পল্লবী সেনগুপ্ত
আজ নিজের হাতে কিছু রান্না করতে বড্ড ইচ্ছা করছিল শ্রুতির। ঊর্মির পছন্দমত কিছু একটা। চিজ কাবাব। মেয়েটা বড় ভালবাসে ওই খাবারটা। দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেল সেই ছোট্ট মেয়েটা। কলেজের গণ্ডি পের করে ফেলল আজ। দেখতেও হয়েছে কি সুন্দর! ঠিক যেন ওর মায়ের মুখের আদল কেটে বসান। সেইজন্যই তো ঊর্মি এত সুন্দর। ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকের কাছটা কেমন যেন টনটন করে উঠল শ্রুতির। ও কি তাহলে সারাজীবন শুধু ঊর্মির সৎ মা হয়েই থেকে যাবে? কোনদিন পৌঁছতে পারবে না ওর মনের কাছাকাছি? সারা জীবন কি শুধু ঊর্মি ঘেন্নাই করে যাবে ওকে?
হ্যাঁ শ্রুতি জানে ঊর্মি ওকে মনে প্রাণে ঘৃণা করে। কিন্তু কেন সেটা আজও সঠিক বোঝে না ও। কি ভাবে ঊর্মি? ও কি সত্যি এটা বিশ্বাস করে মনোরোমা রায়ের মৃত্যুর জন্য শ্রুতি দায়ী? কিন্তু কি করে শ্রুতি বোঝাবে নিজের সত্যিটা ওকে? কি করে ওকে বোঝাবে আসলে ঊর্মি ওর কতটা আপন।
প্লেটে কাবাব গুলো সাজাল শ্রুতি। আজ নিজে হাতে ওকে খাইয়ে দিতে বড্ড ইচ্ছা করছে। কিন্তু ঊর্মির কি ভাল লাগবে সেটা? না ঊর্মি হয়তো সেটা এলাউ করবে না। খাবারের প্লেটটা হাতে নিয়ে ঊর্মির ঘরের দিকে এগোল শ্রুতি। কিন্তু ঢুকতে গিয়েই থমকে গেল ও। একি! ঊর্মির ঘরের দরজা ভেজান, অল্প ফাঁক করা। তা দিয়েই দেখা যাচ্ছে মেয়েটাকে। ওর চোখ মুখ ফোলা ফোলা। কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মত লাগছে। ক্যানভাসে লাগান ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে আর পাগলের মত কি যেন বলছে বিড়বিড় করে। দু চোখ বেয়ে জলের ফেঁটা গড়িয়ে পড়ছে ওর। কিন্তু কেন? কি জন্য এত কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটা? কি হয়েছে ওর? আর বলছেই বা কি? দরজায় কান লাগিয়ে শোনার চেষ্টা করল শ্রুতি।
-''আমি সত্যি ওকে কষ্ট দিতে চাই নি। আজও চাই না। কিন্তু কি আমি কি করব বল? কাকে বোঝাব আমার যন্ত্রণাটা? তুমিও তো বোঝো না আমাকে। খালি দূরে দূরে সরে থাক। পালিয়ে পালিয়ে বেড়াও। চাইলেও ছুঁতে পারি না তোমায়। কষ্টের মুহূর্তেও তোমার বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে পারি না আমি। কেন? কেন এমন কর তুমি? তুমি সত্যি আমায় ভালবাস তো''?
এবার হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নিজের চোখ মুছে নিল ঊর্মি। হাতে তুলে নিল তুলি আর রঙ। মন ডুবিয়ে আবার রঙিন আঁচড় কাটছে।
কয়েক মুহূর্ত এর জন্য স্থবির হয়ে গেছিল শ্রুতি। পলকের জন্য মস্তিষ্ক যেন অচল হয়ে গেছিল। কিন্তু কুড়ি সেকেন্ডের মাথায় হুঁশ ফিরে এল ওর। ঊর্মি প্রেম করছে! কিন্তু কার সাথে? কাউকে কিছু জানায়নি তো। কোন ভুল ছেলের পাল্লায় পড়ে যায় নি তো? মেয়েটা যে বড্ড সরল, বড্ড আবেগপ্রবণ। যে কেউ তো ওর সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করতে পারে ওকে। জীবনের কতটুকু দেখেছে ও! আর মেয়েটা তো ভীষণ অভিমানী। পর করে রেখেছে শ্রুতিকে। নিজের বাবার থেকেও মানসিক ভাবে দূরে চলে গেছে অনেকটা। ভিতরে ভিতরে যে মেয়েটা নিঃসঙ্গতার আগুনে পুড়ছে সেটা বেশ ভাল বোঝে শ্রুতি। কিন্তু বুঝেই বা কি লাভ! শ্রুতি তো সব রকম চেষ্টা করেছে ওকে স্নেহ বন্ধনে বেঁধে বারবার ওর কাছাকাছি যাবার। কিন্তু বারবারই তো ব্যর্থ হয়েছে ও।
কিন্তু সে যাইহোক, এখন তো চিন্তা অন্য। ঊর্মির এ হেন অভিমানী স্বভাব, মানসিক একাকীত্ব আর সরলতার সুযোগ নিয়ে কেউ ওকে ব্যবহার করতে চাইছে না তো! আর সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেবার মত তো একেবারেই নয়। কলকাতা শহরের বিখ্যাত হার্ট স্পেশালিষ্ট অনীশ রায়ের একমাত্র মেয়ে ঊর্মি। তাকে নিজের ভালবাসার মিথ্যা জালে ফাঁসিয়ে শর্ট কাটে বড়লোক হতে চাইবার মত নিচু মানসিকতার ছেলে তো আর এ শহরে কম নেই।
কিন্তু সব বুঝেও, শুধু এক বুক আশঙ্কা নিয়ে তো আর চুপ করে থাকতে পারবে না শ্রুতি। ওকে এবার ব্যপারটার মধ্যে ঢুকতেই হবে, সে ঊর্মি যতই অপছন্দ করুক সবটা। দরজা ঠেলে এবার ঘরের ভিতর ঢুকল শ্রুতি। তন্ময় হয়ে তুলি দিয়ে রঙের ছবি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলছে ঊর্মি। মুখটা কি ভীষণ বিষণ্ণ।
—''ঊর্মি, ঊর্মি দেখ তোর জন্য আজ নিজের হাতে চিজ কাবাব বানিয়েছি। খাবি তো তুই''? কথাটা বলেই আড়চোখে ক্যানভাসের দিকে তাকাল শ্রুতি। ঊর্মি ছবি আঁকছে। কেমন বৃষ্টি ধোয়া একটা শহরের ছবি। তার মাঝে হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলেছে দুটো ছেলে মেয়ে।
ঊর্মি ক্যানভাস থেকে মুখ তুলল অল্প। নিরুত্তাপ গলায় বলল
—''রেখে যাও। এখন ক্ষিদে নেই। পরে ক্ষিদে পেলে খাব''।
—''ওমা! তা বললে কি করে হয়? তুই আমার সামনে খা। নাহলে কি আমার ভাল লাগবে?''
এবার একটু অদ্ভুত ভাবে হাসল ঊর্মি। তারপর কেটে কেটে বলল
—''বললাম তো আমার এখন ক্ষিদে নেই। আমায় নিয়ে তোমায় ওত ভাবতে হবে না''।
—''আমি ভাবব না তো কে ভাববে শুনি। তুমি আমাদের মেয়ে ঊর্মি।আর আইনত আমিই তোমার মা। তাই তুমি চাও বা না চাও আমি তোমাকে নিয়ে মাথা ঘামাবোই। আর আমার তোমার সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। সেটা এখন না সেরে আমি যাব না''। এবার গলা কিছুটা গম্ভীর করল শ্রুতি।
—''আমার তোমার সাথে কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা থাকতে পারে না। তুমি চলে যাও প্লিজ। আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ ছবি আঁকছি এখন। মনঃসংযোগ করতে চাই''।
—''ছবি তুমি পরে আঁকবে। আগে তুমি এখন আমার কথা শোন। শুনতেই হবে তোমায়''। শ্রুতির কেমন যেন মাথাটা বেশি গরম হয়ে যাচ্ছে।
—''কেন? কেন শুনব আমি তোমার কথা? তুমি কেউ হও না আমার। আর কেন তুমি বিরক্ত করছ আমায় আজ? তোমার লেখা নেই আজ? তুমি তো বাংলা সাহিত্যের নাম করা লেখিকা। কত কাজ আছে তোমার। তবু কেন আমার পিছনে নষ্ট করছ সময়? কেন বিরক্ত করছ আমায়? তুমিও তো সৃষ্টি কর, তাহলে কেন আমার সৃষ্টির পথে বাধা হতে আস বারেবারে? কেন আঁকায় মন দিতে দিচ্ছ না আমায়''? কথাগুলো রুদ্ধশ্বাসে শেষ করেই কেঁদে ফেলল ঊর্মি।
শ্রুতি বুঝতে পারল কোন কারণে সাঙ্ঘাতিক কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটা। এবার ও আর একটু কাছ ঘেঁষল ঊর্মির। ওর মাথায় হাত রেখে নরম স্বরে বলল
—''ঊর্মি মা তুই কি কাউকে ভালবাসিস? তা তুই বাসতেই পারিস, এই বয়সটাই তো এমন। কিন্তু সে কে মা? আমায় বল। আমায় জানাবি না? মায়ের কাছেই তো মেয়েরা আগে বলে।''
এবার যেন ক্ষিপ্র সিংহের মত গর্জে উঠল ঊর্মি। ছিটকে সরে গেল শ্রুতির কাছ থেকে
—''এত দূর! এত দূর বেড়ে গেছ তুমি? এত বেড়ে গেছে তোমার কৌতূহল যে তুমি আমার ঘরে আড়ি পাতছ তুমি? গোয়েন্দা লাগিয়েছ আমার পিছনে? শোন শ্রুতি রায় এসব করে তুমি কিচ্ছু করতে পারবে না বুঝেছ''। চীৎকার করে উঠল মেয়েটা। টান মেরে মেঝেতে ফেল দিল কাবাব সাজান প্লেটটা।
—''শোন তুমি যেভাবে আমার মাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছিলে ঠিক সেইভাবে আমায় কিন্তু তুমি সরিয়ে দিতে পারবে না বুঝেছ। বেরিয়ে যাও। বেরিয়ে যাও বলছি। তুমি বাইরে যত বড় আর নামী লেখিকা হও না কেন আমার কাছে তুমি কেউ না। কিচ্ছু না। বুঝেছ''। পাগলের মত চেঁচাচ্ছে ঊর্মি।
চমকে গেছে শ্রুতি। এমন করছে কেন ঊর্মি? ও তো এমন চীৎকার করার মেয়ে নয়। কি হয়েছে ওর? সমস্যাটা তো গুরুতর মনে হচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আর কথা বাড়ান ঠিক হবে না। ভাঙ্গা প্লেটের টুকরোগুলো আর ফেলে দেওয়া কাবাব গুলো মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিল শ্রুতি।
ঊর্মির ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল ও। দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল ঊর্মি। বুকের কাছটায় কেমন যেন একটা কষ্ট দলা পাকিয়ে উঠছে শ্রুতির। বারবার কানে অনুরণন হচ্ছে ঊর্মির শেষ কয়েকটা কথা
'বাইরে তুমি যত বড় লেখিকা হও না কেন আমার কাছে তুমি কেউ না'। বুক ঠেলে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল শ্রুতির।
—''নারে ঊর্মি আমি কোন বড় লেখিকা নই, যে যাই ভাবুক না কেন। আমি জানি আমি সত্যি কিচ্ছু না। আমি যদি সত্যি বড় লেখিকা হতাম তাহলে তো আমার জীবণের আসল উপন্যাসটা এতদিনে লিখে ফেলতে পারতাম। কিন্তু সেটা যে আমি পারি নি। আর পারবোও না। কারণ ওই উপন্যাসের শেষ পাতাটা তো হারিয়ে গেছে। আমি নিজেই হয়তো একদিন হারিয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম। সেইজন্যই তো আজ আমি এত নিঃস্ব, এত রিক্ত। আর এই অসম্পূর্ণ উপন্যাসের মত জীবনটা যে আমায় মৃত্যুর শেষ দিন অবধি বয়ে বেড়াতে হবে। তুই যে কোনদিন সেটা জানতেও পারবি না মা''। নিজের মনেই কথাগুলো বলে ফেলল শ্রুতি। টুক করে ও আরও একবার লুকিয়ে ফেলল নিজের দীর্ঘশ্বাস আর চোখের জলের ফেঁটাগুলো। রমা দি'র মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে ও যে কথা দিয়েছিল তাকে রমাদির মেয়েকে কোনদিন এক ফোঁটাও কষ্ট পেতে দেবে না সে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই প্রতিশ্রুতি পালন করবে ও। কোনদিন ঊর্মি জানতে পারবে না রমা দির মত শ্রুতিরও সমান অধিকার আছে ওকে ভালবাসার, ওর ভাল চাওয়ার আর ওর ভালবাসা পাবার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।