পল্লবী সেনগুপ্ত
চওড়া ঝুল বারন্দাটায় রাখা রকিং চেয়ারে বসে আনমনেই ঘোলাটে বিকালের ধূসর আকাশটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল তিস্তা।
সপ্তাহ খানেক হল চলে গেছে রমলা। হঠাৎ কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল সেটা যেন কিছুতেই এখনও বুঝে উঠতে পারছে না তিস্তা। গত চার বছর ধরে দুজন মিলে তিল তিল করে নিজেদের স্বপ্নটাকে নিয়ে পরিচর্যা করেছে ওরা। তারপর আজ এসে পৌঁছেছে এই জায়গায়।
তিস্তা আর রমলা দু জন মিলে প্রথমে তৈরি করেছিল ওদের স্বপ্নের রেস্তোরাঁ ' বাউল মন'। বাঙ্গালী ও দক্ষিণ ভারতীয় নানা খাবারের এই ফিউশন রেস্তরাঁ অধিকাংশ ভোজনপ্রেমী মানুষের আহ্লাদের ঠিকানা হয়ে উঠতে সময় খুব বেশি লাগে না ভগবানের আশীর্বাদে। খুব কম সময়ের মধ্যেই বড়সড় লাভের মুখ দেখেছিল ওরা। ক্রমশ 'বাউল মন' এর সুখ্যাতি বাংলার সীমা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল দিল্লী মুম্বাইয়ের মত শহরগুলোতেও। মানুষের চাহিদায় সাড়া দিয়ে তাই 'বাউল মন' এর আউটলেট শাখা বিস্তার করেছিল ওই শহরগুলোতেও। সত্যি কথা বলতে কি লক্ষ্মী দেবী যেন উজাড় করে দিয়েছিলেন নিজের কৃপা রমলা আর তিস্তার ওপর। জীবনসংগ্রামে বিধ্বস্ত মেয়ে দুটো প্রমাণ করতে পেরেছিল 'আমরাও পারি'। কোন পুরুষের ছত্রছায়াতে না থেকেও মেয়েরাই পারে খরস্রোতা নদীর মত দুর্বার গতিতে এগিয়ে যেতে সেটা প্রমাণ করেছিল ওরা।
সাফল্যের সুবাস গায়ে মেখে দিনগুলো বেশ কাটছিল ওদের ভাল মন্দ মিশিয়ে। কিন্তু তিস্তার কপালে যে লেখা রয়েছে অখণ্ড একাকীত্ব সেটাই ভুলে গেছিল ও। মাস তিনেক আগে একদিন হঠাৎ অসহ্য মাথা যন্ত্রণা নিয়ে নার্সিং হোমে ভর্তি হল রমলা। অনেক টেস্ট এর পরে দেখা হল ব্রেন টিউমার হয়েছে ওর এবং সেই টিউমারটা ক্যান্সারাস। পাগলের মত চেষ্টা করেছিল তিস্তা রমলাকে ধরে রাখার। কিন্তু তাতে বিস্তর অর্থ ব্যয় ছাড়া আর কোন লাভই হয়নি। গত সপ্তাহে চলে গেছে রমলা। আবার তিস্তা একা। বড্ড একা।
গোটা পৃথিবীর সামনে নিজেকে ভীষণ শক্ত আর গাম্ভীর্যপূর্ণ দেখালেও মনে মনে যে একেবারে ভেঙ্গে চুরে গেছে ও সেটা আর ওর থেকে ভাল কে জানে! এতদিন এই বাড়িতে রমলাও থাকত ওর সাথে। আর আজ রয়েছে শুধু রমলার স্মৃতি। চাইলে অনেক ঝি চাকর এ বাড়িতে পুষতেই পারে ও, কিন্তু ইচ্ছা করেনি। ঘরটা তাহলে আর একান্ত আপন রইবে কি করে। অবশ্য শায়না এখানেই থাকে। তবে ও তো আর ঠিক কাজে মেয়ে নয়। এই মেয়েটাও বড় দুঃখী। তিন কূলে কেউ নেই ওর। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা গায়ে আগুন দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল ওকে তারপর কোনমতে পালিয়ে বাঁচে ও। আশ্রয় জোটে এক হোমে। কিন্তু সেখানেও কিছু অর্থলোলুপ মানুষরূপী পিশাচ বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল ওকে। আবার সম্মান এর তাগিদে পালাতে হয়েছিল ওকে। মেট্রোর লাইনে আত্মহত্যা করতেই পৌঁছে গেছিল ও, কিন্তু তখনই ওকে সেখান থেকে উদ্ধার করে মিসেস বেরা মানে 'বাউল মন' এর কলকাতা ব্রাঞ্চের ম্যানেজার। উনি নিয়ে এসেছিলেন ওকে তিস্তার কাছে।
-''মরতে গেছিলে কেন? মরলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? বেঁচে থেকে লড়াই করতে এত ভয় কেন''? এটাই প্রথম কথা ছিল তিস্তার ওর সাথে।
-''লড়াই করব বলেই পোড়া শরীর আর ঝলসান মুখ নিয়েও হোমে গিয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু চামড়া পুড়লেও মেয়ে লোকের শরীর তো, তাই খুবলে খাবার মজাটা বোধ হয় একই আছে। তাই মরে গিয়ে সেই শরীরটাকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম। মেয়েলোকের শরীর বাঁচানোর তাগিদ আর আপনারা কি বুঝবেন দিদি''! ওর কথার মধ্যে কি যেন ছিল সেদিন। রমলা আর তিস্তা দুজনেই নির্বাক হয়ে গেছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য। রমলা বলেছিল
-''তিস্তা আমি ওকে আমাদের সাথেই রাখতে চাই। এ মেয়েটার মধ্যে একটা আলাদা আগুন আছে। আমাদের ঘরের কাজগুলোই না হয় করবে সাথে থেকে''। সেই থেকেই শায়না এখানেই আছে। বছর দুই হয়ে গেল।
-''দিদি তুমি কাঁদছ? আমি জানি না আত্মা বলে কিছু হয় কিনা, কিন্তু যদি হয় তাহলে তুমি কাঁদলে রমলা দিদির আত্মা যে বড় কষ্ট পাবে গো''। শায়নার গলার আওয়াজে হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফিরে পেল তিস্তা।
-''তুই আত্মা মানিস না''?
-''ধর্ম, আত্মা, ঈশ্বর এগুলো আসলে ধোঁকা দিদি। মানুষকে বোকা বানানোর আর ভুলিয়ে রাখার ছল। যা দেখা যায় না তা সত্যি হতে পারে না। কিন্তু তবুও যা সত্যি নয় তা অনেক সত্যিকেও মিথ্যা করে দেয়। তাই ধর্ম মানি না। ঈশ্বর, আত্মা, পরজন্ম এগুলোও মানি না''।
শায়নার মুখের দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তিস্তা। এই মেয়েটার কথাগুলো মাঝে মাঝেই কেমন যেন হেঁয়ালির মত লাগে ওর। মনে হয় অনেক কিছু যেন ও লুকিয়ে রেখেছে নিজের পোড়া চামড়া দিয়ে ঢাকা বুকটার আড়ালে। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তিস্তা। তার আগেই ঝঙ্কার তুলে বেজে উঠল ওর মোবাইল।
-''হ্যালো'' ফোন কানে চাপল তিস্তা।
-''নিজের নিঃসঙ্গ জীবনে বন্ধু পেতে চান? সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সাথে বন্ধুত্ব করুন। বেছে নিন পছন্দের নারী বা পুরুষ। বিস্তারিত জানতে ৯ টিপুন''।
উফফ! মাঝে মাঝেই আসে এসব হাবিজাবি ফোন। বিরক্তি লেগে যায়। একই কথা বারবার শোনায় যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর। আজকেও অন্য দিনের মতই একরাশ বিতৃষ্ণা নিয়ে ফোনটা কেটেই দিতে যাচ্ছিল তিস্তা। কিন্তু হঠাৎ কেন যেন আটকে গেল হাত। সত্যি কি একটা বোতাম টিপে জীবনের নিঃসঙ্গতা দূর করা যায়? সত্যি কি নিজের পছন্দের পুরুষ খুঁজে পাওয়া এতোই সহজ?
হঠাৎ কেমন যেন একটা অন্য অনুভূতি হচ্ছে তিস্তার। জীবনে তো কোনদিন পুরুষ সঙ্গ পাওয়াই হল না। এত টাকা, সাফল্য সব কিছু থাকার পরেও নিজেকে তো বড্ড অসম্পূর্ণ লাগে। একমুঠো উষ্ণতার দাবীতে রক্ত মাংসের শরীরটা সরব হলেও তাতে তো অস্বাভাবিক কিছু নেই।
পিঁ শব্দ হল। ৯ নম্বরটা টিপেই দিয়েছে তিস্তা। দেখাই যাক না কি হয়। ছন্দ লয়হীন জীবনে এক পশলা অজানা উষ্ণতার আহ্বান করে না হয় একটু অপেক্ষাই করবে। কে বলতে পারে কখন জীবনে কোন অধ্যায় এসে বদলে দেবে সবটুকু!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।