পল্লবী সেনগুপ্ত
ঘুমটা ভাঙতেই ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসল সাত বছরের বাচ্চা মেয়েটা। ঘরটা ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারে ঢেকে রয়েছে। আর সেই ঘরেই বিছানার ওপর একা বসে মেয়েটা। মা মারা যাবার পর থেকে সত্যি এভাবেই পুরোপুরি একা হয়ে গেছে ও।
ছোটমা ওকে সাথে নিয়ে শুতে চায়, কিন্তু ওর ইচ্ছা করে না ছোটমায়ের সাথে শুতে। ইদানিং ওর একদম ভাল লাগে না ছোটমাকে। কেন যেন বারবার মনে হয় ছোট মায়ের জন্যই বোধ হয় মা এত তাড়াতাড়ি চলে গেল! মা এর কি সব কঠিন অসুখ করেছিল। মা এর মাথার সব চুল পড়ে গেছিল। মা খুব বিচ্ছিরি দেখতে হয়ে গেছিল। এমনকি ওর নিজেরও মাঝে মাঝে কেমন যেন ভয় করত মাকে দেখে। তবুও মা সব সময় ওকে কাছে টেনে রাখতে চাইত। আদর করত জেগে থাকার সবটুকু সময় জুড়ে। কিন্তু ছোট মা বোধ হয় এটা চাইত না। ওরা মা মেয়ে কাছাকাছি এলেই ওকে সরিয়ে নিয়ে যেত। মা বলত
—''ওকে একটু থাকতে দে না রে আমার কাছে''। কিন্তু ছোটমা বারবার বলত
—''না গো ওর তোমার কাছে বেশি থাকা ঠিক নয়। তুমি বিশ্রাম কর। আমি আছি তো।'' ও দেখত ছোটমায়ের এই কথাগুলো শুনেই কেমন যেন আরও বেশি ফ্যাকাশে হয়ে যায় মায়ের মুখটা। ও বারবার বলত
—''না আমি মার কাছে যাব''। তবুও কেউ শুনত না সে কথা। ছোট মা তো নইয়ই। সেই থেকেই আস্তে আস্তে রাগ জমতে শুরু করেছিল ওর ছোটমায়ের প্রতি।
—''ছোটমা দেখতে কত সুন্দর। আর আমি তো একদম বিচ্ছিরি হয়ে গেছি অসুখে। তাই আজকাল ওর কাছেই থাকতে বেশি মন চায় না রে''? ছলছল চোখে একদিন প্রশ্নটা করেই ফেলেছিল মা।
—''না মা আমি তোমাকেই শুধু ভালবাসি''। জোর গলায় সেদিন বলেছিল ও।
—''না রে সব সময় তা হয় না। তোর বাবাকেই দেখ না, আগে আমায় কত ভালবাসত, সময় দিত। আর এখন? শুধুই ব্যস্ততা আর সুযোগ পেলেই তোর ছোটমায়ের সাথে গল্প''। এই কথাগুলো বলার সময়ে মায়ের মুখে চোখে এসে ভিড় করা কষ্টগুলোকে টেনে ছিঁড়ে দিতে ইচ্ছা করেছিল ওই বাচ্চা মেয়েটার। ভীষণ ভাবে মনে হয়েছিল ওদের জীবনে ওই ছোটমা না থাকলেই বোধ হয় বেশি ভাল হত। সেই থেকেই ওই ভদ্রমহিলার ওপর ঘৃণা জন্মাতে শুরু করেছিল। ওনাকে ছোটমা মা বলতে কে শিখিয়েছিল ওকে আর কেনই বা শিখিয়েছিল সেটা সেদিন হাজার চেষ্টা করেও মনে করতে পারে নি ও। আর বাবার প্রতিও একটা তিক্ত অনুভূতি জন্ম নিতে শুরু করেছিল ওর নানা কারণেই। মনে হয়েছিল সত্যি বোধ হয় একদম ঠিক বলছে মা। যে মনোযোগ বাবার মায়ের প্রতি দেওয়া উচিত ছিল তার অনেকটাই সেদিন কেড়ে নিয়েছিল ওই মহিলা। সেই জন্যই বোধ হয় আরও বেশি করে এক বুক অভিমান জমিয়ে তাড়াতাড়ি চলে গেল মা।
কি যেন একটা গণ্ডগোল আর চিৎকার এর চাপা শব্দ ভেসে আসছে পাশের ঘর থেকে। ও নিঃশব্দে নেমে পড়ল বিছানা থেকে। কান পাতল দরজায়। আবছা ভাবে শোনা যাচ্ছে ডাইনিং হলে বসে বেশ উচ্চস্বরে তর্ক জুড়েছে বাবা আর ছোটমা। বেশ উত্তেজিত ভাবে ছোটমা বলছে
—''তার মানে? কি বলতে চাও তুমি? দিদির মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী''?
—''আমি কারোর ওপর কোন দায় চাপাচ্ছি না। কিন্তু এটা তো অবশ্যই ঠিক মেয়েটাকে নিয়ে তুমি বেশি পজেজিভ হয়ে পড়েছিলে। ক্যনাসারে ভুগতে ভুগতে এমনিতেই মানসিক অবসাদে ডুবে গেছিল মনোরমা, তার মধ্যে নিজের সংসারে প্রতিনিয়ত তোমায় দেখতে দেখতে হয়তো সেই অবসাদটা আরও বেশি গ্রাস করেছিল ওকে। সেইজন্যই হয়তো''...
—''তাহলে কেন আমায় বিয়ে করলে তুমি? আমি তো তোমায় বলিনি। উল্টে মেনে নিয়েছিলাম তোমার সব দাবি।''
কেন বাবা এই মহিলাকে বিয়ে করেছিল আর কিই বা বাবার দাবি ছিল তার কাছে সেটা শোনার কোন ইচ্ছা সেদিন আর বাকি ছিল না ওর। একটা বিষাক্ত তিক্ততায় শুধু ভরে গেছিল ওর বুক। আরও নিশ্চিত হয়ে গেছিল ও যে মায়ের মৃত্যুর জন্য তাহলে সর্বাঙ্গীণ ভাবেই ঐ মহিলা দায়ী,তাই ঐ মহিলাকে কোনদিন ক্ষমা করবে না ও।
বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে করতে পুরনো দিনের সেই কথাগুলোই বারবার মনে পড়ছে ঊর্মির। না শ্রুতি রায় মানে ওর তথাকথিত ছোট মাকে কোনদিন ক্ষমা করেনি ও, আর করবেও না। বাবার সাথেও কোনদিন ওর গড়ে ওঠে নি তেমন কোন প্রাণের বন্ধন। সেই জন্যই তো চিরকাল মনে মনে ভীষণ একা ঊর্মি। ও শুধু বেঁচেছিল নিজের রঙ তুলি, ক্যানভাস আর একটা মায়াবী সবুজ স্বপ্ন নিয়ে।
কিন্তু আজ তো সেই স্বপ্নটাও কেমন যেন অচেনা লাগছে ঊর্মির। আজ প্রায় পনেরো দিনেরও বেশি সময় হয়ে গেল মেঘ এর কোন খবর নেই। কোন ফোন নেই, কলেজস্ট্রিট এ দোকানও বন্ধ। মেঘের ভালবাসা নিয়ে আজকাল সত্যি কেমন যেন সংশয় লাগে ঊর্মির। ছেলেটা ওকে সত্যি ভালবাসে তো? তাহলে কেন এমন পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়? আর যদি ঊর্মিকে ভালবাসার না ইচ্ছা ছিল, তাহলে কেন বারবার সাড়া দিয়েছে ওর ডাকে।
মনের মধ্যে লক্ষ সংশয়ের তোলপাড়, একটা অসহ্য একাকীত্ব এই সব কিছুর মাঝে আজ একটা শক্ত কাঁধ বড় দরকার ছিল ঊর্মির। যে কাঁধটা ওকে দিতে পারত কোন সত্যিকারের বন্ধু যার প্রতি চোখ বুজে নির্ভর করা যায়।
কিন্তু ঊর্মির জীবন থেকে সেই বন্ধুও তো হারিয়ে গেছে। আর কোন যোগাযোগ নেই আকাশের সাথে। হঠাৎ করে যেন মুছে গেছে ও। কিন্তু ঊর্মি যে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত মিস করে ওকে। সেটা কি কোনদিন জানতেও পারবে আকাশ?
হয়তো আর কোনদিন আকাশ এর সাথে দেখা হবে না। হয়তো কোনদিন মেঘ ঊর্মিকে কাছে টানবেই না, কিন্তু তবুও ঊর্মি হাল ছাড়বে না। আকাশ আর মেঘ এই দুজন মানুষকে নিজের জীবনে সামিল করতে না পারলে যে ঊর্মির এই অসম্পূর্ণতা কোনদিন মিটবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।