমি ক্লায়েন্টকে ওর সাথে পরিচয় করে দিও ওই ডিস্কে এসে তারপর সব নয়ন সামলে নেবে''।
কট করে কেটে গেল ফোনের লাইন। থম মেরে কিছুক্ষণ বসে রইল আকাশ। তারপর বুক ঠেলে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল একটা।
******
ক্লায়েন্টকে নিয়ে যথাস্থানে পৌঁছে গেছে আকাশ। ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যা আটটা ছুঁইছুঁই। মিস্টার জনসন মনের সুখে মদ্যপান করে চলেছে, আর ঢুলুঢুলু চোখে প্রতীক্ষা করছে আজকের নৈশসঙ্গীর। লোকটাকে দেখেই কেমন যেন ঘৃণ্য লাগছে আকাশের। ইতিমধ্যেই দু বার সে জিজ্ঞাসা করে ফেলেছে নয়ন বিশ্বাসের কথা।
কিন্তু সৈকত কই? কোথায়ই বা নয়ন বিশ্বাস? উফফ! দমটা কেমন যেন আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে আসছে আকাশের।
সত্যি কত সব অন্ধকারই না লুকিয়ে থাকে আমাদের চারপাশের পৃথিবীটারই আনাচকানাচে। এই সব পুরুষযৌনকর্মীরাইও তো এই সমাজেই বাঁচে। নিজের বিবেক, বুদ্ধি, মান সম্মান সব কিছু বিসর্জন দিয়ে এরা শরীর বিক্রি করে চলেছে দিনের পর দিন। নিষিদ্ধ নোংরা কাজ কর্ম করে আবার বুক ঠুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই সমাজেই। সমকামীদের ভোগ্য হতেও এদের দ্বিধা হয় না শুধু অর্থের জন্য। ছি! এরাও নাকি পুরুষ! ভাবতেও ঘেন্না হয় যতবার ওই নয়ন বিশ্বাস নামটা মনে আসছে ততবারই যেন বমি পাচ্ছে আকাশের।
—''আকাশদা'' চমকে তাকাল পিছনে আকাশ।
—''আকাশদা এই যে, এই হল নয়ন বিশ্বাস। এর কথাই বলেছিলাম। একেই তুমি আলাপ করিয়ে দাও জনসন বাবাজীর সাথে''। চোয়াল ফাঁক করে হাসছে সৈকত। ওর ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে মভ কালারের শার্ট আর নেভি ব্লু জিন্স পরা একটা চকচকে ছেলে। তার শরীর থেকে ভুরভুর করে ভেসে আসছে দামী পারফিউমের গন্ধ।
—''হ্যালো স্যার। আই অ্যাম নয়ন।'' বাহারি চালে কথাগুলো বলেই আকাশের দিকে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল ছেলেটা।
আকাশ হাত বাড়াতে পারল না। ও বুঝতে পারল ওর পায়ের নীচের জমিটা কাঁপছে। চোখের সামনে দুলতে শুরু করেছে সাজান গোছান পৃথিবীটা। বুকের মধ্যে ধড়ফড় করছে অস্বাভাবিক রকম।
না নিজের চোখকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না আকাশ। ওকি আদৌ ঠিক দেখছে? নাকি সবটাই চোখের ভুল? এটা কি আদৌ সম্ভব? কিন্তু কি করে হতে পারে এটা?
এই মুহূর্তে আকাশের চোখের সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে নয়ন বিশ্বাসের পরিচয়ে, তার মুখটা আকাশের অচেনা নয়। বরঞ্চ একটু বেশিই ভাল ভাবে চেনা। ঠিক এই মুখের ছবিই বহুবার দেখেছে ও নিজের ভালবাসার মানুষের রঙ তুলিতে। ঊর্মির কল্পনায় ওর যে প্রেমিক আজও ছেয়ে রয়েছে তার প্রতিভূ তো হুবুহু এই নয়ন বিশ্বাসের মত। ঊর্মির মনের মানুষ মেঘ, যে বড় সাধারণ হয়েও অসাধারণ ঊর্মির মতে। কিন্তু ওর সেই কাল্পনিক চরিত্রের সাথে কি করে এত মিল থাকতে পারে এই নিচ ঘৃণ্য ছেলেটার?
—''আকাশদা, আকাশদা তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? আকাশদা''.... দৌড়ে এসে এবার ওকে ধরে ফেলল সৈকত। ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়েছে আকাশ। সৈকত এসে ধরে না ফেললে অজ্ঞান হয়ে মাটিতেই লুটিয়ে পড়ত ও।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।