বিংশ অধ্যায়

পল্লবী সেনগুপ্ত

হুহু করে চেনা শহরের রাজপথ দিয়ে ছুটে চলেছে দুধ সাদা গাড়িটা। চোখের সামনে দিয়ে ঝটঝট সরে যাচ্ছে কংক্রিট কলকাতার নানা দৃশ্যের স্লাইড। আর আকাশের মনে এলোমেলো ভাবে আছড়ে পড়ছে স্মৃতি ঘেরা সেই দিনগুলোর টুকরো টুকরো কোলাজ। সেই পুরনো কলেজজীবন, বন্ধু বান্ধব, হইহই, আড্ডা আরও অনেক কিছু। আর হ্যাঁ অবশ্যই একটা নাম, যে নামটা গত চার বছরের প্রতিদিন নিজের মন থেকে মুছে ফেলার মরিয়া চেষ্টা করে গেছে আকাশ।

হ্যাঁ চার বছর। গত চার বছর ধরে আকাশ নিজেকে নির্বাসন দিয়ে রেখেছিল পরিচিত গণ্ডির বাইরে, অন্য একটা শহরে। কখনও চাকরির অছিলায়, কখনও পড়াশুনার অজুহাতে; বারবার আকাশ এড়িয়ে যেতে চেয়েছে এই কলকাতা শহরটাকে। কখনোই ফিরতে চায়নি ও। বাবা মা অভিমান করেছেন বারবার। কিন্তু তবুও ফেরার প্রসঙ্গ উঠলেই খুব সচেতন ভাবেই প্রতিবার ফিরে আসাটা এড়িয়েছে ও। কি একটা অদৃশ্য বাধা যেন অবরুদ্ধ করেছে বারবার ওর ফেরার পথ।যখনই ফেরার কথা হয়েছে প্রতিবারই একটা ভাবনাই এসেছে ফিরে ফিরে। এই শহরেই তো ওর ভালবাসার মানুষটা প্রত্যাখান করেছিল ওকে। যে মুখটা প্রতি রাতে ওর হৃদয়ের আয়ানায় ভেসে ওঠে আজও, সেই মুখের মানুষটাই অন্য একজনকে ভালবেসে আজ হয়তো বা তার ঘরণী। এই ভাবনাগুলোই একটা অদৃশ্য জালের মত যেন এই শহরে ফেরা থেকে চার বছর ধরে ওকে আটকে দিয়েছিল বারবার।

ঊর্মিকে ভুলে যাবার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন দীর্ঘমেয়াদী চেষ্টাটার মধ্যে কোন গাফিলতি ছিল না আকাশের। নিজেকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলেছিল আকাশ, যাতে ভুল করেও কোনদিন ঊর্মির কোন ডিজিট্যাল অস্তিত্বও যাতে স্পর্শ না করতে পারে ওকে। নিজের হাতে ঊর্মির নম্বর ব্লক করেছিল, এমনকি খুব সযত্নে ডিলিট করে দিয়েছিল নিজের পুরনো ইমেল আইডিটাও।

কিন্তু এত কিছুর পরেও আর শেষ রক্ষা হল কই? কোথায় আর ওকে ভুলতে পারল আকাশ? আজও তো পুরনো স্মৃতির অনুরণন একইভাবে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায় ওকে। কলকাতা শহরটাও এবার জোর করে নিজের ফাঁদে যেন টেনেই নিল ওকে।

কর্মসূত্রের প্রয়োজনে, এছাড়া বাবার ইদানীং অসুস্থতার কারণেও চার বছর পর আজ আবার সেই শহরে আকাশ। আর ফিরে আসার পর থেকেই একটা বেয়াড়া অবাধ্য ইচ্ছে ফড়িং ক্রমাগত ডানা ঝাপটেই চলেছে ওর বুকের মধ্যে। বারবার ভীষণ ইচ্ছে করছে অন্তত একটিবার হলেও ঊর্মির মুখোমুখি হতে। বড্ড সাধ হচ্ছে ওকে একবার হলেও দেখার। কেমন আছে ও এখন? এতদিনে নিশ্চয়ই মেঘের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে ওর! হয়তো ছোট্ট ফুটফুটে এক ছোট্ট ঊর্মিও এসে গেছে পৃথিবীতে। নিজের স্বপ্ন আর ভালবাসার পৃথিবী সাজিয়েছে ও মেঘ কে নিয়ে। নিশ্চয়ই ভীষণ খুশি ও।

তবুও আকাশের ওকে দেখতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে ওর চওড়া সিঁদুর টানা মুখটা দেখতে। আর আরও বেশি ইচ্ছে মেঘকে দেখার। কি এমন আছে ছেলেটার যেটা আকাশের নেই! ও কি আকাশের থেকেও বেশি ভালবাসতে পারে ঊর্মিকে?

বেয়াড়া অবাধ্য ইচ্ছে গুলোর দাপাদাপিতেই আবার নতুন করে ফেসবুক জয়েন করেছে আকাশ গত এক সপ্তাহ হল। তারপর থেকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে ওকে। কিন্তু খুঁজে পায়নি।পুরনো কিছু বন্ধূকেও জিজ্ঞাসা করেছে ঊর্মির ব্যাপারে। কিন্তু কেউ কিছুই বলতে পারে নি। ঊর্মি নাকি সকলের থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বহুদিন হল। কিন্তু কেন? আজকাল কি তবে মেঘ একাই শুধু ওর সবটুকু পৃথিবী জুড়ে? পুরনো ফোন নম্বরটাও তো বলছে আউট অফ সার্ভিস।

গত সাতদিনে ঊর্মির সামনা সামনি হবার সবটুকু প্রচেষ্টা সমূলে ব্যর্থ হয়েছে আকাশের। তাই আজ একটা বেশ সাহসি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে ও। আজ একবার ঊর্মির বাড়িতেই ঢুঁ মারবে। ঊর্মি থাক বা না থাক কেউ তো থাকবেন, যার থেকে হদিশ পাওয়া যাবে মেয়েটার। এর আগেও তো ঊর্মির কাছে দু একবার বাড়িতে গেছিল আকাশ।

হঠাত ঘ্যাঁচম্যাচ করে বেশ জোরে ব্রেক কষল গাড়িটা। ভাবনার ঘোরটাও ছিঁড়ল ছেলেটার। ড্রাইভার অম্লান বদলে বলল

-''এসে গেছে স্যার''।

গাড়ি থেকে নেমে পড়ল আকাশ। বুকের মধ্যে কেউ যেন অবিরত হাতুড়ি পিটাচ্ছে। এতদিন পর সত্যি আবার ঊর্মির খোঁজ মিলবে এবার। বাড়ির বাইরের লনটা পেরিয়ে আস্ত আস্তে মেন গেটের দিকে এগোচ্ছে আকাশ। দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল দু সেকেন্ডের জন্য। তারপর কাঁপা হাতে টিপল কলিং বেল। ওপ্রান্ত চুপ। হঠাৎ যেন অখণ্ড নীরবতা এসে ভর করেছে পৃথিবীটাকে। বোধ হয় দশ সেকেন্ড হবে, তবু আকাশের মনে হচ্ছে ও যেন এক যুগ ধরে প্রতীক্ষারত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই দরজায়।

খুট করে দরজা খুলে গেল এবার। দরজার ওধারে তুলনামুলক মলিন পোশাক পরা একটা কমবয়সী মেয়ে। বড্ড গলা শুকাচ্ছে আজ আকাশের। তবুও ঢোঁক গিলে কোনমতে বলল

-''ঊর্মি মানে ঊর্মি রায়ের বাড়ি তো এটা? ও কি আছে এখন?''

-''আপনি কে? কোথা থেকে আসছেন?'' আকাশকে মাঝপথে থামিয়েই বলল মেয়েটা।

-''আমি ওর বন্ধু।''

মেয়েটা একবার আপাদমস্তক দেখে নিল ওকে। তারপর একটু ব্যঙ্গের স্বরেই বলল

-''আপনি ঊর্মি দিদির বন্ধু অথচ এটা জানেন না যে ঊর্মি দিদি ইদানিং এখানে নিয়মিত থাকেন না।''

-''জানি। ও এখন বেশিরভাগ সময়েই নিজের বরের সাথে থাকে। আসলে আমি অনেকদিন বাইরে ছিলাম তাই যোগাযোগ ছিল না। যদি ওর ফোন নম্বরটা দেন'' হুড়মুড় করেই বলে দিল আকাশ।

-''অ। আপনি বাইরে ছিলেন। তাহলে সেইজন্যই হয়তো জানেন না। ঊর্মি দিদি ভাল নেই একদম। ওর মাথার ব্যারাম হয়েছে। মানে পাগল হয়ে গেছে আর কি! একদম বদ্ধ পাগল। তাই তো চিকিৎসা চলছে ওনার। আজকাল বেশিরভাগ সময়েই নার্সিং হোমে থাকেন তিনি''।

-''কি! কি বলছেন আপনি পাগলের মত? ঊর্মি পাগল এসবের মানে কি''? চীৎকার করে উঠল আকাশ। এসব কি বলছে এই মেয়েটা?

-''দেখুন স্যার আমি বাড়ির কাজের লোক। আমি এর থেকে বেশি কিছু তো বলতে পারব না''।

-''আর মেঘ? সে কোথায়? সেই কি কোনভাবে কষ্ট দিয়েছে ঊর্মিকে''?

হে হে হে হে হি হি হি বিশ্রী শব্দ করে এবার হেসে উঠল মেয়েটা।

-''আপনি কে স্যার? মেঘের কথা আপনাকে কে বলল?''

-''ঊর্মিই বলেছে। আবার কে বলবে''!

-''ওটাই তো ঊর্মি দিদির পাগলামি। আপনি জানেন না? সব বড় ডাক্তারবাবুরা তো তাই বলেছেন। আসলে মেঘ বলে তো কেউ নেই। কোনদিন ছিলও না। ওগুলো তো সব ঊর্মি দিদির কল্পনা। খুব কঠিন নাম দেওয়া কি যেন এক পাগলামি অসুখ এটা। যাকগে আপনি আজ আসুন স্যার। বাড়িতে কেউ নেই এখন বাড়ির লোকরা। সবাই নার্সিং হোমে। মেয়েটার অবস্থা ভাল না।''

-কোন নার্সিং হোম''?

-''বললাম না আমি ওত কিছু জানি না। আপনি পরে আসবেন''। বেশ ঝাঁজ মেরে বলেই মুখের ওপর দুম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল মেয়েটা।

পা টলছে এবার আকাশের। এসব কি শুনল ও? এসব কেমন করে সম্ভব? কি মানসিক রোগ হয়েছে ঊর্মির? কি বলতে চাইছিল মেয়েটা? স্কিতজোফ্রেনিয়া নাকি?

না আর কিছু ভাবতে পারছে না আকাশ। মাথার মধ্যে সব গোলমাল পেকে যাচ্ছে। সব কিছু।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%