পল্লবী সেনগুপ্ত
অখণ্ড নৈশব্দ বিছানো অন্ধকার ঢাকা ঘরটায় নিঝুম প্রতিমার মত নিশ্চল হয়ে বসে আছে শায়না। রাত কত হল হিসেব নেই। ঘড়ি দেখেনি ও। দেখতে ইচ্ছেও করছে না। বিগত কয়েক ঘণ্টায় আচমকাই যেন বদলে গেল হঠাৎ ওর লক্ষ্যহীন জীবনের উদভ্রান্ত ভাবনারা।
নিঃশব্দে ঘরের দরজা খুলে বাইরের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল শায়না। আজ গোটা বাড়িটাতেই যেন বিষণ্ণতার ছায়া। ও জানে আজ তিস্তা দিও খুব কেঁদেছে। তারপর এক সময়ে না খেয়েই ঘরের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে। তবে ঘুমাচ্ছে না নিশ্চয়। তিস্তাদিরও ঘুম বোধ হয় আসবে না আজ ঠিক শায়নার মতই।
অন্ধকারে ডুবে থাকা রাতের শহরের নিঃসঙ্গ রাতবাতিগুলোকে নির্নিমেষ চোখে দেখছিল শায়না। মনে হচ্ছে ঠিক যেন একটা কালো সমুদ্রের মাঝে নিঃসঙ্গ এক দ্বীপের মত জেগে রয়েছে ওদের বাড়িটা।
হুহু করে ফ্ল্যাশব্যাকের মত পুরনো সেই দিনগুলো চলে আসছে এক এক করে শায়নার সামনে।
কোন ছোটবেলাতেই মরেছিল শিউলির বাপ মা, মনেও নেই ওর। কাকা কাকীর সংসারে পরগাছার মতই বেড়ে উঠছিল মেয়েটা অযত্ন আর অবহেলায়। ভালবাসা কি, কাকে বলে আপনজন কিছুই জানা হয়নি ওর। হয়তো হতও না, যদি না ওই ফর্সা মুখের টানা টানা চোখের ছেলেটার সাথে ওর পরিচয় হত।
রোজ স্কুল থেকে ফেরার সময় ছেলেটাকে দেখতে পেত শিউলি। সাইকেল নিয়ে ঠিক ওর পিছু পিছু হেঁটে আসে। তারও পরনে স্কুল ড্রেস। তবে সে কোন কথা বলে না। শুধু অতন্দ্র প্রহরীর মত যেন সব বিপদ থেকে ওকে আগলে নিয়ে বেড়াতে চায় সে।
মাস দুয়েক এভাবে যাবার পর আর ধৈর্য রাখতে পারেনি শিউলি। একদিন মুখ ঝামটা দিয়ে বলেই উঠেছিল
—''এই কি চাও তুমি? কেন পিছু নাও আমার? বলব নাকি আমাদের গ্রামের বাকি দাদাদের''?
ছেলেটা কোন উত্তর দেয়নি। শুধু মাথা নিচু করে চলে গেছিল । তারপর আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার। আর শিউলির বুকের ভেতরটাও খালি হয়ে গেছিল তার অনুপস্থিতিতে। নিজেকেই সেদিন ও দোষ দিয়েছিল বারবার। ইশশ! কি দরকার ছিল ছেলেটাকে ওভাবে বলার। সে তো বেচাল করেনি কখনও।
দিন দশেক পর আবার হঠাৎ একদিন তাকে স্কুলের বাইরে দেখতে পেয়েছিল শিউলি। ওমনি মনটা এক অচেনা খুশিতে ভুরভুর করে উঠেছিল। ছেলেটা ওকে দেখতে পেয়েই একটা কাগজের দলা ছুঁড়ে মেরেছিল, আর মুহূর্তের মাঝেই ধাঁ করে উবে গেছিল সাইকেল নিয়ে। হা হা করে উঠেছিল শিউলির বন্ধুরা।
—''দেখলি দেখলি কেমন পাজি ছেলে! কাগজ ছুঁড়ছে মেয়েদের দেখে''।
সেদিন ওদের কথার কোন জবাব দেয়নি শিউলি শুধু সবার নজর এড়িয়ে কুড়িয়ে নিয়েছিল কাগজটা। লাল কালিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল তাতে একটাই শব্দ তিনবার।
ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসি।
ব্যস! সেই শুরু। তারপর থেকেই আস্তে আস্তে সেই ছেলেটা শিউলিকে বুঝিয়েছিল ভালবাসা কাকে বলে, ভাল রাখা কাকে বলে, স্বপ্ন দেখা ঠিক কেমন হয়।
কিন্তু ওর কপালে তো ভগবান সুখ লেখেননি। তাই সতেরো পুরতে না পুরতেই কাকিমা বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিল সেদিন ওর, ওরই থেকে উনিশ বছরের বড় একটা লোকের সাথে।
নিজের ভালবাসার মানুষের হাত দুটো ধরে সেদিন হাউ হাউ কেঁদেছিল শিউলি।
—''আমায় নিয়ে পালিয়ে চল। নইলে যে সব শেষ হয়ে যাবে''।
—''কিন্তু আমি তোকে নিয়ে কি করে পালাব? আমি মুসলমান তুই হিন্দু। গ্রামের মাথারা কেউ ছেড়ে কথা বলবে না। আর তাছাড়া আমি তোকে নিয়ে পালালে আমার মায়ের কি হবে?''
—''তাহলে চল বিয়ে করে নি আমরা শহরে গিয়ে। মন্দিরে হোক, মসজিদে হোক যে কোন জায়গায়। তারপর না হয় আবার এই গ্রামেই ফিরে আসব''।
—''পাগলের মত কথা বলিস না। এরকম কিছু করলে আমাকে গাঁ ছাড়া করবে সকলে। আমার মা টা তাহলে মরে যাবে রে। আমিই যে মায়ের একমাত্র আশা ভরসা। আর সেই আমিই কোন মেয়ের জন্য মায়ের বিশ্বাস ভাঙলে মানুষটা আর বাঁচবে না''।
—''আজ আমি তোর জন্য যে কোন একটা মেয়ে হয়ে গেলাম আজিজ? আর এতই যদি তুই মায়ের বাধ্য ছেলে তাহলে কেন পা রেখেছিলি আমার জীবনে? কেন ভালবাসার স্বপ্ন দেখিয়েছিলি আমায়? শোন আজিজ, তুই যদি আমায় ছেড়ে দিস তাহলে আমি কিন্তু নিজেকে শেষ করে দেব এই আমি বলে রাখলাম''।
—''না শিউলি তুই এসব বলিস না। দোহাই তোর। বেশ তুই যা চাস তাই হবে। আজ রাতে তুই ভাঙ্গা মন্দির তলায় চলে আসবি। ওখান থেকেই তোকে নিয়ে পালাব আমি''।
সেদিন সারা রাত এক বুক অপেক্ষা নিয়ে নিজের ভালবাসার মানুষটার জন্য অপেক্ষা করেছিল শিউলি। কিন্তু ওর সমস্ত আশা আকাঙ্খাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছিল সে। হেরে গেছিল শিউলির ভালবাসা আর বিশ্বাস। না আজিজের ছায়াটুকুও আসে নি সেদিন শিউলের কাছে।
বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছিল ওর। তাই গায়ে আগুন দিয়ে সেদিন নিজেকে শেষই করে দিতে চেয়েছিল ও। কিন্তু বিধি বাম। মরণও বেইমানি করেছিল ওর সাথে। মরতে মরতেও শেষ অবধি মরেনি শিউলি। শুধু পুড়ে ঝলসে ভয়াবহ হয়ে গেছিল ওর শরীরের সব অংশগুলো।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ও। আর যাইহোক কাকা কাকীর সংসারে আর ফিরবে না। তাই যে দিন ওর ছুটি পাবার কথা ছিল ঠিক তার আগের রাতেই হাসপাতালের নার্স দিদির পার্স থেকে সুকৌশলে কিছু টাকা চুরি করে মাঝরাতে হাসপাতাল থেকে পালিয়েছিল ও।
কিছুটা হঠকারীর মতই পালিয়ে এসেছিল কলকাতায়। পরিচয় হয়েছিল এক বৃদ্ধা মাসিমার সাথে। তার বাড়িতেই কেটেছিল বছর কয়েক কাজের মেয়ে হিসেবে। কিন্তু সেই মাসীমা মারা যেতে না যেতেই ওকে পড়তে হয়েছিল তার নোংরা কামুক ছেলেটার খপ্পরে। ছেলেটা সু কৌশলে খুব নোংরা এক চক্রের হাতে বেচে দিতে চেয়েছিল ওকে ওর অসহায়তার সুযোগ নিয়ে। ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পেরেই সেদিন পালিয়েছিল। নিজেকে শেষ করতে ছুটেছিল রেল লাইনে। কিন্তু সেবারও ধরা দিল না মৃত্যু। উল্টে পাকে চক্রে আশ্রয় মিলল তিস্তা দিদির কাছে।
নিজের অতীতটা আর ফিরে দেখতে চায়নি বলেই নিজের মিথ্যা নাম, মিথ্যা পরিচয় আর নিজের জীবন নিয়ে একটা মিথ্যা গল্প সেদিন ও বলেছিল তিস্তা আর রমলাদিকে। সত্যি ও মনে প্রানে ভুলে যেতে চায় নিজের ফেসে আসা দিনগুলো। হৃদয় নিংড়ে ঘৃণা করতে চায় প্রেমিক সাজা থাকা ঐ অপদার্থ কাপুরুষটাকে।
কিন্তু চাইলেই কি আর সব হয়! তাইতো এত চেষ্টার পরেও কোনদিন ও মন থেকে মুছতে পারেনি আজিজ নামের ওই প্রতারক শয়তানটাকে। বারবার মনে হয়েছে আচ্ছা তার কি একবারও মনে পড়ে শিউলি নামেরও কেউ কোনদিন ছিল ওর জীবনে?
কিন্তু আজ এসব কি দেখল ও? সে আজ যৌনকর্মী! পুরুষ মানুষ হয়ে এসব কি কাজ করছে সে? কেন করছে নিজেকে এত ছোট? আর তিস্তা দিদি? সে কি সত্যি ভালবাসে আজিজ কে? কেন সে ফিরিয়ে দিল আজ তিস্তাদিদিকে? সেটা কি শুধুই পেশার কারণে? কেন তাকে আজও দেখতে পেয়ে এত দুর্বল লাগছিল শায়নার? কেন মনের ভেতর উথাল পাথাল করছিল আবেগের অবাধ্য ঢেউগুলো?
একের পর এক প্রশ্নগুলো আছড়ে পড়ছে ক্রমাগত মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠে। কোন উত্তরটাই নেই শায়নার কাছে। আর কি কোনদিন সে আসবে এ বাড়িতে? শিউলি কি কোনদিন সুযোগ পাবে তার মুখোমুখি হয়ে তার কাছে শুধু জানতে চাওয়ার কেন সে পালিয়ে গেছিল সেদিন তার ভালবাসার থেকে? তবে কি ভালবাসা বলে সত্যি কিছু হয় না? সবই শুধু অলীক মায়া?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।