পল্লবী সেনগুপ্ত
দরজা পেরিয়ে কিছুটা সঙ্কুচিত পায়েই ভিতরে এল নয়ন। প্রথমবার কোন ক্লায়েন্টের বাড়ি। অবশ্য তিস্তাকে মোটেই শুধু ক্লায়েন্ট এখন আর বলা যায় না, যদিও পরিচয়টা পেশাকে ভিত্তি করেই হয়েছিল।
তিস্তা মেয়েটা বড় দুঃখী। ভীষণ একা ও। জীবনে অনেক সাফল্য পেলেও পায়নি কখনও ভালবাসা বা বন্ধুত্বের উষ্ণ স্পর্শ। তাই নয়নের সামান্য সহমর্মিতাকেই আজকাল ভীষণ ভাবে আঁকড়ে ধরতে চাইছে যেন ও। তিস্তার নিঃসঙ্গতা, ওর ভালবাসার জন্য আকুতি কিভাবে যেন স্পর্শ করেছিল নয়নকেও। আসলে ওর একাকীত্বের হাহাকারের মাঝে কোথাও যেন নয়ন খুঁজে পেয়েছিল নিজেরই এক টুকরো প্রতিবিম্ব। নয়নও যে পুরোপুরি নির্বান্ধব একজন মানুষ। যৌনকর্মীর পেশা বেছে নেবার পর থেকে আস্তে আস্তে অবশ্য 'মানুষ' পরিচয়টাও হারিয়ে যেতে বসেছিল ওর। ও ক্রমে ক্রমে প্রতিদিন পরিনত হচ্ছিল রক্ত মাংসের শরীররূপী এক যন্ত্রে, যাকে কখনও নিজের শরীরী বিভঙ্গে সন্তুষ্ট করতে হয় ষাট বছরের বিকৃতকামতাড়িত মহিলাকে আবার কখনও নিজেকে মেলে ধরতে হয় সমকামী পুরুষের ক্ষুধার্ত শরীরের সামনেও।
তিস্তাই সেই মানুষ যে প্রথম নয়নকে মনে করিয়ে দিয়েছিল ওর 'মানুষ' হবার পুরনো পরিচয়টা। তিস্তা অনেকদিন পর ওর মনকে খুঁজেছিল, শরিরকে নয়। সেইজন্যই বোধ হয় নির্বান্ধব নয়নও সেদিন একটা আলাদা আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল তিস্তার মধ্যে। আর সেই থেকেই হয়তো শুরু হয়েছিল ওদের অসম বন্ধুত্বটা।
তিস্তা নিজের জীবনের সবটুকু উজাড় করে বলেছে নয়নকে। ওর শৈশব, কৈশোর, বিয়ে, ব্যবসা, সাফল্য, ব্যর্থতা সব কিছু । কিন্তু নয়ন পারেনি। নিজের অতীত জীবনের অন্ধকার, পালিয়ে বেড়ান, প্রেমহীনতা এসব কিছুই বলতে পারেনি ও তিস্তার বারবার জানতে চাওয়া সত্ত্বেও।
-''এই নয়ন, কি হল ওভাবে দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? এস''। তিস্তার ডাকে যেন সম্বিৎ ফিরল ও।
-''হ্যাঁ চল''। বলে ও এগিয়ে গেল পিছু পিছু তিস্তার।
একটা বেশ বড়সড় ফ্ল্যাট। সেখানকার ডাইনিং রুমে ওকে হাত ধরে নিয়ে গেল তিস্তা। টেবিলভর্তি থরে থরে খাবার সাজান।
হুট করে নয়নের গালে চকাস করে একটা চুমু খেল তিস্তা। তারপর আদুরে গলায় বলল
-''তোমার জন্য সব কিছু আমি নিজে হাতে রান্না করেছি জান''।
সব কটা পদে চোখ বুলাল নয়ন। সত্যি অনেক গুলো পদ।
-''না না এত কিছু আমি খেতে পারি নাকি! আমি এত কিছু খেতে পারব না তিস্তা। তুমি আমায় বারবার অনুরোধ করেছিলে তাই এসছি। কিন্তু এত কিছু খেতে পারব না। তবে এখানে দেখছি আমার প্রিয় পুলির পায়েস রয়েছে, সেটা একটু অবশ্যই চেখে দেখব। তুমি শুধু শুধু কেন এত কিছু করলে বল তো''।
-''শুধু শুধু কিসের নয়ন! রমলা চলে যাবার পর আমার একলা জীবনে তুমিই তো এসেছিলে একমাত্র বন্ধু হয়ে। তুমিই তো এই পৃথিবীতে আমার একমাত্র আপন, একমাত্র বন্ধু। তাই তোমায় কিছু করে খাওয়াতে পারার মধ্যে আমার নিজের আনন্দই লুকিয়ে আছে। কিন্তু ঐ পায়েসটা নয়, ওটা আমি বানাইনি। শায়না বানিয়েছে। শায়না এ বাড়িতেই থাকে। আমার থেকেও ভীষণ দুঃখের ওর জীবনটা''।
-''আমি একজন জিগেলো তিস্তা। যৌনকর্মী। আমি কি করে কারোর বন্ধু হতে পারি বল। তবু তুমি আমায় বন্ধু মনে করেছ, এত সম্মান দিয়েছ এই পাওনা আমি কোনদিন ভুলব না বিশ্বাস কর। তবে এত কিছু খাওয়া সত্যি অসম্ভব। কাল ভোরেই মুম্বাই যেতে হবে । একটা হাই প্রোফাইল পার্টিতে এনটারটেনার হিসেবে যাচ্ছি। তারপর খুশি করতে হবে পঞ্চান্ন বছর বয়সী বিদেশি সমকামী পুরুষকে''।
নয়নের শেষ কথাগুলোতেই কেমন যেন চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তিস্তার। ততক্ষণে পায়েসে চুমুক দিয়েছে নয়ন।
-''শোন নয়ন ''কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তিস্তা। কিন্তু তার আগেই মুখ খুলেছে নয়ন,
-''এই পায়েস পায়েস তুমি কোথায় পেলে তিস্তা? এই স্বাদটা যে'' কেমন যেন বিস্ফারিত লাগছে হঠাৎ নয়নের দু চোখ। তিস্তা আমল দিল না তাতে। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল নয়নের দিকে। একেবারে পাশ ঘেঁষে বসল ওর। ওর কাঁধে মাথা রেখে নিবিড় গলায় বলল
-''এসব কথা আর কোনদিন বলবে না নয়ন। কাউকে খুশি করার আর কোন দায় নেই তোমার। কোথাও যাবে না তুমি। কারোর কাছে আর বিক্রি করবে না তুমি তোমার শরীর । এবার থেকে তুমি শুধু আমার হয়ে থাকবে। আমার কাছে থাকবে। তোমার শরীর মন শুধু আমার হবে''।
-''বাঁধা করে রেখে দিতে চাইছ আমায়? শেষমেস আমি তোমার কাছেও শুধু একটা শরীর হয়ে গেলাম তিস্তা ? কিন্তু আমি যে বাঁধা পড়ার চুক্তি নিই না। তোমার থেকেও অনেক বেশি ধনী মহিলা এর আগেও এই প্রস্তাব দিয়েছিল আমায়। আমি তখনও মানিনি। আজও মানব না। তবে ভেবেছিলাম তুমি আমার মনের অস্তিত্ব বুঝতে পার, আমার শরীর তোমার কাছে মুখ্য নয়। কিন্তু আজ বুঝতে পারলাম যৌনকর্মীর শুধু শরীরই থাকে। মন থাকতে নেই''। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে নয়ন। তিস্তা দেখতে পেল ওর চোখের কোণে চিকচিক করছে স্বচ্ছ ফোঁটা।
বুক মুচড়ে উঠল তিস্তার এসব কি বলছে নয়ন! ও যে নিদারুণ ভাবে ভুল বুঝছে ওকে। এবার ওর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তিস্তা। পাগলের মত চুমু খাচ্ছে ওর বুকে।
-''না নয়ন না। তুমি ভুল বুঝছ আমায়। আমি সেভাবে বলতে চাইনি। আসলে আমি হারাতে চাইনা তোমায় কোনভাবেই। তাই আমি চাই না তুমি আর ওই অন্ধকার জগতে ফিরে যাও। আমি তোমায় ভালবাসি নয়ন। আমি বিয়ে করতে চাই তোমায়''।
তিস্তার বাহুপাশ থেকে এবার নিজেকে ছাড়িয়ে নিল নয়ন। কেটে কেটে বলল-''কিন্তু আমি তোমায় ভালবাসি এ কথা কি কোনদিন বলেছি? আর তুমি চাইলেই আমি তোমায় বিয়ে করব এ কথা কি করে ভাবলে? আমি যৌনকর্মী। তাই বিয়ে করার ধর্ম আমার নেই। আমি কোন গৃহস্থ পুরুষ নই যে কেউ চাইলেই তার দয়ায় তার সাথে সংসার সংসার খেলতে লেগে যাব। জিগেলোদের ভালবাসতে নেই তুমি জান না?''
চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে তিস্তার। এ কোন নয়নকে দেখছে ও? এত রুক্ষ, এত অসংবেদনশীল মানুষ তো ওর নয়ন নয়। তাহলে কেন আজ এভাবে কথা বলছে ও? কোন কারণে কি তবে অজান্তেই ওকে আঘাত করে ফেলল তিস্তা?
-''প্লিজ নয়ন , তুমি আমায় এভাবে ভুল বুঝ না। আমি জানি তুমিও আমায় ভালবাস''।
-''কে বলেছে তোমায় এ কথা? আমি কোনদিন কাউকে ভালবাসিনি। আমি ভালবাসতে জানি না। আর তাছাড়া টাকা ছাড়া কিই বা আছে তোমার যে তোমায় ভালবাসতে যাব আমি? তোমার বিয়ে করা বরই তোমায় ভালবাসে নি, তো একজন যৌনকমী কি ভালবাসবে তোমায়''?
শেষ কথাটা কানের মধ্যে ঝনঝন করে বেজে উঠল তিস্তার। চকিতে মনে পড়ে গেল নিজের বিয়ের রাতের কথাটা। অরূপ দাসের মুখটা। আত্মসম্মানে প্রবল একটা আঘাত অনুভব করল ও। এবার তীব্র চীৎকার দিয়ে বলল
-''ঠিক বলেছ তুমি নয়ন, তুমি শুধুই একজন যৌনকর্মী। আসলে তোমরা শুধু শরীর বেচে অর্থই উপার্জন করতে পার, এর বেশি কোন ক্ষমতা তোমাদের নেই। এইজন্যই তো সমাজের মূলস্রোত থেকে বিতাড়িত তোমরা। আমি সত্যি তোমার মত একজন পুরুষকে বন্ধু ভেবে বসেছিলাম ভেবে নিজের প্রতিই ঘেন্না হচ্ছে এখন। বেরোও, এক্ষুনি বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে''।
-''দেখলে তো কত সহজে বুঝে গেলে আমার আসল জায়গাটা''। মিটিমিটি হাসছে নয়ন। আর কেমন অদ্ভুত ভাবে যেন উঁকি মারছে ওর ঘরের অন্দরের দিকে।
মাথাটা আরও জ্বলে গেল তিস্তার। গলা আরও চড়িয়ে বলল
-''তুমি নিজে থেকে বেরোবে নাকি অয়াচম্যানকে ডাকব''।
এবার চোখ নামিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল নয়ন। তিস্তা বুঝতে পারল দরজা খুলে বেরিয়েও গেল ও।
দু চোখ বন্ধ করে মেঝেতেই বসে পড়ল তিস্তা। ও দেখতে পাচ্ছে আস্তে আস্তে কেমন যেন একটা অন্ধকারের চোরা স্রোতে ডুবে যাচ্ছে ও। দু হাত তুলে বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা করলেও, কোন হাত এগিয়ে আসছে না ওকে আবার আলোয় ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।