পল্লবী সেনগুপ্ত
হঠাৎ করেই টাইফয়েডটা বিষাক্ত হাঙরের মত আছড়ে পড়েছিল ঊর্মির শরীরের ওপর। প্রায় দিন কুড়ি বিছানায় বন্দি থাকার পর কলেজে পৌঁছে খবরটা পেয়েই আঁতকে উঠেছিল ঊর্মি। কয়েকটা অনিবার্য কারণবশত নাকি হঠাৎ এগিয়ে এসেছে কলেজের প্রথম ইন্টারনাল এক্সাম। যেটা প্রায় একমাস পরে হবার কথা ছিল সেটা শুরু হবে এক সপ্তাহ পর থেকেই।
টেনশনে দুর্বল শরীরটা আরও কেঁপে উঠেছিল ওর। কি হবে এবার? ঊর্মির তো তেমন কোন ভাল বন্ধুও নেই কলেজে যে ওকে গত কুড়িদিনের ক্লাস নোটস, স্যারদের দেওয়া বাছাই করা শেষ মুহূর্তের সাজেশান এগুলো দিয়ে সাহায্য করতে পারে। তাহলে কি কলেজের প্রথম ইন্টারনাল পরীক্ষাতেই ফেল করে যাবে ঊর্মি! পড়াশুনাতে তেমন মারকাটারি ভাল না হলেও ফেল করার মত লজ্জাজনক পরিস্থিতে কোনদিন পড়তে হয় নি। শেষে কিনা শহরের নামজাদা ডাক্তারের মেয়ের কপালে ফেলুড়ে মেয়ের তকমা জুটবে!
কয়েকজন প্রফেসরের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিল ঊর্মি। কিন্তু তেমন লাভ হয় নি। সকলেই একই কথা বলেছিলেন। যা যা মিস করেছ সেগুলো কোন বন্ধুর থেকে যোগাড় করে নিও। কিন্তু কোথায় বন্ধু পাবে ও? নিজের চূড়ান্ত অন্তর্মুখী স্বভাবের জন্য যে গত ছয় মাসেও ওর কোন ভাল বন্ধুই জোটেনি সেকথা তো আর কলেজের অধ্যাপকদের বলা যায় না। অসহায়তার তাড়নায় সেদিন বারবার বুকটা মুচড়ে উঠেছিল ঊর্মির। কান্নার দলা বারবার বেরিয়ে আসতে চাইছিল বুক ঠেলে।
সেদিন কলেজ ছুটির পরেও বেবাক ফাঁকা দৃষ্টি নিয়ে বোকার মত খালি ক্লাসরুমেই বসে ছিল ঊর্মি শূন্য ব্ল্যাক বোর্ডটার দিকে তাকিয়ে। বাড়ি যাবার জন্য যেন পা দুটো সরছিলই না। ঠিক তখনই চমকে উঠেছিল একজনের গলা পেয়ে
—''কবি কবি দৃষ্টি নিয়ে দেওয়াল আর নিরেট ব্যাকবোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকলেই কি সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে''? কথাটা বলেছে আকাশ। ওদের ক্লাসেরই ছেলে। পড়াশুনায় বেশ ভাল আর খুব বুদ্ধিদীপ্ত। ঊর্মি আগেও দেখেছে ওকে ক্লাসে অনেকবার। একটু বেশি পাকা টাইপের। সবেতেই একটু বোদ্ধা ভাব দেখায়। সব ক্লাসের পরেই প্রোফেসরদের কাছে ওর প্রচুর প্রশ্ন থাকে। আর ওর এই অতিরিক্ত জ্ঞান পিপাসার জন্য কোন কোন অধ্যাপক ওকে একটু বেশিই পছন্দ করেন বই কি! কিন্তু এই ছেলেটা এখানে এখন কি করতে এসছে ঊর্মির সামনে? কলেজ ছুটির তো আধঘণ্টা হয়ে গেল তাও বাড়ি যায় নি?
—''কেন বলতো? তোমার কি অসুবিধা হয়েছে? কি চাই তোমার? কেন এসেছ এখানে''? বেশ রুক্ষস্বরেই বলে ফেলল ঊর্মি।
—''আরে! এই তো হচ্ছে বড়লোকদের মেয়েদের সমস্যা। সব সময়তেই ভাবে কেউ বুঝি তাদের হাইজ্যাক করে মুক্তিপণ চাইবার প্ল্যান করছে। আরে বাবা কিডন্যাপারদের প্রাণেও তো ভয় থাকে নাকি। চট করে কি ওভাবে হাইজ্যাক করা যায়?''
—''দেখ আকাশ আমার বাজে কথা বলতে বা শুনতে কোনটাই একদম ভাল লাগে না। তুমি কেন এত হ্যাজাচ্ছ আজ আমার সাথে? কি উদ্দেশ্য তোমার''?
—''এটাই তো আপনার সমস্যা ঊর্মিলা দেবী। আপনি বড় বেশি তিরিক্ষে মেজাজের। এইজন্যই তো কোন বন্ধু নেই আপনার। আর সেইজন্যই আপনি এত সমস্যায় পড়েছেন। কলেজে আমরা আপনার বন্ধু না হলেও অসুখ হুট করেই আপনার সাথে সখ্যতা করে ফেলল। ফলে আপনি প্রয়োজনীয় যাবতীয় ক্লাস মিস করলেন আর এখন কান্না চাপার মিথ্যা চেষ্টা করছেন।
যাইহোক কান্নার কষ্টকটা তুলে রেখে আপাতত এই প্যাকেটটা রাখ। গত কুড়ি দিনের সব নোটস, সাজেশান সব কিছু জেরক্স করিয়ে দিয়েছি। ভাল করে পড় সাতদিন। ফেল করার হাত থেকে হয়তো এ যাত্রা রক্ষা পেয়ে যাবি''।
—''কি? নোটস! মানে? কিন্তু কেন? তুমি আমায় কিজন্য দেবে? অপ্রতাশিত পাওয়া, খুশি আর বিস্ময় সব কিছু মিলিয়ে সেদিন যেন সমস্ত ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল ঊর্মি।
-''তুমি নয় তুই। আমায় তুই বল ভাই। আমি কোন তোর জ্যাঠামশাই নই যে এত সম্মান দিবি। বন্ধুদের সবাই তুই করেই বলে। ও হ্যাঁ আবার এটা ভেবে বসিস না যে আমি তোকে এগুলো দিয়ে পটিয়ে প্রেমের জালে ফাঁসাতে চাইছি। তোকে এগুলো দিলাম কারণ আমি খুব দয়ালু। আর তাই কোন মেয়ের যদি ক্লাস চলাকালীনই চোখে জল ভরে আসে তাহলে আবার আমার খুব ইয়ে হয়। ইয়ে মানে, মানে, মানে ধরে নে পটি পেয়ে যায়''।
ছেলেটার অদ্ভুত কথা শুনে সেদিন আর না হেসে থাকতে পারে নি ঊর্মি। খুব জোরে হেসে উঠেছিল যেটা সাধারণত ও করে না। সেই শুরু। তারপর আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব হয়েছিল আকাশের সাথে। আর সেই বন্ধুত্বের তল বোধ হয় আস্তে আস্তে এতটাই গভীর হয়ে গেছিল যে সেটা কোনদিন আর মাপতেই পারে নি ঊর্মি।
আকাশ কিভাবে যেন আস্তে আস্তে ওর মুশকিল আসানের আর এক নাম হয়ে উঠেছিল। ও এমন এক বন্ধু যাকে সম্পূর্ণ ভাবে বিশ্বাস করা যায়, মন খুলে সব কথা বলা যায় আবার নির্দ্বিধায় সাহায্যও চাওয়া যায়।
আকাশই সেই মানুষ যাকে প্রথমবার নিজের ভাঙা চোরা পারিবারিক জীবন আর শ্রুতি রায়ের শঠতার কথা বলেছিল ঊর্মি।
ঊর্মির মন খারাপ লাগলেও ও যেমন আকাশকে ফোন করে কাঁদতে পারে আবার রাগ হলেও বিনা কারণেই ওর ওপর চেঁচাতে পারে। সব অধিকারই যেন ওর থেকে নিয়ে রেখেছিল ঊর্মি। কোনদিন ও ভাবেই নি ওদের বন্ধুত্ব আর থাকবে না ওর জীবনে। কিন্তু তবুও আজকে তাই হয়েছে। নিজের হাতেই আকাশকে ঠেলে জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছে ঊর্মি। আজ ঝাড়া তিন মাস হয়ে গেল ছেলেটার সাথে কোন যোগাযোগ নেই ওর। কোন ফোন করে নি ছেলেটা। ঊর্মিও করে নি। কতবার ফেসবুকে দেখেছে ওর নামের পাশে সবুজ আলোটা জ্বলতে, তবুও পারে নি ওকে দুটো শব্দও লিখতে। কতবার মন খারাপের সময় ইচ্ছে হয়েছে আকাশকে ফোন করে নিজের সবটুকু কষ্ট উগড়ে দিতে আগের মত, কিন্তু তবু সেটা আর হয় নি।
কিন্তু আজ সন্ধ্যের পর থেকে যেন আর তিষ্ঠতে পারছে না ঊর্মি। ফেসবুকে কি লিখেছে ওটা ও?
'সোশ্যাল মিডিয়া তথা চেনা ছকের বৃত্ত থেকে ছুটি নিচ্ছি বেশ কিছুদিন। জানি না কবে ফিরব না বা আদৌ ফিরব কিনা। ভাল থেকো সবাই'।
কোথায় যাচ্ছে আকাশ? ও কি তবে অভিমান করে কোন অচেনা ঠিকানায় হারিয়ে যেতে চাইছে?
না আর পারল না ঊর্মি। ফোন নম্বরটা ডায়াল করেই ফেলল। ওপারে ক্রিং ক্রিং যান্ত্রিক শব্দটা যেন ধাক্কা মারছে ঊর্মির কানে।
—''হ্যালো'' কি ভীষণ গম্ভীর শোনাচ্ছে ছেলেটার গলা।
—''আকাশ কি হয়েছে রে তোর? ওসব কি লিখেছিস তুই''?
—''তুই কি সেটা জানতেই এত রাতে ফোন করেছিস''? অদ্ভুত একটা শ্লেষ রয়েছে কি ছেলেটার গলায়? ঊর্মি ঠিক পড়তে পারল না। শুধু গিলে নিল একটা দীর্ঘশ্বাস।
—''আকাশ আমি জানি তুই আমার ওপরে অনেকটা অভিমান করে আছিস। আর হয়তো এই তিনমাসে অনেকগুলো প্রশ্ন বারবার তোর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে যেগুলোর উত্তর তুই বহু হাতড়েও খুঁজে পাসনি। আমি তোর সব উত্তর নিয়ে একবার তোর মুখোমুখি হতে চাই। আগামীকাল একবার দেখা কর তুই। আমাদের প্রিয় ঠেক বসু দার কেবিনে তুই চলে আসিস একবার বিকেল পাঁচটা নাগাদ''।
দু মিনিট নীরব রইল আকাশ। তারপর ধীরে ধীরে বলল
—''আসব। তবে বসু দার কেবিনে নয়। তোর পাড়ার সিসিডি তে। বসু দার কেবিনে অনেক ভাললাগা ধোয়া স্মৃতি আছে আমার। প্লিজ সেগুলো নষ্ট করার আব্দার করে বসিস না''। কট করে কেটে গেল ফোনের লাইন। দু মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল ঊর্মি। হয়তো মেঘকে না জানিয়ে সব কিছু আকাশকে জানানোর এত বড় সিদ্ধান্তটা নেওয়া ওর ঠিক হচ্ছে না, কিন্তু তবুও আজ হয়তো সত্যি আর কিছু করার নেই। আকাশএর অনুভুতি, অভিমান সব কিছুকে পুরোপুরি উপেক্ষা করার মত ক্ষমতা বা ইচ্ছা কোনটাই যে নেই ঊর্মিলা রায়ের।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।