পল্লবী সেনগুপ্ত
কাগজের টুকরোটা হাতের মুঠোয় চেপে স্থাণুবৎ বসে রয়েছে আজিজ। মাথার মধ্যে কেমন যেন ভোঁ ভোঁ করছে। এক টুকরো কাগজ যেন নিমেষে বদলে দিয়ে গেল ওর জীবনে বেঁচে থাকার প্রতিটা মুহূর্তগুলোকে।
প্রতি পরতে দারিদ্র্যর ছাপ মাখা এক ফালি ঘরটার ভাঙ্গা খাটে বসে ওই মহিলার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে ও। মানুষটা এখনও এক চিলতে রান্নাঘরটায় দাঁড়িয়ে মন দিয়ে রান্না করে যাচ্ছে আর তার সাথে কেশেই চলেছে খকখক। কি নির্বিকার মুখ। আসলে সে তো এখনও জানেই না তার এই খকখকে কাশির আড়ালে কি সর্বনাশা রোগ ঘাপটি দিয়ে আছে।
ক্যান্সার! এমন সর্বনাশা রোগের বিষ আস্তে আস্তে জমেছে মানুষটার শরীরে। মানুষটা আজিজের মা তো শুধু নয়, মা, বাবা, বন্ধু, শত্রু সব কিছু। না ছেলেকে ভীষণ আদরে যে ছোটবেলা থেকে ভরিয়ে রেখেছিল এমনটা ঠিক নয়, কিন্তু আঁকড়ে রেখেছিল বড্ড বেশি। ছেলের সবটুকু সব সময় তার নিজের হাতে করা চাই। ছেলেকে খুব ভাল ভাবে বড় করার স্বপ্ন দেখত মানুষটা বরাবর। তাই নিজের সাধ্যমত আজিজকে সবটুকু সুখ এনে দেবার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছে চিরকাল। কিন্তু সমাজ তো আর একজন কুমারি মাকে এত সহজে মেনে নেয় না। তার ওপরে আবার ছোট একটা গ্রামের মুসলিম সমাজ। মানুষটাকে কত যে ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করে যেতে হয়েছে সারাজীবন ধরে সেটা হয়তো কেউ আন্দাজই করতে পারবে না।
আজিজকে নানা তির্যক মানুষের নানান কটু কথা আর অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে বারবার। কিন্তু সব সময় মা এসে আগলে নিয়েছে ওকে। সমাজের সমস্ত আঘাত নিজে মাথা পেতে ওকে ক্ষত বিক্ষত হওয়া থেকে বাঁচাতে চেয়েছে বারবার।
আজিজকে নানা সময় মুখ ঝামটা দিয়েছে সে, কিন্তু আজীবন শুধু চেষ্টা করে গেছে ছেলেকে সবটুকু বিপদের আঁচড় থেকে আড়াল করে যেতে। আসলে এই ছেলে ছাড়া আর কে আছে মানুষটার! সব সময় তার বুকে জুড়ে ছেয়েছিল একটা ভয়। ছেলে কখনো ভুলে যাবে না তো তাকে! কতবার বলেছে সে
—''তোর শরীরেও তো বইছে ওই বেইমান হিন্দু জাতটার রক্ত। তাই তোকে বিশ্বাস করি না আমি''।
না মানুষটার হিন্দু জাতের প্রতি রাগ আছে ঠিক এমন নয়। তাহলে কি কেউ সেই জাতের মানুষের হাতেই দিয়ে বসে নিজের মন, নারীত্ব সব কিছু! কালবৈশাখীর বিধ্বংসী ঝড়ের মত সেই লোকটা আছড়ে পড়েছিল আজিজের মায়ের জীবনে।
দুমাসের জন্য এসেছিল সে বড়লোকের ছেলে এই গ্রামে। তার মাঝেই কিভাবে যেন সে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল আজিজের মায়ের। তারপর সে একদিন ফিরে গেল। আর রেখে গেল তার দু মাসের পুতুল খেলার প্রেমিকাকে বিয়ে করার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি সহ, আর একটা অনাগত প্রাণ এর ভ্রূণ।
না আর সে ফেরে নি। অনেক খুঁজেও তাকে আর খুঁজে পায়নি এই গ্রামের এই গরীব মানুষ গুলো। শুধু সমাজের থেকে 'নষ্ট মেয়ে' এর তকমা পেয়েছিল আজিজের মা সারাজীবনের জন্য। তবুও নিজের অনাগত সন্তানকে জন্ম দিয়েছিল সে। ছুঁড়ে ফেলে দেয়নি তাকে জন্মের পরও। শুধু আজিজকে বাঁচাতে পারেনি যারোজ সন্তান হবার লাঞ্ছনার হাত থেকে।
মা এর সব সময় বড় ভয় ছেলে কোন ভুল মেয়ের প্রেমে পড়ে যেন তার মত ঠকে না যায়। প্রেম ভালবাসা এই শব্দগুলোকে ঘৃণা করে মা। আজিজও কোনদিন চায়নি এই শব্দগুলোর কাছাকাছি গিয়ে পড়তে।কিন্তু তবুও শেষমেশ আর পারল কই!
কিন্তু আজিজ মনে প্রাণে বিশ্বাস করে ভালবাসার প্রকৃত অর্থ ভাল রাখা। ও তো নিজের ভালবাসার মানুষদের সুখি দেখতে চায় আজীবন। সেইজন্যই হয়তো নিজের বুকে কষ্ট চাপা দিয়েও হৃদয়কে বুঝিয়ে রাখে বারবার। আটকে রাখে নিজের বেয়াড়া আবেগকে। কিন্তু তাই বা পারছে কোথায়! মাঝে মাঝেই তো দামাল ঝড়ে এলোমেলো হয়ে যায় সব প্রচেষ্টা, সব প্রতিরোধ।
কিন্তু আজকের পর সব কিছু যে আরও অনেক বেশি ওলট পালট হয়ে গেল। মায়ের কাশিটা বড্ড বেড়েছিল। তাই কয়েকদিন আগে তাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছিল আজিজ। ডাক্তারবাবু ভুরূতে গম্ভীর ভাঁজ ফেলে কয়েকটা টেস্ট করাতে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরিণামে যে এমন মারণ সত্য সামনে আসবে তা যে দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে নি ও। সেই সত্যের ঘোষণা পত্রই এখন হাতে ধরে বসে রয়েছে ও।
কিন্তু এবার কি হবে! কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। এই রোগের চিকিৎসার যে বিরাট খরচ। এত টাকা আজিজ পাবে কোথায়? ওর সম্বল তো শুধুই একটা সামান্য মায়নের কলকাতার চাকরী। আর জমানো পুঁজিও যে ওদের শূন্য। তাহলে? তবে কি চোখের সামনে তিল তিল করে মাকে মরতে দেখতে হবে ওকে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই আতঙ্কে শিউড়ে উঠল ও।
—''কিরে কি ভাবছিস অমন ছাদের দিকে তাকিয়ে? নে খেয়ে নে''? কখন যেন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মা। হাতে খাবার। এক বাটি মুড়ি আর তরকারি।
—''আম্মি, আম্মি আমি তোমায় খুব ভালবাসি আম্মি। কোথাও যেতে দেব না আমি তোমায়''। হঠাৎ মাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চা ছেলের মত কেঁদে উঠল আজিজ।
—''কি ব্যাপার? আজ হঠাৎ আম্মি বলছিস আমায় মা না বলে? কি হয়েছে আজিজ''? হকচকিয়ে গেছে মাও।
—''এবার থেকে তুমি যা যা চাও আমি তাই করব। আমি তোমার সব কথা শুনব আমি''।
—''আচ্ছা। হয়েছে। এখন খা তো দেখি''। চিরন্তন স্নেহে ছেলের মাথায় হাত বুলাচ্ছে মা।
হুহু করে কেঁদেই চলেছে আজিজ। মুচড়ে উঠছে ওর বুকটা অব্যক্ত এক যন্ত্রণায়। না মাকে সারিয়ে তুলবেই ও। তাতে যা করতে হয় তাই করবে ও। চুরি ডাকাতি করার দরকার হলে তা করেই না হয় যোগাড় করবে টাকা। কিন্তু মাকে ও পয়সার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মরতে দেবে না। মাকে জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় কেঁদেই যাচ্ছে ছেলেটা। আর ওর চোখের জলেই ধুয়ে যাচ্ছে ওর হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে অঁকা একটা ছবি। পানপাতা মুখ আর নিষ্পাপ দুটো চোখ বসান একটা মেয়ের মুখের ছবি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।