পল্লবী সেনগুপ্ত
একটা ঝমঝমে বৃষ্টি ভেজা অন্ধকার ঢাকা সন্ধ্যাকে পায়ে মাড়িয়ে ছুটছে আজিজ। দৌড়াচ্ছে পাগলের মত। ছুটেই চলেছে। পথ যেন আর শেষ হচ্ছে না। চোখের সামনে একে একে ফুটে উঠছে দৃশ্যগুলো। একটার পর একটা মায়াবী বিকাল। নদীর পাড়ে আজিজের হাত হাত রেখে বসে থাকা সেই মেয়েটা। পরনে তার নীল পাড় সাদা শাড়ির স্কুল ড্রেস আর আজিজের পরনেও স্কুলের পোশাক। হাত ছুঁয়ে দিলেই কেমন যেন শিহরণ হয় আজিজের বুকের মধ্যে। আর ঝিরঝিরে বৃষ্টি মাখা সেই বিকালে যেদিন প্রথমবার আজিজ এর ঠোঁট ছুঁয়েছিল তার কপাল, চিবুক আর ওষ্ঠ, সেইদিনটা তো ছিল সাক্ষাৎ স্বপ্ন ওর জন্য।
কিন্তু সে আজ চলে যাচ্ছে! সত্যি কি সে চলে যাবে আজিজ কে ফাঁকি দিয়ে?
—''আজিজ আজিজ ''অন্ধকার ফুঁড়েই হঠাৎ সামনে চলে এল কালু। আজিজের কাছের বন্ধু।
—''আজিজ তুই এখানে? ওদিকে সব তো শেষ হয়ে গেল রে । সে যে আর নেই''
—''কি বলছিস তুই?'' হিসহিসিয়ে উঠল আজিজ। মাথাটা টলছে ওর। কালুর কোন উত্তরের অপেক্ষা না করেই আবার প্রাণ পণ দৌড় লাগাল ও।
আরও খানিকটা ছোটার পর এবার সামনে দেখতে পেল বাড়িটা। ভাঙ্গা চোরা গ্রামের সাস্থ্যকেন্দ্র। হুড়মুড় করে ও ঢুকে গেল ও ভিতরে। বীভৎস দৃশ্যটা মুহূর্তের মাঝেই স্থবির করে দিল ওর পা দুটো। সাদা চাদরে ঢাকা মৃতদেহটা পড়ে রয়েছে সামনেই। শুধু মুখটুকু জেগে রয়েছে তার। সেই মুখ, যেটা একদিন দেখতে না পেলেই আনচান করে ওঠে আজিজের মনটা। সেই চোখদুটো প্রাণহীন আজ, যে চোখে আজিজ প্রথমবার ঘৃণা, বিদ্রূপ বা তাচ্ছিল্যের বদলে ভালবাসা দেখতে পেয়েছিল নিজের জন্য। না, সে আর নেই। আর কোনদিন সে আজিজ এর পাশে এসে বসবে না, ওর হাতে হাত রাখবে না। স্বপ্ন সাজানোর কথা বলবে না।
সে চলে গেছে। আজিজের ভালবাসা শুধু ওর অপদার্থতার জন্যই আজ চলে গেছে। ওর মৃত মুখটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে আজিজ।
একী! এটা কি হচ্ছে? আস্তে আস্তে? মৃত মুখটা একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে কি করে? আজিজের হাঁটু কাঁপছে এবার।
কয়েক মুহূর্তেই একটা অন্য মুখ বসে গেল ঐ জায়গায়। একটা পানপাতা মুখ। দুটো নিষ্পাপ চোখ। শহুরে হয়েও যে ভীষণ মাটির কাছাকাছি এমন একজনের মুখ আস্তে আস্তে জুড়ে যাচ্ছে কেন মৃতদেহের সাথে? তবে কি সে ও শেষ হতে বসেছে?
—''না না না এটা কিছুতেই হতে পারে না'' পাগলের মত চীৎকার করে উঠল আজিজ।
—''এটাই তো হবে রে বেটা। তোকে যারা যারা ভালবাসবে সবাই এমনি করেই মরবে''। মৃতদেহটার মুখ থেকেই ছিটকে এল কথাটা। আজিজ দৌড়ে গেল এবার শবটার একদম কাছে।
—''না আম্মি না ''ডুকরে কেঁদে উঠল এবার ও? মৃতদেহ জড়িয়ে। এই মৃতদেহ যে আর কারোর না। এটা যে ওর মায়ের নিথর প্রাণহীন শরীর।
—''তোমায় আমি কোথাও যেতে দেব না আম্মি। তোমায় আমি কিছুতেই যেতে দেব না''। হাউহাউ করে পাগলের মত কাঁদছে এবার আজিজ।
—''আজিজ, আজিজ কি হয়েছে তোর? কেন এমন করছিস''? মায়ের ডাকে ধড়মড় করে উঠে বসল এবার ও।
—''এমন ভরদুপুরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কি খারাপ স্বপ্ন দেখছিলিস বেটা''? মা এসে হাত বুলাচ্ছে ছেলের মাথায়।
—''হুম''। ছোট করে বলল ও। মাথার ভেতরটা এখনও ভোঁ ভোঁ করছে। কি বীভৎস স্বপ্ন। শিউলির চলে যাবার সেই কালো দিনটা আবার ফিরে এসেছিল আজ দুঃস্বপ্নের আকারে। স্বপ্নে আজ মরে গেছিল শিউলি, তবে বাস্তবে মরে নি ওর শরীরটা। মৃত্যুর থেকেও খারাপ পরিণতি হয়েছিল ওর। কিন্তু আজকের স্বপ্নটা? স্বপ্নে যে আজ আরও একজনকে মরতে দেখেছে ও। কিন্তু কেন দেখল তাকে ও এভাবে মরতে? আর আম্মি! আম্মির মৃত্যু টাও তো যেন গলা টিপে ধরেছিল ওর স্বপ্নেই।
না এসপার অসপার কিছু একটা এবার করতেই হবে। শিউলির জন্য কিছু করতে না পারলেও নিজের মা কে কিছুতেই মরতে দেবে না ও। মা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আজিজ বের করল নিজের তাপ্পি মারা ব্যাগটা। অনেক কিছু টুকরো টাকরা কাগজের মধ্যে থেকে কুড়িয়ে নিল একটা ময়লা কাগজের টুকরো। টেবিল থেকে তুলে নিল নিজের সস্তার মোবাইলটা। ঝটপট ডায়াল করল একটা নম্বর।
-''হ্যালো বুকু দা, আমি আজিজ বলছি। আমি রাজি। আমি রাজি আছি বুকু দা। তুমি তাড়াতাড়ি সব ব্যবস্থা কর।''
কেটে গেল এবার ফোনের লাইন। আজিজ ধীর পায়ে এগিয়ে গেল আয়নার দিকে। কাচের ওপারে দেখছে নিজের প্রতিবিম্ব। না আর না। এবার বদলে ফেলতে হবে নিজেকে খোলনালচে। আগামী কাল থেকে শুরু হবে ওর একটা নতুন জীবন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।