ষষ্ঠ অধ্যায়

পল্লবী সেনগুপ্ত

দুরুদুরু বুকে আজ পা রেখেছে নিজেরই কলেজে আকাশ প্রথমবার। ভয় জিনিসটা ওর মধ্যে খুব একটা নেই। কিন্তু আজ তবুও একটা চাপা টেনশনই কাবু করছে ওকে বারবার। নিজের অতি পরিচিত কলেজের আনাচ কানাচকে আজ শেষ বারের মত ছুঁয়ে দেখার দিন। আজকের পর তো সবটুকুই বেঁচে থাকবে শুধু স্মৃতি হয়ে। সত্যি, এই কলেজ আর কলেজের ইট কাঠ পাথরগুলো আকাশের বুকে চাপা থাকা নিখাদ ভালবাসার ছটফটানির বহু মুহূর্তের স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে আজীবন।

—''আকাশ কিরে আজ এত দেরি করে এলি কেন''? শুভ'র গলা পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল আকাশ। শুভ ওদেরই ব্যাচের ছেলে।

—''না মানে আসলে'' টেনশনে আজ যেন সব কথা হারিয়ে যাচ্ছে।

—''ঠিক আছে তুই বড় অডিটরিয়মে চলে যা। ওখানেই আছে সবাই।''

ঊর্মিও কি ওখানেই আছে? প্রশ্নটা করতে গিয়েও করল না আকাশ। কলেজশুদ্ধ সকলেই জানে আকাশ আর ঊর্মি বেস্ট ফ্রেন্ড, সেখানে ঊর্মির ব্যাপারে আকাশ কিছু জানে না আর ও শুভকে প্রশ্ন করছে এই ব্যাপারটা ভারী বোকা বোকা দেখাবে।

বেশ দ্রুত গতিতে পা চালিয়ে অবশেষে কলেজের বড় অডিটরিয়মে পৌঁছে গেল আকাশ। ঘাম হচ্ছে অল্প অল্প।

অডিটরিয়মটা আজ খুব সুন্দর করে সাজান হয়েছে আলো আর ফুলের মালায়। বিদায় বেলার সাজ যেন ফিসফিস করে বলে চলেছে সকলকে

—'ভাল আছি, ভাল থেকো।। আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখ'।

এখন ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র ছাত্রীরা স্টেজে সমবেত নৃত্য পরিবেশন করছে, আর একটু পরেই শুরু হবে রক ব্যান্ডের গান।

পরিচিত, আধা পরিচিত বহু মুখ সামনে এসে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। কেউ কেউ ছুঁড়ে দিচ্ছে শেষ বেলার সৌজন্যমূলক টুকরো হাসি। আকাশও চোয়াল ফাঁক করছে, কিন্তু কিচ্ছু ভাল লাগছে না। ঊর্মি কই? সে কি তবে আসে নি? যদিও আজ সকালে ফোনেও ঊর্মি আসবে না'ই বলেছিল, কিন্তু আকাশই বারবার অনুরোধ করায় শেষ অবধি রাজী হয়েছিল ও।

না, এখানে ঊর্মি কোথাও নেই। তাহলে সত্যি এল না মেয়েটা! আজকেও মনের কথা বলা হল না ওকে।

তেঁতো মন নিয়ে বড় অডিটরিয়ম ছেড়ে বেরিয়ে গেল আকাশ বাকী বন্ধুদের চোখ বাঁচিয়ে। কিন্তু বেরোতেই চমকে উঠল। অডিটরিয়মের বাইরের বড় সিঁড়িটার উপর বসে রয়েছে ঊর্মি।

ফুল ছাপা সাদা লঙ কুর্তি পরে আজ যেন আরও বেশি মায়াময়ী লাগছে ওকে।

—''একি ঊর্মি তুই এখানে এভাবে বসে আছিস কেন? ভিতরেই বা গেলি না কেন''? চোখে একরাশ বিস্ময় আকাশের ।

—''ভিতরে যাবার জন্য তো আমি আজ আসিনি। ওই অনুষ্ঠানে সামিল হবার জন্য বা ফেয়ারঅয়েল নেবার জন্যও আসিনি। এসেছি শুধু তোর জন্য। তুই আমায় আজ ডেকেছিস বলে''।

শুধু আকাশের কথাতেই আজ এসেছে ঊর্মি! ভাবতেই ভাল লাগায় দমটা কেমন যেন বন্ধ হয়ে এল ওর।

—''ঊর্মি, তোকে আজ এখানে এত বার করে কেন আসতে বলেছি জানিস?'' নিজের বুকের ধুকপুকানি যথাসম্ভব আড়াল করার চেষ্টা করল আকাশ।

—''কেন? তুই আজ ফেয়ারওয়েল আমার সাথে মানে তোর প্রিয় বন্ধুর সাথেই নিতে চেয়েছিলি সেইজন্য। তাই তো''? সহজ সরল জবাব ঊর্মির।

—''হ্যাঁ তাই, মানে না। শুধু তাই নয়। আরও কিছু আছে''।

—''আর কি আছে''? এবার কৌতূহল মেয়েটার চোখে মুখে।

—''চল, আমার সাথে একটিবার চল ওদিকে''। ঊর্মির হাত ধরল আকাশ। ওকে নিয়ে যাচ্ছে ভিড় থেকে সরিয়ে একটু ছোট্ট আড়াল খুঁজতে।

বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করে কে যেন হাতুড়ি পিটাচ্ছে । ঊর্মির হাত ধরতেই আজ কেমন যেন অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে একটা। ঊর্মি ওর প্রিয় বন্ধু হবার সুবাদে এর আগেও কয়েকবার বন্ধুত্বের ছলেই ওর হাত ধরেছিল আকাশ। কিন্তু কই এমন তো তখন কোনদিন হয় নি।

অবশেষে মিনিট দশেক হাঁটার পর আর একটু খোঁজার পর একটু আড়াল খুঁজে পেল আকাশ, নিজের প্রিয়তমার হাত ছুঁয়ে তার পাশে থাকার অঙ্গীকার করার মত ছোট একফালি নিভৃত। ভিড়ে ঠাসা কলেজেরটারই ক্যান্টিনের পিছন দিকটার একটু নিরিবিলি কোণ।

—''কিরে আকাশ কি এমন হয়েছে? কেন আমায় এখানে নিয়ে এলি''? রোদে লালচে হয়ে গেছে ঊর্মির ফর্সা মুখ। তাতে এবার হাল্কা বিরক্তি আর অধৈর্যের ছায়া।

নিজের কথাগুলো মনে মনে সুন্দর ভাবে গুছিয়ে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা করল আকাশ। না, এবার তো বলতেই হবে।

—''ঊর্মি, তুই আমায় সত্যি বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবিস তো''?

—''না ভাবি না। কারণ তুই আমার প্রিয় বন্ধু নস, তুই আমার একমাত্র বন্ধু যে আমায় সব থেকে ভাল বোঝে। যাকে আমি সব কিছু মন খুলে বলতে পারি''। এবার অল্প হাসি খেলেছে মেয়েটার গোলাপি ঠোঁটে।

—''তুই সত্যি চাস আমাদের বন্ধুত্ব সারাজীবন এমনই থাকুক''। আবার সব গুলিয়ে যাচ্ছে আকাশের।

—''হ্যাঁ চাই তো। আর শুধু চাইবার ব্যাপার নয় তো এটা, আমাদের বন্ধুত্ব এভাবেই থাকবে চিরকাল যদি না তোর প্রেমিকা বা বউ এসে আমায় খেঁদিয়ে দেয়''। হি হি হি করে এবার জোরে জোরে হাসছে ঊর্মি।

—''আমার প্রেমিকা বা বউ এসে খেঁদিয়ে দিলে তোর খারাপ লাগবে না''? আস্তে আস্তে ঘন আবেগ বাষ্পীভূত হচ্ছে আকাশের গলায়।

—''হুমম। তা খারাপ তো একটু লাগবেই। কিন্তু কি করা যাবে? তোর বউ বলে কথা! তোর কপালে তো দজ্জাল বউই লেখা আছে আমি নিশ্চিত''। চোখে দুষ্টুমি খেলছে আজ চুপচাপ অন্তর্মুখী মেয়েটার।

—''কিন্তু ঊর্মি, আমি যে পারব না। আমি যে কোন কিছুর বিনিময়েই পারব না আমাদের বন্ধুত্বকে হারাতে মানে তোকে হারাতে। আমি যে সারাজীবন এই ভাবেই তোকে আমার পাশে দেখতে চাই। একদম পাশে''।

—''মানে? এসব কি বলছিস তুই''? গলা কাঁপছে ঊর্মির।

—''হ্যাঁ ঊর্মি আমি ঠিকই বলছি। আমি তোকে হারাতে পারব না। কিছুতেই না। কারণ আমি তোকে ভালবাসি।। খুব ভালবাসি। তুই-ই আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যার বাস্তব স্বত্বা''। ঊর্মির হাত নিজের মুঠোতে শক্ত করে চেপে ধরেছে আকাশ। আবেগে আর বশে রাখতে পারছে না ও।

ঊর্মি কোন উত্তর দিল না। শুধু আস্তে আস্তে সরিয়ে নিল নিজের হাত।

আকাশ তাকাল ওর মুখের দিকে ভাল করে। পড়তে চেষ্টা করল ওর চোখের অভিব্যাক্তি। বুঝতে চেষ্টা করল ওর মুখের রঙ। সে রঙ কি বেদানার মত লালচে আভার কুচি ছড়িয়ে দিচ্ছে ওর দুই গালে নাকি কোন ধূসর মেঘ ঘনাল ওর কাজল কালো দুই চোখে!

না পড়তে পারছে না আকাশ আজ ঊর্মিকে। নিশ্চল পাথরের প্রতিমার মত দাঁড়িয়ে রয়েছে ঊর্মি সবটুকু শোনার পর। যেন ভাষা হারিয়ে গেছে ওর।

—''কি হল ঊর্মি? চুপ কেন তুই? আমি কি কিছু ভুল বললাম? তুই কিছু তো বল''।

এবার অল্প ঠোঁট নড়ল ওর। কিছু বলছে ঊর্মি।

—''না আকাশ না। পারলাম না। আমি তোর কথা রাখতে পারলাম না। কারণটা একান্ত ব্যাক্তিগত রে।'' চোখ দিয়ে টপ টপ করে মুক্তো দানা ঝরছে ওর।

—''আমি জানি তুই কি বলবি। তুই বলবি তো তোর শৈশবটা আমাদের সবার মত নয়। তোর সৎ মা, তোর বাবাও শুধু দায়িত্ব পালন করেই ক্ষান্ত। তাই তিনিও তোর মন থেকে অনেক দূরে। তোকে ভালবাসেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার বাড়িতে কেউ তোর এসব জটিল বাস্তবগুলো মানবে কিনা সেই নিয়ে ভাবছিস তুই তাই তো? বিশ্বাস কর ঊর্মি তোর পারিবারিক জীবন নিয়ে আমার কিছু যায় আসে না যেমন, তেমনই আমার বাড়ির কারোরই কিছু যায় আসে না। আমার বাড়ির সকলে একদম অন্য ভাবনার মানুষ। তোকে ভাল লাগে সেটা মাকে আমি বলেছি, আর তোর তথাকথিত জটিল পারিবারিক অবস্থার কথাও বলেছি। বিশ্বাস কর মা কিচ্ছু মনে করেন নি। সব সহজ ভাবেই নিয়েছেন। শুধু তোকে একবার দেখতে চেয়েছেন। আমার বাবা'ও এরকমই। তাহলে আর কিসের চিন্তা বল''।

—''না আকাশ না। তুই যা ভাবছিস সবটা হয়তো তেমন নয়।আমাদের দেখা আর জানার পরিধির বাইরেও অনেক কিছু থাকে, তুই ধরে নে আমারও তেমন কোন অজ্ঞাত সত্যি আছে যেটা তুই জানিস না। তুই প্লিজ আর কোনদিন আমার সামনে আসিস না আকাশ। আর কোনদিন যে আমাদের বন্ধুত্ব ছিল সেটাও পারলে ভুলে যাস''। কথাটুকু কোনমতে শেষ করেই দু চোখ ভরা জল নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঊর্মি।

-''ঊর্মি ঊর্মি শোন'' না আকাশের ডাকে আর দাঁড়াল না ও। আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল আকাশের ডাকটা তিতকুটে বিষণ্ণ বাতাস আর নাম না জানা কি একটা পাখীর বেসুরো একঘেয়ে ডাকের একটা দুপুরের মাঝে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%