চতুর্থ অধ্যায়

পল্লবী সেনগুপ্ত

বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে আকাশ। কিছুতেই ঘুম আসছে না আজ। আর আসবেও না হয়তো আজ রাতে। মনের ভেতর ছুটোছুটি করছে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। সে তো অবশ্য করারই কথা। আগামীকাল ওর জীবনের ভীষণ বিশেষ একটা দিন। আগামীকাল নিজের মনের মানুষকে প্রথমবারের জন্য নিজের মনের কথা জানাবে আকাশ। ঊর্মিকে ও জানাবে যে সে শুধু ওর বেস্ট ফ্রেন্ড, ঊর্মিই ওর মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা সেই স্বপ্নের নারীর রক্ত মাংসের প্রতিফলন যাকে বারবার খুঁজে ফিরেছে ও নিজের বাস্তব জীবণে।

দেখতে দেখতে যেন চোখের নিমেষে পের হয়ে গেল তিনটে বছর। কিন্তু মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা সবকিছু।

আকাশ পড়াশুনায় বরাবরই বেশ ভাল। তাই ইকোনোমিক্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিল স্নাতক স্বরে। আকাশ উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে। মেধাবী, স্মার্ট আর দেখতে শুনতেও বেশ ভাল। তাই বরাবরই মেয়েদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে ও। কিন্তু কোন মেয়েই সেভাবে কোনদিন মন কাড়তে পারে নি ওর। হ্যাঁ টুকটাক ইনফ্যাচুয়েশন বা সাময়িক ভাল লাগা যে কখনও কারো প্রতি তৈরি হয় নি তা মোটেই নয়, তবে সত্যিকারের প্রেমের অনুভুতির সুঘ্রান কোনদিন স্পর্শ করে নি ওকে। এই কলেজে ভর্তি হবার আগে কোনদিন ও বোঝে নি সত্যিকারের মন হারানো কাকে বলে।

এখনও মনে পড়ে ছবির মত সেই দিনটা। কলেজে তখন সবে এক সপ্তাহ মত হয়েছে। হঠাৎ একদিন চোখে পড়েছিল মেয়েটাকে। সেদিন ক্লাস হচ্ছিল না। সব ছেলে মেয়েরা নিজেদের মত করে মেতেছিল হই হল্লাতে। কিন্তু শুধু একজন যেন সব কিছুর থেকে কি অদ্ভুত কৌশলে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। মেয়েটা এই ফার্স্ট ইয়ারের ইকোনমিক্সই বোধ হয়। তার চোখ দুটো কি ভীষণ অদ্ভুত। চোখে যেন প্রতিমুহূর্তে খেলা করছে আশ্চর্য মায়াবী সহস্র অনুভূতির বুদ্বুদ।

—''এই রবি ওই মেয়েটা কে রে? ও কি আমাদের ব্যাচেরই''? রবিকে চাপা স্বরে সেদিন প্রশ্ন করেছিল আকাশ। রবি ওর স্কুলেরই বন্ধু, কলেজেও ভর্তি হয়েছে একই সাথে একই সাবজেক্টে।

—''কে? ওই মেয়েটা? ওই কচি কলাপাতা সালোয়ার পরা''?

—''হুম''।

—''ওই মেয়েটার নাম ঊর্মিলা রায়। হ্যাঁ আমাদেরই ব্যাচের। তবে মেয়েটা একটু অদ্ভুত। তেমন কোন বন্ধুও নেই। বেশি কারোর সাথে মেশেও না। রোজ কলেজে আসে, ক্লাস করেই আবার বেরিয়ে পড়ে। তবে কার কাছে যেন শুনেছিলাম ও নাম করা হার্ট স্পেশালিষ্ট অনীশ রায়ের একমাত্র মেয়ে''।

রবির কথাগুলো সেদিন ভাল করে ঢুকছিল না আকাশের কানে। ওর দৃষ্টি চুম্বকের মত আটকে ছিল ওই মেয়েটার দিকে। আর বারবার মনে হচ্ছিল এই সে, এই মুখ, এই সারল্য আর আবেগ ভরা দৃষ্টিই যেন আকাশ খুঁজে চলেছে কতদিন ধরে। কে যেন কানে কানে ওকে বলছিল

—''আকাশ এই মেয়ে তোকে ভালবাসার জন্যই এই পৃথিবীতে এসেছে''।

—''জানিস আকাশ, আমার মনে হয় মেয়েটা খুব অহংকারী। পয়সাওয়ালা বাপের মেয়েরা যেমন হয় আর কি!''

—''অহংকারী! না। এ মেয়ে অহংকারী হতেই পারে না''। রবির কথার উত্তরে বেশ জোরের সাথেই কেন যেন বলেই ফেলেছিল আকাশ। আর বুঝতে পেরেছিল 'লাভ এট ফার্স্ট সাইট' বা প্রথম দর্শনে প্রেম বলতে যা বোঝায় তা শুধু গল্প বা উপন্যাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সত্যিকারের মানুষ সামনে এসে দাঁড়ালে সেই অনুভূতিটা আছড়ে পড়তে পারে ঘোরতর বাস্তব জীবনেও।

তারপর কেটে গেছে তিন তিনটে বছর। নানা ঘটনা পরম্পরা আর ভাগ্যের সহায়তায় আকাশ এই তিন বছরে হয়ে উঠতে পেরেছে ঊর্মির একমাত্র ভাল বন্ধু। কিন্তু বন্ধুত্বের বন্ধন যতই মজবুত হোক না কেন ওদের, আকাশ নিজের মনের কথা কোনদিন বলে উঠতে পারে নি ঊর্মিকে। যখনই বলবে ভেবেছে তখনই কেমন যেন একটা ভয় চেপে ধরেছে ওর গলা। ঊর্মিকে হারানোর ভয়, ওর বন্ধুত্ব হারানোর ভয়। ঊর্মি আর সব মেয়েদের মত নয়। ভীষণ অন্যরকম। ইকোনমিক্স পড়তে এসেও বিষয়টাকে ভালবাসতে পারে নি ও। ও সাহিত্য পড়লে বোধ হয় বেশি ভাল হত বারবার মনে হয়েছে আকাশের। একবার তো ও জিজ্ঞাসাও করেছিল

—''তুই সাহিত্য নিয়ে কেন পড়লি না ঊর্মি? আমার মনে হয় ওটাই তোর জন্য বেশি উপযুক্ত হত''।

অদ্ভুত উত্তর দিয়েছিল সে।

—''আমার পড়াশুনা করতেই ভাল লাগে না আকাশ। আমার তো শুধু ভাল লাগে রঙ তুলির আঁচড়ে সাদা ক্যানভাসে রঙিন ছবি সৃষ্টি করতে। আমি যে ভীষণ সৃষ্টি করতে ভালবাসি।

কিন্তু আঁকা নিয়ে পড়াশুনা করে সেই প্যাশনটাকে আমি ছকবন্দী করতে চাই নি। আর রইল বাকি প্রথাগত শিক্ষার কথা, তাতে ইকোনমিক্স পড়ি বা সাহিত্য কি আসে যায়! আমার কাছে পড়াশুনাটা শুধুই ফর্মালিটি।

সাহিত্য তো মনের খুশি আর বিনোদনের জন্য পড়ি আমি। কেনই বা তাকে পরীক্ষা, নম্বর, আর প্রতিযোগিতায় আটকে দিয়ে বিষাক্ত করি বল''।

মনটা এক অদ্ভুত ভাল লাগায় ভরে গেছিল সেদিন ওর কথা শুনে। কটা মানুষ এভাবে ভাবতে পারে! ভালবাসার সাথে ওর প্রতি তৈরি হয়েছিল শ্রদ্ধা। কিন্তু তবুও মনের কথা বলা হয়ে ওঠে নি। ঊর্মিকে তো সব সময় ভাল করে মোটেই পড়তে পারে না আকাশ। ও তো গভীর, নিস্তরঙ্গ নদীর মত যাকে উপর থেকে মাপা যায় না।

কিন্তু তিন বছর পের হয়ে গেছে। কলেজের পার্ট ওদের শেষ। আগামীকাল কলেজে ফেয়ারওয়েল। এরপর সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে আলাদা আলাদা জীবনে। কিন্তু আকাশ তো ঊর্মিকে বিচ্ছিন্ন হতে দিতে পারবে না। তাই আগামীকাল নিজের মনের কথা জানাতেই হবে ওকে। মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা ভাল লাগা মেশান টেনশন হচ্ছে। ঊর্মি বহুবার ওকে বলেছে

—''আকাশ তোর মত ভাল বন্ধু আমি জীবনে কোনদিন পাই নি। তুই আমায় যেভাবে বুঝিস আমায় সেভাবে কোনদিন কেউ বুঝতে পারে নি। তুই তোর বন্ধুত্বের হাত কোনদিন আমার থেকে সরিয়ে দিবি না কথা দে''।

প্রতিবার কথা দিয়েছে আকাশ। ও কি পারবে নাকি ঊর্মির থেকে সরে থাকতে! হ্যাঁ আকাশ মোটামুটি ৯০ ভাগ নিশ্চিত ঊর্মিও নিজের জীবনে ওকেই পাশে চায়। ওকেই ভালবাসে। কিন্তু নিজের জীবনের মাঝে গেঁথে থাকা কিছু সমস্যা আর অনুভূতির দোলাচলের মাঝে ও বুঝতেই পারে না নিজের ভালবাসার আবেগটাকে।

কিন্তু আকাশ এবার সবটুকু বুঝিয়ে দেবে ওকে। ওকে বুঝিয়ে দেবে ও একা নয়, আকাশ সারাজীবনের জন্য ওর পাশে থাকবে ওর হাত শক্ত করে ধরে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%