পল্লবী সেনগুপ্ত
সময় বোধ হয় সত্যি একেবারে বয়ে চলা দামাল চঞ্চলা নদীর মত। কোথা দিয়ে যায় বয়ে চলে যায় টেরই পাওয়া যায় না। ঠিক এই কথাটাই নির্জন ব্যালকনিতে বসে বসে ভাবছিল তিস্তা। দেখতে দেখতে কেমন হুহু করে বয়ে চলে গেল গোটা একটা বছর। এখন ভাবতে অবাক লাগে মাত্র মাস চোদ্দ আগেই নয়ন নামের ছেলেটা ছিল ওর কাছে সম্পূর্ণ অচেনা এক মানুষ।
কে ছিল নয়ন? কেউ না, কিচ্ছু না। নিছক এক ভাড়া করা যৌনকর্মী হয়েই তো এসেছিল ও তিস্তার জীবনে। কিন্তু সেই যৌনকর্মীই কখন যেন আস্তে আস্তে দখল করে নিয়েছে তিস্তার মনের সবটুকু। না ছেলেটার শরীরের প্রতি একবারও মনযোগ যায়নি তিস্তার। বরঞ্চ ওকে আজ বিপুল ভাবে বেঁধে ফেলেছে নয়নের সুন্দর মনটা। নয়নের মাঝেই সত্যিকারের একটা মনের অস্তিত্ব বারবার টের পেয়েছে তিস্তা। যে ভালবাসতে জানে, ভালবাসা বুঝতে জানে, খেয়াল রাখতে জানে আর খুব ভাল বন্ধু হতে জানে।
হ্যাঁ সত্যি নয়নের মাঝে একজন প্রকৃত বন্ধুকেই যেন খুঁজে পেয়েছে তিস্তা। প্রথম প্রথম শুধুই পয়সার বিনিময়ে ওর সঙ্গ ভাড়া নিয়ে আশ মিটিয়ে নিজের মন উজাড় করে ওর সামনে নিজের সব জমান যন্ত্রণা ঢেলে দিত তিস্তা।
তারপর আস্তে আস্তে কখন যেন টাকা পয়সা আর পেশাদারিত্বর বাঁধ ভেঙ্গে গেল অজান্তেই। নয়নের সাথে আজকাল প্রায় প্রতি দশদিন অন্তর দেখা করে তিস্তা। কোন অর্থের বিনিময়ে নয়, নয়নও এখন ছুটে আসে বারবার শুধু বন্ধুত্বের তাগিদেই। অনেক হোটেল, রেস্তরাঁ, পার্ক নানা জায়গায় সময় কাটিয়েছে ওরা। নয়নকে কাছে পেলে আর ছাড়তেই ইচ্ছা করে না ওর। মনে হয় ও চলে গেলেই তো আবার উষ্ণতাহীন একাকীত্ব গ্রাস করবে ওকে।
-''নয়ন নিজের পেশার ক্ষতি করে কেন আস তুমি? কেন আমি ডাকলে না করতে পার না''? একদিন জিজ্ঞাসা করেছিল ওকে তিস্তা। উত্তরে অল্প হেসে ছেলেটা বলেছিল
-''তোমায় সুখী দেখতে চাই সব সময়। তোমার ঠোঁটের কোণের ঐ চিলতে হাসিটায় যে বড্ড মায়াময় লাগে তোমায়। তাই সেই হাসিটা যাতে কখনও মুছে যেতে না পারে শুধু নিজের তরফ থেকে সেই চেষ্টাটুকুই করি''। নয়নের উত্তরটা সেদিন মন ভরিয়ে দিয়েছিল তিস্তার। মনে হয়েছিল এই মানুষটাকে যদি সারাজীবনের জন্য পাশে পাওয়া যেত!
তবে জীবনের সব চাপান উতর আর প্রশ্ন চিহ্ন কে উপেক্ষা করেও আজ একটা অন্তিম সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে ও। নয়নকে বা ওর বন্ধুত্বকে কোনদিনই কোন মূল্যেই হারাতে পারবে না তিস্তা। তাইতো আজ প্রথমবার নয়নকে নিজের বাড়িতে ডেকেছে ও। ও আজ জানাবে ওকে নিজের মনের কথা। নয়ন একদিন বলেছিল সে নিজেও বড় একা। নেহাত দায় পড়েই আজ যৌনকর্মী হতে হয়েছে ওকে। তবে যা হয়ে গেছে, তা হয়ে গেছে। কিন্তু আগামী দিনে ওকে এই যৌনকর্মীর জীবন থেকে টেনে বের করে আনবেই তিস্তা। ও যে নয়নকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন সাজিয়ে বসে আছে।
আজ বড্ড ইচ্ছা করছে খুশিগুলো ভাগ করে নিতে। কিন্তু কাকেই বা বলবে ও? সুখ বা দুঃখ কোন কিছু ভাগ করার মত মানুষই যে ওর জীবনে প্রায় নেই।
-''শায়না, শায়না ঐ মেয়ে'' শায়নাকে গলা তুলে ডাকল ও।
-''হ্যাঁ দিদি বল'' ওড়নায় হাত মুছতে মুছতে এসে সামনে দাঁড়াল মেয়েটা। আজকাল ওর অপ্রতিভ ভিতু ভাবটা অনেকটাই কেটেছে আগের থেকে। মাঝে মাঝে বেশ টুকটাক গল্প করে তিস্তার সাথে। মাঝে মাঝেই গুনগুন করে গানও করে। আর মেয়েটা বেশ গুণী। হাতের রান্না তো ওর অসাধারণ। সেলাই ফোঁড়াই ও জানে মন্দ না।
-''শায়না তুই যে ইলিশ ভাপা করেছিলি না একদিন বেশ জম্পেশ করে সেটা কর তো আজ। আর বাকী রান্নার যোগাড় করে দে। আমি বাকি সব রান্না আজ নিজের হাতে করব''।
একটা অবাক ভেবে খেলে গেল শায়নার মুখে। অল্প হেসে বলল
-''কেন দিদি? তুমি কেন রাঁধবে? তুমি তো সাধারণত রান্না কর না''।
-''আজ বাড়িতে একজন আসবে রে। একজন অতিথি''।
বিস্ময়টা আরও বাড়ল শায়নার। হয়তো নামজাদা রেস্তরাঁর মালিক একজন অতিথি আসবে বলে নিজে রাঁধতে চাইছে শুনেই অবাক হচ্ছে ও। তিস্তা চাইলেই তো হোটেলের হাজার পদ চলে আসবে বাড়িতে।
-''আমি জানি, তুই ভাবছিস কেন আমি রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার না এনে নিজে খাবার বানাতে চাইছি তাই তো? আসলে কি জানিস, আজ যে আসবে সে একদম স্পেশাল একজন মানুষ। তাই তাকে নিজের ভালবাসার স্পর্শ মাখান খাবারই আমি খাওয়াতে চাই। বুঝলি''?
-''কে আসবে আজ দিদি''? গাল ছড়িয়ে হাসল পোড়ামুখি মেয়েটা।
-''আমার ভালবাসার জন। আমার মনের মানুষ। আজ তাকে আমার নিজের করে নেবার দিন রে''। অল্প চোখ নিচু করে বলল তিস্তা। বুঝতে পারল লজ্জার লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে ওর দু গালে কথাটা বলতে গিয়ে। বুকের মধ্যে কেমন যেন জলতরঙ্গ বাজছে।
-''সত্যি বলছ দিদি! এটা তো দারুন আনন্দের খবর। কে গো সে? কিন্তু ইশশ! আমি তো তাকে দেখতেই পাব না''। পলকেই বিষাদের ছায়া শায়নার মুখে।
-''ও মা! দেখতে পাবি না কেন? বাড়িতেই তো আসবে সে''।
-''না গো দিদি এই পোড়া চামড়া আর ঝলসান রূপ নিয়ে কারোর সামনে আমার যেতে ভাল লাগে না তুমি তো জান। তাছাড়া তিনিই বা কি ভাববেন বল''।
-''কিচ্ছু ভাববে না। আমার নয়ন তেমন মানুষই নয়। তবে হ্যাঁ প্রথমদিনেই যদি তুই সামনে না আসতে চাস তো না আসবি। কিন্তু পরে তোদের আলাপ করিয়ে দেব আমি। আরে! আমাদের বিয়ের পর তো নয়ন এই বাড়িতেই থাকবে। তবে আপাতত তোর মন ভাল করার জন্য আমি একটা কাজ করতে পারি। তোকে নয়নের একটা ছবি দেখাতে পারি''। ব্যাগ থেকে ঝট করে নিজের দামী মোবাইলটা বের করল তিস্তা। নয়ন একদম ছবি তুলতে চায় না। তাই সেদিন ওর অজান্তেই ঝট করে ওকে ক্যামেরাবন্দী করেছিল তিস্তা। ও জানেই না এখনও। অদ্ভুত ছেলে! ও কি বোঝে না তিস্তার এখন প্রতিটি মুহূর্ত ওকে চোখের সামনে দেখতে ইচ্ছে করে।
-''এই দ্যাখ'' মোবাইলটা শায়নার সামনে মেলে ধরল তিস্তা। ঝুঁকে পড়ে ছবিটা দেখছে মেয়েটা।
-''দিদি তোমাদের বিয়ে কি ঠিক হয়ে গেছে''? জিজ্ঞাসা করল এবার।
-''হ্যাঁ বলতেই পারিস। আমি ওকে ভালবাসি। আর ও আমাকে। বিয়ে ঠিক হতে আর কি লাগে বল। না আমার তিনকুলে কেউ আছে না ওর। তাই বাড়ির মতামতের কোন ব্যাপারই নেই''। আবেগে কেমন যেন ভেসে যাচ্ছে তিস্তা। কোনদিকেই যেন খেয়াল নেই ওর। সেই জন্যই বোধ হয় দেখতেই পেল না নয়নের ছবিটা দেখা মাত্রই দু চোখ জলে ভরে উঠেছে শায়নার। মুখটা রক্তশূন্য ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। নিজেই নিজের গলাটা খামচে ধরল শায়না। না এই চোখের জল তিস্তা দিদিকে দেখান যাবে না। কিছুতেই না। ভাল থাক তিস্তা দিদি এটাই তো চায় ও। আর হ্যাঁ সে ও ভাল থাকুক এটা তো আরও বেশি করে চিরকাল চেয়ে এসেছে ও।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।