পল্লবী সেনগুপ্ত
পিসীর ঘরে কতকটা পা টিপে টিপেই ঢুকল তিস্তা। এই ঘরেই রাখা আছে ছবিটা। তাই ছবিটা নিতেই এখন এই ঘরে আগমন ওর। একটু সসংকোচেই বালিশের তলা হাতড়াল এবার । হ্যাঁ পেয়ে গেছে। বালিশের নিচেই রাখা ছিল। দু চোখ ভরে একবার দেখল ছবিটা । তারপর সযত্নে রেখে দিল সস্থানেই।
আসলে এই চব্বিশ বছর বয়সেও মনটা মাঝে মাঝে কেন যে ষোল বছরের মত দুষ্টুমি করে মাঝে মাঝে কে জানে! অরূপ দাস এর ছবিটা কেন ইদানীং এত টানছে সেটা নিজেও স্পষ্ট বুঝতে পারছে না তিস্তা।
লোকটা মোটেই সুপুরুষ নয়, বয়সটাও তিস্তার থেকে বেশ খানিকটাই বেশি। হয়তো পরিস্থিতি আগের মত থাকলে এমন মানুষের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা তো দূর, তিস্তা এমন লোকের ছবি হাতে নিয়েই নাক কুঁচকে বলত
—''ইশ! কি বাজে দেখতে লোকটা। কেমন যেন মোটা মত''
আসলে সময়। সময় মানুষকে আমূলে বদলে দিতে পারে। আর পরিস্থিতি মানুষকে অচেনা করে তোলে মাঝে মাঝে নিজের কাছেই। আর তিস্তা যে বড্ড লোভী। ভালবাসা পাবার লোভটা যে কিছুতেই পিছু ছাড়ে না ওর। অবশ্য পিছু ছাড়ার কথাও নয়। ও যে বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। তাই আদর পাওয়ার অভ্যাসটা সেই ছোটবেলা থেকেই মজ্জায় মিশে গেছে ওর।
কিন্তু ওই যে সময়! সময়ের চাকার হাতে বাঁধা পড়ে ঘুরছে সবাই। কখন কে কোন পরিস্থিতির শিকার হতে চলেছে সে অনুমান করা নশ্বর মানুষের আওতার বাইরে।
একটা বিচ্ছিরি পথ দুর্ঘটনায় বাবা আর মাকে যখন একইসাথে হারিয়েছিল তিস্তা বছর পাঁচেক আগে তখন যেন মাথার ওপর গোটা একটা আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল ওর। শোক, দুঃখের সাথে সাথে যে অনুভূতিটা সেদিন আরও বেশি করে গ্রাস করেছিল সেটা হল ভয়। একা একা এই গোটা পৃথিবীতে এবার কি করবে ও?
পড়াশুনায় তিস্তা কোনদিন তেমন চৌকস না হলেও চিরকালই বাস্তববুদ্ধিটা ওর বেশ বেশি। আর আধুনিক যুগের শ্বাপদ সঙ্কুল মনুষ্য সমাজের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার জন্য যতটা স্মার্ট হওয়া প্রয়োজন সেই স্মার্টনেসও তিস্তার ছিল। তাই বাবা মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তি আর টাকা পয়সা দিয়ে তিস্তা নিজের পৃথিবীটা চালিয়ে নিতে সমর্থ ছিল না এমনও নয়। কিন্তু অখণ্ড একাকীত্বটা আস্তে আস্তে ক্ষয়ে দিচ্ছিল ওকে।
তিস্তা চিরকালই বেশ অন্তর্মুখী স্বভাবের। বন্ধুর সংখ্যাও যে কারণে ওর উল্লেখযোগ্য ভাবেই কম ছিল। তাই বাবা মা চলে যাবার পর ওই একাকীত্বের অসহয়তা আস্তে আস্তে ওকে একটা সাঙ্ঘাতিক মানসিক অবসাদের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছিল।
ধীরে ধীরে তিস্তা ভীষণ বদলে যাচ্ছে এটা প্রথম লক্ষ্য করেন ওর পিসি। তাই পিসে মশাইএর বেশ খানিকটা আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তিস্তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন তিনি। না পিসির সাথে খুব প্রাণের সম্পর্ক কোনদিনই ছিল না। তবুও সেই মুহূর্তে একাকীত্বের সেই বীভৎসতা থেকে মুক্তি পেতে পিসিদের সাথে ওদের বাড়িতে থাকাটাই অনেক শ্রেয় মনে হয়েছিল ওর।
পিসি ওর এখানে আসায় খুশি হয়েছিল কি? না সে প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজে পায়নি তিস্তা। কখনও কখনও তার মতিগতি বেশ ভাল, আবার কখনো মেজাজ তিরিক্ষে।
তবুও এই পিসীর উদ্যোগেই শেষ পর্যন্ত গ্রাজুয়েশন শেষ করে তিস্তা। না, কলেজে পড়ার সময়টাতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের মত কোন নতুন মানুষ আছড়ে পড়েনি ওর জীবনে। আসলে তিস্তা খুব চুপচাপ, দেখতেও মারকাটারি কিছু নয় তাই ওর প্রেমে আর কার মন ভিজবে!
কিন্তু মন তো আর ওত যুক্তি বোঝে না। তিস্তার অবুঝ মনটা তাই বারবার খুঁজে পেতে চেয়েছে এমন একজন মনের মানুষ যে ঠিক ওর মনের মত। মিতভাষী, ভোজনপ্রিয়, বইপোকা ইত্যাদি ইত্যাদি।
গ্রাজুয়েশান করার পর বেশ কিছুদিন কর্মহীন হয়েই বাড়িতে বসে রয়েছে তিস্তা। না চাকরীর যে খুব চেষ্টা করেছে এমনও নয়। বাবার রেখে যাওয়া মোটা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স তো আছেই। কিন্তু মনটা নিজের মানুষ খুঁজে চলেই অবিশ্রান্ত ভাবে।
তাই ঘটক কাকু যখন অরূপ দাসের সম্বন্ধটা আনল তখন আনন্দে মনটা নেচে উঠেছিল তিস্তা। শেষ পর্যন্ত তাহলে বাবা মায়ের পর সত্যিকারের একজন নিজের মানুষ হবে ওর। এই পিসীর বাড়িতে যে ও একজন আশ্রিতা সেটা বুঝিয়ে দিতে সর্বক্ষণই অগ্রণী ভূমিকা নেয় পিসেমশাই, পিসীর মেয়ে রিমলি এমনকি মাঝে মাঝে পিসী নিজেও।
তাই তাড়াতাড়ি যে কোন পাত্রের সাথে বিয়ে দিয়ে বোধ হয় দায়মুক্ত হতে চায় ওরা। আর তিস্তাও তাই চায়। ও নিজেও চায় একজন সত্যিকারের ভালবাসার মানুষ, যার হাত ধরে ও নিশ্চিন্তে হেঁটে যেতে পারবে বাকী জীবনের প্রতিটা দিন।
অরূপ দাস কেমন মানুষ তিস্তা জানে না। আজকালকার ছেলেদের মত বিয়ের আগে হবু বউয়ের সাথে বেশি যোগাযোগ রাখা পছন্দ করে না সে, তাই কথাও তেমন হয় নি। তিস্তা তার ব্যাপারে শুধু জানে লোকটা বেশ পোড় খাওয়া ব্যবসাদার আর তিস্তার হবু জীবনসাথী। বিয়ের পরই তিস্তা আবার আশ্রিত থেকে কারোর আপনজন হয়ে উঠবে। মনের মাঝে রামধনু রঙ খেলছে ওর। অধীর আগ্রহে এখন শুধু একটাই দিনের জন্য অপেক্ষা, যে দিন একজন মানুষকে পুরোপুরি ভাব পাবে ও আর নিজেকেও সমর্পণ করবে একদম হৃদয়ে জড়িয়ে থাকা মানুষটার কাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।