পল্লবী সেনগুপ্ত
সুরটা লক্ষ্য করে একা একাই হেঁটে যাচ্ছিল ঊর্মি। সুরটাকে অনুসরণ করে তার কাছেই পৌঁছাতে চাইছে ও যথারীতি। জায়গাটা ঊর্মির ঠিক চেনা নয়, তবে পুরো যে অচেনা এমনও বলা যায় না। মনে হচ্ছে এর আগেও বোধ হয় কখনও এসেছিল ও এখানে। তবে কবে এসেছিল সেটা ঠিক মনে পড়ছে না। যতদূর মনে পড়ছে এই সুরকে অনুসরণ করেই আগে কখনও এখানে এসেছিল ও।
একটা শিশির ভেজা নরম সকাল। অদ্ভুত মাদকতা জড়ান একটা হাওয়ার ক্রমাগত ঝাপটা বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে ঊর্মিকে। ঝিরঝির করে একটা বৃষ্টিও শুরু হয়ে গেল হঠাৎ। মিহি বারিধারা ভিজিয়ে দিচ্ছে ওর সারা শরীর। ওর এলোমেলো অবিন্যস্ত চুলগুলো কপালের উপর বারবার ছড়িয়ে যাচ্ছে। যেন চূড়ান্ত অবাধ্যতা করে শাসনের সব বেড়াজাল ভেঙ্গে ওরা ঢেকে দিতে চাইছে ঊর্মির দুটো চোখ। এবার কেমন যেন অধৈর্য হয়ে উঠল ঊর্মি। ব্যস্ত হাতে চুলগুলো সরিয়ে জোর পা চালাল সামনের দিকে। মায়াবী সুরটার অনুরণন ক্রমে আস্তে আস্তে কেমন যেন মোহাচ্ছন্ন করে দিচ্ছে ওকে।
ঝিম ধরানো বৃষ্টিটার গতি একটু যেন কমল এবার। নতুন প্রেমিকের আলতো আদরের মত ভেজা বাতাসটাকে দু হাতে মুঠো ভর্তি করে নিতে চাইল ঊর্মি। ওর ভীষণ ইচ্ছে করছে এই সোঁদা গন্ধ জড়ান সবটুকু বাতাস বসন্তের লাল আবীরের মত তার দু গালে ঘষে দিতে। কিন্তু সে কোথায়? বুকের কাছটা এবার কেমন টনটন করে উঠল ওর। কিন্তু না। কোন রকম দুর্ভাবনাকে প্রশয় দিতে পারবে না ও। মন শক্ত করে আবার পা চালাল ঊর্মি। বিগত কয়েকবার যেমন হয়েছে এবার তেমনটা কিছুতেই হতে দেবে না ও।
হয়তো দশ পা হবে বড়জোর, ওটুকু এগোতেই তাকে দেখতে পেল ঊর্মি। সে বসে রয়েছে কাঁচের মত স্বচ্ছ টলটলে জলের ওই নীল নদীটার পাশে। একমনে নিজের সবটুকু প্রানের সুর ঢেলে বেহালার ছড় তুলে বাজনা বাজিয়ে চলেছে। সেই সুরটা। যে সুরটা যেন ঊর্মির কত জন্মের চেনা। যেন এই সুরের মধ্যেই মিশে আছে ঊর্মির অস্তিত্বের সমস্ত অর্থটা, ওর সকল চাওয়া পাওয়ার ইতিবৃত্ত।
দ্রুত পায়ে এবার এগিয়ে গেল ঊর্মি। পিছন ফিরে বসে রয়েছে সে। তাই পিছন থেকে ই শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে। নাঃ, আর কিছুতেই ও একান্ত নিজের মানুষটাকে হারিয়ে যেতে দেবে না।
আচমকা আলিঙ্গনে বোধ হয় বেশ চমকে গেছে সেও। হঠাৎ চারপাশটাকে অখণ্ড নিস্তব্ধতায় মুড়ে থেমে গেছে তার বাজনা। কিন্তু সেই নৈশব্দ বেশিক্ষণ থাকল না। হঠাৎ খুব কাছেই অদ্ভুত সুরেলা কণ্ঠে ডেকে উঠল কি যেন একটা নাম না জানা পাখী। ঊর্মি দেখতে পাচ্ছে পাখীটাকে। থোকা থোকা সাদা তুলোর মত মেঘ ভাসা আকাশটার দিকে ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে কি যেন খুঁজছে পাখীটা। হলুদ আর কমলা রঙ দিয়ে যেন সাজিয়ে দিয়েছে ওকে প্রকৃতি।
এতদিন পর তাকে স্পর্শ করতে পারছে ঊর্মি। বুকের মাঝে এক অদ্ভুত অচেনা জলতরঙ্গ বাজছে আজ ওর। মনে হচ্ছে সবটুকু আবেগ বুঝি এক্ষুনি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ওকে। কষ্ট কষ্ট সুখ মেশান এ এক অদ্ভুত অনুভুতি।
—''কেন? কেন বারবার আমায় একা করে দিয়ে চলে যাও তুমি? বল। কেন এভাবে মুখ লুকিয়ে থাক আমার কাছে? আমাকেই তো ভালবাস তুমিও। তাহলে কিসের এত লুকোচুরি খেলা''?
এবার আস্তে আস্তে সামনের দিকে ফিরছে সে। ধীরে ধীরে আলগা হচ্ছে ঊর্মির বাহুবন্ধন। আজ ঊর্মি দেখতে পাবেই তার মুখ। আর সে লুকাতে পারবে না।
—''ঊর্মি দিদি ঊর্মি দিদি কি হয়েছে তোমার ঊর্মি দিদি? তুমি এভাবে ঘুমের মধ্যে কাঁদছ কেন? তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে নাকি? ''বিনতা দির ঝাঁকানিতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ঊর্মির।আর প্রতিবারের মত এইবারেও অসম্পূর্ণ রয়ে গেল ওর স্বপ্নটা। না, এবারেও ওর দেখা হল না আর তার মুখটা।
—''কেন? কেন ডাকছিলে আমায়? বল কি দরকার''? নিজের স্বভাববিরুদ্ধ চালেই এবার চীৎকার করে উঠল ঊর্মি।
একটু ভয় পেয়ে গেল বিনতাদি। আমতা আমতা স্বরে বলল
—''আমি তো রোজকার মতই তোমার বেড টি নিয়ে এসেছিলাম। এসে দেখলাম তুমি ঘুমের মধ্যে কি সব ভুলভাল বকছ, আর দু চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে তোমার। তাই''.....
—''আচ্ছা ঠিক আছে। রেখে যাও চা।'' এবার একটু সুর নরম হল ঊর্মির।
—''বিনতাদি তুমি কিছু মনে কোর না গো''। মানুষটার সাথে রুক্ষ ভাবে কথা বলে নিজেরই মনটা ভার লাগছে এবার। সে তো কম কিছু করে নি ওর জন্য। ঘাড় নেড়ে চলে গেল বিনতা।
এবার বিছানা থেকে আস্তে আস্তে নামল ঊর্মি। ধীর পায়ে গিয়ে দাঁড়াল ক্যানভাসটার সামনে। একটা বিষণ্ণ মেয়ের মুখের অসম্পূর্ণ ছবি জেগে রয়েছে ক্যানভাসের বুকে।
দুহাত বাড়িয়ে ও ছিঁড়ে ফেলল ছবিটা। না, নতুন ছবি আঁকবে। নতুন ভাবনা, নতুন স্বপ্ন আর নতুন একটা সৃষ্টি। ছবিটাকে আস্তে আস্তে মাথার মধ্যে সাজিয়ে নিচ্ছে ঊর্মি। ভাবনাকে রঙ তুলিতে সাজিয়ে তুলবে এবার।
'ঊর্মি কেন এভাবে চীৎকার করছিলে তুমি? কি হয়েছে তোমার? ভাবনাটা পলকেই ছিঁড়ে গেল ওর।
কখন যেন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে শ্রুতি রায়। মুহূর্তের মাঝে মনটা বিষিয়ে গেল এক অব্যক্ত তিক্ততায়।
কেন? কেন বারবার ওর একান্ত ভাললাগার বা কষ্টের মুহূর্তগুলোতেই এভাবে সামনে চলে আসে শ্রুতি রায়?
—''কি হয়েছে ঊর্মি''? প্রশ্ন করেই চলেছেন শ্রুতি নামের এই ভদ্রমহিলা।
কোন উত্তর দিল না ঊর্মি। শুধু দড়াম করে ভদ্রমহিলার মুখের ওপর বন্ধ করে দিল ঘরের দরজাটা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।