পল্লবী সেনগুপ্ত
অনেকদিন পর আজ আবার পানশালায় এসেছে অরূপ। নিজের কাজ আর টাকা কামানোর ধান্দার বাইরে মদ আর মেয়েমানুষের শরীর, এই দুই ছাড়া আর কিছু তো পাবার নেই এই জীবনে। হঠাৎ মাঝখানে কয়েকদিনের জন্য এলোমেলো হয়ে গেছিল জীবনটা বাপটার কথায় বিয়ে করে।
মদ খাওয়া কম করতে হয়েছিল, বাড়িও তাড়াতাড়ি ফিরতে হচ্ছিল আরও কত কি সব পরিবর্তন যেন হয়ে গেছিল আপনা থেকেই। হাজার হোক একটা অন্য বাড়ির ভদ্র মেয়ে ছিল সে। তার সামনে যা হোক বেল্লেল্লাপনা তো আর করা যায় না!
যাক এখন সে সব ঝামেলা মিটেছে। বাপ ও চলে গেল আর তার কয়দিনের মাথাতে সে ও। না অরূপ তাকে আর নতুন করে যাবার কথা মোটেই বলে নি। কিন্তু সে নিজেই চলে গেল বাপের শ্রাদ্ধ মেটার দিন সাতেক পর।
অবশ্য যাবে তো বটেই। ফুলশয্যার রাতেই তো অরূপ যা বলার বলে দিয়েছিল তাকে। আর যে কদিন সে ছিল ওই বাড়িতে অরূপ কটাই বা কথা বলেছে তার সাথে! না, সে গিয়ে তো ঠিকই করেছে। অরূপ তাকে কোনদিন ভালবাসতে পারবে না, স্ত্রী হিসাবে মানতেও পারবে না। তাহলে সে থাকবে কেন? শুধু অরূপ দাসের বাড়ির পাহারাদার হয়ে তো সে সারাজীবন থেকে যাবে না নিশ্চয়ই।
—''দাদা, দাদা কি হল? কেন এত গিলছ আজ? এর পর শরীর বেশি খারাপ করবে তো''। অরূপকে বেসামালের মত একগাদা মদ খেত দেখে ওকে সামলানোর চেষ্টা করল বিজু।
বিজু ছেলেটা এক কথায় বলতে গেলে অরূপের ডান হাত। ব্যবসা পত্তর থেকে শুরু করে অরূপের মদ খাওয়া সবেতেই বসের ছায়াসঙ্গী ও।
—''চুপ কর বিজু। বেশি জ্ঞান মারিস না''। ছেলেটাকে ধমকে ফের গলায় অ্যালকোহল ঢালল অরূপ দাস।
অন্যদিনও মদ খায় লোকটা, কিন্তু আজ যেন বড়ই লাগামছাড়া।
বসকে খানিকক্ষণ নিষ্পলক চোখে নিরীক্ষণ করল বিজু। তারপর মৃদু স্বরে বলল—''বৌদিকে চলে যেতে দিলে কেন দাদা? তাকে নিয়ে কেন নিজের ঘরটা গড়লে না''?
—''শাট আপ। একদম বেশি কপচাবি না বুঝেছিস। শালা, বেশি বকবি তো লাথি মেরে বের করে দেব। কে বৌদি অ্যাঁ? কিসের বৌদি? সম্পর্ক পাতান হচ্ছে? কারোর সাথে কোন সম্পর্ক নেই আমার। সব শালাকে ঘেন্না করি আমি। মেয়েছেলেদের জাতটাই নষ্ট বুঝেছিস।'' অশ্রাব্য গালিগালাজ করছে এবার অরূপ।
গালিগালাজ করতে করতেই আবার গ্লাসে নতুন পেগ তৈরি করল লোকটা আর কেঁপে উঠল সাথে সাথে। গ্লাসের সোনালী তরলে জেগে রয়েছে একটা মুখ। মাথায় সিঁদুরের রেখা টানা, আত্মবিশ্বাসী চোখ বসান একটা মেয়ের দৃষ্টি যেন পানীয় ভেদ করে জরিপ করছে অরূপকে।
মেয়েটা খুব জেদি, খুব গোঁয়ার। মেয়ে মানুষের আবার এত আত্মসম্মান থাকে নাকি! না অরূপ যেমন ভেবেছিল একদম তেমন নয় মেয়েটা। মেয়েরা তো শুধু সুবিধাবাদী আর স্বার্থান্বেষী হয়। কিন্তু তিস্তা একদম তার থেকে আলাদা। অরূপের প্রস্তাবিত খোরপোষ ফিরিয়ে দিয়েছে সে। স্পষ্ট ভাবে বলেছে
—''আমি নিজের একজন মানুষ খুঁজে পাবার জন্য সংসার করতে চেয়েছিলাম, বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি তো কোনদিন নিজেই নিজেকে ভালবাসতে পারেননি, তাই অন্যকে কি ভালবাসবেন! ভালবাসা মানে কি সেটাই কোনদিন জানেন নি আপনি। আসলে আপনি একজন ভীষণ গরীব মানুষ। কিচ্ছুই তো নেই আপনার সামান্য কয়েকটা টাকা ছাড়া। আর এ হেন নিঃস্ব মানুষের থেকে কয়েকটা টাকা নিয়ে আমি নিজেকে ছোট করতে পারব না। তার চেয়ে আমি বরং আপনাকে কিছু দিই। বিনামুল্যের পরামর্শ। জীবনে ভালবাসাকে বুঝতে শিখুন, খুঁজতে শিখুন। ঘৃণার পাঠ আর বেসামাল জীবনযাপনের ইতি ঘটিয়ে আশ্রয়ের পথ চিনে নিন। আদতে আপনিই ভাল থাকবেন''।
—''দাদা বলছিলাম কি এভাবে সত্যি আর চলে না গো? আর কতদিন এভাবে ছন্নছাড়ার মত চলবে? থিতু হতে ইচ্ছা করে না তোমার? বাড়ি ফিরে দেখতে ইচ্ছে করে না কেউ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে?''
বিজুর কথায় ঝট করে মনে পড়ে গেল একটা কথা। ফুলশয্যার রাতে বলেছিল তিস্তা
—''এভাবে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত লাগে না? কোনদিন কাউকে ভালবাসতে ইচ্ছা করে না''?
—''না আমার ইচ্ছে করে না। কাউকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে না আমার। কোনদিন করবেও না। আমি শুধু ঘৃণা করতে চাই। সব শালা বেইমানকে ঘৃণা করতে চাই। আমি দেখিয়ে দেব সব কটাকে এই অরূপ দাস কি পারে! প্রতিশোধ নেব আমি শুধু প্রতিশোধ চাই ''। বিশ্রী চীৎকার করে গ্লাসটা ভেঙ্গে দিল লোকটা। ছুটে এল পানশালার লোকজন। কোনমতে সবটা সামাল দিল বিজু। ভীষণ অবাক লাগছে ওর। কি হল কি বসের আজ! এমন তো করে না এ। তবে কি তিস্তা বৌদির ওপর মন পড়ে গেছিল বসের?ভাবনাটা এসেই মিলিয়ে গেল বিজুর মাথা থেকে। না অরূপ দাস কোন মেয়ের প্রতি দুর্বল হতেই পারে না। মেয়ে জাতটাকেই তো মনে প্রাণে ঘেন্না করে লোকটা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।