পল্লবী সেনগুপ্ত
বিছানায় শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করেই যাচ্ছে আকাশ। না ঘুম আর আজ আসবে না। ঊর্মির ব্যাপারে যা কিছু আজ শুনে এসেছে ও তারপরে হয়তো ঘুম আর কোনদিনই এসে ভিড় করবে না ওর দু চোখের পাতায়।
ঊর্মি মানসিক রোগে ভুগছে। কোন সাধারণ অসুখ নয়। স্কিতজফ্রেনিয়া তে আক্রান্ত মেয়েটা। যে প্রেমিকের কথা একদিন ও আকাশকে বলেছিল, যার জন্য একদিন আকাশকে ফিরিয়ে দিয়েছিল সেই ছেলেটাই হল মেঘ, যার আদপে নাকি কোন অস্তিত্বই নেই।
আজ অনেকক্ষণ কথা হল শ্রুতি আনটির সাথে। আকাশ শহর ছেড়ে চলে যাবার কয়েকদিন পর থেকেই নাকি শুরু হয়েছিল ব্যাপারটা। ঊর্মির মধ্যে হঠাত করেই সূত্রপাত হয় বেশ কিছু পরিবর্তনের। প্রথম দিকে ব্যাপারটার গুরুত্ব ওর বাড়ির সকলে না বুঝলেও শ্রুতি আনটি সন্দেহ করছিলেন যে ব্যাপারটা খুব একটা ভাল দিকে যাচ্ছে না।
তারপর একদিন ওর বাবা ও ছোট মা বেশ শক্ত করেই চেপে ধরেন ওকে সবটা খোলাখুলি ভাবে জানার জন্য। সেই সময়েই প্রবল অনিচ্ছাস্বতেও মেঘের কথা সকলকে জানায় ঊর্মি। সকলে জানতে পারেন মেঘ ঊর্মির প্রেমিক, কলেজস্ট্রিটের বই পাড়ায় তার বইয়ের দোকান। ছেলেটা খুব অর্থবান পরিবারের সন্তান নয়, কিন্তু সংগ্রাম করে বড় হতে চাইছে সে। ছেলেটা খুব সুন্দর গিটার বাজায়, এবং স্বপ্নের জাল বুনতে সে বড় ওস্তাদ। মেঘের সততা, নিষ্ঠা, অধ্যাবসায় এবং এরকমই নানাবিধ গুন দেখেই ঊর্মি ভালবেসে ফেলেছে।
-''ঠিক আছে। একদিন নিয়ে আসবি মেঘকে আমাদের কাছে। আমরা একবার কথা বলতে চাই ওর সাথে''। আর পাঁচটা বাঙালি পরিবারের বাবা মায়ের মতই সেদিন বলেছিলেন ঊর্মির গুরুজনেরাও। কিন্তু বেঁকে বসে ঊর্মি। ও বারবার বলতে থাকে মেঘ নাকি আর পাঁচটা ছেলের মত খুব মিশুকে প্রকৃতির নয়। তাই সে আসতে চায় না ওর বাড়ি। আর যেহেতু শ্রুতি আনটির প্রতি ওর চিরকালই একটা চাপা আক্রোশ ছিল তাই হয়তো আরও মেঘকে ওদের সামনে নিয়ে আসতে অসম্মত ছিল ঊর্মি।
কিন্তু বাড়ির সকলে সে কথা কেনই বা মানবেন? তারা ধীরে ধীরে ঊর্মির প্রতি চাপ বাড়াতে থাকেন মেঘকে নিয়ে আসার জন্য। তারপরেই একদিন আচমকা ঝড়ের মত আছড়ে পড়ে ঘটনটা।
একদিন সন্ধ্যাবেলায় তীব্র বোমার মত বাড়িতে ফিরে ফেটে পড়ে ঊর্মি। ও জানায় মেঘ নাকি হঠাৎ নিরুদ্দেশ।কোন খবর নেই আর ওর। এমনকি যে বইয়ের দোকান ওর ছিল সেখানেও নাকি তালা পড়ে গেছে রাতারাতি। ঊর্মির স্থির বিশ্বাস বাড়িতে আসার কথা শুনেই এভাবে দূরে চলে গেছে মেঘ।
নিজের জীবনে মেঘের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে প্রবলভাবে বাড়তে থাকে ঊর্মির অস্থিরতা। কোনভাবেই আর পৌঁছান যাচ্ছে না মেঘ অবধি। সেই সময়েই দিন দিন তীব্র ভাবে বাড়তে থাকে ঊর্মির এক অদ্ভুত হিংস্রতা। সব সময় ও যেন খুঁজেই চলেছে ওই একটাই নাম, 'মেঘ'।
ঊর্মির অস্থিরতা ক্রমশঃই মানসিক ভারসাম্যহীনতার দিকে মোড় নিচ্ছে এটা আন্দাজ করেই ছেলেটাকে খোঁজার দায়িত্ব নিজেই নিয়ে নেন ঊর্মির বাবা অনীশ রায়।
কিন্তু মেঘকে খুঁজে পাওয়া ছিল সেদিন মারাত্মক দুষ্কর। সে ছেলের কোন ফোন নম্বর নাকি ছিল না আজকের দিনেও নেই তার কোন সোশ্যাল মিডিয়ায় উপস্থিতি, এমনকি বাড়ির ঠিকানাও নেই। থাকার মধ্যে আছে শুধু একটা বইয়ের দোকানের ঠিকানা।
সেই দোকানেও খোঁজ করেছিলেন অনীশ রায়। খবর নিয়ে জানা যায় বৃদ্ধের দোকান সুলেমান রহমান নামের এক বৃদ্ধের। সেই বুড়োর শরীর ভাল যাচ্ছে না তাই আপাতত বন্ধই থাকবে দোকান। কারণ পালিয়েছে কর্মচারীরাও।
না সেইখান থেকেও কোন খবর পাওয়া যায় না মেঘ নামের কোন চরিত্রের। অথচ মেঘকে নিয়ে এবং হঠাৎ করে ওর হারিয়ে যাওয়া নিয়ে ক্রমাগত অবসেশন বাড়তেই থাকে ঊর্মির। সেই সময়েই সায়ক্রিয়াটিস্ট অমলেন্দু নস্কর কলকাতা বেড়াতে এসেছিলেন। অমলেন্দু অনীশের বন্ধু। অনীশ তাই সব কথা শেয়ার করেছিল সেদিন অমলেন্দুর সাথে।
সবটা শুনে এবং ঊর্মিকে একবার দেখে নিয়ে মিস্টার নস্কর জানান যে ঊর্মি জটিল মানসিক ব্যাধি স্কিতজফ্রেনিয়া শিকার। এমন হলে রোগী, তাকে নাকি স্কিতজফ্রেনিক বলে সেদিন বলেছিলেন ডক্টর। এরকম মানসিক বিকারের ফলেই পেশেন্ট নাকি ক্রমাগত কোন কাল্পনিক চরিত্রকে বানিয়ে নেয় নিজের মত করে। তাদের নিয়েই গড়ে তোলেন নিজের মনের মধ্যে আর এক পৃথিবী। কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে অবসেশন বাড়তে শুরু করলে তা নাকি সঙ্ঘাতিক পর্যায়ে যেতে পারে।
হয়তো ঊর্মি সত্যি অনেকটাই বেশি সিরিয়াস ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে ইদানীং মেঘ মেঘ করে। হয়তো ওকে রিহ্যাবেও পঠাতে হতে পারে। তবে এত কিছুর মাঝেও ওর মুখে মেঘের সাথে সমানভাবেই উচ্চারিত হয় আকাশের নাম। ওর স্থির বিশ্বাস আকাশ ওর থেকে সরে না গেলে এমন কিছু হত না। আকাশ ঠিক খুঁজে আনত মেঘকে।
-''আমি পাগল নই। সত্যি একদিন মেঘ ঠিক সামনে আসবে তোমাদের''। বারবার পাগলের মত এই কথাটাই নাকি বলতে থাকে ঊর্মি।
মেয়েটার পরিণতির কথা ভেবে বারবার চোখ জলে ভরে উঠছে আকাশের। এত কিছু টানাপড়েনের পরেও আজও আকাশকে ভোলে নি ও? আজও অবাধ বিশ্বাস করে সেই আকাশকেই।
হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ মুছল আকাশ। না মেঘ সত্যি না মিথ্যা ও জানে না।ওর কাছে একটাই লক্ষ্য এখন ঊর্মিকে ভাল করে তোলা। তিল তিল করে মেয়েটাকে মরতে দিতে পারবে না ও। ঊর্মিকে ও ভাল করে তুলবেই, তার জন্য যতদূর যেতে হয় হোক তাতে একেবারেই পিছপা হবে না আকাশ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।