চতুর্দশ অধ্যায়

পল্লবী সেনগুপ্ত

রাস্তা দিয়ে ভীষণ অন্যমনস্ক ভাবে হেঁটে যাচ্ছিল তিস্তা। তাই খেয়ালই করে নি যে অনেকক্ষণ ধরে একনাগাড়ে কেউ ডেকে চলেছে ওর নাম ধরে।

—''তিস্তা, এই তিস্তা কিরে কতক্ষণ ধরে ডাকছি শুনতে পাচ্ছিস না?'' রমলা একেবারে সামনে এসে এবার দাঁড়াল তিস্তার। হাঁফাচ্ছে অল্প অল্প।

রমলাকে এতগুলো বছর পর সামনে দেখে যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়ল ও। কিন্তু পরমূহুর্তেই ওর ঠেঁটে ফুটে উঠল একটা পাতলা হাসি।

—''আরে রমু তুই! এখন কলকাতায় বুঝি? উফফ কতদিন পরে তোকে দেখলাম রে''।

—''হ্যাঁরে আমি বেশ কিছুদিন হল কলকাতায় এসে গেছি ''। ঝিকঝিক হাসছে রমলা।

—''সেকি রে কেন?''

—''আসলে হঠাৎ করে বাবা মারা গেলেন। এদিকে মাও অসুস্থ। আমি যদি এসময় মায়ের পাশে না থাকি তাহলে কে থাকবে বল। ''কথাগুলো বলতে বলতেই কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল রমলা।

—''আর তোর প্রেমিক? রাহুল দা?''

—''রাহুলের সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক নেই। আসলে কি জানিস তো তিস্তা, প্রেম হচ্ছে একটা রঙ্গিন অলীক স্বপ্ন; যার কোন অস্তিত্ব বাস্তব জীবনে থাকে না। পাথুরে জমির মত শক্ত কঠিন বাস্তব পরিস্থিতে পড়লে কাঁচের গুলির মত টুকরো টুকরো হয়ে যায় এই প্রেম । ''মুখে কালো ছাপ ঘনিয়েছে রমলার সেটা বেশ বুঝল তিস্তা। নিজের দীর্ঘশ্বাসটাও লুকাবার কোন চেষ্টা করল না ও এবার আর।

—''তুই বল। তোর তো বিয়ে হয়ে গেছে। তুই নিশ্চয় ঘোরতর সংসারী।'' জোর করে সপ্রতিভ হবার চেষ্টা করছে এবার রমলা।

—''হুম বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু খুব কম দিনের মাথাতেই ডিভোর্স হয়ে গেছে। আসলে যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল সে মানসিক ভাবে অসুস্থ একজন মানুষ''। মনে চাপা ক্ষেদ খানিক উগড়ে দেবার চেষ্টা করল তিস্তা পুরনো বন্ধূকে পেয়ে।

আসলে তিস্তার জীবনে বন্ধুর সংখ্যা চিরকালই বড্ড কম। যে দু একজন জুটেছিল তারাও বেশিদিন টিকত না কেউ। হয়তো তিস্তার দৃঢ়চেতা স্বভাব আর বেশি কথা না বলতে পারাই এর প্রধান কারণ। তবে সে যাই হোক এই বন্ধুহীনতার মাঝে রমলা যেন ছিল তিস্তার জীবনে এক মুঠো অক্সিজেন। কলেজ জীবনের প্রথম থেকেই এই মেয়েটা বড্ড কাছের হয়ে উঠেছিল।

রমলার সাথে এক সময় নিজের সব মনের প্রাণের কথা ভাগ করে নিত ও। রমলাও ছিল ঠিক এরকমই। নিজের সব কথা বলত ও তিস্তাকে। কিন্তু কলেজ পাশ করার পর রমলা দিল্লী চলে গেছিল হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়তে। সেখানেই জুটেছিল প্রেমিক। তাই পড়াশুনা শেষ করে ওখানেই চাকরী করছিল একটা বড় কোন রেস্তোরাঁয়। তারপর যা হয় আর কি! দূরত্ব যত বেড়েছে যোগাযোগও ততই ক্ষীণ হতে থেকেছে। তারপর একসময় আপনা থেকেই কেমন যেন নিজের হাতেই সবটুকু যোগাযোগ শেষ করে দিয়েছিল রমলা।

কিন্তু আজ আর এসব ভাবার একদম সময় নেই।

—''তুই কি করছিস রে এখন? কোন চাকরী''? গলা ঝাড়ল তিস্তা ফের।

—''হ্যাঁ রে একটা রেস্টুরেন্টে চাকরী করি। সারাজীবন এ হোটেল সে হোটেলে এভাবেই ঘুরে বেড়াতে হবে হয়তো চাকরির জন্য। জানিস, বড্ড ইচ্ছা ছিল একটা নিজের ব্যবসা করার। রেস্টুরেন্টের ব্যবসা। কিন্তু হল না। অনেকরকম এক্সক্লুসিভ আইডিয়া ছিল মাথায়। কিন্তু পয়সা কোথায়? যাকগে এই সব বাদ দে। তুই বল তো কোথায় রয়েছিস এখন''?

—''আমি একটা লেডিজ হস্টেলে থাকি। নিজের মত নিজে থাকি। কিন্তু একদম কর্মহীন। পড়াশুনায় তো আমার মাথা কোনদিনই ছিল না তাই চাকরি পেয়ে যাব এমন আশা করছি না। কিন্তু কিছু তো একটা করতে হবে। বাবার রেখে যাওয়া টাকায় আর কদ্দিন বসে বসে চলবে? এমন ভাবে বসে খেলে তো কুবেরএর ধন ভাণ্ডারও ফুরিয়ে যাবে একদিন''।

—''তুই ডিভোর্সের পর খোরপোষ পাস নি''? ভুরূতে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞাসা করল রমলা।

—''চাইলেই পেতে পারতাম। কিন্তু নিতে চাইনি। কেন নেব বলতো? যে মানুষটার সাথে সংসারটাই হল না তার টাকা নেব কোন দুঃখে? আর তাছাড়া মেয়ে মানেই পরনির্ভর কেন হবে রে? তার বাবার টাকা, বরের টাকা, তা সে ডিভোর্স হয়ে যাওয়া বরই হোক না এসব নিয়ে কেন চলতে হবে? একটা সাধারণ মেয়ে মানেই তার একজন পুরুষ অভিভাবক দরকার এটা আমি মানি না রে। মেয়েরাও পারে একা বাঁচতে কারো সাহায্য ছাড়া।''

—''তোর কথা গুলো শুনে কেমন যেন বুকের মধ্যে ঝমঝম বৃষ্টি হচ্ছে জানিস। যে আমি একদিন অনেকটা আত্মবিশ্বাসী ছিলাম নানা কারণে আজ সেই আত্মবিশ্বাস আমি অনেকটা হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু তোর কথাগুলো যেন নতুন করে বুকে একটা বিশ্বাসের প্রদীপ জ্বালাচ্ছে রে তিস্তা''।

—''কিন্তু সব কথা এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেরে ফেলতে যে আমি একদম রাজী নই। চল শিগগির? ক্যাফেটায়। ''বন্ধুর হাত ধরে কফি শপের দিকটায় এগিয়ে গেল তিস্তা।

***

ছোট্ট ছোট্ট চুমুক দিচ্ছে রমলা কোল্ড কফির গ্লাসে। ওর সারা মুখে চোখে কেমন যেন ঝড়ের কালচে ছাপ। মনে হচ্ছে বড্ড যেন ধকল গেছে মেয়েটার বিগত কিছু দিনে। একদৃষ্টে ওকে খানিকক্ষণ নিরীক্ষণ করল তিস্তা। কিন্তু রমলার সে দিকে যেন খেয়ালই নেই। বিষণ্ণ চিত্তে কি যেন ভেবেই যাচ্ছে ও।

—''রমু আমার একটা কথা আছে। খুব মন দিয়ে শুনবি কিন্তু''। একটু গলা খাঁকরে কথা শুরু করল তিস্তা।

—''হ্যাঁ বল না''

—''আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে, যেটা তোর সাহায্য ছাড়া হবে না। আমি তো বললামই আমি কিছু একটা কাজে যুক্ত হতে চাই, কিন্তু চাকরী করতে চাইছি না।

আমি তাই ব্যবসা করব বলে ভাবছি রমলা। ইনভেস্টমেন্ট হয়ে যাবে। বাবার রেখে যাওয়া অঙ্কের পরিমাণটা নেহাত কম নয়। এছাড়া বাঁকুড়ার এক গ্রামে আমাদের বেশ খানিকটা জমিও আছে। সেটাও বেচে দেব ভাবছি। সব মিলিয়ে টাকা জোগাড় হয়ে যাব।

আমি রেস্তোরাঁর ব্যবসা খুলতে চাই। বেশ ইউনিক কিছু একটা করব। পয়সা আমার কিন্তু মস্তিষ্ক হবে তোর। পার্টনারশিপে শুরু হবে ব্যবসা। প্রথমে না হয় একদম ছোট করেই করব। এতে তোরও আশা পুরন হবে, আর আমার ও। কিরে তোর কি আপত্তি হবে?''

নিমেষে মুখ চোখ বদলে গেছে রমলার। চোখের মণিতে কোথা থেকে যেন এসে ভিড় করেছে একমুঠো চিকচিকে খুশি।

—''এসব কি বলছিস তিস্তা? এমন হয় নাকি''? গলা থেকে আবেগ লুকাবার চেষ্টা করল না মেয়েটা।

—''না হবার কি আছে? মেয়েরাও যে চাইলে পুরুষ অভিভাবক ছাড়াই স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে বাঁচতে পারে এবং যথেষ্ট টাকা রোজগার করে নিজেদের নিজেরাই নির্বাহ করতে পারে নিজের এবং পরিবারের দায়িত্ব সেটাই আমি পৃথিবীর সামনে দেখিয়ে দিতে চাই''।

—''একদম ঠিক বলেছিস রে তিস্তা''। এবার বন্ধুর হাত চেপে ধরেছে রমলা।

—''আমি আছি রে তোর সাথে। আমি আর তুই মিলে ঠিক প্রমাণ করে দেব মেয়েরাই পারে দশ হাতে অস্ত্র ধরে দশ দিকে সামলাতে''।

বন্ধুর হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে এবার চেপে ধরল তিস্তা।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%