সপ্তদশ অধ্যায়

পল্লবী সেনগুপ্ত

আঁখি বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল। ঘুম আসছে না কিছুতেই। বিগত কয়েকদিন ধরে এটাই হচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি পাচ্ছে না আঁখি।

এভাবে যে হঠাৎ মিষ্টিদি আর অনি দাদার জীবনে বিপদের কালবৈশাখীর ঝড় আছড়ে পরে ওদের সবটুকু এলোমেলো করে দেবে সেটা স্বপনেও ভাবতে পারেনি ও।

ওদের সাথে কয়েকমাসের জন্যই দূরদেশে বেড়াতে এসেছিল আঁখি। প্রথম দিকে বেশ ভালোই কাটছিল দিনগুলো। মাসখানেকের মধ্যেই বয়ে এল এক সুখবর। মা হতে চলেছে মিষ্টিদি। অনি দাদাও ভীষণ খুশি। অনাগত অতিথির আগমনের কল্পনায় তখন বিভোর নবদম্পতি।

আঁখিও খুশি হয়েছিল। কিন্তু তবুও কোথায় যেন যন্ত্রণার একটা সুক্ষ হুল প্রতিনিয়ত খচ খচ করছিল ওর হৃদয়ে। কেন কে জানে বারবার মনে হচ্ছিল যদি ওর কপালটাও এমন পোড়া না হত তাহলে হয়তো মিষ্টিদির জায়গাটায় আঁখিও থাকতে পারত। এই ছোট্ট ফুটফুটে প্রাণটা ওর গর্ভেও বেড়ে উঠতে পারত।কিন্তু এইসব ভাবনা মনে এসে ভিড় জমালেই সাথে সাথে মনকে প্রবল শাসনের শৃঙ্খল পরিয়েছে আঁখি। ছি! ছি! এসব কি ভাবনা!

তবে মনে মাঝে মাঝে বেয়াড়া স্বপ্নের ঝড় উঠলেও আঁখি যে ভুল করেও কোনদিন মিষ্টিদিদির এক চিলতে ক্ষতিও চায়নি সেই বিষয়ে তো এক ফোঁটাও সন্দেহ নেই ওর। তবু কেন এভাবে এলোমেলো হয়ে গেল সব?

প্রেগনেন্সির যখন মাস দুই সেই সময়ে বাথরুমে স্নান করতে গিয়ে একদিন পা পিছলে পড়ে গেল মিষ্টিদি। বাড়িতে তখন কেউ নেই। অনি দাদাও তখন নিজের কাজে। থাকার মধ্যে শুধু আঁখি একা। আজও সেই দুঃস্বপ্নের মত দিনটা মনে পড়লে আতঙ্কে কেঁপে ওঠে ওর বুক।

ঘরে বসে কি যেন একটা অদরকারি কাজই মন দিয়ে করছিল আঁখি। হঠাৎ ভেসে এল বীভৎস একটা পরিত্রাহি চিৎকার বাথরুম থেকে। আঁখি পড়িমরি করে দৌড়ে সে দিকে যেতেই দেখতে পেয়েছিল দৃশ্যটা। বাথরুমের মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে মিষ্টিদি, পেট চেপে আকুল যন্ত্রণায় মরণ চিৎকার করছে সে।

অচেনা এই বিদেশ বিভুঁয়ে হঠাৎ ধেয়ে আসা এমন এক বিপদের পরিস্থিতে দাঁড়িয়ে কিভাবে সবটা সামাল দেবে কিছুতেই প্রথমে বুঝতে পারছিল না আঁখি। কিন্তু যাহোক, শেষমেশ আশে পাশের দু একজন প্রতিবেশিকে কোনমতে ডেকে সামাল দিয়েছিল ও পরিস্থিতিটা। মিষ্টিদি কে কোনমতে নিয়ে যাওয়া হয় নার্সিং হোমে।

কিন্তু এটা যে সবেই বিপদের শুরু সেটা আর কে জানত তখন! এই ঘটনার পরেই হঠাৎ করেই যেন এলোমেলো হয়ে গেল সবটুকু। ডাক্তার জানালেন মিষ্টিদির গর্ভে থাকা সন্তানকে বাঁচান যায়নি। শুধু তাই নয়, মিষ্টিদি সারাজীবনের মত হারিয়ে ফেলেছে সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা।

এই সত্যিটাই মেনে নিতে পারে নি মিষ্টিদি। এখনও পারছে না। আস্তে আস্তে মানসিক ভাবে নিদারুণ অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে ও। ইদানীং তো ভাল করে খেতে অবধি চায় না, কারোর সাথে কথা বলে না। সারাদিন একদৃষ্টে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে আর মাঝে মাঝে বীভৎস চীৎকার করে ডুকরে কেঁদে ওঠে। একটা পুতুল কোলে নিয়ে কি যেন বিড়বিড় করে সারাদিন। মেয়ের এই অবস্থা শুনে মাসী মেসোও চলে এসেছিল এখানে। কিন্তু তাদের সামনেও চুপ মিষ্টিদি, ঠিক যেন মাটির প্রতিমা।

দিন দিন অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে মেয়েটার। এবার বোধ হয় রিহ্যাবেই পাঠান হবে ওকে। আর তার সাথে আঁখিও প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছে নিজের মনে জমে থাকা একটা অপরাধবোধের সাথে। বারবার মনে হচ্ছে ওর মনের কু খেয়ালে জন্যই বোধ হয় ঘটল এসব সর্বনাশ।

টুক টুক টুক দরজায় টোকা পড়ল হঠাৎ। খুব মৃদু টোকা। একটু চমকেই গেল আঁখি। এত রাতে এখানে ওর শোবার ঘরে কে এভাবে নক করতে পারে। তবুও খুলতে তো হবেই দরজাটা।

দরজা খুলতেই চমকে উঠল ও। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছে অনি দাদা। বিধস্ত ঝোড়ো কাকের মত লাগছে ছেলেটাকে।

—''তুমি''! একরাশ বিস্ময় বেরিলে এল আঁখির গলা চিরে।

কোন উত্তর না দিয়ে ওকে ঠেলেই ভিতরে ঢুকে গেল অনিদাদা। চোখের কোলে জল চিকচিক করছে মানুষটার।

হুট করে জড়িয়ে ধরল সে হঠাৎ আঁখির হাত।

—''আঁখি প্লিজ। তুমিই একমাত্র এখন আমাদের বাঁচাতে পার। তোমার দিদির শরীরের যা অবস্থা তাতে হয়তো খুব শিগগির ওকে মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠাতে হবে। ডাক্তাররা সেরকমই আভাস দিচ্ছে। কিন্তু আমি ওকে এভাবে এই ধরণের যন্ত্রণার মধ্যে ঠেলে দিতে পারব না।

ওর এই মারাত্মক ডিপ্রেশনের কারণই হল কোন বড়সড় আঘাত। এই আঘাত হল মা হতে না পারার আঘাত। তাই ওকে এখন ঠিক করতে একমাত্র প্রয়োজন একজন সন্তান।''

—''কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব?''

—''তুমি চাইলেই হবে আঁখি। তোমার দিদির এই স্বপ্নপূরণ হতে পারে একমাত্র নিজের সন্তানের সান্নিধ্য পেলে। তার আসার খবর পেলে।''

—''কিন্তু এখানে আমি করবো''? একটু বিস্মিত হল আঁখি।

—''তোমাকে সারগেট মাদার হতে হবে আমাদের সন্তানের। পারবে না''?

—কি! সারগেট মাদার! সেটা কি জিনিস? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। এসব কি বলছ তুমি''? সাংঘাতিক রকম চমকে গেছে আঁখি। রাত দুপুরে কি বউ সোহাগি অনি দাদার মাথাটা খারাপ হয়ে গেল? এসব বলছে টা কি?

কয়েকমুহূর্ত চুপ রইল ছেলেটা। তারপর মেঝের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল

—''আই অ্যাম সরি। আমার হয়তো এভাবে তোমাকে বলাটা ঠিক হয়নি''।

আঁখি তখনও আকুল অন্ধকারে। কিছুই বুঝছে না ও। আস্তে আস্তে বলল

—''কিন্তু সারগেট মাদার মানে কি? আমায় একটু বুঝিয়ে বলবে''?

—''ব্যাপারটা হয়তো এক কথায় সহজে বুঝিয়ে দেবার মত নয় আঁখি। তবু খুব সরল করে বলতে গেলে সারগেট মা নিজের গর্ভ ধার দিয়ে থাকেন অপর একজন মাকে। মানে এমন একজন মহিলা যিনি হয়তো শারীরিক ত্রুটির জন্য নিজের সন্তান-এর ভ্রূণ কে নিজের শরীরে বহন করে উঠতে পারবেন না, সারগেট মাদার সেই মাকে নিজের জঠর ধার দিয়ে থাকেন বলতে পার।

১৯৮৫ সালেই সর্বপ্রথম একজন মহিলা সারগেট মা হিসাবে সফল হন আমেরিকাতেই। সারগেসি অনেকভাবেই হতে পারে। তবে সাধারনত উদ্দিষ্ট মায়ের ডিম্বাণু ও উদ্দিষ্ট বাবার শুক্রাণুকে কৃত্রিম ভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিষিক্ত করে ভ্রূণ সৃষ্টি করে সেই ভ্রূণকে প্রতিস্থাপিত করা হয়ে থাকে সারগেট মাদারের গর্ভে। দশমাস দশদিন সারগেট মা'ই বহন করে সেই সন্তানকে।

তবে সব কিছু প্রসেস শুরু হবার আগে আইনি লেখা পড়া চুক্তি ইত্যাদি অনেক কিছু নিয়ম থাকে, যাতে সারগেট মায়ের কোন দাবী ভবিষ্যতে সন্তানের ওপর থাকবে না এটা নিশ্চিত করা হয়''। একটানা এতটা বলে থামল অনি। আঁখিও চুপ। দুজনের নীরবতাতেই কেটে গেল বেশ খানিকটা সময়।

—''আচ্ছা আমি চলি। ও ঘুম ভেঙ্গে আমায় দেখতে না পেলে আরও অস্থির হয়ে পড়বে''। উঠে দাঁড়াল অনি।

—''তুমি কি চাও আমি তোমাদের সন্তানের সারগেট মা হই''? এতক্ষণে মুখ খুলল আঁখি।

—''না আঁখি। আমি সেটা ক্ষণিকের ভাবনায় ভেবেছিলাম স্বার্থপরের মত। কিন্তু আমি এতটাই আত্মকেন্দ্রিক নই যে নিজের সুবিধার জন্য তোমার জীবনটা নষ্ট করে দেব। তুমি একজন অবিবাহিতা মেয়ে। সামনে তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। আমি কোনভাবেই তোমায় এসবে জড়াতে পারি না''।

—''আমি রাজি আছি। আমি হতে চাই সারগেট মা''। অনির চোখে চোখ রেখে বলল এবার আঁখি।

—''না এটা হয় না আঁখি। কেন তুমি এসব বলছ? মিষ্টির মা বাবা তোমায় বড় করেছেন সেই ঋণ মিটাতে চাইছ আমাদের দয়া করে''?

—''দয়া করার মত বড় মানুষ আমি নই বা হতেও চাই না সেটা হয়তো তুমি জান। তবে হ্যাঁ ঋণমুক্তির কথাই যদি বল তাহলে বলব সারাজীবন ঋণভারে ত্রস্ত আর কেই বা থাকতে চায় বল? তবে ব্যাপারটা ঠিক সেরকমও না। আমি সত্যি মিষ্টিদিদিকে খুব ভালবাসি। আমিও চাই ও আবার আগের মত হয়ে যাক। আর সেটা করার জন্য আমি যদি কোনভাবে কাজে লাগতে পারি তাহলে তার থেকে ভাল আর কিই বা হতে পারে''?

—''কিন্তু''

—''আর কোন কিন্তু নয় অনিদা। রাত অনেক হয়েছে। তুমি শুয়ে পড়। আমি শোব''।

—''আচ্ছা। গুড নাইট। পরে আবার কথা হবে''। শুভরাত্রি জানিয়ে ধীর পায়ে বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল অনি।

দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় আবার ফিরে এল আঁখি। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অচেনা অনুভূতির দল দাপাদাপি শুরু করেছে হঠাৎ।

অনি দাদারর সন্তান শেষমেশ তাহলে ওর গর্ভে! নাই বা হল আঁখি সে সন্তানের বায়োলজিক্যাল মাদার, তবুও মা তো। দশমাস দশদিন গর্ভে রাখা মা। নাড়ির টান এর জোর যে বড় পোক্ত।

বড্ড ইচ্ছা করছে হঠাৎ করে আঁখির মা হতে। অনি দাদার সন্তানের মা। বেশ হবে যদি একটা ছোট ফুটফুটে মেয়ে আসে ওর গর্ভে! মিষ্টি দিদি তার মা হলেও আঁখিও সাজাবে তাকে মনের মত করে। নিজের জীবন, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আর ভাবতে ইচ্ছে করছে না একটুও আর ওর। মা হওয়ার আনন্দ বোধ হয় একেই বলে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%