ত্রয়োদশ অধ্যায়

পল্লবী সেনগুপ্ত

কাঁচঘেরা কফিশপে একা একা বসে রয়েছে ঊর্মি। নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে আপ্রাণ। সমস্ত কথাগুলো সাজিয়ে গুজিয়ে নিচ্ছে আপ্রাণ নিজের মনের ভেতর। আজ আকাশকে বোঝাতেই হবে, যেভাবেই হোক। না, আকাশকে কিছুতেই কষ্ট দিতে পারবে না ও। ওই ছেলেটা যে ওর জীবনের অনেকখানি জুড়ে, ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু। অথচ সেই আকাশই এখন নিদারুণ অভিমান করে আছে নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই বড্ড ভুল বুঝছে ওকে। আজ এইসব ভুল বোঝাবুঝি শেষ করতেই হবে। ওকে সব কিছু বুঝিয়ে বললে ও নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে।

—''বল কি বলবি'' আকাশের ভাঙ্গা চোরা স্বরটায় মুখ তুলে চাইল ঊর্মি। কখন এসে পড়ল ও! কিছু টের পায়নি তো ঊর্মি।

উলটো দিকের চেয়ারটা টেনে বসল আকাশ। মুখটা ভীষণ শুকনো লাগছে। চোখের সেই উজ্জ্বল ভাবটাও নেই।

—''কেমন আছিস আকাশ? আমার ওপর খুব রেগে আছিস না রে''? শুকনো স্বরে বলল ও।

—''কি বলবি বল''। অদ্ভুত একটু হেসে বলল আকাশ।

নিজের চোখ দুটো বন্ধ করল ঊর্মি। নিজের মনে সাজিয়ে রাখা কথাগুলো বলতে শুরু করল ধীর গলায়,

—''আকাশ তুই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, তাই আমি এখন যা কিছু বলব সেটা তুই খোলা মনে বুঝবি বলেই আমি বিশ্বাস করি।

তুই তো জানিস আমি একটা ডিস্টার্ব শৈশব কাটিয়ে বড় হয়েছি বা বলা ভাল আজও আমার জীবনের গতি তেমন মসৃণ নয়।

আমার মা আমার খুব কম বয়সেই মারা যান। মায়ের স্নেহ ভালবাসার আমার কাছে শুধুই স্মৃতি। মায়ের মৃত্যুর পর আমার বাবা বিয়ে করেন আমাদেরই এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয়াকে বা বলা ভাল সেই আত্মীয়াই আমার বাবাকে নিজের মোহের জালে ফাঁসিয়ে বিয়ে করতে বাধ্য করেন। কারণ ওদের সম্পর্কটা গড়ে উঠেছিল আমার মায়ের মৃত্যুর আগেই। বাবা কোনদিনই আমার তেমন ঘনিষ্ঠ হতে পারেন নি। আর ওই সৎ মা তো ননই। তাই এই সব কিছুর মাঝেই আমি বেড়ে উঠছিলাম নিঃসঙ্গ একটা বৃক্ষের মত। জানি না কেন আমার কোনদিন তেমন ভাল কোন বন্ধুও হত না। তাই আমার এই নিঃসঙ্গতার দম চাপা গহ্বর থেকে মুক্তির আশায় কখন যেন আমার অজান্তেই আমার মনের মাঝেই গড়ে উঠেছিল সুন্দর সবুজ সুখের একটা স্বপ্নের কাল্পনিক পৃথিবী। একটা স্বপ্ন সেই কত যুগ থেকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে আমায়। আর সেই স্বপ্নের মধ্যে মিশে থাকা একটা সুর। আর সেই সুরটা বেহালার ছড় টেনে প্রতিবার সৃষ্টি করে একজন মানুষ। কিন্তু কোনদিন তার মুখ দেখতে পেতাম না আমি স্বপ্নের মধ্যে। আমি মরিয়া হয়ে চেষ্টা করতাম বারবার। তবু পেতাম না। আর তত যেন অস্থিরতা বাড়ত আমার। মনে হত যেভাবেই হোক আমায় দেখতেই হবে ওই মুখ।

তারপর অবশেষে একদিন ইচ্ছাপূরণ হল আমার। স্বপ্নের মধ্যে তার মুখ আমি দেখতে পেলাম। কে যেন আমার কানে ফিসফিস করে বলে গেল 'ঊর্মি এই সে, এই সেই মানুষ যাকে না জানি কত জন্ম ধরে খুঁজে চলেছিস তুই। এই সেই মানুষ যে বদলে দেবে তোর জীবনের রঙ, যাকে তুই ভালবাসবি পাগলের মত আর যে তোকে বসাবে জীবনের ধ্রুব তারার আসনে'।

জানিস আকাশ এসব কথা আমি কোনদিন কাউকে বলিনি। আজ প্রথমবার তোকে বলছি। সেই দিন থেকে পাগলের মত আমি খুঁজে বেরিয়েছি সেই মুখটা এই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে। খুঁজতে খুঁজতে বারবার ব্যর্থ হয়ে একসময় ভেবেছি, না এবার বুঝি আমি হেরেই গেলাম। আর বুঝি পাব না তাকে।

কিন্তু না রে। আমার জন্য ভগবান সত্যি তাকে বরাদ্দ করে রেখেছিলেন। তাই অবশেষে খুঁজে পেলাম তাকে। সে সুর চিনিয়ে দিল আমায় মানুষটাকে। তার গিটারের মূর্ছনায় আমি খুঁজে পেয়েছি আমার সেই জন্ম জন্মান্তরের চেনা সুর। তার নাম মেঘ। তাকে খুঁজে পাবার পর থেকেই আমি যেন অন্য মানুষ হয়ে গেছি। সারাক্ষণ শুধু তার কথাই ভেবে যাই আমি। একটা অদ্ভুত ভয় তাড়া করে বেড়ায় আমায়, তাকে হারিয়ে ফেলার''।

—''মেঘকে বলেছিস নিজের মনের কথা? সে ভালবাসে তোকে? কি করে সে''? ঊর্মির চোখে চোখ রেখে ঠাণ্ডা গলায় প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল আকাশ।

—''মেঘ একদম অন্য রকম মানুষ। না খুব বড় সড় চাকরী তার ঝুলিতে নেই। খুব সাধারণ একটা কাজ করে সে। একটা বইয়ের দোকান আছে তার। সে গল্প কবিতার ফেরিওয়ালা। বই বেচে, কবিতা লেখে, গান বাঁধে আর স্বপ্ন দেখাতে পারে। মেঘ বলে ও নিজে স্বপ্ন দেখে না। ও স্বপ্ন ছেড়ে দেয় অন্যের চোখে। যেমন আমার চোখেও এঁকে দিয়েছে ও অনেকগুলো সবুজ স্বপ্ন। আজ আমি বিশ্বাস করি এই নিঃসঙ্গতার বেড়া জাল ছিঁড়ে একদিন আমিও পৌঁছে যাব ভালবাসাময় রঙিন পৃথিবীতে যেখানে একে অন্যর পরিপূরক হয়ে বেঁচে থাকে সম্পর্করা। আমি ভালবাসি মেঘকে। খুব ভালবাসি। আর মেঘ! হ্যাঁ হয়তো ও ভালইবাসে আমায়। আমি জানি না। বুঝতে পারি না ঠিক। কখনও কখনও মনে হয় ওকে আমি খুব বুঝি, ঠিক যেন আমারই মনের ভাবনা গুলোর প্রতিফলন ও; আবার কখনও মনে হয় ও বুঝি সুদূরের কোন নির্জন দ্বীপ যার পরতে পরতে রয়েছে অনেক অজানা বাঁক''।

—''হুম বুঝলাম। জানিস ঊর্মি আজ প্রথমবার তোর চোখে মত্ত ভালবাসার আবেগ দেখলাম আমি । স্বপ্নের ঘনঘটা দেখলাম। তোকে বারবার বিষণ্ণ, স্বপ্নহীন দেখতে আমারও ভাল লাগত না রে বিশ্বাস কর। সর্বান্তকরণে আমি সব সময় চেয়েছি তুই ভাল থাক, খুব আনন্দে থাক। তোর জীবনেও ভরে উঠুক রামধনুর সাতরঙ। তুই মেঘের সাথে সত্যি খুব ভাল থাকবি আমি বুঝতে পারছি। না আমি এটা জানি না সে তোকে আমার থেকে বেশি ভালবাসতে পারবে কিনা। কিন্তু তোর এই মালিন্যহীন নিখাদ ভালবাসা সে যখন পেয়েছে সে নিশ্চয়ই খুব যোগ্য মানুষ। আর নিজের ভালবাসার মানুষটাকে কাছে পেলে যে জীবনে আর কিছু দরকার হয় না রে''। কথাগুলো বলেই কফিতে ছোট্ট চুমুক দিল আকাশ।

ঊর্মি চোখ রাখল ওর চোখে। আকাশের চোখ দুটো ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। কেমন যেন ভাষাহীন লাগছে ওর চোখের উজ্জ্বল তারাদুটো। বুকটা মুচড়ে উঠছে ঊর্মিরও। ও যে নিজের একমাত্র বন্ধুটাকে সব সময় খুশিই দেখতে চায়।

—''তুই ফেসবুকে ওসব কেন লিখেছিস আকাশ? তুই কোথায় যাবি?''

—''আমি কলকাতায় আর থাকতে চাই না রে। দমবন্ধ লাগছে। আমি দিল্লী যাচ্ছি। হায়ার স্টাডিজ করতে। ফেসবুক, হোয়াটসআপ থেকে ছুটি নেব আপাতত''।

—''তুই কেন আমায় ভুল বুঝছিস আকাশ? কেন আমার ওপর রাগ করছিস? কেন দূরে চলে যাচ্ছিস এভাবে''?

—''কে বলল আমি তোকে ভুল বুঝছি? একদম ভুল বুঝছি না। আর তোর ওপর কেন রাগ করব রে পাগলি? তুই সারাজীবন আমার মনের মধ্যে জলছবি হয়ে বেঁচে থাকবি। কিন্তু আমি পারব না রে। ভালবাসার মানুষটার শুধু বন্ধু হয়ে থাকার মত মনের জোর আমার নেই। অন্তত আপাতত নেই। পরে যদি কোনদিন মনে হয় সেই জোর এসেছে মনে তাহলে নাহয় আবার তোর বন্ধু হয়ে তোর সামনে এসে দাঁড়াব''। কান্নার দলাটাকে কোনরকমে বুকে চেপে বলল আকাশ। পুরুষকে যে চোখের জল ফেলতে নেই। কে জানে কোন হৃদয়হীন বানিয়ে গেছিল এই নিয়মটা।

ঊর্মিও যেন আর পারছে না চাপতে কান্না। আকাশ সত্যি চিরতরে হারিয়ে যাবে ওর জীবন থেকে ভাবতেই পারছে না ও।

—''আমার যে তোকে ছেড়ে থাকতে খুব কষ্ট হবে। আমি যে তোকে বড্ড মিস করব আকাশ''।

—''আমিও মিস করব রে তোকে''।

টেবিলের ওপর রাখা আকাশের হাতটায় এবার আলতো করে আঙ্গুল ছোঁয়াল ঊর্মি।

—''এক জীবনে কেন শুধু একজনকেই ভালবাসতে হয় বলতো আকাশ? কে বানিয়েছিল এই নিয়মটা? কেন দুজনকে ভালবাসা যায় না? দুটো চোখ, দুটো ফুসফুস, দুটো কিডনি, দুটো হাত, দুটো পা হতে পারলে কেন দুজন প্রেমিক থাকতে পারে না কারোর? কোন এক জীবনে দু'জন মানুষের অপরিহার্যতা মেনে নেওয়া যায় না''? হঠাৎ যেন অপ্রতিরোধ্য নদীর মত শোনাচ্ছে ঊর্মির ব্যকুল স্বর।

নিজের হাতটা সরিয়ে নিল আকাশ। ধীরে ধীরে বলল

—''মানুষের অনেক অঙ্গ দুটো থাকলেও হৃদয় যে একটাই হয় রে ঊর্মি। একটা হৃদয় দুজনকে কি দেওয়া যায়? না যায় না। আমি চলি রে। ভাল থাকিস তুই''। ক্যাফে ছেড়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল আকাশ।ঊর্মি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ছোট হতে হতে মিলিয়ে যাওয়া ওর অবয়বটার দিকে। কেন যেন মনে হচ্ছে আবার একদিন ঠিক দেখা হবে ওর আকাশের সাথে।

মনটা বড্ড বেশি খারাপ লাগছে। আজ ছয় দিন হল কোনও ফোন আসে নি মেঘের।

— বুকের মধ্যে অনেকটা কষ্ট ছেয়ে রয়েছে ঊর্মির। কেন এমন করে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে চায় ছেলেটা? ঊর্মি মেঘকে নিজের কাছে ধরে রাখতে পারবে তো? মেঘকে ছেড়ে যে বাঁচার কথা ও আর এখন ভাবতেই পারে না।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%