পল্লবী সেনগুপ্ত
ক্লান্ত ধীর পায়ে করিডর পেরিয়ে নার্সিং হোম চত্বরটার বাইরে এসে দাঁড়াল তিস্তা। বাইরেটায় বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে প্রাক বসন্তকালীন। সেই মিঠে হাওয়াই প্রাণ ভরে নিজের ফুসফুসে ভরে নিতে চাইল । বিগত কয়েকটা দিন ধরে কি কি যে হল, কেনই বা হল, কোথা থেকেই বা হল সেটা ভাবার তেমন কোন সময়ই পায়নি ও।
নয়নকে সত্যি বড্ড ভাল লেগেছিল তিস্তার। আস্তে আস্তে একটা নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। যৌনকর্মী হলেও নয়ন বিশ্বাস নামের ঐ ছেলেটার মাঝে একটা প্রকৃত মন দেখতে পেয়েছিল ও। আর এই সব কারণেই বোধ হয় ছেলেটাকে নিয়ে রঙিন পৃথিবী সাজানোর সবুজ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল ওর অবুঝ আবেগি মনটা। কিন্তু বিনিময়ে কি পেল? আবার একরাশ প্রত্যাখান।
সেই সন্ধ্যার পর থেকে নয়ন যেন বেমালুম হাওয়া হয়ে গেছে তিস্তার জীবন থেকে। প্রথম প্রথম বেশ রেগে থাকলেও পরে সেই রাগ অনেকটা কমে এসেছিল ওর। তাই টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল বেশ কয়েকবার। কিন্তু প্রতিবারই ফোন বাজতে বাজতে থেমে গেছে একসময়।। বেশ অনেকবার চেষ্টা করেছিল ও। কিন্তুপ্রতিবারই ফল একই রকম হয়েছে। মনে হচ্ছে এমন যেন নয়ন বলে আসলে কেউ কোনদিন ছিলই না ওর জীবনে। সবটাই যেন অলীক কল্পনা, যেটা হঠাৎ হাওয়ায় মিশে গেছে।
এমনই একটা মন খারাপের বিকালে অফিসে বসে বসে ও ভাবছিল নয়নএর কথা। ঠিক তখনই ওর মোবাইল যন্ত্রে ঝড়ের মত আছড়ে পড়েছিল ফোনটা।
-''দিদি দিদি আমি বিজু বলছি। আমায় চিনতে পারছ''? হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে ক্লিষ্ট স্বরে বলেছিল একটা ছেলে।
-''কে বিজু?''
''আমায় চিনতে পারলে না দিদি? আমি অরূপ দা-এর কাছে কাজ করি। ভুলে গেছ আমায়''? পলকেই তিস্তার মনে পড়ে গেছিল ছেলেটার মুখটা। আর তার সাথেই মনে এসে ভিড় করেছিল স্বল্প মেয়াদী একটা অসুখী বিবাহিত জীবনের একরাশ স্মৃতি। কিন্তু সেই ফেলে আসা অতীত আবার কেন এসে দাঁড়াতে চাইছে ওর মুখোমুখি?
-''কি ব্যাপার? হঠাৎ এখানে ফোন কেন''? কঠিন স্বরে জিজ্ঞাসা করেছিল তিস্তা।
-''দিদি, দাদা মনে হয় বাঁচবে না আর দিদি। দাদা খুব অসুস্থ দিদি। নার্সিং হোমে ভর্তি। ডাক্তারবাবুরা বলছেন বাঁচার আশা কম। দাদার পাশে এই দুঃসময়ে কোন আপন মানুষ নেই। টাকা পয়সার হালও খারাপ। তুমি একটিবার এস গো''।
অরূপ দাস মৃত্যুশয্যায়! খবরটা কেমন যেন ধাক্কা মেরেছিল দপ করে তিস্তার বুকের ভেতর। না কেউ হয় না এই লোকটা ওর। তবুও মনের ভেতর থেকে কেন কে জানে কোনদিনই ওকে সরাতে পারেনি তিস্তা। ঘেন্নার ভেতরে হলেও বেঁচে ছিল সে চিরকাল ওর মনের চোরা কুঠুরিতে। এই সেই পুরুষ যাকে নিয়ে প্রথম ভালবাসার ঘর সাজাবার স্বপ্ন বুনেছিল ও, হয়তো সেই কারণেই মানুষটা মনের এক চিলতে জায়গায় ঘেন্না নিয়ে হলেও পড়েই ছিল। এই লোকটার থেকেও যোগ্যতর হয়ে উঠে ওর সব অপমানের জবাব দেবার অদম্য জেদই তো একদিন ওর মধ্যে তাগিদ সৃষ্টি করেছিল কিছু করে দেখাবার। সফলতা আলিঙ্গন করেছিল ওকে। সেই মানুষটাই আর থাকবে না? না অরূপের পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার ষড়যন্ত্রটা সেদিন কিছুতেই মেনে নিতে পারে নি তিস্তা। তাই পৌঁছে গিয়েইছিল সেদিন লোকটার মৃত্যুশয্যার পাশে।
না তার ইহলোক ছাড়ার চক্রান্তটা মিথ্যা করে দিয়েছে তিস্তা। মরতে দেয়নি লোকটাকে। এখন খানিক স্থিতিশীল অরূপের অবস্থা। মানুষটা ছুটে বেড়াচ্ছিল সাফল্য খোঁজার প্রচেষ্টায়। ভালবাসা, পরিবার, বন্ধন এই শব্দগুলোকে ঘৃণা করত সে। কিন্তু আজ জীবনই তাকে বিনিময়ে ফিরিয়ে দিয়েছে এক দলা বিতৃষ্ণা। প্রাণে বেঁচে গেলেও শরীরের নিম্নাংশ অকেজো হয়ে গেছে তার। আর্থিক অবস্থাও খুব সুবিধার নয়। এখন থেকে হুইল চেয়ার, ফিজিওথেরাপি এগুলোকে সাথী করেই ওকে অনেকটাই পরনির্ভর হয়ে বেঁচে থাকতে হবে।
আজ প্রায় বাহাত্তর ঘণ্টা পর অচেতন অবস্থা কেটে চেতনায় ফিরেছে অরূপ। জ্ঞান আসা মাত্রই নাকি বারবার তিস্তাকে খুঁজেছে সে। তিস্তাকে সামনে দেখতে পাওয়া মাত্রই অসহায় ভাবে হাতটা শুধু ওর দিকেই বাড়িয়ে দিচ্ছিল মানুষটা। নাকে মুখে নল গোঁজা ওই নুয়ে পড়া লোকটার মধ্যে কোনভাবেই খুঁজে পাচ্ছিল না তিস্তা অনেকগুলো বছর আগে দেখা বিয়ের রাতের সেই দাপটে লোকটাকে।
তিস্তার হয়তো উচিত ছিল ওর আকুতিভরা হাতের আবেদনটাকে তাচ্ছিল্য ভরে প্রত্যাখান করা ঠিক তেমনভাবেই যেমনভাবেই একদিন ওর স্বপ্নভরা হৃদয়টাকে ছুঁড়ে ফেলে ভেঙ্গে দিয়েছিল ঐ অরূপ দাস। কিন্তু তিস্তা পারেনি। অসহায় লোকটার শেষ ভরসাটুকু প্রতিশোধের তাড়নায় দলে পিষে চুরমার করে দিতে পারেনি। অরূপের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে ওকে আজ বুঝিয়ে দিয়েছে ও যে আমি আছি তোমার সাথে। তুমি শুধু সেরে ওঠো।
কিন্তু কেন করল তিস্তা এটা? নিজেই যেন কোন উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। শুধুই কি অরূপের প্রতি করুণার বোধ ছিল এর পিছনে? হয়তো সমীকরণটা ওত সহজ সত্যি নয়। নিজের মনে আজও হয়তো সেই ফেলে আসা সংসারটার জন্য টুকরো মায়া লুকিয়ে ছিল ওর। হয়তো হাজারো ব্যস্ততার ভিড়ে সেই মায়াটুকু ও নিজেই দেখতে পায়নি কোনদিন। আসলে রোজনামচার বেঁচে থাকার জীবনের আড়ালে হয়তো সবারই লুকিয়ে থাকে অদেখা আর একটা জীবনের খোঁজ, যেটা মানুষ নিজেই বুঝতে পারে না অনেক সময়। নিজের প্রকাশ্য সফল জীবনটার আড়ালে যে একাকীত্বময় জীবনটা বয়ে বেড়ায় তিস্তা সেই জীবনটার থেকে মুক্তির একটা স্বপ্নই হয়তো ওকে বাধ্য করেছে আবার অরূপকে নিজের জীবনে সামিল করে নিতে। হোক না সে প্রাক্তন, হোক না পঙ্গু, হোক না বিতৃষ্ণায় বেঁচে থাকা কেউ তবুও একজন সঙ্গী তো। জীবনসঙ্গী শব্দটার ব্যাপ্তি অনেক গভীর, সেই গভীরতাকে আজ একবার ছুঁয়ে দেখতে বড্ড ইচ্ছা করছে তিস্তার।
আস্তে আস্তে পার্কিং-এ রাখা গাড়িটার দিকে এগিয়ে চলেছে তিস্তা। আজকের মত একটু বিশ্রাম দরকার। কাল থেকে শুরু হবে আবার একটা নতুন সকাল। হঠাৎ কি যেন একটা গন্ধ এসে ঝাপটা মারল তিস্তার নাকে। চমকে উঠল ও। ঠিক এই গন্ধটাই মাখত না সে? নয়ন বিশ্বাস? আবার হুট করে মনে পড়ে গেল নয়নের মুখটা। কি করছে এখন নয়ন? আবার কি অন্য কোন রমণীর মন ভোলাচ্ছে নিজের শরীরী খেলা দিয়ে? ঘর বাঁধার স্বপ্নকে ভয় পায় নয়নরা? নাকি ঘেন্না করে নাকি পালিয়ে বেড়াতে চায়? যেমন একদিন অরূপও চাইত। আজ সেই অরূপই ঘর খুঁজছে মরিয়া হয়ে। হয়তো একদিন নয়নও ঘর খুঁজবে। হয়তো একদিন সেও বাঁধা পড়তে চাইবে সংসার নামক মায়ার বাঁধনে।
গাড়িতে উঠে পড়ল তিস্তা। ধীর লয়ে চলছে গাড়ি শহরের ধোঁয়া আর ধুলোকে পিছনে ফেলে। হুট করে কি একটা ভেবে ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করল তিস্তা। মেসেজ আইকনের আঙ্গুল ছুঁয়ে টাইপ করছে দ্রুত লয়ে
-''ভাল থেকো নয়ন। হয়তো সেদিন তোমার প্রত্যাখানটা না পেলে আজও বুঝতেই পারতাম না যে জীবনে চাওয়া আর পাওয়ার কতটা তফাত হয়। তোমাকে পেয়ে মনে হয়েছিল তুমি একদম আমার মনের মত, ঠিক যেন আমার স্বপ্নে লুকিয়ে থাকা এক রাজপুত্র। কিন্তু তোমার প্রত্যাখান আমায় বুঝিয়ে দিয়েছে স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝের সীমানাটা অতিক্রম করা যায়না। জোর করে করতে গেলে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়ে রক্তাক্ত হতে হয়, ঠিক যেভাবে আমায় ক্ষত বিক্ষত করেছিল তোমার অপমান।
জান প্রথমে খুব রাগ হয়েছিল, অস্থির লেগেছিল তোমায় এভাবে আমার জীবন থেকে মুছে যেতে দেখে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি হয়তো দোষটা তোমার নয়। সংসারের বন্ধনে নিজেকে বেঁধে নিতে হলে, কাউকে ভালবাসতে গেলে যে শক্তিটা প্রয়োজন হয় সেই শক্তিটা তোমার নেই। তাই পালিয়ে যাওয়াটাই হয়তো তোমার কাছে বেশি সহজ বিকল্প ছিল।
তবে পালিয়ে তো সারাজীবন বাঁচা যায় না। তাই তুমিও পারবে না। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করব যাতে তুমিও বন্ধনের সুখ থেকে বঞ্চিত না হও, ভগবান তোমার শিরদাঁড়ায় সেই শক্তি দিন।
তোমার মনে আছে আমি তোমায় আমি আমার প্রাক্তন স্বামী অরূপের কথা বলেছিলাম যে ঠিক তোমার মতই দুর্বল আর ভীরু হয়েও শক্তিশালী হবার ভ্রমে ভুগত। একদিন আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল সে, সংসার করার সৎ সাহস সেদিন তার ছিল না। কিন্তু আজ সেই ভেঙ্গে চুরে গেছে, মরিয়া হয়ে খুঁজছে একফালি ভালবাসার আশ্রয়। আর আমিও তাকে ফিরিয়ে নিয়েছি আমার জীবনে। তাকে সুস্থ করে তার সাথে বাঁধা পড়ব সংসারে, কারণ আমি ভীরু নই। আমার মেরুদণ্ড যথেষ্ট শক্ত। ভাগ্যিস তুমি সেদিন ফিরিয়ে দিয়েছিলে সেইজন্যই তো আজ চিনতে পারলাম নিজের মনের অদেখা দিকটা, বুঝতে পারলাম নিজেরই আভ্যন্তরীণ শক্তিটুকু। কাউকে আপন করে তোলা খুব সহজ কাজ নয়, অনেকটা শক্তি লাগে তাতে। আমার সেই শক্তিটাই আজ আমার গর্ব''।
এতটা লিখেই মেসেজটা পাঠিয়ে দিল তিস্তা। বেশ তৃপ্তি অনুভব করছে ও। বুক ঠেলে বেরিয়ে এল একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস। মন দিয়ে এবার নয়নের ফোন নম্বরটা ব্লক করল। গাড়ির সিটে এলিয়ে দিল নিজের অবসন্ন শরীরটা। বাটন টিপে নামিয়ে দিল গাড়ির কাঁচ। বাইরের ঠাণ্ডা বাতাসটা ছুঁয়ে দিচ্ছে ওর মন শরীর ভেদ করেও। বড্ড আরাম হচ্ছে তিস্তার আজ অনেকযুগের পরে। ভীষণ ইচ্ছা করছে একটা নিশ্চিন্ত ঘুম দিয়ে শরীর মনের সবটুকু ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।